Friday, September 19, 2025

জুম চাষ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী এবং বর্তমান অবস্থান- দয়ানন্দ ত্রিপুরা

দয়ানন্দ ত্রিপুরা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে যে বিস্তৃত পাহাড়ীয়া অঞ্চল তারই নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি এই তিনটি জেলা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। ভৌগলিকগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমনি বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে সম্পূর্ন স্বাতন্ত্রের অধিকারী তেমনি এই অঞ্চলের গাছপালা, পশু পাখি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জনসমষ্টি এবং জনসমষ্টির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষা ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন প্রকৃতির। আর এই ভিন্ন প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিপুরা হচ্ছে এই অঞ্চল তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অন্যতম আদিবাসী জনগোষ্ঠী।

ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছে। তৎমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলাতেই বাংলদেশের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের বসবাস। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল তথা কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকার রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায়ও অদ্যাবদি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসতি লক্ষ্য করা যায়।
পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা মূলতঃ জুমচাষের উপরই নির্ভরশীল। যদিওবা সময়ের বিবর্তনের কারনে শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতির ফলে পেশাগতভাবে ত্রিপুরাদের মধ্যে কিছুটা পরির্বতন এসেছে এবং সমতল ভূমি তথা জমি চাষের ক্ষেত্রে অনেকাংশ অভ্যস্থ হয়েছে। তথাপি পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ অদ্যাবদি ঐতিহ্যগতভাবে জুম চাষের উপরই নির্ভরশীল এবং জুমচাষের মধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। জুমচাষ এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যে এতটাই গভীরে প্রোথিত এবং প্রভাবিত করেছে যে, একে ঘিরেই ত্রিপুরাদের রীতিনীতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি কাঠামো অনেকাংশে গড়ে ওঠেছে। কিন্তু বর্তমানে জুম চাষের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তবে সেই পরির্তন যতনা পদ্ধতিগত তার চাইতে উৎপাদনের ক্ষেত্রেই বেশি হয়েছে। এবং এই উৎপাদনীয় পরিবর্তন ইতিবাচক নয়, নৈতি বাচক। নৈতিবাচক হল জুম চাষে আর আগেকার মত উৎপাদন না হওয়া কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধি করনের জন্য যথাযথ আধুনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে না পারা। ফলশ্রুতিতে জুমচাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। আর এই অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়াতে সকল ক্ষেত্রে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সার্বিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ন্যায় অগ্রসর হতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জুম চাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সার্বিক চিত্র কী রকম (?) সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। একটি এনজিওর "অংশ গ্রহনমূলক গ্রামীন সমিক্ষা "জরিপে অংশগ্রহনের সুবাদে এবং ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরামের কর্মী হিসাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ত্রিপুরা গ্রামগুলোতে সাংগঠনিক সফরে অংশ গ্রহণ, সর্বোপরি আমার একান্ত ব্যাক্তিগত আগ্রহে পাবর্ত্য অঞ্চল, বিশেষ করে খাগড়াছড়ি জেলার অনেক দূর্গম পাহাড়ীয়া অঞ্চলের ত্রিপুরা পল্লীগুলোতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এবং সেই সুবাদে সেই সব জুমচাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থা, জীবনবোধ এবং জীবিকা নির্বাহের প্রকৃত অবস্থা একান্ত আপনভাবে কাছে থেকে দেখেছি, শুনেছি, সর্বোপরি বুঝতে চেষ্টা করেছি।
আসলে যা দেখেছি, যা শুনেছি এবং যা উপলব্ধি করতে পেরেছি বাস্তবে মুখোমুখি না হলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের সামগ্রিক অবস্থা জানা ও উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন হবে বৈকি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মত একটি ক্ষুদ্র পরিসরে, একটি ক্ষুদ্র ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে এত ভিন্নতার শেকড় ছড়াতে পারে ভাবতে অবাক লাগে। অথচ যখন কিছুটা শহর অঞ্চল তথা রাঙামাটি সদরের ত্রিপুরা পরিবারগুলোতে যাই কিংবা খাগড়াছড়ির মিলনপুর, খাগড়াপুরের ত্রিপুরা পরিবার গুলোতে যাই তখন মনে হয় ত্রিপুরারা বুঝি সবাই অগ্রসর হয়েছে, সবাই সচেতন হয়েছে। আর যখন ঐ সব প্রত্যন্ত অঞ্চলের ত্রিপুরা গ্রামগুলোতে যাই তখনই বুঝতে পারি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ কোন অবস্থায় আছে, কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে, জীবন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। বলতে গেলে উপত্যকা থেকে পাহাড় চূড়ার চড়াই উৎড়াইয়ের মতো তাদের জীবন প্রবাহ। পার্বত্য অঞ্চলের কালো পাহাড়কে ঘিরেই তাদের দিন রাত্রি, হাসি কান্না, বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। তাদের বেশি কিছু চাওয়া নেই, বেশি কিছু স্বপ্ন নেই, নেই বেশি কিছুর প্রত্যাশা। তাদের চাওয়া বলতে, স্বপ্ন বলতে, প্রত্যাশা বলতে, শান্তিতে শত পরিশ্রমের পর দু'মুঠো ভঙ, ভালো জুম ভূমি এবং জুম চাষে ভালো ফসলের প্রত্যাশা। একবিংশ শতাব্দিতে এসে অন্যান্য জনগোষ্ঠী যখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগ পেরিয়ে তথ্য প্রযুক্তি
যুগে প্রবেশ করেছে, সেখানে একটা জাতির বৃহৎ অংশের এই পশ্চাদপদতা একটু হতাশাজনক বৈকি।
আগেকার দিনে, এমনকি কয়েক দশক আগেও জুমচাষ একটি লাভজনক পেশা ছিল। জুমে নাকি এমন সব ফসল উৎপাদন করা যেত, বাজার থেকে শুধু মাত্র লবন ছাড়া কিছু কিনতে হত না। জুমচাষে তখন উৎপাদনও হত প্রচুর। কয়েক কাঠা ধান বপন করলে প্রচুর ধান পাওয়া যেত। কিন্তু জুমচাষীদের কাছে সেই সব কাহিনী এখন গল্পের মত শোনায়। জুম চাষে এখন আর আগের মত উৎপাদন হয় না। জুমচাষ করার জন্য এখন আর আগের মত উর্বর এবং ভাল জায়গা পাওয়া যায় না। আগে জুম চাষ করার জন্য প্রচুর জায়গা ছিল। কিন্তু এখন? এখন তা আর নেই। সময় বদলানোর সাথে সাথে কৃত্রিমভাবে-বিশেষ করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মান, অবৈধ বসতি স্থাপনসহ বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভূমি বেদখল ইত্যাদি কারণে জুমভূমিগুলো এখন জনপদে পরিনত হয়েছে। কিংবা কোন অলাভজনক সরকারী বা বনবিভাগের বাগানে পরিনত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা কিন্তু এত ব্যাপক হারে জুম চাষী হওয়ার কথা ছিলনা। বরং বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার অনেক চাষযোগ্য সমতল জমি ত্রিপুরাদের আওতায় ছিল। বর্তমানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা কেন সেই সব সমতল জমিগুলো হারিয়েছে হয়ত অনেকেরই সেই প্রশ্নের উত্তর জানা আছে।
১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের কারণে যে হাজার হাজার জমি ডুবে গিয়েছিল এবং জমি ডুবে যাওয়াতে অনেক আদিবাসী বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকেরা খাগড়াছড়িতে উদ্বাস্ত হয়ে চলে আসে। কিন্তু ঐ সমস্ত উদ্বাস্তরা খাগড়াছড়িতে আসার আগে মূলতঃ ত্রিপুরারাই ছিল খাগড়াছড়ি জেলার অন্যতম জনগোষ্ঠী। এবং ত্রিপুরাদের তৎকালীন সময়ে অনেক সমতল জমিজমা ছিল বলে জানা যায়। ঐ সমস্ত জমি জমাগুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দখলীয় ছিল, বন্দোবস্ত ছিল না। ফলে অনেক বছর ধরে ভোগ দখলকৃত জমিগুলো বন্দোবস্তহীনতার অজুহাতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উদ্ভাস্ত হয়ে আসা চাকমাদেরকে দিয়ে দেয়। এবং কোন কোন ক্ষেত্রে চাকমাদের দ্বারা জমিজমাগুলো কৌশলগত আগ্রাসনের শিকার হয়। যার ফলে অনেক ত্রিপুরা পরিবার তৎসময়ে জমি হারিয়ে, জমিচাষ সেরে জুম চাষে ঝুঁকে পরে।
এরপর ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮৭-৮৯ সালের দিকে সুদূর প্রসারি চিন্তা করে সম্পূর্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পার্বত্যাঞ্চলে বাঙালী বসতি স্থাপন করেন। এই বাঙালী বসতি স্থাপন এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগনের উপর এততাই বিরুপ প্রভাব ফেলেছে যে, সেখানে শুধু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী নয়, এই অঞ্চলের সমগ্র আদিবাসী জনগন এখন অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকির সম্মুখীন। অধিকন্তু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর যে কিছু অংশের সমতল ভূমিগুলোতে বসতি ছিল সেখান থেকে উচ্ছেদ হতে বাধ্য হয়েছে। যারা উচ্ছেদ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিকগত গঠনের কারণে তারাও পাহাড় তথা জুমচাষ যোগ্য অঞ্চলগুলোতে উদ্বাস্ত হতে বাধ্য হয়েছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার জুম চাষে ঝুঁকে পড়েছিল।
আজ যখন, খাগড়াছড়ির গুমতি, রাম্ভাদেবা, গরগরিয়া নাল, অযোধ্যা, বেলছড়ি, চোংড়াকাপা, তাইনদং, ত্ববলছড়ি, বড়নাল, বান্দরছড়াসহ অনেক এলাকাগুলোতে গেলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সমতল ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার জলন্ত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই। এই সমস্ত এলাকার বিস্তৃত জমিগুলো কয়েক দশক আগেও ত্রিপুরাদের ছিল। কিন্তু এখন সেই সমস্ত এলাকায় ত্রিপুরাদের জমি-জমাগুলো বসতিকারীদের দখলে। কোন কোন এলাকায় এমনও আছে যে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা নিজেদের জমিজমাগুলো বাঙালীদের কাছে হাতবদল হয়ে উল্টা নিজের জায়গায় ভাড়াটিয়া হিসাবে থাকতে হচ্ছে। কি নির্মম পরিহাস! তাই আজ সেই সমস্ত এলাকার পাহাড়ী নদী ও ঝর্নাগুলোতে মিশে আছে জমি হারানো অনেক ত্রিপুরার চোখের পানি, বাতাসের সাথে মিশে আছে ক্রন্দনের দীর্ঘ শ্বাস।
এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সামাজিক রাজনৈতিক কারনসহ বৃহৎ জনগোষ্ঠী কর্তৃক কখনো সলে, কখনো বলে, কখনো কৌশলে আগ্রাসনের ফলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী আজ অস্তিত্বের সম্মুখীন। সুতরাং বলা যায় যে শহর অঞ্চলের কয়েকটি ত্রিপুরা পরিবার দেখে সমগ্র ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মূল্যায়ন করা যায়না। অধিকন্তু একটা বৃহৎ অংশের এই পশ্চাদতা ও অনগ্রসরঅবস্থা জাতীর সার্বিক অগ্রগতির জন্য মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। সুতরাং সমগ্র ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সকলের মতপার্থক্য ভুলে কাজ করতে হবে আমাদের, এগিয়ে যেতে হবে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে।

প্রকাশিত বই ও সময়ঃ সান্তুআ জার্নাল, বৈসু ও ত্রিপুরা নববর্ষ সংখ্যা, এপ্রিল ২০০২ খ্রি., ১৪১২ ত্রিপুরাব্দ, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ।

No comments: