Tuesday, January 7, 2020

জুম্ম জাতির মূল্যায়নের দিন -১০ নভেম্বর----রুপায়ন দেওয়ান

-রুপায়ন দেওয়ান                         

ভূমিকাঃ
 পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগন এখন শান্তির উদ্গ্র প্রত্যাশী।প্রতিনিয়ত তাঁরা শান্তির আকাঙক্ষা ব্যক্ত করে চলেছেন।কারণ জেএসএস-ইউপিডিএফ ও জেএসএস মধ্যকার দ্বন্ধ।এই দ্বন্ধের সূচনাকাল ১৯৯৭ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর,চুক্তিকে ঘিরেই।এরপর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(জেএসএস) আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিখন্ডিত হয় ২০১০ সালের ২৯-৩১ মার্চ,খন্ডিত(গঠণতন্ত্র লঙ্ঘন করে দলের একটা অংশকে এ জাতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ হতে বাদ দেয়া হয়) জেএসএস এর নবম জাতীয় মহাসম্মেলনের(কংগ্রেস) মাধ্যমে; সম্পূর্ণ অবৈরী দ্বন্ধের কারণ হতেই। প্রকৃতপক্ষে জেএসএস এর দ্বন্ধ কর্মী মহলে প্রকাশ্য রুপ নেয় ২০০৫ এর মাঝামাঝি এবং ২০০৬ এর মার্চ এর ৮ম কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। জেএসএস এর ‘অবৈধ’ সভাপতি সন্তু লারমা পরিবর্জন নীতি বা ভাঙন নীতি গ্রহণ করেন এই কংগ্রেসেই। পার্টির সাংগঠনিক নীতিমালার বিরুদ্ধে গিয়ে,একই বছর নভেম্বর এর সাধারণ কর্মী সম্মেলন ‘পার্টি লাইন’ যাঁরা মানতে পারবেন না তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ধূল তুলোতুলি’র অর্থাৎ নির্মূলীকরণের হুমকি প্রদান করা হয় পার্টির সহসভাপতি লক্ষী প্রসাদ চাকমার মুখ দিয়ে।
বর্তমান চলমান দলীয় দ্বন্ধ সংঘাত ব্যাপক কর্মী,ছাত্র-যুবা,শুভাকাঙ্ক্ষী ও জুম্ম জনগনকে হতাশাগ্রস্থ করে চলেছে।এই দুঃসময় হতে পরিত্রাণ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বক্ষ্যমাণ লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে,গৃহযুদ্ধের উপর করা গবেষণার পান্ডুলিপির কিছু চুম্বক অংশ দিয়ে। এটি পাঠে ১৯৮৩-১৯৮৫ সনের গৃহযুদ্ধের একটা নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া সম্ভব।তবে উৎসুক সুধী পাঠকের অনেক জিঙ্গাস্য থাকবে বা বিস্তারিত চিত্র পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে,যা সংগত কারণে সীমিত কলেবরের এই লেখাটিতে পাওয়া সম্ভব নয়।এই গৃহযুদ্ধে আমিও পার্টিধারার পক্ষে অনেকের মতো একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম।তাই,আমার নিরপেক্ষতার মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে ।বিদ্রোহী গ্রুপের কেউকেউ কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও পেতে চাইবেন।সে জন্য তাদেরকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে ।
গৃহযুদ্ধের সঠিক কার্যকারণ খোদ গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেকের কাছে অজানা।তাই, কারো কারো কাছে গৃহযুদ্ধটি অন্ধলোকের হস্তিদর্শ্নতুল্য।এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, গৃহযুদ্ধ বিষয়ে জেএসএস এর প্রকাশনাগুলোর কিছু লেখা শুধু পক্ষপাতদুষ্ট নয়,স্তাবকতা অ কেন্দ্রভিমূখ দোষেও দুষ্ট।কিছু ক্ষেত্রে শালীনতাহীনতার দোষেও দুষ্ট।
গৃহযুদ্ধে ইউনিটসমূহের পক্ষাপক্ষবলম্বন চলে।বিদ্রোহী পক্ষে অবস্থান নেয় ১নং সেক্টর,বিশেষ সেক্টর ও ৪নং সেক্টর ।তবে বিশেষ সেক্টরের ‘ডি’ জোন(দীঘিনালা) কেন্দ্রের পক্ষে থাকে এবং ৪নং সেক্টরের যুদ্ধক্ষেত্রে আগত সম্পূর্ণ জনশক্তি কমান্ড পোষ্ট বি এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।কেন্দ্রের পক্ষে অবস্থান নেয় ৩নং সেক্টর,৫নং সেক্টর,২নং সেক্টর,’ই’ কোম্পানি,’এফ’ কোম্পানী,স্পেশাল কোম্পানী ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্স এবং কমান্ড পোষ্ট বি ।জিএইচকিউ(জেনারেল হেডকোয়াটার্স) এর আওতায় কমান্ড পোষ্ট, এর আওতায় সেক্টর ও সেক্টরের আওতায় জোন (পরবর্তীতে এরিয়া)।তখন একটি কমান্ড পোষ্ট ছিল,১৯৯১ সনে ৩টি করা হয়। ২৯জন কেন্দ্রীয় সদস্যদের মধ্যে ১৫জন কেন্দ্রের পক্ষে,১০ জন বিদ্রোহী পক্ষে,২ জন জেলবন্দী(জ্ঞানময় চাকমা ও স্নেহ রঞ্জন চাকমা),১জন আলঙ্কারিক(মংসানু  চৌধুরী) ও ১জন নিরপেক্ষ ছিলেন।সাধারণ সম্পাদক(ভবতোষ দেওয়ান) বিদ্রোহী পক্ষে এবং সভাপতি(এমএনলারমা) ও ফিল্ড কমান্ডার ( সন্তু লারমা) কেন্দ্রের পক্ষাবলম্বন করেন।

দ্বিতীয় কংগ্রেসঃ
জেএসএস এর প্রথম বিভাজন বা ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষকে তথা জুম্মজাতির গৃহযুদ্ধকে বুঝতে হলে ১৯৮২ সনে (২৪-২৭ সেপ্টেম্বর ) অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেস এর চিত্রটি পাওয়া দরকার।শুধুমাত্র এই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত করার জন্য পানছড়ি থানাধীন চেঙ্গী মৌজার টঙ্গপেদা কার্বারী আদামের পশ্চিমে এহতমরা ছড়ার ‘থুম’ বা উৎস  এলাকার এক গভীর জঙ্গলে অস্থায়ী ব্যারাক নির্মাণ করা হয়।এই ব্যারাক নির্মাণ ও নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব ছিল বিশেষ সেক্টরের।কয়েকটি কারণে এই কংগ্রেস জেএসএস এর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এই কংগ্রেসেই জেএসএস এর ইতিহাসে সশস্ত্র উপায়ে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা চলে এবং কেন্দ্রীয় কমিটি গঠণের জন্য প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বিদ্রোহী ঘরানার লেঃ সুকাশ (বকুল চন্দ্র চাকমা,পানছড়ি) সাক্ষাৎকার প্রদানের সময় বলেন,
”আমি মায়নী মিশনে  নিয়োগপ্রাপ্ত হলে মিশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার পূর্বে দেবেন দা (দেবজ্যোতি চাকমা) আমাকে নির্দেশ প্রদান করেন,

(১ মায়নী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের উত্তর অংশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরীদের শত শত লোক কর্তৃক ফিবছর করা জুমচাষ বন্ধ করার জন্য প্রেরিত অভিযানের নাম।অভিযানটি ২৮ আগস্ট ১৯৮২ মায়নীর ধনপাতা হতে যাত্রা শুরু করে।)

আমি যেন ২য় কংগ্রেসে সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনার আওতায় সেঃ লেফঃ দীপক(দিব্যেন্দু চাকমা) এর সহযোগীতায় মায়নী মিশনে মেজর মানস(বনমালী চাকমা) ও ক্যাপ্টেন সমেশকে (ধীর কুমার চাকমা) বন্দি করি।অনুরুপভাবে বিশেষ কোম্পানীর সঙ্গে প্রয়োজনে যুদ্ধ করে সকলকে  নিরস্ত্র করি”।
নরেশ চাকমা,পার্টিলাইনের বিশেষ কোম্পানীর একজন কমান্ডার,দীর্ঘ ঊনত্রিশ বৎসর পর গৃহযুদ্ধের একটা গোপন তথ্য উন্মুক্ত করতে গিয়ে বলেন,
”মায়নী মিশনে রওনা দেওয়ার পূর্বে ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান (মেজর পলাশ) আমাকে পূজগাঙের আহজাছড়া ঘাঁটিতে একান্তে বলেছিলেন,দ্বিতীয় কংগ্রেসে এমএনলারমা ও সন্তু লারমাকে গ্রেফতার করে ‘ভুদি’কেড়ে নেওয়া হবে।তাই, তুমিও বিশেষ কোম্পানীর অন্যান্য কমান্ডারগ্ণও মায়নী মিশন হতে সুকাশের সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়ে যথাসময়ে লোগাং এলাকায় ফিরে আসবে।যেহেতু গৃহযুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা আছে।“তিনি আরও বলেন যে ,ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান বিশেষ সেক্টর ব্যারাকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযানের জন্য অনেককে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছিলেন এবং তাঁকেও সেজন্য ডাকলে তিনি সময় চেয়ে নেন।
কংগ্রেসের পুরো আবহ অত্যন্ত থম্থমে ও ভীতিপূর্ণ অবস্থায় ছিল।প্রতিনিধিবৃন্দদের একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারার বিন্দুমাত্র কারণ ও সুযোগ ছিলনা। এই পরিস্থিতির অবস্থা বর্ণ্না দিতে গিয়ে ২নং সেক্টরের তৎকালীন ডেপুটি কমান্ডার তঞ্চঙ্গা (বীরেন্দ্র লাল চাকমা) বলেন,”কংগ্রেসের আতঙ্কজনক অবস্থা আমাকে ভীতসন্ত্রস্থ করে তুলে।এক পর্যায়ে আমি কংগ্রেসস্থল হতে পালিয়ে আসার চিন্তা করেছিলাম ।নিরাপত্তারক্ষীদের ভয়ে শেষে তা বাতিল করি।“কংগ্রেসস্থল পুরোপুরি প্রীতিকুমার চাকমার নিয়ন্ত্রণে  এবং প্রায় দুই প্লাটুনের সশস্ত্র নিরাপত্তার দায়িত্ব বিশেষ সেক্টরের কমান্ডার মেজর পলাশের হাতে ছিল ।কার্যত নিজের বন্দী অবস্থা দেখে ও পরিণতির কথা ভেবে সন্তু লারমা ছিলেন বিধ্বস্থ চেহারায় ।এই কারণেই কংগ্রেসস্থলে তিনি ছিলেন নিশ্চুপ ও অত্যন্ত গৌণ ।তাঁর পৃথিবীটা ২০/২৫ গজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে,নিজের বিছানা হতে শৌচাগার পর্যন্ত।
কংগ্রেসের কিছুকাল আগে হতে বিদ্রোহীরা লারমা ভাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে ভিতরে- ভিতরে স্বজনপোষণ,স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রচার চালান।পাশাপাশি তাঁরা এমএনলারমার প্রদর্শিত আন্দোলনের “রণ্নীতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও রণকৌশলগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির” তত্ত্বের বিপরীতে

(২ ভুদি একটি চাকমা শব্দ যার অর্থ হচ্ছে বোচকা।আন্দোলন চলাকালে কার্যালয়ের সকল দলিলপত্র রুকস্যাকে রাখা হতো অর্থাৎ ক্ষমতা রুকস্যাকে রক্ষিত থাকতো ।তাই ভুদি বলতে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে আন্দোলন চলাকালে বোঝানো হতো।)

“দ্রুত নিষ্পত্তি” তত্ত্ব তুলে ধরেন।“লাম্বা নয়,বাধি” অর্থাৎ “দীর্ঘস্থায়ী নয়,দ্রুত নিষ্পত্তি”র জিগির দেন এবং লারমা ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়ে সংগঠিত করার প্রয়াস চালান।ফলে প্রায়ই প্রতিনিধি সংশয়চিত্তে কংগ্রেসে উপস্থিত হন।সুধাসিন্ধু খীসা(সৌগত) বলেন, কংগ্রেসস্থলে পৌঁছার ৩-৪ দিন পূর্বে পূজগাঙ এলাকায় প্রীতি কুমার চাকমা ভিন্নমতাবলম্বী ঘরানায় টানতে তাঁকে এক পর্যায়ে বাধ্য করতে চান।এতে সুধাসিন্ধু খীসা বলেন “তুমি কি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছো?আমাকে তুমি ‘থুম’ করে মারলে তোমাকেও ‘ফুং’ করে মারার লোকের অভাব হবেনা ।“
সমসাময়িক,সমপর্যায় ও ঘনিষ্ট বন্ধুত্বে আবদ্দ গৌতম কুমার চাকমা,ঊষাতন তালুকদার ও আমি পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছিলামনা কার অবস্থান কোন পক্ষে ।অত্যন্ত সতর্কতায় বিরাজিত আতঙ্কজনক পরিস্থিতি ও পরিণতির কথা উত্থাপন করে একে অপরের অবস্থান আমরা জানতে চেষ্টা করি ।আমাদের তিনজনের অবস্থান সুস্পষ্ট হওয়ার পর আলোচনা মোতাবেক আমি এমএনলারমার সঙ্গে তাঁর ব্যারাকে দেখা করি ।তখন তিনি খুব উৎকন্ঠিত অবস্থায় ছিলেন।প্রীতি কুমারদের বল্পূর্বক ক্ষমতা দখলের বিষয়টা উত্থাপন করলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন,তিনি এবং সন্তু লারমা পার্টি হতে সরে যাবেন;যেহেতু প্রীতি কুমাররা তাদেরকে চান না ।তাঁর এই সিদ্ধান্ত তিনি সন্তু লারমাকে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান। তিনি আরো বলেন যে,তাঁরা নামমাত্র পদবী নিয়ে দলে থাকবেন এবং ধীরে ধীরে পার্টি হতে সরে যাবেন ।যান্ত্রিকভাবে সরে গেলে কর্মী,জনগ্ণ ও শুভাকাঙ্খীমহলে প্রচন্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।তাঁর ভাষায়,”এভাবে ধীরে ধীরে প্রীতি কুমারদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে এবং তাঁদের অনুপস্থিতিও স্বাভাবিক হয়ে যাবে ।“
“আমরা যদি এই সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করি?”,আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “প্রীতি কুমাররা আমাদের দুই ভাইকে পার্টিতে চায়না।তাঁরা যে কোন মুহূর্ত্তেই আমাদেরকে হত্যা  করতে পারে ।আজ কংগ্রেসস্থল তাঁদের অনুগত বাহিনী দিয়ে অঘোষিতভাবে আমাদেরকে বন্দী করে রেখেছে এবং আমাদের প্রাণ এখন তাঁদের হাতে।“ এরপর,”প্রীতি কুমার ও আপনার ও আপনার সিদ্ধান্ত যদি অগ্রাহ্য করি ।“,এই কথা বললে তিনি অপার বিস্ময়ে আমার আপদমস্তক নিরীক্ষণ করেন।আমাদের উদ্দ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা অবহিত কুল্র কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর ছোট্ট বাক্যে বল্লেন-“তোমরা যা ভালো বোঝ তা-ই করো।“
আমাদের উপর কড়া নজরদারি থাকা সত্ত্বেও আদর্শিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা হতে প্রীতি কুমারদের সশস্ত্রপন্থায় ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিতে নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার উদ্দ্যোগ আমরা ৩ জনে গ্রহণ করি ।পরবর্তীতে আমাদের সঙ্গে যোগদান করেন কেন্দ্রীয় সদস্য রাম কিশোর চাকমা (মেজর শংকর,প্রাক্তন মাইচছড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক)।একমাত্র নিরাপদ স্থান ছিল সেন্ট্রিপোষ্ট,তাও রাত্রিবেলায়।সুযোগ নেওয়া হয়েছিল প্রতিনিধিবৃন্দের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেন্ট্রিপোষ্টে সেন্ট্রি দেওয়ার সময়কে ।এইভাবে আমরা বাছাই করা প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হই।তাঁরা প্রীতি কুমারদের সশস্ত্রপন্থায় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টাকে সবচেয়ে বেশী নিন্দা জানিয়েছেন ।এভাবে বিদ্রোহীদের সামরিক উত্থানকে কূটনৈতিক ও সাংগঠনিক পদ্ধতিতে মোকাবেলা করার একটা দৃঢ় অবস্থান তৈরী হয়।প্রীতি কুমার ও আমার মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি লারমাভ্রাতাদের সঙ্গে আমার ‘আত্মীয়তা’র বিবেচনায় আমায় আস্থায় আনেননি। ১৪ জুনের ঘটনার পর এমএনলারমার সঙ্গে আলাপকালে প্রমাণ হয়,প্রীতি কুমার আমার বিরুদ্ধে এমএনলারমার কাছে অসত্য তথ্য দিয়ে সাবোটাজ করেছিলেন।দুই টার্মের কেন্দ্রীয় সদস্য নীলচন্দ্র চাকমাও বহু আগে আমাকে বলেছিলেন,প্রীতি কুমার তাঁর ও গৌতম কুমারের সঙ্গেও অনুরুপ আচরণ করেছিলেন ।
কংগ্রেস শুরুর একদিন পূর্বে সন্ধ্যাবেলায় প্রীতি কুমারের সঙ্গে আমার কথা হয় ।বিরাজিত পরিস্থিতিতে আমি তাঁর কাছে আমার নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিই।তাঁকে আরো বলি যে,এই ধরণের বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মী(নেতা) নিরপেক্ষ আছেন এবং গ্ণতান্ত্রিকভাবে সমস্যার সমাধান না হলে তাঁরা কারও পক্ষাবলম্বন করবেন না।প্রীতি কুমারকে আহবান জানাই,তিনি যেন সশস্ত্রপন্থার পরিবর্তে গ্ণতান্ত্রিকপন্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তনের চিন্তা করেন।সশস্ত্রপন্থায় লারমাভ্রাতাদের হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করলে তিনি জুম্মজাতির কুলাঙ্গার হিসেবে ইতিহাসে পরিচিহ্নিত হয়ে থাকবেন ও তাঁর সশস্ত্র পদক্ষেপ পাল্টা সশস্ত্র পদক্ষেপ হিসেবে এনে জাতিকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে ঠেলে দেবে। তাই, বিকল্প পদক্ষেপ হিসেবে গণতান্ত্রিকভাবে ও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লারমা ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে গোপন ব্যালটে ভোট দাবি করার উৎসাহ দিই।পরবর্তীতে ১৯৮৩ সনের ২৯শে সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের মধ্যে ঐক্য-সংলাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে শুরু হলে দেবজ্যোতি চাকমা (দেবেন) আমাকে বৈঠকে দেখামাত্র বলেছিলেন,”রিপভাই,কংগ্রেসে তুমি নিজেকে ‘নিরপেক্ষ’ দাবী করে এক পিলের চালে আমাদেরকে কুপোকাৎ করেছো।“দেবজ্যোতির এই মন্তব্যে বুঝা যায় আমাদের ‘নিরপেক্ষ’ কৌশল বিদ্রোহীদের কি পরিমাণ প্রভাবিত করে এবং কূটনৈতিক পরাজয় ডেকে আনে।
পার্টির সাধারণ সম্পাদক ভবতোষ দেওয়ানের অনুপস্থিতিতে সেপ্টেম্বর ২৪,১৯৮২ সন সকালে কংগ্রেস শুরু হয়।মেজর পলাশ দীর্ঘ জ্বালাময়ী ভাষণ দেন।তিনি পার্টির ‘রণ্নীতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও রণকৌশলগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই’ তত্ত্বের বিদ্রুপপূর্ণ ভাষায় কড়া সমালোচনা করেন।পাঁচ ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তিকে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে পরিচিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের দাবি জানাতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলেন,”আমাদেরকে দুর্নীতিগ্রস্থ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করতে হবে ।“এতে প্রতিনিধিবৃন্ধ হতকচিত ও রুষ্ট হন।পলাশের বক্তব্যের বিপরীতে ঊষাতন তালুকদারের কড়া ভাষণ বিভেদপহ্নীদের দীর্ঘদিনের মর্মজ্বালার কারণ হয়ে থাকে।পাল্টাপাল্টি ভাষণ অব্যাহত থাকে।এরপর কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার (পরবর্তীতে খাগড়াছড়ি নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী দলীয় সংসদ সদস্য) নেতৃত্বে ৫-সদস্যক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়।এই পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সবার আলোচনা ও দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে যায়।নির্বাচন সম্পর্কিত নীতিমালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে,প্রত্যেক ভোটার নিজেকেসহ প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত ২৯ জনকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট সমান সমান হলে সে ক্ষেত্রে কমিটির প্রধান ১টা নির্ধারক ভোট প্রদান করবেন।
২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯৮২ জেএসএস এর ইতিহাসে প্রথম ভোটাভুটি হয়। ৪৯জন প্রতিনিধির গোপন ব্যালটে ভোট প্রদান সমাপ্ত হলে দেখা যায়,উভয়পক্ষের ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা গেলেও কোনপক্ষ কাউকে কমিটি হতে বাদ দিতে সমর্থ হননি।অর্থাৎ কেউই ‘না’ বাচক ৫০% বা ততোধিক লাভ করেননি।বিদ্রোহীদের বিবেচনায় ৫জন ‘বিতর্কিত’ ব্যাক্তি হচ্ছেন-এমএন লারমা,সন্তু লারমা,অমিয় সেন চাকমা,অনাদি কুমার চাকমা ও গৌত্ম কুমার চাকমা।অপরদিকে  পার্টিপক্ষে সন্তু লারমা কর্তৃক নির্ধারিত পাল্টা ৫জন ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তি হচ্ছেন -প্রীতি কুমার চাকমা,সনৎ কুমার চাকমা,ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান,দেবজ্যোতি চাকমা ও হরিকৃষ্ণ চাকমা।

(৩ ভবতোষ দেওয়ান নিজের এক ভ্লেন্টিয়ারের অসতর্ক্তায় থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলিতে ডান পায়ে গুরুতরভাবে আহত হন ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৭,পানছড়ি থানার খেদারাছড়ার(পূজগাং) এক পাড়ায় অবস্থানকালে।ফলে খাটো হওয়া পায়ে কংগ্রেসস্থলে আসা সম্ভব ছিলনা।)

জেএসএস-এর ২য় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচনী ফলাফল 
(ভোটের ফলাফল সিটে সাজানো ক্রমানুসারে সাজানো)      


ক্রমিক নং        নাম          হ্যাঁ                      না                     বাতিল            প্রদত্ত                          
১।এমএনলারমা(প্রবাহণ)                     ২৭                      ১৯(৪১%)                                                  ৪৯                         
২।জ্যোতিরিন্দ্র বি. লারমা(তুঙ)           ২৮                      ১৮(৩৯%)                                                     ৪৯                  
৩। অমিয় সেন চাকমা(কাঞ্চন)           ২৫                          ২১(৪৫.৬৫%)                                                  ৪৭
৪। ভবতোষ দেওয়ান(গিরি)                 ৪৪                           ১(৪.৪%)                                                          ৪৬
৫।কালী মাধব চাকমা(মিহির)              ৪৮                          ০(০%)                                                              ৪৮
৬।নলীনি রঞ্জন চাকমা(অফুরন্ত)         ৪৮                           ০(০%)                                                             ৪৮
 ৭।অনাদি কুমার চাকমা(অম্বর)          ২৬                          ২২(৪৫.৮৩%)                                                   ৪৮
৮।মংসানু চৌধুরী(সমিত)                    ৪৬                          ১(২.১%)                                                           ৪৭ 
৯।সনৎ কুমার চাকমা(সাগর)              ২৮                          ১৯(৪০.৪২%)                                                     ৪৭ 
১০।যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা(নির্মল)             ৪৮                          ০(০%)                                    -                           ৪৮  
১১ ।জ্ঞানময় চাকমা(অমল)                 ৪৮                           ০(০%)                                                             ৪৮ 
১২।প্রীতি কুমার চাকমা(প্রকাশ)           ৩০                           ১৬(৩৪.৭৮%)                         -                          ৪৬  
১৩।গৌতম কুমার চাকমা(অশোক)      ৪৩                         ৫(১০.৪১%)                             -                          ৪৮   
১৪।রুপায়ন দেওয়ান(রিপ)                   ৪৭                           ১(২.১%)                              -                         ৪৮  
১৫।রাম কিশোর চাকমা(শঙ্কর)            ৪৮                           ০(০%)                                     -                          ৪৮         
 ১৬রঞ্জন বিকাশ চাকমা(রবিন)          ৪৮                            ০(০%)                                    -                         ৪৮  
১৭। হরিকৃষ্ণ চাকমা(বিদ্যুৎ)                 ২৬                           ১৯(৪২.২২%)                           -                         ৪৫ 
১৮।দেবজ্যোতি চাকমা(দেবেন)            ২৮                        ১৮(৩৯.১৩%)                           -                         ৪৬  
১৯। সুবাস ব্রত চাকমা(অনুরায়)            ৪৫                           ২(৪.৩%)                                  -                         ৪৭ 
২০। বিনয় কৃষ্ণ চাকমা(কৃষ্ণ)                ৪৮                           ০(০%)                                     -                         ৪৮ 
২১। সুদত্ত প্রিয় চাকমা (দীপায়ন)           ৪৭                           ১(২.১%)                                -                         ৪৮  
২২। শচীন্দ্র লাল চাকমা(সুরেঙ্কর)           ৪৫                           ২(৪.৩%)                               -                         ৪৭  
২৩।স্নেহ রঞ্জন চাকমা(ধ্রুব)                 ৪৭                           ০(০%)                                  -                         ৪৭   
২৪। ঊষাতন তালুকদার(সমীরণ)            ৪১                            ৬(১২.৮%)                           -                         ৪৭   
২৫।ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান(পলাশ)               ২৭                            ১৮(৪০%)                             -                         ৪৫   
২৬।নীল চন্দ্র চাকমা(সুকান্ত)                 ৪৫                            ৩(৬.৫%)                             -                         ৪৮   
২৭। তাতিন্দ্র লাল চাকমা(পেলে)             ৪৮                         ০(০%)                                -                          ৪৮   
২৮।লক্ষীপ্রসাদ চাকমা(দেবাশীষ)           ৪৮                         ০(০%)                                -                          ৪৮   
২৯। সুধাসিন্ধু খীসা(অনুপ)                     ৪৮                        ০(০%)                                -                          ৪৮

আন্দোলনের পুরোধা ও জুম্মজাগরণের অগ্রদূত হওয়া কিংবা অন্য কোন ধরণের কেলেঙ্কারী স্পর্শ না করা সত্ত্বেও কেন এমএনলারমা বিদ্রোহীদের ‘বিতর্কিত’ তালিকায় ৪১% ‘না’ ভোত পেয়েছেন, তা জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় সদস্য গৌতম কুমার চাকমা বলেন,”বিভেদপন্থীদের ইচ্ছা পরিপূরণে সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিলেন প্রয়াত নেতা।তাই তাঁরা প্রয়াত নেতাকে প্রধান টার্গেট করে সবচেয়ে বেশী কলঙ্কিত করার প্রয়াস চালান এবং মোক্ষ্ম অস্ত্র হিসেবে দুর্নীতিকে তুলে ধরেন। তাছাড়া পার্টি লাইনের ১জন বা ২ জন যে না ভোট দেননি এই  আশ্নকাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায়না।“
যথাসময়ে পার্টির সভাপতি এমএনলারমা,সাধারণ সম্পাদক ভবতোষ দেওয়ান ও ফিল্ড কমান্ডার সন্তু লারমা মহাসম্মেলনে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হন।এমএনলারমা তার দীর্ঘ আবেগপূর্ণ ভাষণে জুম্মজাতির ইতিহাস রচনার জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহবান জানান। তিনি বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রামের অসম বিকাশমান ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জাতিসমুহের মধ্যকার উগ্রজাতীয়তাবাদী ও সংকীর্ণজাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা একমাত্র ধারণ করতে পারে প্রগতিশীল চিন্তাধারা।এই প্রগতিশীল চিন্তাধারাই পারে সামন্তবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারাকে মোকাবেলা করতে।তিনি বলেন যে,পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগণের আন্দোলন হচ্ছে জাতীয় আন্দোলন  বা জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন।তাই ,জেএসএস হচ্ছে সকল চিন্তাধারার ঐক্যফ্রন্ট এবং এই ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে থাকবে প্রগতিশীল শক্তি।

কংগ্রেস পরবর্তী অবস্থাঃ
২য় কংগ্রেসের পর ১৯৮৩ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত সাড়ে ৮ মাস সময়টা জেএসএস এর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত প্রীতি কুমার বিরোধীতা  না করলেও কংগ্রেসের পরপরই গোপ্নে ৯ সদস্যক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন এবং মাসিক চাঁদা ও কার্যক্রম নির্ধারণ করেন। ভবতোষ দেওয়ানকে সভাপতি,যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে সহসভাপতি ও প্রীতিকুমার চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক করে এই কমিটি গঠিত হয় ।হরিকৃষ্ণ চাকমা বলেন,কংগ্রেসের পর লোগাং এর এহতমরা ছড়ায় একটি পাল্টা কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়,তিনিও সেই সময় উপস্থিত থেকে এই কমিটিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।“বিশেষ সেক্টরের আশ্রয়ে বাত্তি রয়েছে।সেই বিশেষ সেক্টর এখন বিরোধী।সুতরাং,বাত্তিতে যারা রয়েছে তাদের মানসিক অবস্থা কি রকম হবে এবং তুমি যদি থাকতে,তা হলে কি হতো, নিজেই চিন্তা করে দেখো।বিশেষ সেক্টরের সঙ্গে
[৪ ১৪জুন ১৯৮৩ বিদ্রোহী ঘাঁটি আক্রান্ত হলে কমান্ডার পলাশ পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর হ্যাভারস্যাকটি ছুঁড়ে ফেলে দেন।এটি কেন্দ্রের অনুগত বাহিনীর হস্তগত হয় ।এতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র পাওয়া যায়।এই দলিল পত্র হতে বিদ্রোহীদের সমান্তরাল কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন সম্পর্কিত তথ্যাদি জানা যায়।
জিএইচকিউ বা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ছদ্মনাম বাত্তি,সংক্ষেপে কেন্দ্রও বলা হতো।এমএন লারমার নির্বাচনী প্রতীক ছিল মাটির প্রদীপ বা বাতি। সেই হতে এই বাত্তি নামকরণ করা হয়।এই নির্বাচনী প্রতীকটি জেএসএস এর লোগো হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।]

কেন্দ্রের যোগাযোগ বলতেই নেই।বিশেষ সেক্টরের সাথে কেন্দ্রের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।একা বিশেষ সেক্টর পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলন কি পরিচালনা করতে পারবে ?” ৩১ মে ১৯৮৩ ভবতোষ দেওয়ানকে এমএনলারমা এই কথাগুলো বলেছিলেন বলে সন্তু লারমাকে ১ জুন এক চিঠিতে জানান । এই চিঠিতে আরও জানা যায়,”বিশেষ সেক্টরের শ্রী পলাশকে কেন্দ্রের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থায় তুমি আনতে পারবে কিনা?” ভবতোষ দেওয়ানের উত্তর ছিল,”পারবো অথবা পারবো না এ  রকম প্রতিশ্রুতি দেয়া কঠিন।কারণ শ্রী পলাশতো একা নয়।তাকে কেন্দ্র করে আরো রয়েছে। তবে আমি চেষ্টা করবো।“ প্রকৃতপক্ষে, বিশেষ সেক্টর ‘ভাতে মারবো,পানিতে মারবো’ নীতি গ্রহণ করে কেন্দ্রের উপর চাপ সৃষ্টি করতে রেশন ও অর্থ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং সকল প্রকার কেন্দ্রবিরোধী কার্যকলাপ চালাতে থাকে।
১৯৮৩ সনের ফেব্রুয়ারী ভবতোষ দেওয়ানের আস্তানায় সন্তু লারমা ও ভবতোষ দেওয়ানের আলাপ হয়।এ সময় কালী মাধব চাকমাও উপস্থিত ছিলেন ।শ্রী দেওয়ান এই প্রসঙ্গে বলেন- “সন্তুর সঙ্গে আমি খোলাখুলি কথা বলি,যাতে পার্টির ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব হয়।আমার বিরুদ্ধে কর্মীমহলে তাঁর পরিচালিত অপপ্রচার বিষয়টি আমি তখন উত্থাপন করি।এতে তিনি এক পর্যায়ে তাঁর দোষ স্বীকার করেন।আমি তাকে অপপ্রচার হতে বিরত থাকতে অনুরোধ জানাই।তিনি একপর্যায়ে চোখের জল ফেলেন।“ভবতোষ দেওয়ান দুঃখ করে আরো বলেন,”আমার বিবাহ উপলক্ষে আমার আত্মীয় তথা পার্টির দুজন প্রভাবশালী শুভাকাঙ্খীর উপহার দেয়া ষ্টিলের ২টা থালা ও ২টা গ্লাসকেও সন্তু রাজনৈতিক ইস্যু করেছেন।আম্রা স্বামী-স্ত্রী দুজনে এই থালা ও গ্লাস দিয়ে ভাত খেতাম বলে ।“ এই আলাপের পর নিজ আস্তানায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সন্তু লারমা কতিপয় কেন্দ্রীয় সদস্যকে বলেছেন ,”এই ধরণের মানুষগুলো সুযোগ পেলে মাথায় ধরে এবং বিপদে পড়লে পায়ে পড়ে ।“
১৯৮৩ এর এপ্রিলে এমএন লারমা ও ভবতোষ দেওয়ানের সাক্ষাৎ হয় ।সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাক্ষাতে স্বাভাবিকভাবে নেতৃত্ব বিষয়ে কথা উঠে আসে এবং ভবতোষ দেওয়ানকে জিএইচকিউ যেতে এমএন লারমা অনুরোধ করেন,যাতে প্রীতি কুমার ও বিশেষ সেক্টরের পার্টিবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ে সমাধা করা যায়।ভবতোষ দেওয়ান সেদিনের কথা বলতে গিয়ে বলেন যে,পথে দুজন সৈনিকের কথোপকথন তাঁর কানে আসে ।এতে তিনি নিশ্চিত হয়ে যান,তিনি বাঘের খাঁচায় ঢুকতে যাচ্ছেন এবং বেরুতে পারার সম্ভাবনা নেই।খোঁড়া পায়ে পালিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। ১জুন ১৯৮৩ ভবতোষ দেওয়ান পার্টির এক অস্থায়ী ঘাঁটিতে পৌছেঁন।এরপ্র ১৪জুনের ঘটনা ঘটে।সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের কারণে তাঁকে বাঘমারা ঘাঁটি বা টেকটিক্যাল জিএইচ হতে মুক্তি দেওয়া হয় ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩।
কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগার বিদ্রোহীদের কব্জায়ঃ
বিশেষ সেক্টর এলাকার মধ্যেই পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা জেনারেল হেডকোয়াটার্স অবস্থিত এবং কেন্দ্রীয় অস্ত্রগারের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বও  বিশেষ সেক্টরের। ১ ব্যাটালিয়ান জনশক্তির অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোতে বিলি -বন্টনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে ৪নং সেক্টরের বরাদ্দ ১৯৮২ সনের অক্টোবরে সেক্টর পলিটিক্যাল সেক্রেটারি অনুরায় (সুবাসব্রত চাকমা) নিয়ে যান ।কমান্ড পোস্ট বি এলাকায় অবস্থানরত ‘ই’ ও ‘এফ’ কোম্পানীকেও তাদের অস্ত্র-গোলাবারুদের কোটা বুঝে নিতে বিশেষ সেক্টর এলাকায় আসতে কেন্দ্র নির্দেশ প্রদান করে।এই নির্দেশ ১৯৮৩ সনের এপ্রিল মাসের গোড়াতে ইস্যু করা হয়।
এমএন লারমা ১৯৮৩ এর মে মাসের ১ম সপ্তাহের দিকে ‘ই’ কোম্পানী ও ‘এফ’ কোম্পানীর অস্ত্র-গোলাবারুদের বরাদ্দ বিশেষ সেক্টর হতে ডেলিভারী নেওয়ার পূর্ণ দায়িত্ব আমাকে প্রদান করেন।যেহেতু,বিশেষ সেক্টরের মতিগতিতে তাঁর ধারণা জন্মে, ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান এইসব সরবরাহ করবেননা এবং আমার প্রতি ত্রিভঙ্গিল এর শ্রদ্ধাবোধের কারণে তা অস্বীকার করা সহজও হবেনা ।নির্ধারিত দিনে বিশেষ সেক্টরের একটা ব্যারাকে বসে ত্রিভঙ্গিল সঙ্গে দুই কিস্তিতে এইসব অস্ত্র -গোলাবারুদ ও সরঞ্জামাদি হস্তান্তরের তারিখ,সময়,স্থান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে অনুযায়ী প্রথম কিস্তিটি যথাযথভাবে হস্তান্তরও করা হয় বোয়ালখালী থুমের সুরক্কবাবঅ আদামে।তবে,দ্বিতীয় কিস্তিটি আর সরবরাহ করা হয়নি।জানা যায়,প্রীতি কুমার খেদাড়ছড়া মোন হতে অস্ত্র-গোলাবারুদ সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা জারী করেন।

অস্ত্র-গোলাবারুদ পুনরুদ্ধারঃ
বিদ্রোহীরা ২য় কিস্তির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার পর বিষয়টি কেন্দ্রকে অবহিত করা হলে কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারের সকল অস্ত্র-গোলাবারুদ যে কোন মূল্যে উদ্ধারের নির্দেশ আমাকে দেওয়া হয় ।নির্দেশ অনুসারে সেই ঘাঁটিতে অবস্তানরত চন্দ্র শেখর চাকমা(মেজর তাপ্স),কমান্ডার পেলে(তাতিন্দ্র লাল চাকমা) ও কমান্ডার দেবাশীষসহ (লক্ষী প্রসাদ চাকমা ) যৌথ আলোচনায় এই বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষ কোম্পানির ২জন সদস্যকে রেকি করতে ৩ জুন নিরস্ত্র অবস্থায় পাঠানো হয় ।তাঁরা [সার্জেন্ট সচিত্র ও লেঃ কর্পোরেল সুকুমার ,উভ্যে বিশেষ কোম্পানির সদস্য] পর দিন সকালে ফিরে এসে রিপোর্ট করেন যে, বিদ্রোহীরা অস্ত্রাগারের সমস্ত অস্ত্র-গোলাবারুদ সরিয়ে নিয়ে গেছে ।সশস্ত্র গ্রুপ পাঠিয়ে সেগুলি সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে,কারণ প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে মাটি নরম হওয়ায় কয়েকশ লাগেজ বহনের কারণে পথের নিশানা লুকানো অসম্ভব।
এসটিএফ ঘাঁটিতে উপস্থিত ‘ই’ কোম্পানি,’এফ’ কোম্পানি ও এসটিএফ-কে বিষয়টি অবহিত করা হলে সদস্যবৃন্দ উত্তেজিত হয়ে তৎমুহূর্তে সেসব সম্পত্তি উদ্ধারে অভিযানে বেরুনোর নির্দেশ পাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন।এরপর উপস্থিত সিনিয়র কমান্ডারদের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়।সেদিন ৪জুন ১৯৮৩ সূর্যাস্তের পূর্বে সেঃ লেফঃ রামের নেতৃত্বে ১ প্লাটুনের একটি গ্রুপ বেদখল হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার অভিযানে বেরিয়ে যায় এবং পরদিন ৫জুন ১৯৮৩ সকালে পানছড়ি থানার লুদিবেতছড়া(লতিবান) এর উৎসমুখের কাছে এ্যামুনেশনের লাগেজগুলো ও নিকটবর্তী গোলকপুদিমাছড়ার উৎসমুখে ফুলবাপের পাড়ায় দক্ষিণ দিকের একটা খামারের কাছের ঝিরিতে হাতিয়ারের লাগেজগুলো পাওয়া যায় এবং দখলে আনা হয়।

১৪ জুন ১৯৮৩ঃ
কেন্দ্রের পত্রপাঠ পৌঁছার নির্দেশ পেয়ে আমি ৫ জুন কেন্দ্রে পৌঁছে ভবতোষ দেওয়াঙ্কে উৎকন্ঠিত অবস্থায় দেখতে পাই।ভবতোষ দেওয়ান ও প্রীতি কুমারসহ দ্বন্ধ নিরসনে বসার জন্য প্রীতি কুমারকে কেন্দ্রে পৌঁছতে সংবাদ পাঠানো হয়েছিল বলেছিল বলে শুনি।এই অস্থায়ী ব্যারাকে এমএম লারমা ও সন্তু লারমার সঙ্গে আলোচনায় জানতে পারি যে, বিদ্রোহ দমনের জন্য বিদ্রোহীদের গোলকপুদিমাছড়ার ঘাঁটি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত এর মধ্যে নেওয়া হয়েছে এবং সেই জন্যই আলোচনার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছে ।আমাকে বলা হয় এই আক্রমণে আমাকে নেতৃত্ব দিতে হবে ,যা শারীরিক অসুস্থতার কারণে সম্ভব হয়নি।
১৪ জুন ১৯৮৩,মঙ্গলবার,দুপুর আনুমানিক ১২.৩০ টায় পানছড়ি থানাধীন ২৪২নং পূজগাং মৌজার ও ৩নং পানছড়ি ইউনিয়নের গোলকপুদিমাছড়ার শাখা-ছড়া,লাম্বাছড়ার উৎসমূখে এক টিলার উপর বিদ্রোহীদলের স্থাপিত এই ঘাঁটি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সুপরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র আক্রমণ করে।এই আক্রমণের মধ্যে দিয়ে জেএসএস আভ্যন্তরীণ দ্বন্ধের সশস্ত্র পরিণতি ঘটে,যা জুম্মজাতির ইতিহাসে গৃহযুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।এই ভ্রাতৃঘাতী আক্রমণে কমান্ডার ছিলেন ঊষাতন তালুকদার (তখন ২নং সেক্টরের কমান্ডার)।এই আক্রমণ

[৬ এই ঘাঁটির প্রাকৃতিক জঙ্গল পরিস্কার করে সেখানে এখন পূজগাং মৌজার হল্ধর পাড়াবাসী রত্নাকর চাকমা(আলস্যা)  ২৫ একরের সেগুন বাগান করেছেন।এই বাগানের বয়স এখন ১০/১২ বৎসর।]

বিদ্রোহীদের কেন্দ্র আক্রমণের পরিকল্পনা বানচাল করে দেয়।কারণ ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান কেন্দ্র আক্রমণ করার পরিকল্পনা চুড়ান্ত করেছিলেন।
মূল টার্গেটের আনুমানিক ৫০০ গজ দক্ষিণে সেক্টর ব্যারাকটি মুখে পড়ে।তাদের ২/৩ জন গোলাগুলি শুরুর আগেই ধরা পরে যান ।এরপর গোলাগুলি শুরু হয় এবং সেক্টর ডেপুটি পলিটক্যাল সেক্রেটারী শরজিৎ(সুধ্ন কুমার চাকমা) ১টা কারবাইনসহ আত্মসমর্পন করেন।বিদ্রোহীরা একটি চাষের খামারবাড়িকে কেন্দ্র করে আনুমানিক ৬০/৭০ জন এখানে অবস্থান করছিলেন।কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তাঁদের এই ব্যারাকটি দখলে আসে।প্রচুর এ্যামুনেশন ও বেশ কিছু  অস্ত্র হস্তগত হয়।এরপর মূল টার্গেট আক্রমণ করা হয় মর্টার,রকেট,গ্রেনেড,এলএমজি ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে এবং আক্রমণে বলি ওস্তাদ নিহত হন।

‘ক্ষ্মা করা ও ভুলে যাওয়া’ নীতির ভিত্তিতে ঐক্যচুক্তিঃ
১৪ই জুন,১৯৮৩ সনে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ নিরসনে ২৯ সেপ্টেম্বর হতে ১ অক্টোবর ,১৯৮৩ “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিবাদমান দুইপক্ষের মধ্যে ঐক্য পুনঃস্থাপনের জন্য বন্ধুত্ব ও হৃদয়তাপূর্ণ  পরিবেশে অকৃত্রিম সদিচ্ছার মনোভাব নিয়ে শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সভাপতিত্বে বৈঠক বসে।“এবং  “বৈঠকে উপস্থিত সকলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে পার্টির মধ্যকার সর্ব প্রকার বিরোধ অতি সত্ত্বর শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিরসন করে দলীয় ঐক্য ও সংহতি পুনঃস্থাপনের জন্য আন্তরিক সদিচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন।“ক্ষ্মা করা ও ভুলে যাওয়া “ নীতির ভিত্তিতেই সর্ব প্রকার মতবিরোধ বুলে গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাপোষ্ণ করে দলীয় সংকট নিরসনের জন্য সকলেই একমত পোষণ করেন।“
১ অক্টোবর ১৯৮৩, ঐক্যবৈঠকের শেষদিনের সকালের আলোচনায় ঐক্যচুক্তির খসড়া চুড়ান্ত হয়।অপরাহ্নে স্বাক্ষর প্রদানের মধ্য দিয়ে ঐক্যবৈঠক সমাপ্ত করার সিদ্ধান্তও হয়।কিন্তু ,এরপর দুপুরের খাবারের পূর্বে এমএন লারমা ও সন্তু লারমার মধ্যে বৈঠকস্থানের অদূরে কথা টানাটানি চলে।সন্তু লারমা এমএন লারমাকে দোষারোপ করতে থাকেন চুক্তি করতে সম্মত হওয়ার জন্য ।অথচ,ঐক্যচুক্তি করার বা ঐক্যচুক্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে পার্টিধারা এই বৈঠকে গিয়েছিল।সন্তু লারমাকে অগ্রজ এমএন লারমা বুঝাতে থাকেন চুক্তিটা করার জন্যে।এই অবস্থায় সন্তু লারমা ক্ষোভে অশ্রু ফেলতে থাকেন।তবে বিকালবেলা আলোচনা মোতাবেক ঐক্যচুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যায়।চুক্তির ঐক্যমত্য

[৭ ইনভাইটেড কমার মধ্যে ২টি স্থানে উল্লেখকৃত বক্তব্য হচ্ছে ঐক্যবৈঠকের মিনিটস এর বয়ান।]

মূল সিদ্ধান্ত হচ্ছে পূর্বেকার মতো একটি কমান্ডে কাজ করা এবং ছয় মাসের মধ্যে কংগ্রেস অনুষ্ঠিত করে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠণ করা ।
অপরপক্ষে,চুক্তি স্বাক্ষরের পরই সেদিন বিকালে বিদ্রোহীধারার নেতৃবৃন্দ এক বৈঠকে বসেন।সুদত্ত প্রিয়[মেজর রক্সিও/দীপায়ন] চাকমাসূত্রএ জানা যায়- এই বৈঠকে প্রীতি কুমার চাকমা অমান্য করার কথা বলতে থাকেন।তিনি বলেন যে, চুক্তি স্বাক্ষর করতে তিনই বাধ্য হয়েছিলেন।এই ঐক্যচুক্তি স্বাক্ষর করার ইচ্ছে তাঁর ছিলনা। এই প্রেক্ষিতে ভবতোষ দেওয়ান বলেন যে,প্রীতি কুমার কেন এইসব বৈঠকে বলেননি;কেন বলেননি কোথায় তার আপত্তি ছিল।ঐক্যচুক্তি স্বাক্ষর করার পর তা বলে কি লাভ ইত্যাদি ।পাঠকের অবহিত হওয়া দরকার যে,পার্টির সঙ্গে ঐক্যবৈঠক শুরুর পূর্বে  ভবতোষ দেওয়ানের বাড়িতে বিদ্রোহীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এক বৈঠক বসে ২৬-২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ এর যে কোন একটি দিনে এবং এই বৈঠকে গৃহীত ঐক্যচুক্তি স্বাক্ষর করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েই তাঁরা পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঐক্যবৈঠকে অংশগ্রহণ করতে যান।
এর পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে ভবতোষ দেওয়ান ও সুদত্ত প্রিয় চাকমার পৃথকভাবে দেওয়া বক্তব্যে মোটামুটি একই ধরণের ,যা হচ্ছে –“ঐক্যচুক্তি স্বাক্ষরের পর কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবার একদিন পূর্বে ভবতোষ দেওয়ানের কাছে প্রীতি কুমার বিদায় নিতে যান । তাঁদের দুজনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়।আলোচনায় প্রীতি কুমার ঐক্যচুক্ত বাস্তবায়নে তাঁর অস্বীকৃতির কথা জানান ।এই ইস্যুতে তাঁদের দীর্ঘ আলাপ ও বিতর্ক হয়,যা প্রায় রাত ১২টা অবধি গড়ায়। অবশেষে বিদায় নেওয়ার সময় প্রীতি কুমার বলে উঠেন,”হোই, মনে কলে ইতিআহজ চদরভদর ওহক”,যার বাংলা মর্মার্থ হচ্ছে “হেই, ইতিহাস তছনছ যদি হয় হোক”।

ঐক্যচুক্তি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহঃ
সুদত্ত প্রিয় চাকমা বলেন যে,”বিদ্রোহীধারার জনশক্তি ও অস্ত্রশক্তি পূর্বেকার মতো কেন্দ্রের কমান্ডে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব বর্তায় প্রীতি কুমার চাকমার কাঁধে ও বন্দী নেতা-কর্মীদের মুক্তি দেয়ার দায়িত্ব পড়ে দেবজ্যোতি চাকমার ভাগে।দেবজ্যোতি চাকমা প্রতিপালন করলেও প্রীতি কুমার তা করেন নি।“
এমএন লারমা বাঘমারা ঘাঁটিতে ফিরলে ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে নির্দেশ প্রদান করেন বিবাদমান ইউনিটগুলোর পনর্মিলনীর স্থান,তারিখ ইত্যাদি বিষয় সুনির্দিষ্ট করার জন্য।এমএন লারমা আমাকে ডেকে ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ দেন,এই পুনর্মিলনকালে যাতে খাদ্যব্যবস্থাপনা সুচারু হয় ও উন্নত খাবারের আয়োজন করা হয়।তিনি আমাকে বলেন পুনর্মিলনীর মুহূর্তগুলি যাতে সুখের ও আনন্দের হয়।

১০ই নভেম্বর ১৯৮৩ঃ
“ক্ষমা করা ও ভুলে যাওয়া নীতির ভিত্তিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।প্রীতি কুমার জানেন,এই চুক্তির আওতায় ,পূর্বেকার মতো পার্টির সদস্যরা একই কমান্ডে ফিরে আসলে তাঁর মুখোশ উন্মোচিত হবে এবং তাঁর অনুসারীরাই তাঁকে বাঁচতে দেবেনা।তাই, তিনি নিজের জীবন বাঁচাবার জন্যই ১০ নভেম্বর হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন।“,এই মূল্যায়ণ লেফঃ সুকাশের ।প্রশ্ন করা যায়,নিজের অনুসারীদের হাত হতে শুধুমাত্র নিজেকে রক্ষা করার জন্যই কি প্রীতি কুমার ১০ নভেম্বর সংঘটিত করেছিলেন?সোজা  উত্তর ‘না’।কারণ,১৯৮২ সনের ২য় কংগ্রেসে আমরা দেখেছি প্রীতি কুমার চাকমার মূল লক্ষ্য ছিল লারমা ভ্রাতৃদ্বয়কে পার্টি হতে সরিয়ে দেয়া ।তাছাড়া তিনি কংগ্রেস সমাপ্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই গোপনে পালটা কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে কেন্দ্রবিরোধী কার্যকলাপ চালাতে থাকেন।সুতরাং ,প্রশ্ন করা যায়,তাহলে প্রীতি  কুমারের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল ?তার উত্তর সুকাশের মুখেই আবার শুনা যাক,”প্রীতি কুমার একটা ঝুঁকি নিয়েই ১০ নভেম্বর ঘটনা ঘটিয়েছেন।পরবর্তীতে তিনি বলেছিলেন,এটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হলেও,কাজটায় সাকসেস্ফুল হলে বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া নিশ্চিত ছিল।“ হরিকৃষ্ণ চাকমা বলেন, “প্রীতি কুমার ও সনৎ কুমার এই দুই ভাই পার্টিপক্ষের বেশ কিছু নেতাকে হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।সেই পরিকল্পনার আওতায় ১০ই নভেম্বরের ঘটনা ঘটে।“তিনি আমাকে আরও বলেন,একই পরিকল্পনার আওতায় আমাকেও চেঙ্গী নদী পার হওয়ার সময়(পানছড়ি থানার শান্তিপুরের কাছে ) হত্যা করার সিদ্ধান্ত প্রীতি কুমারের ছিল।প্রীতি কুমার এমএন লারমাকে চিঠি দিয়েছিলেন লারমা যেন আমাকে তাঁর পানছড়ি ঘাঁটিতে পাঠিয়ে দেন তাঁর অনুসারীদেরকে স্বাক্ষরিত ঐক্যচুক্তি বিষয়ে আশস্ত করার জন্য।এই সময়ই প্রীতি কুমার আমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।এই হত্যাকান্ড করতে তিনি কমান্ডার পিয়রকে(নিশিধন চাকমা,কাউখালী থানা) দায়িত্ব দেন।একই প্রশ্নে বিদ্রোহীদের কেন্দ্রীয় সদস্য সুদত্ত প্রিয় চাকমা বলেন,”ভবতোষ দেওয়ান ১০ই নভেম্বর ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।প্রীতি কুমার,সনৎ কুমার ও প্রীতি কুমারের এক মামা সক্রিয়ভাবে জড়িত।বিদ্যুৎ ও বিলাস সিনিয়রদের মধ্যে জড়িত।“
 অবশেষে ইতিহাস তছনছ করতে ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ ভোর আনুমানিক পৌনে তিনটার দিকে অর্থাৎ ৯নভেম্বর দিবাগত রাত পৌনে তিনটার দিকে  প্রীতি কুমার জেএসএস এর টেকটিক্যাল জিএইচকিউ(বাঘমারা ঘাটিঁ) আক্রমণ করেন।আক্রমণকারী দলটির কমান্ডার ও টুআইসি ছিলেন যথাক্রমে এলিন(সুখেন্দু বিকাশ চাকমা,বাড়িঃ পাগ্যোজ্যাছড়ি,পানছড়ি উপজেলা।বর্তমানে জেলা আনসার এ্যাডজুটেন্ট) ও এমং বা এ্যাহমং(অংচিং প্রু,বাড়ীঃবান্দরবান।পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে চাকুরীরত)। আন্দোলনের পুরোধা এবং জুম্ম জাগরনের অগ্রদূত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তাঁর বিপ্লবী সাত সহযোদ্ধা – পরিমল বিকাশ চাকমা(রিপন),শুভেন্দু প্রভাস লারমা(তুফান),অর্পনা চরণ চাকমা(সৈকত),কল্যানময় খীসা (জুনি),অমর কান্তি চাকমা(মিশুক),মনিময় দেওয়ান(স্বাগত) ও অর্জুন ত্রিপুরা(অর্জুন) ঘটনাস্থলে শহীদ হন।সন্তোষমাই চাকমা (সুমিত্র),মং সাজাই মারমা(জাপান) ও মুক্ত বিকাশ চাকমা(বকুল) গুরুতরভাবে আহত হন।কর্পোরেল সৌমিত্র দুদিন জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে থেকে অত্যধিক রক্তক্ষরণে শাহদাৎ বরণ করেন।
বিদ্রোহীদের ১০ নভেম্বরের হত্যাকান্ড সংঘটিত করতে পারার পেছনে পার্টি নেতৃত্বের গাফলতির পাশাপাশি ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের কারণে ঝড়ো হাওয়া,বাঘমারা ঘাঁটির ব্যারাকসমূহের ম্যাপ প্রাপ্তি ও চানারাম চাকমা নামক উপযুক্ত পথপ্রদর্শক খুঁজে পাওয়া অন্যত্ম কারণ ছিল।চানারাম চাকমার বাড়ি মাটিরাঙ্গা থানার ১৮৩ নং আচলং মৌজা ও ১নং তাইন্দং ইউনিয়নের বগাপাড়ায়।বিদ্রোহীরা যে আক্রমণ করবে তা আমরা জানতে পারি ৮ নভেম্বর ১৯৮৩,মঙ্গলবার ,আমার ছোটপানছড়ির বিদ্রোহীদের ঘাঁটির উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাওয়ার সময়;বাঘমারা ঘাঁটির ১কিলোমিটার পূর্বে অগ্রবর্তী নিরাপত্তা চৌকিতে।বিদ্রোহীদের সার্জেন্ট রুপান্তর বিদ্রোহীদের ছোটপানছড়ি ঘাঁটি হতে পালিয়ে এসে আমাদের ২নং সেক্টরে ফাঁস করে দেন।সার্জেন্ট রুপান্তরের দেয়া তথ্য ও আগরতলার “দৈনিক ত্রিপুরা দর্পন” পত্রিকার একটা শঙ্কার সংবাদ মিলিয়ে বিদ্রোহীরা ৯ অথবা ১০ নভেম্বর আক্রমণ করতে পারে এই ধারণা জানিয়ে এবং সেজন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এমএন লারমা ও সন্তু লারমার কাছে আমার লিখিত মতামত নিয়ে পানছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই।পরে জানি যে সন্তু লারমার নেতৃত্বে সে বিষয়ে কেন্দ্রে আলোচনা হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়েও দেখা হয়।জানা যায় বিশেষ করে ঊষাত্ন তালুকদার একপ্রকার জবরদস্থি করে নিজ পরিবারে ছুটিতে যাবার কারণে নিরাপত্তা জোরদার করার কাজটায় ভাটা পড়ে যায়।এরপর সন্তু লারমাও কোন উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেননি।
সেঃ লেফঃ তপন(দেবব্রত চাকমা),টেকটিক্যাল জিএইচকিউ এর ফাইটিং গ্রুপের একজন কমান্ডার।তিনি বলেন, “১০ নভেম্বরের আক্রমণের সময় বাঁঘমারা ঘাঁটির পশ্চিমের পাহাড় চূড়ায় আমাদের ফাইটিং গ্রুপটি ১ প্লাটুনের বেশী জনশক্তি নিয়ে ৩টা ব্যারাকে ৩ গ্রুপে ছিল ।ফাইটিং গ্রুপটির মূল কমান্ডার ছিলেন ভিক্টর বাবু (লেফঃ প্রণতি বিকাশ চাকমা,জেএসএস এর বর্তমান কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক) ।ভোর হওয়ার কিছু পূর্বে বিভেদপন্থীরা উত্তর দিক হতে আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করলে ভিক্টরবাবু ও সুবীর ওস্তাদ [দেবু বিকাশ] গ্রুপ ফেলে পালিয়ে যান।ফলে তিনটি গ্রুপের নেতৃত্বদানের দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়।“

লাম্বা-বাধি তত্ত্বঃ
পর্যবেক্ষণ,অনুসন্ধান ও বিদ্রোহী ঘরনার নেতা-কমান্ডারদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়,প্রীতি কুমার এবং তাঁদের কতিপয় নেতা মনে করেন,এমএন লারমার “রণ্নীতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও রণকৌশলগতভাবে দ্রুতনিষ্পত্তির লড়াই” তত্ত্বটি একটি শুধুমাত্র মার্কসীয় তত্ত্ব,যেটি অধিকার অর্জনকে মিছেমিছি প্রলম্বিত করে এবং বহু শুভানুধ্যায়ীর বিরাগভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।তাই,এই তত্ত্বটির বিপরীতে রণ্নীতিগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি তত্ত্ব বা ‘শর্টকার্ট’ অর্থাৎ বেটে বা ‘বাধি’ তত্ত্বের আবিষ্কার এবং সেই ভিত্তিতেই বাহ্যিক শর্ত পরিপূরণে পরনির্ভরশীলতার (বা অন্যের সাহায্য গ্রহণের) দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের কৌশলের পরিবর্তে নীতি হয়ে দাঁড়ায়।ফলে এই ‘শর্টকার্ট’ তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে বিদ্রোহীপক্ষ পরনির্ভরশীল তথা বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর নীতি অনুসরণ করতে থাকেন।অথচ,আভ্যন্তরীণ ভিত্তি এবং বাহ্যিক শর্ত বিষয়ে এমএন লারমা কর্তৃক প্রবর্তিত ও জেএসএস কর্তৃক গৃহীত তত্ত্ব হচ্ছে, “রণ্নীতিগতভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়া এবং রণকৌশলগতভাবে শর্তহীনভাবে বন্ধুর সাহায্য গ্রহণ করা”।প্রীতি কুমার পার্টির এই তত্ত্বটিরও বিপরীতে গিয়ে বাহ্যিক শর্ত নির্ভর নীতি গ্রহণ করেন।পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক গৌতম কুমার চাকমা এই প্রসঙ্গে বলেন,তাঁদের রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছিল,ছিল রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের অপ্রতুলতা।“

ডিডিএফ গঠন ও অপারেশন ‘ডগ’ঃ
১৯৮৩ সনের ১০ নভেম্বরের নৃশংস হত্যাকান্ডের পরপই নভেম্বর মাসের মধ্যে দু দফায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পার্টি গ্রহণ করে ।যার সুফল পরবর্তীকালে পার্টি বা আন্দোলন প্রত্যেক্ষভাবে পেয়েছে। প্রথম হচ্ছে-পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে সন্তু লারমাকে নির্বাচিত করা,দ্বিতীয়টি হচ্ছে-সুসংগঠিত উপায়ে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য ‘ডিসিডেন্টস ডেষ্ট্রাকশন ফোর্স বা ডিডিএফ, যার বাংলা অর্থ হতে পারে ‘ বিভেদপন্থী ধবংসকারী বাহিনী’ গঠন।মূল যুদ্ধক্ষেত্র এলাকায়(দীঘিনালা,পানছড়ি ও খাগড়াছড়ি) উপস্থিত থাকা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বিভিন্ন ইউনিটের কিছু কমান্ডারের উপস্থিতিতে সন্তু লারমাকে সর্বসম্মতিক্রমে পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।তাঁর উপর সম্পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করা হয়।একই স্থানে মেজর পেলের কমান্ডে ডিডিএফ গঠন করা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তৃতি ,বিদ্রোহীদের অবস্থান ও শক্তি প্রভৃতি বিবেচনায় এনে ডিডিএফ-কে কোবরা,লায়ন ও টাইগার নামে তিন ইউনিটে বিভক্ত করা হয় এবং তাদের কর্মএলাকা নির্দিষ্ট করা হয়।দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা দেয়ার প্রাক্কালে সন্তু লারমা মেজর পেলের হাতে ১৬৫ জনের একখানি খতম তালতকা হস্তান্তর করেন। সন্তু লারমা তাঁর খতম তালিকা মেজর পেলেকে দেয়ার সময় মোটামুটি এ কথাগুলোই  বলেছিলেন-খাগড়াছড়ি হতে লোগাং পর্যন্ত আমাদের বিরোধীদের নাম এই তালিকায় আছে।তাদের সবাইকে ফেলে দেবে।এর বাইরে ছোটখাট আরও যদি পাও সেগুলোকেও রাখবেনা।“মেজর পেলে খতম তালিকা দেখে অবাক হয়ে যান।তিনি দেখেন তালিকায় তাঁর কলেজ জীবনের বন্ধু জ্ঞান প্রভাত চাকমা(হাইস্কুলের শিক্ষক),পানছড়ি এলাকার তৎকালীন প্রভাবশালী মুরুব্বী সূতকর্মা চাকমা(খতম তালিকার ২নং ব্যক্তি),নিশাকর চাকমা,জগদীশ চাকমা(প্রাক্তন উপজেলা চেয়ারম্যান)সহ অনেকের নাম।তিনি নির্বিকার থেকে চলে আসেন এবং ঐ খতম তালিকার একজনকেও খতম না করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের ব্যাপারে মনোনিবেশ করেন।তিনি আমাকে বলেন যে,”এতগুলো লোককে হত্যা করলে আমি এতদিন হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যেতাম।আমি তা চাইনি এবং হতেও দিইনি।“বেসামরিক এতগুলো স্থানীয় মুরুব্বী হত্যা করার ব্যাপারে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন সন্তু লারমা নিজেই।এসব আমরা অনেক পরে জানতে পারি।অবশ্য এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই,পানছড়ি ও খাগড়াছড়ি এলাকার মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যেক অঞ্চলে চরম প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ত নেতৃত্ব সবসম্য সক্রিয়ভাবে ও গোপনে জেওএসএস এর সর্বনাশ করতে তৎপর ছিল।কিন্তু এও দেখা গেছে যে,সামন্ত খুঁটি হয়েও অনেকে পার্টির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং সার্বক্ষণিক হয়েছিলেন।এসব সম্ভব অনেকাংশে হয়েছিল সেসব এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত দলীয় যোগ্য কর্মীদের যোগ্যতার কারণও।বরকল উপজেলার করুণা মোহন চাকমা,১৫৫ নং এহদ ভোরেয়া মৌজার হেডম্যান ও সুবলং এলাকা বা বর্তমান জুরোছড়ি উপজেলার প্রয়াত অরিন্দম দেওয়ান,তিনিও হেডম্যান;এই দুজনের উদাহরণ দেয়া যায়।প্রথম জন ইউপি চেয়ারম্যান,পরবর্তীতে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং মুক্তিবাহিনীও।দ্বিতীয়জন কোলকাতায় পড়াশুনা করা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ও সমাজের উঁচুতলার সদস্যও।তারা উভ্যে পার্টির আঞ্চলিক গ্রাম পঞ্চায়েত পরিচালক ছিলেন।যে দিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়,সে দিন তাঁরা উভয়ে প্রথম গ্রাম পঞ্চায়েত পরিচালক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ২৬০ নং ইটছড়ি মৌজার এক প্রত্যন্ত গ্রামে।এ সম্মেলনে পার্টির প্রতিনিধি ছিলেন সন্তু লারমা ও যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা,এমপি।
কঠোর পরিস্থিতিতে অভুক্ত-অর্ধভুক্ত অবস্থায় প্রত্যেক সদস্যের চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ডিডিএফ গৃহযুদ্ধে অবিস্মরনীয় অব্দান রাখতে সক্ষম হয়।উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় উপস্থিতি ডিডিএফ এর প্রত্যেক সদস্যকে উজ্জীবিত করে।দীঘিনালা থানা এলাকার চন্দ্র শেখর চাকমার নেতৃত্বে একটি পৃথক ইউনিট মোতায়ন ছিল।গৌতম কুমার চাকমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ২নং সেক্টরে,যদিও সেখানে কোন সংঘর্ষ ছিলনা।তার মূল দায়িত্ব ছিল গৃহযুদ্ধে ২ নং সেক্টরকে কেন্দ্রের পক্ষে রাখা,বিদ্রোহী ১ নং সেক্টরকে নজরদারি করা ও ২ নং সেক্টরে অবস্থান করে রাঙ্গামাটি এবং ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা।
১০ নভেম্বর ১৯৮৩ যদি প্রীতি কুমার চাকমার গৃহযুদ্ধে আরোহণের উত্তুঙ্গ- বিন্দু হয়,তাহলে লাল চাকমার মধ্য-মার্চ ১৯৮৫ এর ‘ডগ; (ডেনজারাস অপারেশন গোলকপুদিমা) অপারেশন অবরোহনের নিমজ্জন-বিন্দু  বিবেচিত হতে পারে।বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল গোলকপুদিমাছড়াকে কেন্দ্র করে পানছড়ি থানার কিছু এলাকা এবং পূজগাং এলাকা ।অপর পক্ষে পার্টি বা কেন্দ্রের শক্ত ঘাঁটি ছিল লোগাং ও পানছড়ি থানার দক্ষিণ অংশ ।সোজা কথা হচ্ছে যে,গৃহযুদ্ধের মূল রণাঙ্গন ছিল পানছড়ি থানা ও খাগড়াছড়ি সদর থানার উত্তর অংশ।
 ডিসেম্বর ১৯৮৩ সন হতে ডিসেম্বর ১৯৮৪,এই ১৩ মাস সময়ে এমন একটি সপ্তাহ যায়নি যেখানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মূল রণাঙ্গনের অধিকাংশ এলাকায় সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়নি বা রক্ত ঝরেনি।এই সময়ের মধ্যে মূল রণাঙ্গনের অধিকাংশ এলাকায় তাঁদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সীমিত করা সম্ভব হলেও একমাত্র গোলকপুদিমাছড়াকে ভিত্তি করে তাদের আক্রমণ অব্যাহত থাকে।মূলতঃ গোলকপুদিমা ও পার্শ্ববর্তী ২/৩ টা পাড়া এবং চতুস্পার্শ্বস্ত বিস্তীর্ণ জঙ্গলকে ভিত্তি করে বিদ্রোহীদের কিছু পরিবার ও ঘাঁটি কেন্দ্রের বিষফোঁড়া হয়ে থেকে যায়।
সুতরাং,এই গোলকপুদিমায় সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে মূল রণাঙ্গন বিদ্রোহীমুক্ত করার উদ্দ্যেশ্য ১৯৮৪ সনের মধ্য-মার্চে ‘ডগ’ মাঠে নামানো হয়।এই অপারেশনের কমান্ডার ছিলেন ডিডিএফ কমান্ডার তাতিন্দ্র লাল চাকমা ও সহকারী কমান্ডার ছিলেন বিশেষ কোম্পানীর ক্যাপ্টেন ভারত চন্দ্র চাকমা(রনি)। ১৬৫জন সদস্য এই অপারেশনে অংশগ্রহন করেন ৪টা গ্রুপে।সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অবলম্বন করে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি এলাকা সঙ্কুচিত করা হয় এবং ৮-১০ দিনের মধ্যে অপারেশন কৃতকার্যতা লাভ করে।প্রানের ভয়ে তাঁদের দ্রুত পাততাড়ি গুটাতে হয় এবং সোজা দক্ষিণ্মুখী পশ্চাদপসরান,বলতে গেলে প্রাণ হাতে নিয়ে ১নং সেক্টরে সরে যাওয়া।ডিডিএফ এর পিছু-ধাওয়া মহালছড়ি থানার জগনাতলী পর্যন্ত চলে।এরপর ফুলবিঝুর দিন অর্থাৎ ১৯৮৫ সনের ১৩ এপ্রিলে ঝোরবো মহাজন পাড়ায়(তৈচাকমা থুম)বিদ্রোহীদের হামলা করে ডিডিএফ,ফলে বিদ্রোহী বাহিনী ফুরোমোন-তেঙাছড়িমোনের রেঞ্জ অতিক্রম করে কাউখালী থানা এলাকায় আশ্রয় নেয়।এতে সরকারের নিকট বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পন ত্বরান্বিত হয়।বিদ্রোহীদের ১জুন ১৯৮৪ সনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে শুরু হওয়া গোপন বৈঠকের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮ ও ১৯ এপ্রিল ১৯৮৫ তারিখে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত হওয়া নবম বৈঠকে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মধ্যে দিয়ে ।ফলশ্রুতিতে ২৯ এপ্রিল বিদ্রোহীদের ২৩৩ জন সদস্য রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামে আত্মসমর্পন করেন এবং ১ বছর ১০ মাস ১৬ দিনব্যাপী গৃহযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

গৃহযুদ্ধ অবসানের চুক্তিঃ
অপর দিকে “দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে গৃহযুদ্ধ অবসান করে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে “১৯৮৫ সনের ২৮-৩০ এপ্রিল ,৩ দিনব্যাপী এক উচ্চ পযায়ের বৈঠকে গৃহযুদ্ধ পরিসমাপ্তির ঐক্যমত্য হয়।তবে,এই চুক্তিতে “সক্রিয়ভাবে কাজ করতে ইচ্ছুক এবং সক্রিয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য সদস্যদেরকে সক্রিয় পক্ষ কর্তৃক গ্রহণ করা”র ঐক্যমত্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।বিদ্রোহী,ভিন্নমতাবলম্বী,বিভেদপন্থী,প্রীতিগ্রুপ,বাধি,চক্র,চার-কুচক্রী-যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন,১০ নভেম্বরের হত্যাকান্ড যারা ঘটিয়েছেন তারা ‘নিস্ক্রিয়পক্ষ’ পরিচিতি নিয়ে আন্দোলন হতে সরে যান।গৃহযুদ্ধ অবসানের জন্য ৩০ এপ্রিল ১৯৮৫ সনে স্বাক্ষরিত চুক্তিখানি কিন্তু একটা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিছু নয়।এই চুক্তির প্রয়োজনীয়তা ছিল এই কারণে যে,নিস্ক্রিয়পক্ষের দখলে থাকা অস্ত্র-গোলাবারুদ ও সাজসরঞ্জামাদি এবং বেহাত হওয়া দলিলপত্রাদি সক্রিয়পক্ষ কর্তৃক দ্রুত ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা এবং উভয়পক্ষের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐক্যমত্য হওয়া ।এই চুক্তি “নিস্ক্রিয়পক্ষের সদস্য,সমর্থক এবং সহানুভূতিশীল জনগনের বাজেয়াপ্তকৃত স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি সক্রিয়পক্ষ কর্তৃক ফেরৎ প্রদান করা এবং স্বীয় সম্পত্তি ভোগদখলের ব্যবস্থা করা ।“এবং “উভয়পক্ষের সদস্য,সমর্থক এবং সহানুভূতিশীল জনগনের প্রতি উভয়পক্ষ কর্তৃক জীবন ও সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা।“ও “গৃহযুদ্ধকালীন নিস্ক্রীয়পক্ষের যাঁরা বন্দী,গৃহত্যাগী অবস্থায় এখনো রয়েছেন তাঁদেরকে শর্তহীনভাবে মুক্তি প্রদান করা।“-এর ঐক্যমত্য সিদ্ধান্ত দিয়ে পার্টিকর্মী,সহানুভূতিশীল জনগন ও আত্মীয়বর্গের সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় উভয়পক্ষ দিয়েছে।তবে উভয়পক্ষই কিছু বিষয়ে লঙ্ঘন করেছে।

প্রীতি কুমারের বিষয়ে তাঁর সহকর্মীদের মন্তব্যঃ

লেফঃ সুকাশঃ “প্রীতি কুমার বৈদেশিক সাহায্যের মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে কর্মীবাহিনীকে বিপদ্গ্রস্থ করেছেন।তিনি পানছড়ি এলাকার বোরবো গোজা এবং কুরাকুট্যা গোজার লোকদেরকেও প্রতারিত করেছেন।তিনি দাবী করেছেন, ‘ইজরাইল আমাদেরকে সমর্থন করে ,চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ও আমাদেরকে সমর্থন করেন এবং ভারতের সমর্থনও আমাদের পক্ষে আছে।‘এই উভয় গোজার লোকেরা ত্রিদিব রায় ভক্ত।সুতরাং ত্রিদিব রায়ের কথা বলাতে পানছড়ি এলাকায় রাতারাতি সমর্থন প্রীতি কুমারের পক্ষে চলে যায়।“নেতৃত্বের বিশ্বস্থতা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন,”প্রীতি কুমার ১৯৮৫ সনের মাঝামাঝি তাঁর নিরাপত্তার জন্য রাখা দলীয় পিস্তলটি পর্যন্ত বিক্রি করে খেয়ে ফেলেছিলেন।কথাটা প্রকাশ হয়ে পড়লে নেতা কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।আমরা অত্যন্ত অসৌন্যমূলক কথাও বলি।আমরা বলেছিলাম যে ,পিস্তল্টি তাঁর বাবার সম্পত্তি নয় যে ওটা বিক্রি করে খাবেন।ওটা জুম্ম জাতির সম্পত্তি।“

হরিকৃষ্ণ চাকমাঃ “প্রীতি কুমার একজন প্রতারক।বিভিন্ন সময়ে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে কর্মীদেরকে বিপদে ফেলেছেন।সরকারের কাছে আমাদের একসঙ্গে ২৩৩ জনের আত্মসমর্পনের পরও এই নেতা-কর্মীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে রাজনীতিতে সক্রিয় রাখতে বিভিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।“তিনি অত্যন্ত বেদনা ও ক্ষোভ নিয়ে আরো বলেন, “সকারের সঙ্গে সংলাপে আমাদের সংলাপ কমিটিতে প্রথমে বিলাস থাকলেও এক পর্যায়ে তিনি সরে যান।মাঠের পরিস্থিতি প্রতিকূল মনে হলে কাচলং হতে রাজেশ[মনিস্বপন দেওয়ান] ‘পরিস্থিতির খোঁজ নিতে ‘ চাকমা ডিষ্ট্রিক্ট কাউন্সিল-এ চলে যান এবং তিনি আর ফিরে আসেননি বা যোগাযোগও করেননি।দীঘিনালা হতে সাগর [সনৎ কুমার চাকমা],কোয়ার্টার মাষ্টার জেনারেল] সরে যান।পানছড়ি হতে প্রীতি কুমার ও বিলাস সরে যান।একে একে সিনিয়র সবাই মাঠকর্মীদের ফেলে চলে যান।“আর্মীদের সঙ্গে তাঁদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কিছুদিন পূর্বে তিনি পরামর্শ নিতে গেলে প্রীতি কুমারের বাড়িতে ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন,”আমার হাতে যদি আজ হাতিয়ার থাকতো তাহলে আমি তোমাকে খুন করতাম।“

সুদত্ত প্রিয় চাকমাঃ “প্রীতি কুমারের কোন পলিটিক্যাল স্যাগাসিটি(বিচক্ষণতা) নেই।নেই কোন পলিটিক্যাল ডেপথনেস(গভীরতা)।পার্টির বিভাজন ও গৃহযুদ্ধে তিনি দুর্যোধনের ভূমিকা রেখেছেন।“তিনি আরও বলেন,”প্রীতি কুমার  প্রায়ই দাবি করে থাকেন যে উচ্চ পর্যায়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ১০ নভেম্বর ঘটনা ঘটিয়েছেন;যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।“

প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঃ “১৪ই জুনের ঘটনার পরপরই আমার কাছে প্রীতি কুমার চাকমার মেসেজ ছিল, ‘আন্দোলন দ্রুত বিজয়লাভের জন্য সকল প্রকার বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবস্থা সুনুশ্চিত করা হয়েছে।‘ সেই সঙ্গে গৃহযুদ্ধে যোগদানের জন্য দেবেনদাসহ তার নির্দেশ।উত্তর অঞ্চলে পৌঁছে বৈদেশিক সাহায্যের কোন আভাসই আমি দেখতে পাইনি।এই  মিথ্যা আশ্বাস আমাকে ও আমার গ্রুপের সবাইকে ব্যথিত করে ।বিষয়টি প্রাণভয়ে প্রীতি কুমার বা অন্য কাউকে বলতে পারিনি।তবে মিথ্যা আশ্বাসে প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি আমার সেক্টর কমান্ডার তথা রাজনৈতিক গুরু দেবেনদার নিকট উত্থাপন করলে তিনি অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন।“

ভবতোষ দেওয়ানঃ “প্রকাশের [প্রীতি কুমার চাকমা] গগনচুম্বী উচ্চাভিলাষ রয়েছে।সুযোগ পেলে সে এখনও রাজনীতি করবে।“

ত্রিভঙ্গিল দেওয়ানঃ “গিরি ও আমাকে প্রকাশ বিশ্বাস করেননি।তিনি আমদের এড়িয়ে গিয়ে কার্যক্রম চালিয়েছেন। ১০ই নভেম্বরের ঘটনা আমি জানতাম না।আমার পরিবারে চিকিৎসা-ছুটিতে থাকার সময় এই বিষয়ে জানতে পারি।প্রকাশ তাঁর বাবুরা গোজার আত্মীয়দেরকে নিয়েই কাজ চালিয়েছেন।বাবুরা গোজা ও লারমা গোজার দ্বন্ধে পার্টির রাজনৈতিক লাইন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।“

সন্তু লারমার পুলিশের হাতে গ্রেফতারঃ
শান্তিবাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার সন্তু লারমা ২৬অক্টোবর ১৯৭৫ অপরাহ্ন আনুমানিক ৩ ঘটিকায় পানছড়ি-খাগড়াছড়ি রাস্তার কুগিছড়া নামক স্থানে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন.১৯৭৫ সনে ভালুক্যামা ছড়ায়(উগুদাছড়ির শাখাছড়া,২৯নং ক্যায়াংঘাট মৌজা,ক্যায়াংঘাট ইউনিয়ন,খাগড়াছড়ি) স্থাপিত জিএইচকিউত-তে ফুটবল খেলার সময় তাঁর ভাঙ্গা হাত দিল্লীর অর্থোপেডিক সার্জন ডাঃ গ্রোভার এর তত্ত্বাবধানে  এক নার্সিংহোমে চিকিৎসা শেষে  পানছড়ি হয়ে প্রকাশ্য রাজপথ ধরে জিএইচকিউ-তে হেঁটে আসার সময় এই ধরা পড়া।পুলিশ সন্তু লারমার এক্স-রে প্লেট,সার্জন গ্রোভার এর দেয়া প্রেশক্রিপশন,কিছু ভারতীয় মুদ্রা ও ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এর একখানি ব্যবহৃত টিকেটও পায়।পরবর্তীতে আন্দোলনের একজন শুভানুধ্যায়ি আমাকে রুষ্টস্বরে বলেছিলেন, “এত বড় নেতা হয়ে তিনি কেন প্লেনের ব্যবহৃত টিকেট বহন করতে যাবেন? এটা পারিবারিক জাদুঘরে রাখার জন্য কি তিনি সঙ্গে রেখেছিলেন?”অনেকেই মনে করেন-উচ্ছৃঙ্খতার কারণেই পুলিশের হাতে ধৃত হয়ে তাঁকে খেসারত দিতে হয়।তবে,সবচেয়ে বেশী খেসারত দিতে হয়েছে পার্টি তথা সমগ্র আন্দোলনকে।নিজে মিছেমিছি সোয়া চার বৎসর হাজতবাস করলেন,দুজন দলীয় কর্মীকেও ভোগালেন [অনিমা চাকমা,পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির নেতা ও বিভূতি চাকমা] এবং পার্টি তথা আন্দোলনের মহাসংকটের জন্ম দিলেন।সন্তু লারমার কিন্তু একই বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে আমাকেসহ কমলছড়ি হতে পায়ে হেঁটে পানছড়ি যাওয়ার পথে খাগড়াছড়ি বাজারে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার কথা ছিল।পুলিশ সংবাদটি দেরিতে পায়।খাগড়াছড়ির একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের দুজনের নাম উল্লেখ করে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “পাখি উড়ে গেলো।একটুর জন্য ধরতে পারলামনা।“এটা সন্তু লারমার সাহসিকতা না হঠকারিতা?উচ্ছৃঙ্খলতা না উচ্ছন্নতা?

সন্তু লারমার জেল্মুক্তি,বিপরীতে দলে সংকট সৃষ্টিঃ
২৬ অক্টোবর ১৯৭৫ হতে ১৯৮০ সনের ২২ জানুয়ারী,এই সোয়া চার বৎসর সন্তু লারমা জেলে আটক ছিলেন বিনা বিচারেই ,মূলতঃসেন্ট্রাল জেলেই।মূলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ শান্ত করার করার উপায় খুজতে গিয়ে ব্যাপক জনমতের কারণে জেএসএস ও সরকারের সেতুবন্ধু হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়া তাঁকেকে শর্তহীনভাবে মুক্তি প্রদান করেন।রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউজে এক সুধীসমাবেশে ২২জানুয়ারী ১৯৮০ অন্য তিনজন পার্টির নেতা-কর্মীসহ সন্তু লারমাকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মুক্তি প্রদান করেন।এই তিনজন হলেন-কেন্দ্রীয় সদস্য চাবাই মগ(মেজর মংহ্লাউ),লেফঃ সলিল/সুকান্ত [সমির কান্তি চাকমা,বেতছড়ি] ও সার্জেন্ট বিলাস(বিলাস কান্তি ত্রিপুরা,বেলতলী পাড়া,বাঙ্গালকাটি মৌজা]।
জেলবন্দী অবস্থায় সন্তু লারমার সরকারের কাছে জমা দেয়া ৪৩ পৃষ্ঠার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে সুপারিশনামাকে প্রীতিকুমার “আপোষনামা” হিসেবে চিহ্নিত করেন।তিনি বলেন,এই ‘আপোষনামায়’ জেএসএস পরিচালনা পদ্ধতি,অঙ্গ সংগঠন ও গ্ণলাইনসহ পার্টির অনেক স্পর্শকাতর বিষয় ফাঁস হয়ে যায়।এই দলিলের শেষ্প্রান্তে লেখা সুপারিশটা-“বিদ্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতি সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের সমাধা হবে বলে মনে করি।“প্রীতি কুমার আপত্তি জানান।সন্তু লারমাকে উদ্দেশ্য করে প্রীতি কুমার বলেন,”আমি প্রশ্ন রাখতে চাই,পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা রাজনৈতিক উপায় ছাড়া সমাধা সম্ভব কিনা?” তাঁর মতে -রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সিআইএ ও আইএসআই এর পরামর্শে সন্তু লারমাকে জেল হতে মুক্তি দিয়েছিলেন;জেএসএস ভাঙার জন্য।হাজতবাসের সময় সন্তু লারমাকে সরকার কর্তৃক শ্লো পয়েজনিং করা হয়েছে।যার কারণে তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে এবং ক্ষমতার জন্য উন্মত্ত হয়েছেন বলেও প্রীতি কুমার দাবী করেছেন।
উল্লেখিত প্রেক্ষাপটে সন্তু লারমা তাঁকে আর্মী “গ্রেফতার করেছে এবং পরে ছেড়ে দিয়েছে এবং আর্মীরা পরবর্তীতে গ্রেফতার করবে, এই যুক্তি দেখিয়ে আবার আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রবেশ করেন ১৯৮১ সনে।উল্লেখ্য যে সন্তু লারমার মাতৃদেবীর মৃত্যুর পর ১৯ মার্চ ১৯৮১ সাদদিন্যে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়ে গেলে স্থানীয় এক ক্যাম্প হতে একগ্রুপ আর্মী গিয়ে এক ক্যাপ্টেন সন্তু লারমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।ঐ অনুষ্ঠানের কারণ জানতে পেরে ও সন্তু লারমার পরিচয় পেয়ে আর্মীর এই ক্যাপ্টেনটি সন্তু লারমার কাছে বারবার ক্ষমা চেয়ে ঐ স্থান হতে ফিরে যান।তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে ফিরে গেলে সবচেয়ে বেশী প্রতিক্রিয়া হয় প্রীতি কুমারের এবং প্রীতি কুমাররা সন্তু লারমাকে অসহযোগিতা দিয়ে যান।প্রীতি মূলতঃ দুটি যুক্তি প্রদর্শ্ন করে থাকেন,প্রথমটি হচ্ছে জেল্মুক্ত কোন কর্মীকে পার্টিতে পুনঃপ্রবেশের পূর্বে নজরদারীতে রাখতে হয় এবং সন্তু লারমার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে,দীর্ঘ বছর পর সন্তু লারমার ফিল্ড কমান্ডার পদ ফিরে পাবার অধিকার নেই।এই অভিযোগের মাধ্যমে  এমএন লারমাকে স্বজনপ্রীতিবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করেন প্রীতি কুমার।সত্যি কথা হচ্ছে,সন্যু লারমার অনুপস্থিতে তাঁর সম্মানার্থে এই পদটি শূন্য রাখা হয় এবং ভবতোষ দেওয়ান ভারপ্রাপ্ত ফিল্ড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সনের ১ম কংগ্রেসে ভবতোষ দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ ফিল্ড কমান্ডারের দায়িত্বও প্রদান করা হয়।তিনি ১৯৭৭ সনের ডিসেম্বরে নিজের এক সৈনিকের অতর্কিত গুলিতে আহত হলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আর ফিরতে পারেননি।ফলে সাধারণ সম্পাদক ও ফিল্ড কমান্ডারের পক্ষে নির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর প্রদানের জন্য এমএন লারমা একটি ৩- সদস্যক(অনাদি কুমার চাকমা,নলীনি রঞ্জন চাকমা,যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা) প্যানেল কমিটি গঠন করে দেন।এই প্যানেলে প্রীতি কুমারের নাম না থাকাতে কিংবা এই দায়িত্ব এককভাবে তাঁকে পালন করতে না দেয়ার কারণে সম্ভবত এমএন লারমার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ জন্মাতে শুরু করে । কেন্দ্র বা এমএন লারমার পক্ষে প্রীতি কুমার বিভিন্ন ইউনিট ও অঞ্চলে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে নিজে ফিল্ড কমান্ডার এমন ভাব দেখাতেন বলে জানা যায় ।তার একটি উদাহরণ হতে পারে ,প্রীতি কুমার চাকমা প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিশেষ সেক্টরে গেলে তিনি একক দায়িত্বে মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন গুমতি এলাকার বান্দরকাবা প্রাইমারি স্কুল ও পার্শ্ববর্তী অন্য একটি প্রাইমারি স্কুলে অবস্থানরত সেটেলার বাঙালী মুসল্মানদের আক্রমণ করার নির্দেশ প্রদান করেন।
এমএন লারমা ১৯৮১ সনের মে মাসের মাঝামাঝির পর অতি মানসিক পরিশ্রমজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন।তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় এবং দীর্ঘদিনের ছুটির প্রয়োজন হলে তিনি সন্তু লারমাকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত  সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করলে প্রীতি কুমারের চরম ক্ষোভ পরিদৃষ্ট হয়।ক্ষোভের প্রকাশ্য উদ্গিরণ হয় অক্টোবর ১৯৮২ সনে ,সশস্ত্রপন্থায় ক্ষমতা দখল-প্রচেষ্টার মাধ্যমে । ১৯৮০ সনে সন্তু লারমার মুক্তিলাভ হতে ১৯৮২ সন পর্যন্ত সময়টা অবৈরী দ্বন্ধ হতে বৈরী দ্বন্ধে রুপান্তরিত হওয়ার উর্বরকাল বা গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতিকাল বা সুপ্তিকাল । ১৯৮৩ সনের ১৪ জুন সংক্রমণকালের সূচনা এবং উত্তুঙ্গতালাভ ১০ নভেম্বর ১৯৮৩; যার ব্যাপ্তি ১৯৮৫ সনের ১৯৮৫ সনের এপ্রিল পর্যন্ত।

গৃহযুদ্ধ বা পার্টিতে সংঘাত সৃষ্টির কারণঃ
আন্দোলনের পুরোধা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সন্তু লারমা এক সংগ্রামী নেতা হিসেবে দেশে-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতিলাভের পাশাপাশি জেদি,পরমত অসহিষ্ণু ও কর্তৃত্ববাদী হিসেবেও শুধু জেএসএস নয়, এমনকি দেশ-বিদেশের অনেকের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন।কিশোর বয়সে তিনি কোথাও হোঁচট খেলে তাঁর আঙুল রক্তাক্ত না হওয়া পর্যন্ত হোঁচট খাওয়া স্থানে তিনি লাথি মেরে যেতেন,এটা তার মুখ হতেই শুনা।মাইচছড়ি হাইস্কুলে ১৯৭০ সনের দিকে শিক্ষক্তা করার সময় তিনি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ধীরেন্দ্র লাল চাকমাকে [কাজলাবাপ] নিজ হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছিলেন এবং তাও ঐ স্কুলে।তাঁর পরমত অসহিষ্ণুতা ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাব হতে উৎসারিত ব্যবহার ও সিদ্ধান্তের কারণে তাঁর অনেক যোগ্য সহকর্মী তাঁর কাছ হতে শারীরিক – মানসিকভাবে দূরে সরে যান; তা গৃহযুদ্ধের সময় এবং তার উত্তরকালে ।জেএসএস-এর বর্ত্মান চলমান সংকটে সন্তু লারমা-ঘরানার লক্ষণরেখা পার হতে না পারা এক শীর্ষ নেতার মতেও সন্তু লারমার উচ্ছন্ন চরিত্র পার্টি তথা আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে আসছে।এই একই মত পোষণ করেন আরো কয়েকজন প্রবীণ কেন্দ্রীয় ও নেতৃস্থানীয় সদস্য।
অপরদিকে প্রীতি কুমার ঠিক তার বিপরীত; ভদ্র-নম্র,অমায়িক।ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা হিসেবে তাঁর অনেক গুণগ্রাহীর অধিকারী তিনি।ছোটছোট চিঠি লিখে তিনি বিভিন্ন অঞ্চল ইউনিটের কর্মী -কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে জানা যায়।তবে পার্টির বিভাজন রেখা দৃশ্যমান হওয়ার পর হতে পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর সিনিয়র সহকর্মীদের অবজ্ঞা করে এককভাবে তাঁর ধারা পরিচালিত করেছেন বলে তাঁর সহকর্মীরা অভিযোগ এনেছেন।এইসব কারণে ভবতোষ দেওয়ান,সুদত্ত প্রিয় চাকমা,হরিকৃষ্ণ চাকমা, বিলাস চাকমা,বকুল চাকমা ও আরও কয়েকজনের কাছে তাঁর উপর ক্ষোভ দেখা যায় দীর্ঘ ২৮/২৯ বছর পরও।
সন্তু লারমা ও এমএন লারমার বিরুদ্ধে ১৯৮২ এর কংগ্রেসে প্রীতি কুমার গং যে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন তা আমি প্রত্যাখান করি।গৌতম কুমার চাকমাও প্রত্যাখান করেছেন যা উল্লেখ করা হয়েছে ইতিমধ্যে।সন্তু লারমাকে অন্যের ক্লেশে কাতর হতে আমরা দেখেছি।দেখেছি অন্যের দুঃসময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে।যদিও পার্টির প্রবীণ এবং সন্তু লারমা -ধারার পক্ষে থাকা প্রথম সারির এক নেতার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে -সন্তু লারমা নূন্যতম স্বার্থ ছাড়া কাউকে কোনরুপ সাহায্য করেন না।এই পর্যবেক্ষণ হয়তোবা গৃহযুদ্ধত্তোর কালে বা ১৯৯৭ পরবর্তী সময়ে।প্রীতি কুমারের লারমাভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার বিপরীতে প্রীতি কুমারের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আনা যায়।প্রীতি কুমারের মনে রাখা দরকার ,২য় কংগ্রেসে সন্তু লারমা কর্তৃক নির্ধারিত ৫ জন ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তির মধ্যে অন্ততপক্ষে ১জনের বিরুদ্ধে চরম দুর্নীতি ও ৩ জনের বিরুদ্ধে সামাজিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিল।এইসব বিষইয়ে আলোচনা না হওয়াই কাম্য।
স্নেহময় চাকমা ,১৯৬৯ সনে পাহাড়ী ছাত্র সমিতির সভাপতির মতে,”আসলে ‘লাম্বা’ ‘বাধি’ বিভাজন আমরা চাইনি।সন্তু বাবু এক কাজে দক্ষিণাঞ্চল হতে জনশক্তি নিয়ে আসেন কিন্তু করেছেন অন্যটা।এইভাবে তিনি যদি ১৪ জুনের ঘটনা না করতেন তাহলে গৃহযুদ্ধটা হতোনা।“ এই যুক্তিটা বিদ্রোহীপক্ষের কমান্ডার সুদর্শীসহ (শুভমঙ্গল চাকমা ) অনেকের।অর্থাৎ ১৪ জুন ১৯৮৩ এর আক্রমণকে একমাত্র কারণ বলে দায়ী করা হয়ে থাকে।এটা গৃযুদ্ধের পুরো চিত্রটি তাঁদের অজানা থাকার কারণে অর্থাৎ গৃহযুদ্ধটি তাঁদের কাছে অন্ধের হস্তি দর্শন,নাকি নিজেদের পূর্বের অবস্থান ধরে রাখার প্রয়াসে?
বিদ্রোহী পক্ষের নেতা বিলাস এর মতে ,”পার্টির গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি।মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারার কারণে গৃহযুদ্ধটা হয়েছে”।তিনি আরও বলেন যে, “এমএন লারমা,সন্তু লারমা ও কালী মাধব চাকমার পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রীতি কুমারের পরিবারটিও যদি নিরাপদ জায়গায় সরানো হতো তাহলে গৃহযুদ্ধটা সহজে হতোনা।এই কারণে প্রীতি কুমার নিজেকে বৈষম্যের শিকার মনে করেছেন।“তার একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য হচ্ছে, “সন্তু লারমা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে ,কিংবা ধরা পড়ার পর মুক্তি না পেলে গৃহযুদ্ধটা হতে পারতোনা।“এই মতামত উভয়পক্ষের।বিশেষ সেক্টরের ডেপুটি পলিটিক্যাল সেক্রটারি শরজিৎ এর মতে,”লারমা স্যার সঠিক পথে ছিলেন।তাঁর কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিলনা।তাঁর রাজনৈতিক লাইন সঠিক ছিল।তবে সন্তূ লারমা জেল হদে বেরিয়ে তাঁকে মিজগাইড করেছেন।“যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, “এই গোলমালের মূল কারণ হচ্ছে ভাবাবেগ ও বাস্তব জ্ঞানের অভাব।“
দলের অনেকে মনে করেন প্রীতি-সন্তু ও দেবজ্যোতি-সন্তু এর দ্বন্ধ হতে এই গৃহযুদ্ধের সৃষ্টি ।অনেক কারণের মধ্যে এই দুইটি বিষয় একটি অন্যতম কারণ;একমাত্র কারণ নয়।১৯৭৪ সনের মার্চ মাসে শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় বার্ষিকীর সময় মহালছড়ি থানার মুবাছড়ির কলাবুন্যা ট্রেনিং একাডেমিতে প্রীতি কুমার ও সন্তু লারমার ব্রিজখেলার সময় দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হতে হাতাহাতি হওয়ার উপক্রমকে সংশ্লিষ্ট সকলে এখনও স্মরণ করেন এবং মনে করেন পরবর্তী সময়ে তাঁরা সেই রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি ।সন্তু-দেবজ্যোতি বিরোধ শুরু দেবজ্যোতি চাকমা পার্টির দীঘিনালা আঞ্চলিক কমিটির প্রধান ও সন্তু লারমা দীঘিনালায় শিক্ষক থাকাকালে।‘সবুজ সংঘ ‘ ব্যানারে সন্তু লারমা ঐ সময় জেএসএস এর দীঘিনালা আঞ্চলিক কমিটিকে পাশ কাটিয়ে বাবুপাড়াকেন্দ্রীক  নিজের আত্মীয় ও পছন্দের কিছু ছাত্র-যুবা দিয়ে কাজ করতেন।ফলে  তারা অনেক ক্ষেত্রে  বেপরোয়াভাবে চলতেন বলে অভিযোগ ।দেবজ্যোতি  চাকমা এই বিষয়টা  পদ্ধটিগতভাবে সমাধা করতে  সন্তু লারমার দ্বারস্থ হয়েও কোন কাজ হয়নি ।এই কারণে সন্তু লারমা ক্ষুদে দলবাদী নীতি অনুসরণ করতেন বলে দেবজ্যোতি চাকমার অভিযোগ।ফলে সন্তু- দেবজ্যোতি দ্বন্ধের ব্যাপ্তি ঘটে।গৃহযুদ্ধে সন্তু লারমা বা পার্টির এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন প্রীতি কুমারের দক্ষিণ হস্ত হিসেবে। একমাত্র তাঁর প্রভাবেই ১নং সেক্টর পুরোপুরি বিদ্রোহীদের পক্ষাবলম্বন করে।
এটা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, “রণ্নীতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও রণকৌশলগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই “ তত্ত্বটির বিপরীতে বিদ্রোহীরা যে “দ্রুত নিষ্পত্তি” তত্ত্ব উপস্থাপন করেন এই প্রসঙ্গে গৌত্ম কুমার চাকমার কৃত মন্তব্য, “তাদের রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছিল,ছিল রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের অপ্রতুলতা।“একান্তই যথার্থ।একই সঙ্গে বিদ্রোহীদলের নেতা সুদত্ত প্রিয় চাকমার মন্তব্যও প্রণিধানযোগ্য।মূল্ধারা ও বিদ্রোহীধারার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিষয়ে প্রীতি কুমার ও দেবজ্যোতি হতে তাঁর জানতে চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, “রণ্নীতিগত নাকি রণকৌশলগত কারণে আপত্তি তা আমি প্রকাশ ও দেবেন জানতে চাইলে তাঁরা উভয়ে সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তাঁদের উভয়েরই রণ্নীতি ও রণকৌশলের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিলনা।“একজন রাজনৈতিক নেতা এবং পরিচালকের রণনীতি ও রণকৌশলের মধ্য পার্থক্য নির্ণ্যে অপ্রতুল জ্ঞান থাকলে আন্দোলন-জনগন-কর্মীবাহিনীর কি করুণ পরিণতি হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৮২ সনে পার্টির বিভাজন, ফলশ্রুতিতে সশস্ত্র সংঘর্ষ বা গৃহযুদ্ধ। রণকৌশল বিষ্যে সুস্পষ্ট ধারণা বা জ্ঞান না থাকলে আন্দোলনের যেমনি শত্রু- মিত্র নির্ণয় করা সম্ভব নয়,তেমনি কে প্রধান শত্রু কে অপ্রধান শত্রু তাও নির্ণ্য করা সম্ভব নয়।বিষ্য বা দ্বন্ধের কোনটি প্রধান দিক ও কোনটি অপ্রধান দিক তাও নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
“রণ্নীতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও রণকৌশলগতভাবে দ্রুতনিষ্পত্তির লড়াই” তত্ত্বটি বিদ্রোহীরা একটি নিরঙ্কুশ মার্কসীয় তত্ত্ব হিসেবে মনে করেন।তাঁদের জানা উচিৎ এই তত্ত্বটি মার্কসীয় পদ্ধতি বা গণতান্ত্রিক চেতনায় সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যেমনি প্রযোজ্য,তেমনি অসম -যুদ্ধে  অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জেএসএস এর লড়াই একটি অসম যুদ্ধ,এটা বিদ্রোহীপক্ষ ভালই অবগত আছেন।সন্তু লারমার কর্তৃত্ববাদী আচরণ ও পদক্ষেপকে সামন্ত মানসিকতার মৌলিক রুপ-প্রতিশোধ পরায়ণতা দিয়ে প্রতিহত করার প্রয়াসই হচ্ছে দ্বিতীয় কংগ্রেসের দ্বন্ধ এবং পরবর্তীতে গৃহযুদ্ধ ।এর পেছনে গূঢ় কারণ হচ্ছে সন্তু লারমার দলীয় ক্ষমতা ফিরে পাওয়া এবং প্রীতি কুমার চাকমা ও সন্তু লারমার মধ্যে অন্তত একটি ক্ষেত্রে সাযুজ্যতা পরিদৃষ্ট হয়,তা হলো ক্ষমতার মোহ।পার্টির নীতি-আদর্শের অধ্যয়ন-অনুশীলন-প্রয়োগের প্রক্রিয়া হতে দূরে সরে যাওয়াই তার প্রধান কারণ।

সমাপ্তিঃ
জুম্ম জাতির মহান নেতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ঘুমন্ত জুম্মজাতিকে জাগিয়ে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ।তা-ই দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বে আজ জুম্ম জাতি,জুম্ম জাতির আন্দোলন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির স্বীকৃতিলাভ সম্ভব হয়েছে।এক চরম অসম সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে একটি ছোট্ট জুম্ম জাতি জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার নিয়মতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের দীর্ঘ পথ বেয়ে অবশেষে দেশের এককেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসন ব্যবস্থার আইনগত স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।কিন্তু বিগত ১৭ বৎসরেও এই চুক্তির বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গতা লাভ সম্ভব হয়নি,সরকারসমূহের অসদিচ্ছার কারণে। তাই দরকার জুম্মজাতির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।কিন্তু এই ছোট্ট জাতির পক্ষে কতবার সংঘাত কাঁধে নেওয়া সম্ভব?জাতিকে এই দায়ভার হতে পরিত্রাণ দিতে ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ বেগবান করতে মহান নেতা এমএনলারমার প্রদর্শিত বিপ্লবী গুন-“ক্ষমা গুণ,শিক্ষা গ্রহণের গুণ ও পরিবর্তন হওয়ার গুণ” দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমৃদ্ধি লাভ একান্তই জরুরী।মনে রাখতে হবে আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত আছি।
১৯৮৩-১৯৮৫ এর গৃহযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমি এখানে তুলে ধরেছি।উল্লেখকৃত ঘটনাবলী অনুধাবন ও মূল্যায়ন করতে পাঠকমহলকে  অনুরোধ জানাই।এই গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা হতে মূল্যায়ন করতে অনুরোধ জানাই কোনটি সঠিক পথ ও কোনটি বেঠিক পথ ছিল এবং কারা সঠিক কারা বেঠিক ছিলেন।উদ্দেশ্য,বর্ত্মান চলমান দ্বন্ধ-সংঘাত নিরসনার্থে ব্যাপক জনমত গঠন ও আমাদের রাজনৈতিক দল্গুলোকে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নিতে সহযোগিতা প্রদান ।আসুন ‘বৃহত্তর জুম্ম একতা’র শ্লোগানকে আমরা জনপ্রিয় করি এবং এ লক্ষ্যে শক্তিশালী জন্মত সৃষ্টি করি। জনগনের হাতেই শক্তি বা লিভারেজ এবং এই কাজটি ত্বরাণ্বিত করতে পারে ছাত্র-যুব শক্তি এবং বন্ধ করা সম্ভব আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের উন্মার্গযাত্রা।
১৯৮৩-১৯৮৫ এর গৃহযুদ্ধে যাঁরা মূল্ধারার বিপক্ষে ছিলেন, যাঁরা ‘নিস্ক্রিয় পক্ষ’ পরিচিত নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হতে সরে গিয়ে মূল্ধারার হাতে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন বা অভিশপ্ত গৃহযুদ্ধের কারণে যারা ২৯ এপ্রিল ১৯৮৫ রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছেন,তাঁদেরকে বলছি-আমরা চরম অনুদার রাষ্ট্রীয় কাঠামো হতে কিছু অধিকার আদায় করতে পেরেছি।পেরেছি ছিন্ন প্রসাশনিক ইতিহাসঅকে সূত্রবদ্ধ করতে। ১০ নভেম্বর এর এই দিনে আপনাদেরকে আহবান জানাই,আসুন জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে যে যেখানে ,যে পেশায় বা যে অবস্থায় থাকুন না কেন,অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আপনাদের হাত বাড়িয়ে দিন।আপনারা জানেন,আমাদের মহান পার্টির সাংগঠনিক নীতিমালা হচ্ছে-শত্রুকে নিরপেক্ষ করা,নিরপেক্ষকে সমর্থক করা, সমর্থকে সক্রিয় করা,সক্রিয়কে অধিকতর সক্রিয় করা।অর্থাৎ “ইউনাইট মেনি,অপোজ ফিউ’।

[উপরের লেখাটি প্রবাহন, ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১২-তে প্রকাশ করা হয়েছিল।ছাপাখানায় ঈদের প্রচন্ড চাপ মোকাবেলা করতে গিয়ে লেখাটিতে কিছু ভুল থেকে যায় এবং সেটিংও সরে যায়।সে সব এখানে শুদ্ধ করতে চেষ্টা করা হয়েছে।প্রকাশনাটির ১৩ তম পৃষ্ঠায় জেএসএস-এর দ্বিতীয় কংগ্রেসের ভোটের ফলাফল এর ৮টি ‘না’ ব্যাক ঘরে ‘হ্যাঁ’ বাচক ফল বসানোর ভুল এবার শুদ্ধ করা হয়েছে।লেফঃ সুকাশের পরিবর্তে সেঃ লেফঃ সুকাশ লেখা হয়েছিল ।সেটাও শুদ্ধ করা হয়েছে।এই লেখাটির জন্য অনেকেই লেখকের কাছ হতে স্মরণিকাটি পেতে চেয়েছেন।সুংখ্যাটি পুনঃমুদ্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁদের ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই এ বছর শিরোনাম পরিবর্ত্ন করে লেখাটি এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।বিগত এক বছর সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্ত্ন হওয়ায় লেখাটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে,মূল লেখাটির মৌলিকতা ক্ষুন্ন না করেই।]

প্রকাশঃ প্রবাহণ,১০ নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১৩,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

No comments: