১. সূচনা
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী ও সমতলের বিভিন্ন স্বল্প জনসংখ্যার জাতিগোষ্ঠীসমূহকে কী নামে অভিহিত করা যাবে তা একটি বিশেষ আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অনুরূপভাবে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে 'আদিবাসী' হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টিও আলোচিত ও বিতর্কিত । পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিককালের 'আদিবাসী' ও 'indigenous' শব্দ পরিহার করে 'উপজাতি' শব্দ ব্যবহার করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছে। অনুরূপ পরামর্শ অতীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও দিতে দেখা গেছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদিবাসী নেতা ও দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি উপরোক্ত মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তকে নিন্দা জ্ঞাপন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে 'আদিবাসী' হিসেবে অভিহিত করার আহ্বান জানিয়েছে। ` বাংলাদেশের আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং মানবিক ও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ পরস্পর-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির পর্যালোচনা করা হল । তবে, উপসংহারে গিয়ে যেই সিদ্ধান্তে উপনীত তা আগে বলে ফেলা দরকার: বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী' পরিচয় অবশ্যই যথাযথ, সঠিক ও যৌক্তিক ।
২. আইনের দৃষ্টিতে 'আদিবাসী', 'indigenous', 'উপজাতি' ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ ২.১ সাংবিধানিক আইন
বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীসমূহকে সম্বোধন করার ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা বা পরামর্শ নেই। সংবিধানে লেখা আছে যে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।” তবে, শর্ত থাকে যে, “নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না ।”* সংবিধানের এই বিধানাবলির বিষয়বস্তুগুলো হল সুযোগ ও অধিকারবঞ্চিত নাগরিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া। তবে তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তা অপছন্দনীয়ভাবে অভিহিত করার কোনো ভিত্তি নেই ।
২.২ দেশে প্রচলিত অন্যান্য আইন ও নীতিতে 'aboriginal', 'আদিবাসী' ও 'indigenous ' দেশে প্রচলিত বিভিন্ন আইনে আদিবাসীদেরকে বিভিন্নভাবে অভিহিত করা হয়েছে। ১৯৫০ সনের পূর্ববঙ্গ জমিদারি দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন (১৯৫১ সালের পূর্ববঙ্গ আইন নং- ২৮)-এর ৯৭ ধারার মাধ্যমে সমতল জেলাসমূহের বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের জমি বাংলাদেশের আদিবাসী ব্যতীত অন্য জাতিগোষ্ঠীর ব্যক্তির নিকট মালিকানা হস্তান্তরের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই ধারাতে আদিবাসীদেরকে aboriginal castes and tribes" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই আইনটি সংবিধানের ৪৭ নং অনুচ্ছেদ ও প্রথম তফসিলে অন্যান্য কিছু আইনসহ বিশেষভাবে সংরক্ষিত। সুতরাং সমতলের আদিবাসীদেরকে aboriginal (যা আদিবাসী শব্দের সমার্থক) হিসেবে অভিহিত করাকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। তাই আমি কিছুটা ঠাট্টা করে আমার সমতলের আদিবাসী বন্ধুদের বলি “ভাই আপনারা তো পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের আগে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন ।” ইদানিং কালের আরো দুটি আইনে আদিবাসী বা তার সমার্থক শব্দের প্রচলন দেখা যায়। এর মধ্যে সবচাইতে ইদানিংকালের আইন হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ । এই আইন প্রণয়ণের জন্য আমি সদাশয় সরকারকে অভিনন্দন জানাই । এই আইনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদির বিষয়ে বিধানাবলি প্রবর্তন করা হয় । অধিকন্তু, এই আইনের মাধ্যমে ‘উপজাতীয়' শব্দের অবসান দিয়ে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' ও 'আদিবাসী' শব্দের সূচনা করা হয় । এই আইনটি ১২ এপ্রিল, ২০১০ খ্রি: তারিখে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর একই তারিখের গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হয় । এই আইনে 'নৃ-জনগোষ্ঠী' শব্দের ব্যাখ্যা প্রদানে 'আদিবাসী' শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। আইনটির তফসিলে ২৭টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী উল্লেখ আছে। বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ এসেছে যে, অনেক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নাম এই তফসিলে বাদ পড়েছে । আমিও এ বিষয়ে একমত । অতএব, আদিবাসী নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে উক্ত তফসিলে বাদ পড়া জাতিগোষ্ঠীর নাম জরুরিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত । অনেকের সাথে একমত হয়ে এ বলব যে, সংশ্লিষ্ট আইনের ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের শিরোনাম ‘নৃ-জনগোষ্ঠী' না হয়ে 'আদিবাসী' হলে আরও ভালো হত। কারণ এই প্রতিষ্ঠানসমূহ কেবল আদিবাসী নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের ও উন্নয়নের জন্য সৃষ্টি হয়েছে, বাংলা ভাষাভাষী অথবা বাংলাদেশে বসবাসরত উর্দুভাষাভাষী বা অন্যকোনো নৃগোষ্ঠীসমূহের জন্য নয়, ক্ষুদ্র বা বৃহৎ (বাঙালিও তো নৃগোষ্ঠী !)। এই আইন প্রণয়ণের আগে কতিপয় বিশেষজ্ঞের সাথে সরকার পরামর্শ করেছিল, আইনে কী শব্দ দিয়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা হবে এই বিষয় নিয়ে । বিশেষজ্ঞরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ কে আরেফিন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম (বর্তমানে তথ্য কমিশনার) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক জোবায়দা নাসরীন (কনা)। তিনজনই আমাকে বলেছেন তারা সরকারকে সংশ্লিষ্ট আইনটিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী না বলে, 'আদিবাসী' শব্দ ব্যবহার করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আদিবাসী শব্দের সমার্থক শব্দ সম্বলিত অন্য ইদানিংকালের আইন হল: ১৯৯৫ সনের অর্থ আইন (১৯৯৫ সনের ১২ নং আইন), যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ব্যক্তি কর্তৃক আয়কর প্রদানের বিষয় উল্লেখ করতে গিয়ে তাদেরকে indigenous hillman হিসেবে অভিহিত করা হয়। অনুরূপভাবে indigenous hillman পদের প্রচলন CHT Regulation 1900 ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক নথি ও স্মারকেও দেখা যায়।' এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র ২০০৮ (PRSP, 2008) * ও দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র ২০০৯ (PRSP, 2009)*--এ বাংলাদেশের আদিবাসীদেরকে "indigenous people" হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র ২০০৫ (PRSP, 2005) - এ তাদেরকে adivasi হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১
২.৩ পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আইনে বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে আদিবাসীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। Chittagong Hill Tracts Regulation 1900 এ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসমূহকে indigenous hillman অথবা indigenous tribe হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ১১ অন্যদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮-এ পার্বত্য আদিবাসীদেরকে “উপজাতি” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ১২
২.৪ আদালতের রায়ে বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগ
বিভিন্ন স্তরের আদালতে ভিন্ন ভিন্ন আইনকে ভিত্তি করে বিভিন্নভাবে আদিবাসীদেরকে অভিহিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের Sampriti Chakma v. Commissioner of Customs (5 BLC, AD 2000 29 ) - মামল দরখাস্তকারীকে ‘indigenous hillman' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা 145/201
২.৫ সরকার-প্রধান কর্তৃক 'আদিবাসী' সম্বোধন ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার স্বাভাবিকভাবে প্রচলিত রেওয়াজকে সম্ভবত আমলে এনে বাংলাদেশের একাধিক সরকার প্রধান আদিবাসীদেরকে “আদিবাসী" হিসেবে সম্বোধন করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা ৯ আগস্ট ২০০৯ খ্রি: তারিখে ঢাকায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে তাঁর শুভেচ্ছাবার্তায় আদিবাসীদেরকে “আদিবাসী” হিসেবে সম্বোধন করেছেন। ১৩ এর পূর্বে ঐ একই অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মাননীয় ড.ফখরুদ্দীন আহমেদ (প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা) (২০০৮ সনে) ১৪ এবং মাননীয় খালেদা জিয়া, (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেত্রী) (২০০৩ সনে) আদিবাসীদেরকে 'আদিবাসী' হিসেবে সম্বোধন করেন। ১৫ অধিকন্তু, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাঁর উপরোক্ত শুভেচ্ছাবাণীতে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আদিবাসী বিষয়ক ঘোঘণাপত্র (UN Declaration on the Rights of Indigenous Peoples ) বাস্তবায়নের স্বপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও আদিবাসী অধিকার সংরক্ষণ ও ১৯৯৭ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ের মহলে আই এল ও-এর আদিবাসী ও ট্রাইবেল জাতিগোষ্ঠী কনভেন্সন, ১৯৮৯ ( ILO Convention No. 169 on Indigenous and Tribal Peoples, 1989) এর অনুসমর্থনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনাধীন রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জেনেছি ।
২.৬ আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের আদিবাসীদের আইনি স্বীকৃতি রয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। সুতরাং স্বীকৃতি নেই, এটা বলা যাবে না। তবে প্রত্যক্ষ ও সম্মানজনকভাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করার জন্য নির্দেশনা দিলে ভালো হত তবে সেরকম প্রত্যক্ষ নির্দেশনা না থাকলেও তারা মনগড়া কিছু লিখতে বা বলতে পারেন না, যেমন: আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। তা আইনানুগ হবে না। বরং সংবিধানের বৈষম্যবিরোধী বিধানসমূহের লংঘন হবে। একইভাবে সংগঠনের নামের কোনো অংশে বা প্রকল্পের কোনো ক্ষেত্রে 'indigenous' বা 'আদিবাসী' শব্দ থাকার কারণে একাধিক পার্বত্য অঞ্চলের এনজিও-কে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রদান করা হয়নি অথবা দীর্ঘ বিলম্বের পর অনুমোদন দেয়া হয়। এটা হয়রানির সামিল ও আইন-বহির্ভূত। তবে, সংশ্লিষ্ট এনজিও-রা চাপের মুখে ও হয়রানির ভয়ে সুপ্রিম কোর্টের আশ্রয় নেয়নি। আমি আশা করব যে, বিষয়টি মামলা- মোকদ্দমা ছাড়াই যথাযথ মীমাংসা হবে ।
২.৭ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে indigenous বনাম tribe ২০০৮ সালে জাতিসংঘ UN Declaration on the Rights of Indigenous Peoples গ্রহণ করে। উক্ত দলিলে বিশ্বের আদিবাসীদিগকে indigenous peoples হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৬ এ-ছাড়া আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের পক্ষে জাতিসংঘ একটি আন্তর্জাতিক বর্ষ ও দুটি আন্তর্জাতিক দশক (দ্বিতীয় দশক চলমান) উদযাপন করে এবং সেই একই পদ, 'indigenous peoples' ব্যবহার করেছে।” জাতিসংঘের বিশ্ব শ্রম সংস্থা (ILO)-র আদিবাসী ও ট্রাইবেল জাতিগোষ্ঠী কনভেন্সন, ১৯৮৯ Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (Convention No. 169 ) ] -এ indigenous এবং tribal উভয় শব্দের প্রচলন থাকলেও নব্বই দশক থেকে ক্রমান্বয়ে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে tribal শব্দ পরিহার করা হয় এবং indigenous শব্দের প্রচলনই বেশি হতে থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মহলে tribal শব্দটির প্রচলন নেই বললেই চলে। বিশ্বব্যাংকের আদিবাসী বিষয়ক নীতিমালায় (Operational Procedure (OP) 4.10 Bank Procedure (BP) 4.10} 'Indigenous Peoples' শব্দের সংজ্ঞাতে উল্লেখ করা হয় যে, বিভিন্ন দেশীয় আইন ও দলিলে tribes, tribals, ethnic minorities ইত্যাদি শব্দে অভিহিত জনগোষ্ঠীকে বিশ্বব্যাংক indigenous peoples হিসেবে পরিগণিত করবে। অনুরূপভাবে Asian Development Bank (ADB) ও বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক দাতা সংস্থা (যথা: DANIDA, NORAD, DFID) এবং জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থাসমূহের (যথা: UNDP, IFAD) Indigenous Peoples Policy -তেও অনুরূপভাবে indigenous শব্দটি ব্যবহার করা হয়। Tribe বা tribal শব্দের সাথে বর্বর, আদিম, অনুন্নত ইত্যাদি ভ্রান্ত ও অসম্মানজনক ধারণা সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে এ শব্দসমূহের প্রয়োগ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, ২২ যদিও-বা বিশেষ বিশেষ প্রেক্ষাপটে এই শব্দসমূহের প্রচলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতেও দেখা যায়। ২৩ অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম ও লাওস-এ ethnic minority শব্দের প্রচলন বেশি দেখা যায়। ফিলিপাইনে Indigenous People শব্দের প্রচলন রয়েছে। আর ইন্দোনেশিয়াতে Masyarakat Adat (Customary Law People") শব্দটির প্রচলন রয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব শ্রম সংস্থা (ILO)-র আদিবাসী ও ট্রাইবেল জনগোষ্ঠী কনভেশন, ১৯৫৭ ( Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (Convention No. 107 )} বাংলাদেশ কর্তৃক ১৯৭২ সালে অনুসমর্থন করা হয়। এর পূর্বেও convention টি পাকিস্তান আমলে এ দেশে প্রযোজ্য ছিল যেহেতু ১৯৬০ সনে পাকিস্তান সরকার এই convention টি অনুমোদন করে । এই Convention-এর সংজ্ঞা অনুসারে বাংলাদেশের বর্তমানে যারা আদিবাসী হিসেবে দাবি করছে তারা সন্দেহাতীতভাবে indigenous peoples-এর আওতাভুক্ত। কারণ এই convention-এর সংজ্ঞার সাথে সংহতি রেখে বাংলাদেশের এ সকল জাতিগোষ্ঠীসমূহ “উপনিবেশীকরণ”, “রাজ্য বিজয়” বা “রাষ্ট্রের বর্তমান সীমানা প্রতিষ্ঠিত হবার" সময় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করত; উল্লেখ্য যে, এই convention-এ indigenous tribal দুই শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ থাকলেও এই convention-এর আওতাভুক্ত অধিকারসমূহ indigenous ও tribal জনগোষ্ঠী উভয়ের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হয় ।
অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসমর্থন/অনুমোদনের সময় আপত্তিকর বিধানাবলির ব্যাপারে রাষ্ট্র reservation রাখতে পারে। তবে এই convention অনুসমর্থন বা অনুমোদনের সময় কোনো reservation করা যায় না। এই convention অনুসমর্থনের সময় বা পূর্বেও বাংলাদেশ সরকার indigenous শব্দের প্রয়োগের বেলায় কোনো প্রশ্ন তোলেনি। এখন তা তোলা অবশ্যই অযৌক্তিক ও মানবাধিকার-বিরোধী । আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ক্রমশ গতিশীল ও উদারপন্থী হয়। এটাই Customary International Law-এর স্বাভাবিক রেওয়াজ। জাতীয়ভাবেও তাই হওয়া উচিত । ১৯৯৭ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ও কতিপয় চুক্তি-উত্তর আইনে 'উপজাতি' শব্দ লেখা আছে বলে সে রেওয়াজ এখনও রেখে যেতে হবে এর পক্ষে কোনো যুক্তি নেই । তাই, ২০১০ সনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠা আইনে 'আদিবাসী' শব্দটি টেনে এনে সেই প্রগতিশীল ধারাকেই মেনে নেয়া হয়েছে। আমি আশা করি এ ধারা অব্যাহত থাকবে ।
৩. শব্দচয়ন: 'উপজাতি', 'tribal' ও 'আদিবাসী' উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, tribe বা tribal শব্দের বিরূপার্থক সংশ্লেষের কারণে indigenous শব্দকে { এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে aboriginal শব্দকে (যথা: কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়)} অধিক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে, আপাতদৃষ্টিতে tribe বা tribal ও উপজাতি শব্দের অর্থ একই মনে করা হলেও প্রায়োগিকক্ষেত্রে tribe বা tribal শব্দের চাইতে উপজাতি শব্দের মধ্যে অধিকভাবে বর্ণবাদী, জাত্যাভিমানী, জাতিবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রচলন দেখা যায়। এর কারণে বাংলাদেশের আদিবাসী সমাজের অনেকেই উপজাতি শব্দটিকে এবং এমনকি tribe / tribal শব্দকেও, প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বর্তমানেও করে। উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষাগুলোর মধ্যে কেবল বাংলা ভাষায় tribe ev tribal শব্দসমূহ উপজাতি (আক্ষরিক অর্থে sub-nation) হিসেবে অনূদিত হয়েছে। পক্ষান্তরে উত্তর ভারতের হিন্দী ও অন্যান্য ভাষাতে ইংরেজিতে indigenous এবং tribal এই দুই শব্দ adivasi (আদিবাসী) হিসেবে অনুবাদ করা হয়ে থাকে। আবার ভারতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিন্দী শব্দ 'জনজাতিরও প্রচলন দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের সংবিধানে ইংরেজি 'scheduled tribe'-কে হিন্দী সংস্করণে “অনুসূচিত (তফসিলি) জনজাতি” ও 'scheduled caste'-কে “অনুসূচিত (তফসিলি) জাতি” হিসেবে অনূদিত করা হয়েছে। ২৪ অনুরূপভাবে, নেপালি ভাষায় 'আদিবাসী' ও 'জনজাতি' এই দুই শব্দের প্রচলন দেখা যায় এবং নেপালের অন্ত বর্তীকালীন সাংবিধানিক ও অন্যান্য আইনে এই দুই শব্দের প্রচলন একই সাথে দেখা যায়। ২৫ হিন্দী ও নেপালিতে 'উপজাতি' বা তার সমার্থক কোনো শব্দের প্রচলন দেখা যায় না। সুভাষ চন্দ্র সাংমা নামে এক শ্রদ্ধাভাজন মান্দি (গারো) নেতা ও ধর্মগুরু একবার প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন "আমাদের গারোদেরকে যদি উপজাতি বলা হয়, আমার প্রশ্ন হল গারোরা তাহলে কোন জাতি থেকে উদ্ভূত?”
৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে 'আদিবাসী' / 'উপজাতি' / 'indigenous' ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার
দেশের উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী যেমন: সান্তাল, ওরাওঁ, কোচ, রাজবংশী ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে বাংলা ভাষাভাষীরা সাধারণত 'আদিবাসী' হিসেবে সম্বোধন করে থাকে । এটা যৌক্তিকভাবেই হয়ে এসেছে যেহেতু বরেন্দ্রভূমির বহু এলাকায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে এ সকল আদিবাসী মানুষেরা বসবাস করত। যদি এমনও হয়ে থাকে যে, সেই জনগোষ্ঠীসমূহের মানুষেরা ওখানে আগমনের কিছুকাল পূর্বে বর্তমানের ভারতের সীমানা থেকে এসেছে, সেই ক্ষেত্রেও তারা “আদি”-তে এসেছে (বাংলা ও উর্দুভাষী বাংলাদেশী অনেকের পূর্বপুরুষ ভারত, আফগানিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছিলেন)। সুতরাং তাদেরকে 'আদিবাসী' বলা তথাপিও অযৌক্তিক নহে । উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ন্যায় হাজার হাজার বছর বসতি হয় নাই বলে তাদেরকে আদিবাসী বলা যাবে না, কথাটা অগ্রহণযোগ্য।
অনুরূপভাবে, পার্বত্য চট্টগ্রামেও দেখা যায় যে, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ মোট ১১টি পার্বত্য জাতিগোষ্ঠীসমূহ বিগত ৫০০ বছরেরও অধিককাল ধরে (দক্ষিণ এশিয়ায় পর্তুগিজদের আগমনের পূর্বে) পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করত । উদাহরণস্বরূপ পর্তুগিজ Cartographer, Joao de Barros এর ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের মানচিত্রে "chacomast (চাকমাদের অঞ্চল)-এর উল্লেখ দেখা যায়। তখন "chacomas" অঞ্চল বাংলার অংশ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন বাংলা প্রদেশ বৃটিশ ইস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক অধিগৃহীত হবার আগে "chacomas " ও চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ অনেক আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল বাংলার অধীনে ছিল না।
১৮০০ শতকের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠীর কোনো স্থায়ী বসতি ছিল না। ১৮০০ শতকে চাকমাদের আমন্ত্রণে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে চাকমা জমিদারির অঞ্চলের কিছু বাঙালি কৃষক পরিবার রাঙামাটিতে হাল চাষ করার জন্য প্রথম প্রত্যাবর্তন করে। তারাই পার্বত্যাঞ্চলের প্রথম স্থায়ী বাঙালি বসবাসকারী। সুতরাং আক্ষরিক অর্থেও পার্বত্য আদিবাসীরা পার্বত্যাঞ্চলে নিজেদেরকে আদিবাসী হিসেবে দাবি করতে পারে। তাছাড়া তারা তো পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার আদিবাসী হিসেবে দাবি করছে, ঢাকার বা দেশের অন্যত্র অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে না ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে বাঙালিরা পাহাড়ি' হিসেবে অভিহিত করে থাকে। তবে, ১৯৯৩-এর পর থেকে পার্বত্যাঞ্চলসহ দেশের সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে 'আদিবাসী' হিসেবে অভিহিত করার রেওয়াজ চলে আসে। এটার মূল কারণ হল যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মাধ্যমে আদিবাসীদের ঐতিহাসিকভাবে বৈষম্যের শিকার হওয়ায় প্রক্রিয়াকে মেনে নেয়া হয় এবং তাদের মানবাধিকারের উন্নতির লক্ষ্যে বিশেষ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
৫. আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী বা indigenous peoples
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে বসতি স্থাপন করে আসছে । উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এবং অস্ট্রেলিয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে আদিবাসীদের বসতি ছিল । পক্ষান্তরে, মিয়ানমার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ন্যায় বাংলাদেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অবস্থান অপেক্ষাকৃত ইদানিংকালের। প্রসঙ্গক্রমে অনেক ক্ষেত্রে, বাংলাভাষাভাষীসহ অন্যান্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীসমূহের বাংলাদেশে আগমনও অপেক্ষাকৃত ইদানিংকালের হতে পারে। তবে, বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহ যখন তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করে সেখানে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে বিজিত করে বা খেদিয়ে দিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল এরকম কোনো প্রমাণ মিলে না। সুতরাং সেক্ষেত্রেও তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা অযৌক্তিক নয়। তবে, অবশ্যই পৃথিবীর সকল জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে কোনো না কোনো এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিবাসনের মাধ্যমে নতুন অঞ্চল বা এলাকায় বসতি করেছিল । বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত ত্রিপুরা তাই ঠাট্টা করে লিখেছিলেন, “সবাই তো এক পৃথিবীর মানুষ, মঙ্গলগ্রহ থেকে তো আর কেউ আসেনি। ২৬ তবে যেই জাতিগোষ্ঠী কোনো স্থানে পূর্বে বসতি স্থাপন করে এবং কোনো এলাকার জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ লালনপালন করে সে ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কিছু অগ্রাধিকার থাকাটা অন্যায় নয়, যদি-না তা অন্য কারো মানবাধিকারকে লংঘন করে। তথাপিও মনে রাখা দরকার যে কোনো এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করা ছাড়াও অন্যান্য আরো অনেক উপাদান আছে যেগুলো আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহ বা indigenous peoples - দেরকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক করে । জাতিসংঘের প্রখ্যাত আদিবাসী বিষয়ক Special Rapporteur Erica I. Daes ও Special Rapporteur Jose Martinez Cobo প্রমুখ বিশেষজ্ঞরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।২৭ যথা: (ক) রাষ্ট্রীয় আইনের চাইতে প্রথাগত আইনের মাধ্যমে তাদের আভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি করা; (খ) প্রথাগত আইন কার্যকর করার জন্য সনাতনী অথবা ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি; (গ) একটি বিশেষ আবাসভূমির সাথে আত্মিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক; (ঘ) ধর্মীয় বহুমাত্রিকতা; (ঙ) আধুনিক রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার সাথে অসম্পৃক্ততা অংশ गान পান্তিক সম্পৃক্ততা; ও (চ) বর্তমানের রাষ্ট্রশাসন প্রক্রিয়ায় খুব জোর প্র 150 / 201 শেষোক্ত দুই বৈশিষ্ট্যই (ঙ ও চ) মানবাধিকার ও মানবিক দৃষ্টি --- অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাংবিধান ও রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতি প্রবর্তনে বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত নগণ্য ছিল অথবা একবারেই ছিল না । বর্তমানেও সরকারের অংশ হিসেবে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার একাধিক আদিবাসী ব্যক্তি থাকলেও আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণে তাদের ভূমিকার সুফল দীর্ঘমেয়াদে কতখানি থাকবে তা এখনও বোঝার সময় হয়নি । সে যাই হোক, উপরোক্ত প্রত্যেকটি উপকরণই বাংলাদেশের আদিবাসীদের বেলায় প্রযোজ্য হয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী যে indigenous peoples তাতে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ আমি দেখি না। উটপাখীর মতো বালিতে মাথা পুতে আদিবাসী না-দেখার ভান করা যাবে, তবে তা বিশ্বদরবারে কেবল হাস্যকর দেখাবে ।
৬. উপসংহার
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ন্যায় বাংলাদেশের আদিবাসীরাও উপনিবেশীকরণ, বৈষম্য ও প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়েছে। এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেই জাতিগোষ্ঠীসমূহের পরিচয়কে সর্বতোভাবে মেনে নেওয়া। বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রত্যক্ষভাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি না হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি হয় নাই এ কথা তো না। তবে, এই আদিবাসী পরিচয় সবাই মেনে নিলে। বৈষম্য কমে যাবে এবং বাংলা ভাষাভাষী ও আদিবাসী মানুষের সম্পর্ক আরও উন্নতি লাভ করবে। বাংলাদেশের সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে 'আদিবাসী' হিসেবে দেশের সংবিধানে প্রত্যক্ষ, সম্মানজনক ও যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিলে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা হবে এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অধিকার কোনো মর্মে খর্ব হবে না। বরং বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু বাঙালি জনগোষ্ঠীর উদারতার প্রকাশ পাবে, বাংলাদেশের আন্ত জাতিক ভাবমূর্তি সমৃদ্ধ হবে এবং দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ILO Convention No. 169 অনুস্বাক্ষর করাটাও খুব জরুরি। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে তাই করেছে। এছাড়া, যেসব আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নাম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে বাদ পড়েছে তাদের নাম যথাযথভাবে জরুরিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ।
মহামান্য সুপ্রিমকোর্ট পঞ্চম সংশোধনীর মামলার রায়ের মাধ্যমে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় যে অগ্রযাত্রা শুরু হল তার যথাযথ বাস্তবায়নে আদিবাসীদেরকে 'আদিবাসী' হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানে বাংলাদেশের গৌরব আরো বাড়বে এবং দেশের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতায় যথাযথ প্রতিফলন ও বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রত্যাশা আমার, আরও অনেক আদিবাসীর ও অনেক গণতন্ত্রবাদী ধর্ম-নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাংলাদেশী নাগরিকের।
তথ্যপঞ্জি
১. অশোক কুমার চাকমা, "Who decides Whose Indentity", The Daily Star, Dhaka, 24 February, 2010. অনুরূপভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ প্রদান করেছিল. দেখুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৯.০৪.২০০৬ খ্রিঃ তারিখের স্মারক ও Raja Devasish Roy, The ILO Convention on Indigenous and
Tribal Populations, 1957 and the Laws of Bangladesh: A Comparative Review, Project to Promote ILO Policy on
Indigenous and Tribal Peoples and ILO Office Dhaka, Bangladesh July 2009, p. 7, footnote 31.
২. অশোক কুমার চাকমা,... দ্রষ্টব্য।
৩. অনুচ্ছেদ ২৮(১), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান । ৪. অনুচ্ছেদ ২৮(৪), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ।
৫. এই আইনে সান্তাল, গারো, হাজং, কোচ, মুণ্ডা ও ওঁরাও সহ ২১টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ
আছে।
৬. অনুচ্ছেদ ২৭, ১৯৯৫ সনের অর্থ আইন (১৯৯৫ সনের ১২ নং আইন)। 9. Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900 এর ৪, ৬ ও ৫২ নং বিধি ও তফসিল।
জাতীয় রাজস্ব
বোর্ডের ১৯৬৭, ১৯৮০, ১৯৮৮, ১৯৯২, ১৯৯৪ ও ১৯৯৫-এর স্মারকেও এ শব্দ ব্যবহার করা হয় ।
স্মারকের নাম্বারের জন্য দেখুন রাজা দেবাশীষ রায়, The ILO Convention on
Indigenous and
Tribal Populations, 1957 and the Laws of Bangladesh: A Comparative
Review,
Project to Promote ILO Policy on Indigenous and Tribal Peoples and ILO Office,
Dhaka, Bangladesh, July, 2009, footnote no. 40. ৮. General Economic Division, Planing Commission, Government of Peoples
Republic of Bangladesh, Moving Ahead: National Strategy for Accelerated Poverty Reduction
II (FY 2009-11) ("PRSP-II), 2008.
৯. আরও দেখুন, Macro and Perspective Planning Wing, General Economics
Division, Planning Commission, Government of the People's Republic of Bangladesh.
"Perspective Planning for Bangladesh: 2010-2021". ১০. General Economic Division, Planning Commission, Gov 152 / 201
Republic of Bangladesh, Unlocking the Potential: N..... Accelerated gy
Poverty Reduction, October, 2005 (FY 2009-11 ) ("PRSP-II), 2008. ১১. ফুটনোট ৭ দ্রষ্টব্য ।
১২. দেখুন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯-এর ২,৪ ও ৬ নং ধারা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ।
আইন, ১৯৯৮-এর ২, ৫, ৭ ও ৮ নং ধারা
১৩. সঞ্জীব দ্রং সম্পাদিত, "Solidarity", Bangladesh Adivasi Forum, Dhaka, 2009.
১৪. সঞ্জীব দ্রং সম্পাদিত, "Solidarity, Bangladesh Adivasi Forum, Dhaka, 2008.
১৫. সঞ্জীব দ্রং সম্পাদিত, "Solidarity", Bangladesh Adivasi Forum, Dhaka, 2003. ১৬. জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ৬১/২৯৫ নং রেজুলেশন দ্বারা ১৩ সেপ্টেম্বর,
২০০৭ খ্রি. তারিখে গৃহীত ১৭. জাতিসংঘ ১৯৯৩-কে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ঘোষণা দেয় এবং ১৯৯৫- ২০০৪ এবং ২০০৫-২০১৪-কে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশক ঘোষণা দেয় ।
১৮. Operational Policy 4.10 এর ৩ নং ধারাতে নিম্নরূপ বর্ণনা রয়েছে: "Identification. Because of the varied and changing contexts in which Indigenous Peoples live and because there is no universally accepted definition of "Indigenous Peoples," this policy does not define the term. Indigenous Peoples may be referred to in different countries by such terms as "indigenous ethnic minorities" "aboriginals," "hill tribes, " "minority nationalities," "scheduled tribes," or "tribal groups."
১৯. ২০ জানুয়ারি, ২০১০ থেকে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক-এর "Environment, Involuntary Resettlement and Indigenous Peoples" সংক্রান্ত নতুন
পলিসি কার্যকর হয়। এখানে বিশ্বব্যাংক-এর indigenous peoples'-এর সংজ্ঞায় ন্যায়/নিয়ে অনুরূপ সংজ্ঞা গ্রহণ করা হয় ।
২০. দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাদের মধ্যে ডেনমার্ক, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও নেদারল্যান্ড-
এর আদিবাসী বিষয়ক নীতিমালা রয়েছে। এর মধ্যে ডেনমার্ক সরকারের নীতিমালা (Danish Ministry of Foreign Affairs, 2004. Strategy for Danish Support to Indigenous Peoples, Ministry of Foreign Affairs, 2, Asiatisk Plads, DK - 1448 Copenhagen K. Denmark (http://www.netpublikationer.dk/um/5751/index.htm)
সবচাইতে উদারপন্থী। ২১. জাতিসংঘের সংস্থাসমূহের মধ্যে UNDP ও IFAD-এর বিশেষ আদিবাসী বিষয়ক নীতিমালা রয়েছে।
২০০৯-এ গৃহীত IFAD এর নীতিমালা তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল ।
২২. সীমিত পরিসরে এই শব্দ বা তার প্রতিশব্দ আমেরিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও ভারতে ব্যবহার হলেও
আগের চাইতে অনেক কম।
২৩. কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতে 'aboriginal ' শব্দের প্রয়োগ বিশেষ দেখা যায়, যদিও-বা কানাডাতে no 'indigenous' "First Nations" শব্দের প্রচলন রয়েছে।
২৪. দেখুন, যথা Article 46, Constitution of India. 2. Draft Constitution of Nepal. UNCESCR, UN Document E/C.12/NPL/Co/2,
paragraph 28 the National Foundation for Development of Indigenous Nationalities Act of Nepal (2002).
২৬. প্রশান্ত্ ত্রিপুরা, “আর্জাতিক আদিবাসী দশক”, “Year People", Dhaka, 1993
154/201
২৭. দেখন: Jose Martinez Cobo, Study of the Problem of Discrimination Against Indigenous Populations, 1986, UN Document: E/CN.4/Sub.2/1986/7/Add.4. Erica-
Irene Daes, (i) Reports on the Study: Indigenous Peoples and their Relationship to
Land (1997), E/CN.4/Sub.2/1997/17, (ii) Indigenous Peoples: Permanent Sovereignty Over Natural Resources (2002), E/CN.4/Sub.2/2002/23, (iii) Indigenous Peoples: Keepers Of Our Past - Custodians Of Our Future, International Work Group for Indigenous Affairs (IWGIA), Copenhagen, 2008.
[ লেখক: চাকমা রাজা। এডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট ।]
[লেখা- বিষয়ভিত্তিক ত্রৈমাসিক পত্রিকা হালখাতা,
বাংলাদেশের জাতিগত সংকট ও উত্তরণ সংখ্যা,
৩য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৯]