Thursday, August 25, 2022

ভ্রাতৃঘাতি সহিংসতাঃ ছাত্রদের করণীয়

লেখকঃ তনয় দেওয়ান

এক,
বর্তমান সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পক্ষ-বিপক্ষ মতকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভ্রাতৃঘাতী সহিংসতা চরম পর্যায়ে পেঁছেছে। বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতায় অনেক লোক প্রাণ হারিয়েছে, অপহৃত হয়েছেন অনেকে, মুক্তিপণ শুনতে হয়েছে আরো অনেক অনেককে। কিন্তু দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে শান্তি পূর্ণ, নিরাপদ ও উন্নত জীবন লাভ করবে- এটাই ছিল সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। তাই প্রশ্ন জাগে জনগণের এই সহজ সরল আশা আকাঙ্খাকে কে বা কারা ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে?

উত্তর পাওয়ার জন্য মাথা ঘামানোর দরকার নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধীতাকারী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট সংক্ষেপে ইউপিডিএফ নামধারী একটি দুষ্ট চক্র হলো এ সকল অশান্তির মূল । পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দলছুট কিছু উচ্চাভিলাষী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি মিলে এই সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে তুলেছে। তাই সাধারণভাবে চুক্তির পক্ষ বিপক্ষ দ্বন্দ্ব বলা হলেও মূলতঃ ইউপিডিএফ নামধারী গুটিকয়েক ব্যক্তি অপরিণামদর্শিতা, স্বার্থপরতা বিশ্বাসঘাতকতা ও বেঈমানীর কারণে যে এই সংকট সৃষ্ট ও চলছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই কথাটির মানে বুঝতে গিয়ে একটু অতীতটা পরখ করতে হবে আমাদেরকে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যেকার চার খন্ডের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জাতীয় কমিটির সভাপতি তথা জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। চুক্তিটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণসহ দেশ বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও সমর্থিত হয়। কিন্তু প্রসিত সঞ্চয় চক্রের মুখপাত্র সমীরণ চাকমা (বর্তমানে নিষ্ক্রিয়) তাদের পক্ষে বিবিসিতে সাক্ষাৎকার প্রদানের মাধ্যমে এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং চুক্তি জুম্ম জনগণের অধিকারের জলাঞ্জলি হিসেবে অভিহিত করে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কাজ করার ঘোষণা দেন। তাদের এই ঘোষণায় শান্তিকামী মানুষ মর্মাহত হয়েছিল। তারপরও লোকে আশা করেছিল যে, তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং সঠিক পথে এসে জুম্ম জনগণের ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করবে।

কিন্তু চুক্তির প্রথম বর্ষপূর্তির মাথায় তারা ১৯৯৮ সালের ২৫-২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় দুই দিনব্যাপী মন্ত্রণা করার পর ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে ইউপিডিএফ গঠন করে সাংগঠনিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী শিবির পাকাপোক্ত করে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাবেক একজন সদস্য প্রসিত বিকাশ খীসা হলেন এ দলের নেতা। ইউপিডিএফ-এর আহ্বায়ক কমিটির অন্যান্যরা হলো- (১) সঞ্চয় চাকমা (২) রবি শংকর চাকমা (৩) দীপ্তি শংকর চাকমা (বর্তমানে জাপানে অভিবাসিত ও নিষ্ক্রিয়) (৪) ধ্রুবজ্যোতি চাকমা। ইতিমধ্যে ইউপিডিএফ এর মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে বা সুযোগ পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এদের মধ্যে সমীরণ চাকমা, অভিলাষ চাকমা (যিনি কুতুকছড়ি এলাকায় ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসী কাজ চালিয়েছিলেন), দীপায়ন খীসা, প্রমেশ্বর, দেবাশীষ চাকমা ও প্রতীক দেওয়ান অন্যতম। তার মধ্যে দেবাশীষ চাকমা ও দীপ্তি শংকর চাকমা ইতিমধ্যে একজন আমেরিকা ও একজন জাপান পাড়ি জমিয়েছেন । জানি না তাদের দেশপ্রেম (?) কোথায় উধাও হয়েছে ।

আপোষহীন সংগ্রামের মোড়ক পড়া ইউপিডিএফ এর কোন রাজনৈতিক। কর্মসূচী বা পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন আদায়ের জন্য সরকার বিরোধী কর্মসূচী নেই। বরং সরকারের বিশেষ মহলের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় (সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিসহ খুনের রাজনীতি বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এ পর্যন্ত ইউপিডিএফ কোনরূপ রাজনৈতিক চরিত্র অর্জন করতে পারেনি। সন্ত্রাসের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে জিম্মি করে সরকারের পঞ্চমবাহিনী হিসেবে কাজ করাই তাদের পরিচয়।

আমি আগে উল্লেখ করেছি পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কিছু দলছুট ও উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিরা হীন স্বার্থের মোহে এই জঘন্য তৎপরতায় মেতে উঠেছে। তাদের অতীতটাও এ ধরণের চালবাজীতে ভরা। আমরা যদি তাদের অতীতটা তলিয়ে দেখি তবে তা দিবালোকের মতো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবো। ১৯৮৯ সালে জেনারেল এরশাদ ৯ দফার আলোকে স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠন করে। যা সাধারণের কাছে জেলা পরিষদ হিসেবে মূল্যায়িত হয়। এই জেলা পরিষদপন্থী হিসেবে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের তৎকালীন সভাপতি ও সম্পাদক যথাক্রমে - ধীরাজ চাকমা বাবলি ও প্রতিম রায় পাম্পু দালালি করা শুরু করে। তারা ১৯৯১ সালে জগন্নাথ হলের ৩২০ নং রুমে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানকে নিয়ে এলে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদে অশুভ সংকেত দেখা দেয়। ছাত্ররা গণধিকৃত জেলা পরিষদপন্থী ও আপোষহীন সংগ্রামপন্থী দু'টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরে ব্যক্তি প্রসিত বিকাশ খীসা সংগ্রামপন্থীদের সকল সুফলকে নিজের কোলে টেনে নেয় ও অন্যান্যদের বিতাড়িত করার হীন রাজনীতি শুরু করে ।

প্রসিত বিকাশ খীসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। যদিও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে প্রসিত গ্রুপ বনাম সমীর দত্ত গ্রুপের ভোটাভুটিতে প্রসিত গ্রুপ বরাবরই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতো। তবে তার বোন তার বিপক্ষ গ্রুপে থেকে সবসময় সকলের আস্থা অর্জন করত। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামের নন্দনকাননে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের তিনদিনব্যাপী কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় প্রসিতের হঠকারিতামূলক কাজের সমালোচনা করা হলে তিনি সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেন। ১৯৯৩ সালে ষড়যন্ত্র (সে সময়ে বহুল প্রচলিত শব্দ গিরিঙ্গি) করে করুণাময় চাকমার সহযোগিতায় আবারও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি পদ দখল করে। প্রভাবশালী ছাত্রনেতা প্রধীর তালুকদার সশস্ত্র রাজনীতিতে যোগদান করলে ১৯৯৪ সারে পাহাড়ী গণপরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদটি দখলের পর তিনি চূড়ান্ত অর্থে বিভেদমূলক রাজনীতি শুরু করে দেন। তারই অংশ হিসেবে ১৯৯৫ সালে ১৫-১৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার কুতুকছড়িতে কুতুকছড়ি ইউপি কার্যালয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী গণপরিষদের বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলনে তাদের ষড়যন্ত্রের জাল প্রকাশিত হয় । তখন তারা জুম্ম ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে আলোচনা করেন। পরবর্তীতে তা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে গঠিত হয়।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ব্যানারে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছিল তাদের মধ্যেকার মতবিরোধ ও প্রসিত বিকাশ খীসার সার্কেলবাদী রাজনীতির জন্য সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে জনসংহতি সমিতির শীর্ষ পর্যায় থেকে গণতান্ত্রিক সংগঠনসমূহে সমঝোতা আনায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি তথা যোগাযোগ কমিটির অন্যতম সদস্য বিশ্বজিৎ চাকমার মাধ্যমে প্রসিতের কাছে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হতে মধ্যস্থতা করার উদ্যোগের খবর পাঠানো হয়। প্রসিত বিকাশ খীসা তখন বিশ্বজিৎ চাকমার সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তার পক্ষে ঢাকায় করুণাময় চাকমা দেখা করেন। তখন করুণাময় চাকমা বিশ্বজিৎ চাকমাকে বলেন যে, জনসংহতি সমিতির প্রতি আমাদের বিশ্বাস নেই। তাই প্রসিত বিকাশ খীসা দুদুকছড়ায় যেতে পারবেন না।

পরবর্তীতে তাদের অনুসারী সঞ্চয় চাকমাসহ ৭ জন পাহাড়ী পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ৯ আগস্ট ১৯৯৬ এ ঢাকা মহানগর শাখার কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে রাগের বশবর্তী হয়ে পদত্যাগ করে। কিন্তু অল্প পরেই বুঝতো পারে এতে সাধারণ ছাত্রদের কোন সহমর্মিতা নেই এবং তারা নির্বিকার। - এতে তারা ভরকে যান। এ অবস্থায় জনসংহতি সমিতির উদ্যোগে তারা সাড়া দেয় এবং ঐক্য-সংগ্রাম ঐক্য এই নীতির ভিত্তিতে তা মিটমাট করা হয়। কিন্তু যেসব শর্তে ছাত্রদের মধ্যে তথা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসা করা হয় তা তারা পূর্বপদে বহাল হওয়ার পর ভুলুণ্ঠিত করে বসে। এভাবে জনসংহতি সমিতির ঐক্য প্রচেষ্টাকেও তারা বারবার বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তাদের বিভেদমূলক পথ অনুসরণ করতে থাকেন। ১৯৯৭ সালের ১০ মার্চ তারিখে তিন সংগঠনের নামে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ঘোষণা দিয়ে তারা আবার নতুন করে সংকট সৃষ্টি করে। এই সংকট কেবল মাত্র ছাত্রদের মধ্যে নয় বরং সরকার ও জনসংহতি সমিতির শান্তি আলোচনাকে পর্যন্ত প্রভাবিত করে । মুলতঃ সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যেকার চলমান শান্তি সংলাপকে বিভ্রান্ত করার জন্য পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ঘোষণা দেয়া হয়। তারা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ নামে আয়োজিত সমাবেশ চলাকালে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবী সম্বলিত একটি প্রচারপত্র বিলি করে।

পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদে সৃষ্ট সুরম বিভ্রান্তিকর অবস্থার প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ ইং এর ২০-২১ এপ্ৰিল বুড্ডিস্ট ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামে সংগঠনের বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন আহ্বান করা হয় মূলতঃ পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন বিষয়টি নিয়েই এই বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল। আলোচনায় পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের যে সংজ্ঞা বেরিয়ে আসে তা হলো- পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে, অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যাহার করে অন্যত্র সুষ্ঠু পুনর্বাসন করতে হবে, পাহাড়ীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ জাতিসত্ত্বাসমূহের (গোর্খা, নেপালী, অহোমী, সাঁওতালসহ) স্বীকৃতি দিতে হবে এবং এগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নের নামই হলো পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলী বা কেন্দ্রীয় কমিটির নেই । একমাত্র কেন্দ্রীয় কাউন্সিলেই মৌলিক নীতি গ্রহণ করা সম্ভব । পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন। এতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা মাইকে সস্তায় মৌলিক নীতি গৃহীত হয় না । যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ও বাস্তবতার আলোকে সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; দায়িত্বহীনভাবে নয়। তাছাড়া সম্পাদকমন্ডলী তথা কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ট সদস্য এ বিষয়ে তাদের কোন মতামত নেয়া হয়নি বলে সম্মেলনে জানান। শুধু তাই নয়, পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ধারণায় নতুন কিছু নেই এবং তা চলমান শান্তি আলোচনাবে বিঘ্নিত করবে বলে ছাত্ররা মত প্রকাশ করেন। তাই জনগণের মাঝে যে কোনরূপ বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয় সেজন্য সংগঠনের ঐক্য ও সংহতিকে ধরে রাখার স্বার্থে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ঘোষণাকে সে সম্মেলনে বাতিল করা হয়। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি সঞ্চয় চাকমা জানান যে, “পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের সিদ্ধান্ত প্রসিত বিকাশ খীসার সাথে পরামর্শ করে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছি। জনগণ যেহেতু জেএসএস-এর সাথে সরকারের আলোচনার প্রতি আশাবাদী হচ্ছিল এবং ১২ই মার্চ ৯৭ ইং ঢাকায় জেএসএস এর সাথে সরকারের বৈঠক হয়; তাই যাতে কোন আপোষ চুক্তি হতে না পারে সে জন্য আমরা পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ঘোষণা করেছিলাম।” তাই দেখা যায় যে, পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ঘোষণার মাধ্যমে চলমান শান্তি আলোচনাকে নস্যাৎ করা ও তার পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতি জিইয়ে রেখে ঘোলা জলে মাছ শিকারের জন্য 'প্রসিত-সঞ্চয় চক্র' পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ঘোষণার মাধ্যমে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল।

পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ঘোষণার ফল হিসেবে তিন গণতান্ত্রিক সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ অবস্থায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঢাকা/চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রসিত সঞ্চয় চক্র একতরফাভাবে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের স্থান পরিবর্তন করে খাগড়াছড়িতে স্থানান্তর করলে ছাত্ররা সন্দিহান হয়ে উঠে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির ছাত্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে বান্দরবানের ছাত্রদের নিরপেক্ষ রাখতে পারলে বার্তা পুনরায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হবে। ফুলে বাঁকাওয়ালী ছাত্ররা এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে তা (বিরোধীতা করে এবং পূর্বোক্ত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা/চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের পক্ষে মত দেন। এভাবে সংগঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রীয় নেতা ও শাখাসমূহ ড্রীদের খাগড়াছড়ির কাউন্সিল বয়কট করেছিল এবং চট্টগ্রামে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করেছিল। এভাবে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ শান্তি আলোচনার পক্ষ-বিপক্ষ শিবিরে ভাগ হয়ে দুটি পৃথক সংগঠনে পরিণত হয়। একদিকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের মূল দাবী ৫ দফার ভিত্তিতে সংগঠিত ছাত্র সমাজ এবং অন্যদিকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের পতাকাতলে সমবেত বিভেদপন্থী কিছু ছাত্র। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ফ্রন্ট লাইনের সংগঠন তাই এই সংগঠন পৃথক দু'টি সংগঠনে পরিণত হলে আপনা আপনিতেই হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী গণ পরিষদও বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর স্বাভাবিকভাবে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে কেবল মাত্র গুটিকয়েক কর্মীই যোগ দেয় । এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে জগন্নাথ হলের উত্তর বাড়ির টিভি রুমে পাহাড়ী গণ পরিষদের সভায় পাহাড়ী গণ পরিষদের নাম পরিবর্তন করে জন্ম ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ড বা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট রাখার প্রস্তাব রাখা হলে সৌখিন চাকমা, বিশ্বজিৎ চাকমা ও বিজয় কেতন চাকমা সম্মতি না দিলে তখন থেকে পাহাড়ী গণ পরিষদ সাংগঠনিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। যদিও পাহাড়ী গণ পরিষদের নামে প্রসিত বিকাশ খীসা বিবৃতিসর্বস্বভাবে কাজ চালাত।

এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী তারিখে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী প্রথম দফায় সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দেয় । এই অস্ত্র জমাদানের অনুষ্ঠানে 'প্রসিত-সঞ্চয় চক্র' স্টেডিয়ামের পূর্ব-উত্তর-গ্যালারি হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মানি না শ্লোগান সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন করে। তারা কালো পতাকাও প্রদর্শন করেছিল। এরপর বাঘাইছড়িতেও ১৬ ফেব্রুয়ারী ৯৮ এর অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানে জুতা সেন্ডেল নিক্ষেপ করে। শুধু তাই নয় ২০ ফেব্রুয়ারী ৯৮ দীঘিনালার অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায় । বলা যায় জনসংহতি সমিতির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পদার্পনের পথে 'প্রসিত সঞ্চয় চক্র' প্রথম অসৌজন্যতার প্রকাশ ঘটায়।

প্রসিত-সঞ্চয় চক্রের সন্ত্রাসী বাহিনী ইতিমধ্যে ১৯৯৮ সালের ১৮ জানুয়ারী রাঙ্গামাটি জেলার কুতুকছড়িতে অশ্বিনী কুমার চাকমা নামে একজন চুক্তি সমর্থককে পাথর নিক্ষেপ ও বর্ণা দ্বারা বিদ্ধ করে প্রথম হত্যা করে। অশ্বিনী কুমার চাকমা ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মরত কুমার চাকমার বড় ভাই । তিনি সেই এলাকায় চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা না করার পক্ষে জনমত গঠন করায় এবং কুতুকছড়ি বাজারে চুক্তির পক্ষে জনসমাবেশ আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করায় জমিতে কর্মরত অশ্বিনী কুমার চাকমাকে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করে। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পক্ষ থেকে তার দাহ ক্রিয়ায় যাওয়া হলে সন্ত্রাসীরা তাতে অংশ নিতে দেয়নি। শুধু তাই নয়, তার সাপ্তাহিক ক্রিয়ায় তারা সাধারণ লোকজনকে অংশ নিতে বাধা সৃষ্টি করে।

এরপর শুধু সন্ত্রাস আর সন্ত্রাস। ১৯৯৮, ১৩ জুন তারিখে চুক্তিবিরোধী প্রসিত সঞ্চয় চক্রের সন্ত্রাসীরা রাঙ্গামাটি জেলার ঘিলাছড়ি বাজারের সন্নিকট হতে আমী ক্যাম্পের মাত্র ৮০ গজ দূরের একটি বাড়ী থেকে জনসংস্কৃতি সমিতির ৫ জন সদস্যকে অপহরণ করে। অপহৃতরা হলেন। ১) সত্যবীর দেওয়ান (২) আশাপূর্ণ চাকমা (৩) কিশোর কুমার চাকমা (৪) সোনারঞ্জন চাকমা। পরে প্রবল জনমতের চাপে তারা ২ দিন পর তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। দেখ ভাবে প্রসিত সঞ্চয় । চক্র অপহরণ ও খুনের হোলিখেলা শুরু করে।

দুই,
প্রসিত সঞ্চয় চক্র ইউপিডিএফ গঠন করার পর থেকে জেএসএস খতম লাইন অনুসরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে লাশের রাজনীতির প্রবর্তন ঘটায় এই চক্রটি। সমতল অঞ্চলে দলীয় সন্ত্রাসের ফলে কোন লোক মারা গেলে তাকে দলীয় প্রলেপ দেবার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে রাজনীতিকরা এভাবে ইউপিডিএফও লাশের পচা গন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশ বাতাস ভারী করে তোলে । কিন্তু প্রবল জনমতের চাপে কিংবা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তারা কখনো কখনো জেএসএস-এর সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানায়, সাধু সাজে। কিন্তু বাস্তবে একের পর এক জনসংহতি সমিতির সদস্য হত্যা, অপহরণ, বাড়ীঘর ছাড়া করা প্রভৃতি কাজই তাদের কর্মসূচী, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। শুধু তাই নয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সমর্থক সাধারণ লোকজনও তাদের কবল থেকে মুক্ত নন। তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে তথা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত অবসানের জন্য জনসংহতি সমিতি ইউপিডিএফ-এর সাথে এ পর্যন্ত দু'বার বৈঠকে বসেছে। বিশেষ করে কথিত সুশীল সমাজ নামধারী ব্যক্তিদের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিরসনের উদ্যোগে সাড়া দেওয়ার জন্যও আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু মুখে আর বিবৃতিতে সমঝোতার কথা বললেও আলোচনার টেবিলে ইউপিডিএফ চূড়ান্ত অর্থে 'গিরি-দেবেন-পলাশ প্রকাশ চক্রে'র মতো জনসংহতি সমিতির সাথে চরমভাবে বেঈমানী ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

ইউপিডিএফ হঠাৎ হঠাৎ জে এস এস এর প্রতি সমঝোতার আহবান জানায়। তাদের পত্রিকায় তারা এভাবে আহ্বান জানায়- "ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি নয় আসুন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলি ।" (সূত্রঃ স্বাধিকার, বুলেটিন নং-১৫, ১৮ জুন ২০০০)। এছাড়াও ইউপিডিএফ জনসংহতি সমিতির প্রতি তিনদফা ঐক্য প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবগুলো হলে ১. অচিরেই ইউপিডিএফ ও জনগণের উপর আক্রমণ বন্ধ করা। ২. সরকারের বিরুদ্ধে নূন্যতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা। ৩. ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্যে ইউপিডিএফ ও জেএসএসসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল দেশপ্রেমিক শক্তিসমূহের সমন্বয়ে 'জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট " গড়ে তোলা। (সুত্র স্বাধিকার, বুলেটিন নং-১৭, ১ জানুয়ারী, ২০০১)। 

এসকল আহ্বান ও ইউপিডিএফকে ভ্রান্ত পথ থেকে সরিয়ে আনার জন্য গত ২০০০, ২০ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়িতে নারাণখাইয়ার অনন্ত বিহারী থীসার বাড়ীতে ইউপিডিএফ এর সাথে জনসংহতি সমিতির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জনসংহতি সমিতির পক্ষে নেতৃত্ব দেন তাতিন্দ্র লাল চাকমা এবং ইউপিডিএফ-এর পক্ষে নেতৃত্ব দেন দীপ্ত শংক চাকমা। উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়

১। ইতিমধ্যে যারা অপহৃত হয়েছেন তাদের উদ্ধারকল্পে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতা প্রদান করবে।

২। উভয় পক্ষ চলাফেরাকালীন কোন প্রকার বাঁধা, ধরকাপড় করবে না এবং মিটিং মিছিলে কোন পক্ষ প্রতিপক্ষকে কোন বাধা প্রদান করবে না।

৩। যোগাযোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আলোচনায় বসার দিন, তারিখ ও জায়গা ঠিক করা হবে।

কিন্তু এই সমঝোতার ১২ ঘন্টার মাথায় 'প্রসিত সঞ্চয় চক্র' খাগড়াছড়ি জেলার দাতপ্যায় জনসংহতি সমিতির একজন সদস্য সুখেন্দু বিকাশ চাকমাকে গুলী করে হত্যা করে। ফলে আলোচনায় অর্জিত সমঝোতা ফসল শুরুতেই বিনষ্ট হয়ে যায় ।

পরবর্তীতে ২০০০ সালের ৮ মে তারিখে ইউপিডিএফ চক্র আবার জনসংহতি সমিতির সদস্য জীবন প্রদীপ চাকমাকে অপহরণ করে। তারা জনসংহতি সমিতিকে বৈঠকে বসার শর্তে জীবন প্রদীপ চাকমাকে মুক্তি দেবার কথা বলে। বিশিষ্টজনদের অনুরোধে জনসংহতি সমিতি ইউপিডিএফ-এর বিপাকে আবার ৭ মাসের মাথায় ২০০০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আলোচনায় বসে। এতে জনসংহতি সমিতিরি পক্ষে নেতৃত্ব দেন লক্ষ্মীপ্রসাদ চাকমা ও সভাবীর দেওয়ান এবং ইউপিডিএফ-এর পক্ষে নেতৃত্ব দেন সঞ্চয় চাকমা, অভিলাশ চাকমা ও অনিমেষ চাকমা। দুঃখের বিষয় ইউপিডিএফ-এর একগুয়েমীর কারণে এই বৈঠক কোন প্রকার সিদ্ধান্ত ছাড়া শেষ হয়। ইউপিডিএফ-এর আলোচনা ছিল কৌশলগত, নীতিগত নয়। তাই তারা সমাঝোতা বৈঠকের নামে নিজেদের দূর্বলতা কাটিয়ে উঠে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য আলোচনায় বসতো। তার পাশাপাশি জেএসএস-এর চাপ সৃষ্টি করা এবং সে সুযোগে নিজেদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা এই সমঝোতা বৈঠককে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা চরম অপরিণামদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে।

ইউপিডিএফ প্রথম থেকে জেএসএসকে ভাগ করার হীন প্রচেষ্টায় মেতে উঠে। তারা কাল্পনিকভাবে একদিকে সন্তু লারমাকে দাঁড় করিয়ে অন্যদের তাদের দলে ভীড়ানোর আহ্বান জানাতো। তাই তারা জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) কেও হত্যার প্রচেষ্টা চালায়।

জনসংহতি সমিতি’র সভাপতি তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান খাগড়াছড়ি থেকে রাঙ্গামাটি আসার পথে ইউপিডিএফ-জারা সন্ত্রাসীরা ১৯৯৯ সালের ২৪ মে তারিখে বীজিতলা নামক স্থানে সন্তু লারমার গাড়ীতে বিদ্দেশ্য করে গুলী ছুঁড়ে। সৌভাগ্যক্রমে তিনি অক্ষত থাকেন। এসকর্টে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সদস্য ও সন্তু লারমার সফর সঙ্গীরা তাদের ধাওয়া করলে সন্ত্রাসী ইউপিডিএফ জিন্দাবাদ, প্রতি খীসা জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে গাভীর জঙ্গলে পালিয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, ১৯৯৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী তারিখেও ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি শহরে সন্তু লারমার ফাঁসি দাবী করে মিছিল করেছিল । ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ইউপিডিএফ ও সেটেলার বাঙ্গালিদের কন্ঠের সুর একই তালে বাজছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর এ অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হয় । শুরু হয় বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নবতর পর্যায় কিন্তু ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী শুধুমাত্র জনসংহতি সমিতির সদস্য ও চুক্তি সমর্থকদের খুন, অপহরণ ও সাধারণ জনগণের উপর চাঁদাবাজি করে ক্ষান্ত হয়নি তারা দেশী-বিদেশী উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উপরও কালো থাবা দিতে উদ্যত হয়। চুক্তির পরে উন্নয়নের ধারাকে রুখতে চারদিকে খড়যন্ত্রের জাল ছড়িয়ে দেয়। তারই অংশ হিসেবে ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী বিকাল ৪ ঘটিকার সময়ে ডেনিশ উন্নয়ন সংস্থা ডানিডার তিনজন প্রকৌশলী ডেনিশ নাগরিক মি. টরবেন নিকলসন (৩৮) ও মি. নিলম হার্গার্ড (৬৩) এবং বৃটিশ নগরিক মি. টম সেলবি (২৮) রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি খাগড়াছড়ি সড়কে নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করতে গেলে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা তাদের অপহরণ করে। অপহরণকারীরা ড্রাইভারসহ ইংল্যান্ডের নাগরিক ডেভিড ওয়স্টেনকে ছেড়ে দেয়। নানিয়ারচর থানার শুনিয়াপাড়া আর্মী ক্যাম্পের সন্নিকট হতে তারা অপহৃত হয়েছিলেন। তারা অপহৃত হবার পর গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থগিত হয়ে যায়। অপহরণকারী ইউপিডিএফ চক্র তাদের মুক্তির জন্য ৯ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। এ অপহরণ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসী অমূল্যধন চাকমা। এই অমূল্যধন চাকমা ইউপিডিএফ-এর সদস্য বলে প্রসিত বিকাশ খীসা স্বীকার করেন। (সূত্র ঃ ভোরের কাগজ২০/৩/২০০১)। টানা একমাস পর ১৭ মার্চ ২০০১ তারিখে তারা মুক্তি লাভ করেন।

এ অপহরণ নাটকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী কল্প রঞ্চন চাকমা, দীপংকর তালুকদার এম.পি, সেনাবাহিনীর একটি অংশ এবং আরও উচ্চস্তরের সরকারের বিশেষ মহল যোগসাজশের ভূমিকা পালন করে। তারা অপহৃতদের উদ্ধারের জন্য মুক্তিপণ দেওয়াকে প্রধান উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। বড়ো ধরনের মুক্তিপণ প্রদান এবং সেখান থেকে নিজেদের অংশ লাভ করে তারা অপহরণ নাটকের অবসান ঘটান। দেশ-বিদেশে এই অপহরণ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লেও সরকার পক্ষ কোন মামলা করেনি বা  অপহরণকারী ইউপিডিএফ চক্রের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

তিন,

ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসের দাপটে সেবানাহিনীও মহা অন হয়ে উঠে । তারা অপারেশন উত্তরণ নাম দিয়ে নতুন করে তাদের সেনা গোসল জারী করে। এ অবস্থায় ইউপিডিএফ ও সেনাবাহিনীর আঁতাত সবার কাছে। দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠে। যা নিয়ে আর কোন দ্বিমত নেই। দীঘিনালায় বাবুছড়াতে ইউপিডিএফ সশস্ত্র সদস্যরা সেনাক্যাম্পের পাশে অবস্থান করে। এবং একই কূয়া থেকে পানি পান করে। বিগত ২০০১ সালের ১ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির ব্রিগেডের জি-২ এর সাথে ইউডিপিএফ নেতা দীপ্তি শংকরের মধ্যে এক গোপন বেঠক হয়। উল্লেখ্য তারপর দিন ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৪র্থ বর্ষপূর্তি। সুবলং-এর বরুনাছড়িতে সেটেলার বাঙ্গালি ও ইউপিডিএফ সদস্যরা মিলে একসাথে চাঁদাবাজি করে। বরকল থানার বেতছড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর সাথে ইউপিডিএফ সদস্যরা পাশাপাশি অবস্থান করছে। কথায় বলে চোরে চোরে মামাতো ভাই। তাদের সম্পর্কও এখন সোনায় সোহাগা। Te আন্তর্জাতিকভাবে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে সমর্থন দান করতো তারা প্রথমে ভেবেছিল সত্যি বুঝি জনসংহতি সমিতি সরকারী ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে আন্দোলন তুলেছে। তাই তারা প্রথম দিকে ইউপিডিএফকে কিছুটা সমর্থন যোগায়। পরে তাদের সকল ভ্রান্তি দূর হয়ে যায়। গোটা আন্তর্জাতিক মহল ইউপিডিএফ এর হীন কাজের নিন্দা জানার এমনি অবস্থা 'সাউথ এশিয়া টেরোরিষ্ট পোর্টাল (South Asia Terror ist Portal-এটি দিল্লী ভিত্তিক একটি সংগঠন যা দক্ষিন এশিয়ায় মানবাধিকার ও রাজনৈতিক দলসমূহের কর্মকান্ডকে পর্যবেক্ষণ করে) নামের একটি সন্ত্রাসী দল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউপিডিএফকে বাংলাদেশের দুটি সন্ত্রাসী সংগঠনের মধ্যে একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অপর সন্ত্রাসী সংগঠনটি হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির। চুক্তিবিরোধীতার নাম ভাঙিয়ে প্রশাসন ও চিহ্নিত রাজনৈতিক দলের মনতে ইউপিডিএফ যেভাবে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে তাতে আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক ইউপিডিএফকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে • ঘোষণা দেয়া একটি শুভকর দিক।

রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে কেবলমাত্র চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ এবং অধিকার প্রত্যাশী একটি দলের উপর সশস্ত্র হামলা করলে তাকে কখনো রাজনৈতিক দল বলা যাবে না। এ পর্যন্ত ইউপিডিএফ জনসংহতি সমিতির সদস্য ও চুক্তি সমর্থক ৭৩ জনকে খুন করেছে। তাই এটি কোন প্রকার রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নয়, বরং সরকারের একটি বিশেষ অংশের মদদপুষ্ট একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা যেমনি সমতলে সন্ত্রাসী লালন পালন করে প্রতিপক্ষকে ঠেঙানোর কাজে ব্যবহার করে তেমনি তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে ঠেকানোর জন্য ইউপিডিএফকে ব্যবহার করছে। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে দেখা গেছে যে ট্রাইবেল কনভেনশন, স্থানীয় সরকার পরিষদের মাধ্যমে শান্তকরণ প্রকল্পের অধীনে সরকার ও সামরিকবাহিনী জুম্মদের মধ্য হতে দালাল পুষতো। তার পাশাপাশি গণ প্রতিরোধ কমিটি (গগ্রক বাহিনী), আঙুল বাহিনী, সা প্রতিরোধ কমিটি নামধারী সংগঠন বানিয়ে দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতো। এভাবে সকল সংগঠন সামরিক বাহিনীর পকেট হতে সৃষ্ট হতো আর কালের গতিতে লুপ্ত হতো। সম্প্রতিকালের ইউপিডিএফও একটি রং করা নমুনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

২০০১ সালের ১লা অক্টোবর তারিখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইউপিডিএফ অংশ গ্রহণ করেছে। ইউপিডিএফ নেতা প্রসিত বিকাশ খীসা স্বয়ং রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি আসনে প্রতিবন্দ্বিতা করে এবং বান্দরবান থেকে বাংলাই মে) তাদের পক্ষে নির্বাচন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নের দাবী জানিয়ে জনসংহতি সমিতি এই নির্বাচন বয়কট করে। ইউপিডিএফ প্রথম দিকে জনসংহতি সমিতির দাবীর প্রতি সমর্থন প্রদানের কথা ব্যক্ত করলেও তারা নিজেরাই সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সামরিক প্রশাসন পর্যন্ত সকলেই প্রসিত বিকাশ খীসার নির্বাচনে অকাতরে সহযোগিতা প্রদান করে। রীতিমতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রসিত বিকাশ খীসা একজন উপদোর মর্যাদা নিয়ে খাগড়াছড়ি ঘুরে বেড়ান। তার জন্য সবসময় পুলিশ একটি থাকতো । প্রসিতের বিরুদ্ধে মামলা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ্যাহণের জন্য তাকে কোন চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। নির্বাচনে প্রসিত বিকাশ খীসা। সাধারণ জনগণের উপর কোনরূপ আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হন বা সাধারণ জনগণ প্রসিত বিকাশ খীসাকে প্রত্যাখ্যান করেন।

অন্যদিকে সেটেলার বাঙ্গালীদের নেতা তথ্য সাম্প্রদায়িক চক্রের প্রধান হোতা আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিএনপির মনোনয়নে খাগড়াছড়ি আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং সেটেলার বাঙ্গালীদের অকুণ্ঠ সমর্থনে কল্পরঞ্জন ও প্রসিত বিকাশকে হটিয়ে জয়লাভ করে। তার প্রধান শ্লোগান ছিল- পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলারদের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা, পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা, জুম্মদের উচ্ছেদ করে তাদের ভূমি বেদখল করা এবং এ লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা। তার এই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে সেটেলাররা তাকে ভোট দেয় এবং সে নির্বাচিত হবার পর থেকে চুক্তিকে লংঘন ও ভূমি বেদখল করার জন্য সেটেলারদের উস্কানি দিয়ে চলেছে। আর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ অংশ গ্রহণ করলেও তারা জানতো যে এতে নিশ্চিত পরাজয় ঘটবে। তাই তারা আগে ভাগে তাদের পরাজয় উত্তর কর্মসূচী ঠিক করে রাখে। আব্দুল ওয়াদুর ভূঁইয়ার জয়লাভের খবর পাওয়া মাত্র সদলবলে প্রসিত বিকাশ খীসা ফুলে মালা পরিয়ে দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানায় এবং সবধরণের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেয়। বর্তমান সময়েও প্রতি চক্র ও ওয়াদুদ চক্র জেএসএস বিরোধী তৎপরতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে নস্যাৎ করার কার্যক্রম যৌথভাবে পরিচালনা করে চলেছে। একজন প্রশাসনিক ভাবে ও ভূমি বেদখনের মাধ্যমে অন্যজন সন্ত্রাস ও অনেক রাজনীতির মাধ্যনে ।

চার.

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিত্তোর সময়ে মৌলবাদী ইসলামী দল ও গ্রুপগুলোকে নিয়ে সেটেলার বাঙ্গালী ও সেনাবাহিনী সাম্প্রদায়িক হামলা তথা মানবাধিকার লংঘনের তৎপরতায় মেতে উঠে। ওয়াদুদ ভূঁইয়ার জয়লাভ তাদেরকে আরও শক্তিশালী করে। তিনি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ বেআইনীভাবে দখল করে বসেছেন । এই ওয়াদুদ ভূঁইয়া এতই ক্ষমতাশালী যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জনৈক সচিবকে উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হলে তার মনঃপূত না হওয়ায় তাকে যোগদান করতে দেননি। শুধু তাই নয় জুম্মদের এলাকার প্রজেক্ট বাতিল করে সেটেলার এলাকায় প্রজেক্টগুলো স্থানান্তর করছে। তাই সেনাবাহিনী আর সেটেলাররা জুম্ম নারী ধর্ষণ, বিনাবিচারে আটক, হত্যা, ভূমি বেদখল, লুটপাট, সাম্প্রদায়িক হামলা প্রভৃতির মাধ্যমে দ্বিগুণ উৎসাহে মানবাধিকার লংঘন করে চলেছে। কিন্তু ইউপিডিএফ কখনো এর প্রতিবাদ জানায়নি । বরং জেএসএস ও সন্তু লারমার উপর ঝাল মেটাবার প্রয়াস পেয়েছে। অপারেশন উত্তরণের মাধ্যমে সেনাশাসন বহাল রাখার সরকারের পদক্ষেপকে প্রতিবাদ জানায়নি। শুধু তাই নয় পার্বত্য  চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী সকল সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা থাকলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করছে না এবং ইউপিডিএফ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। সেটেলার বাঙ্গালীরা একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলার মাধ্যমে জুম্মদের ভূমি বেদবল করে চললেও তারা নিশ্চুপ রয়েছে। এ থেকে স্পষ্টত যে, পার্বতী চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে ইউপিডিএফ বাকসর্বস্ব রাজনীতিই করে চলেছে।

 ইউপিডিএফ বর্তমানে নেতৃত্বের সংকট ও আভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভুগছে। আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে অনেকে স্বপক্ষ ত্যাগ করে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। নেতৃত্বের দলাদলির কারণে তাদের চেইন অব কমান্ড' ভেঙে পড়েছে। যতদুর জানা যায় এর পেছনের কারণসমূহ হলো 
১। প্রসিতের একনায়কতন্ত্র ও ঢাকাসহ বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন ।

২। তিন বিদেশী অপহরণের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাস । ৩। সেনাবাহিনীর সাথে ভুল বোঝাবুঝির কারণে সশস্ত্র সংঘাত। 
৪। জেএসএস-এর উপর ক্রমাগত আক্রমণাত্মক নীতি ও সেনাবাহিনীরলেজুরবৃত্তি। 
৫। পারস্পরিক আস্থাহীনতা ও জনবিচ্ছিন্নতা এবং দায়িত্বশীল নেতাদের দুর্নীতি ।

এর ফলাফল হিসেবে সম্প্রতি বিগত ২০০৩ এর ১৬ মে খাগড়াছড়িতে অবস্থিত তাদের কার্যালয়ে নিজেদের কোন্দলের জের ধরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং গুলী বিনিময় হয়। স্বপক্ষ হতে দীপ্তিশংকর চাকমাকে হত্যা করার হুমকি দিলে সে জাপানে পালিয়ে যায়। কুতুকছড়িতে ত্রাস সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসী অভিলাষ চাকমা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ঢাকায় অবস্থান করছে। তেমনিভাবে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে যারা মাঠ পর্যায়ে থেকে কাজ করে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে দীপায়ন খীসা, প্রমেশ্বর চাকমা, মনাঙ দেওয়ান ও তাপস দেওয়ান প্রমুখ শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও রয়েছে। তারও আগে করুণাময় চাকমা ও সমীরণ চাকমা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টির এবং চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী শত শত মা বোনের ইজ্জাত, হাজারও মানুষের আত্মবলিদান এবং দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি তাদের চুক্তি বিরোধী কর্মকান্ড এবং ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কারণে বিনষ্ট হতে চলেছে। তাদের সশস্ত্র তৎপরতার কারণে সামরিকবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে এখনো অপারেশন উত্তরণের মাধ্যমে বহাল তবিয়তে মানবাধিকার লংঘন করে চলেছে। জনসংহতি সমিতি সাংগঠনিক ভিত্তিক সুদৃঢ় করতে পারছে না। ফলে সরকারের উপর চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য জোড়ালো আন্দোলন পরিচালনা করতে পারছে না। শুধু তাই নয়, জনসংহতি সমিতির আন্দোলনে ইউপিডিএফ প্রত্যক্ষভাবে পুলিশ, আর্মীর মতো বাধা প্রদান করে চলেছে ।

তাহলে আমরা লক্ষ্য করি যে, ইউপিডিএফ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং কোমলমতি কিছু ছাত্রের অপরিণত মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করে চলেছে। তার সাথে গ্রামের সহজ সরল যুবকদের বিপথগামী করছে। ইউপিডিএফ-এর নেতারা সাবেক ছাত্র; তারা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নাম নিয়ে তাদের দলে কিছু ছাত্র জুটারে। এতে বিগত সময়ে জেলা পরিষদ বিরোধী আন্দোলন, দালাল বিরোধী তৎপরতা ও মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের লড়াকু ভাবমূর্তিকে তারা কলংকিত করছে। তাদের হীন তৎপরতার কারণে ছাত্রদের ঐক্য বিনষ্ট হয়েছে। এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, সাধারণ ছাত্রদের ভবিষ্যত ও ছাত্রদের ঐতিহাসিক ভূমিকা তথা গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম। তাই ছাত্রদেরদেরকেই প্রথম এগিয়ে আসতে হবে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিরসনে সাহসিকতার সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে। 

ছাত্ররা রাজপথে মিছিলের পদভারে শত্রুর বুকে কাঁপন ধরিয়েছে, সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সংগঠিত হয়েছে, পড়ার টেবিল ছেড়ে মিছিলের প্রথম সারিতে এসেছে। লংগদু গণহত্যায় সেটেলারদের নরক নৃত্যকে কবর দিতে ছাত্ররা মুখের কণ্ঠকে প্রতিবাদী কণ্ঠে সজ্জিত করে রণযাত্রা করেছিল। এখনও চুক্তির পক্ষে জনমত গঠন করেছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাই ছাত্ররা অন্যতম ত্যাগী অংশ যারা সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে একটি উপাদান; শক্তির উৎস । সেই শক্তির স্ফুরণ ঘটাতে হবে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতৃত্বে। বর্তমান সময়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নানান সংকীর্ণতার, সার্কেলের বেড়াজালকে ছিন্ন করে একটি সমগ্র রাজনৈতিক চিন্তাধারা সম্পন্ন নেতৃত্ব দ্বারা বলীয়ান হয়েছে । এই ধারা অক্ষুন্ন রেখে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিরসন ও চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।

গত ২০ মে ২০০৩ ঢাকায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী ভাষণে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আহ্বান রেখেছেন যে, প্রয়োজনে পূর্বের কর্মসূচীতে ফিরে যেতে হবে। আমরা ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা পেয়েছি যে, সংগ্রাম ছাড়া কোন কিছু অর্জিত হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অর্জিত হয়েছে। শত শত মা বোনের ইজ্জত, অগণিত মানুষের ত্যাগ তিতিক্ষা ও এম এন লারমার নির্দেশিত পথে জনসংহতি সমিতির জাতীয় নেতৃত্বের সঠিক নেতৃত্বের কারণে। শুধু তাই নয়, ১৯৮৩ সালের গৃহযুদ্ধে মহান নেতা এম এন লারমা তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন বলে আমরা গৃহযুদ্ধের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। তাই এখন সশস্ত্র ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও জুম্ম জনগণের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে ছাত্রদেরকে অবশ্যই সন্তু লারমার বক্তব্যকে বুঝে নিতে হবে । তার উপলব্ধিকে বাস্তবে রূপায়িত করার সৎ সাহস বুকে ধারণ করতে হবে।

ইউপিডিএফ এর সামগ্রিক কার্যক্রম সার্বিকভাবে জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলন পরিপন্থী; সরকারের একটি হীন ষড়যন্ত্রের অংশ। তাই ইউপিডিএফ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনটির বিলুপ্তি হলে তবেই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের অবসান হবে। অন্যথায় তাদের কবল থেকে জুম্ম জনগণ মুক্ত হতে না পারলে জুম্ম জাতির জাতীয় অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্ত হতে বাধ্য। এই অবস্থায় ছাত্ররা অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এই আশাবদ সকল শান্তিকামী ও সাধারণ জুম্ম জনগণের। শুধু তাই নয়, আগামী দিনেও জাতীয় দুর্যোগে ছাত্ররা সকল পিছুটান ও সুবিধাবাদের মোহকে ছিন্ন করে প্রগতিশীল আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যাবে দৃপ্ত শপথে, নিজেদের প্রাণকে হাতের মুঠোয় নিয়ে । ছাত্ররাই পরিশেষে সমাজ বদলের রাজনীতির এক একটি অগ্নি স্ফুলিঙ্গতে পরিণত হবে।

[কেওক্রাডং, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের মুখপত্র, বুলেটিন নং-৩, ২য় বর্ষ, ৩০জুন ২০০৩ ইং]