![]() |
| শ্রী সুদীর্ঘ চাকমা |
আমরা আমাদের যুবকদের ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে মারা যেতে দেখে বিচলিত হই। হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করি। নৈতিকভাবে যে আমাদের আরো যুব-যুবা তিল তিল করে মারা যাচ্ছে তা কি আমরা উপলব্দি করছি? যুবসমাজের এই দুইভাবে মারা যাওয়া সত্যি বেদনাদায়ক। কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র বলেছেন- মানুষকে পশুর স্তরে না নামাতে পারলে মানুষকে দিয়ে পশুর কাজ করানো যায়না। সেইজন্য শাসকেরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন ঘটানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করে রেখেছে। ষাট-সত্তর দশকের যে যুবকেরা ক্যারিয়ারের চিন্তা না করে তীব্র ঝুঁকি নিয়ে সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশের জন্য মনুষ্যত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেছিল আজ যুবসমাজের সেই তেজ কি আমরা দেখতে পাই? আশির দশকে আন্দোলন যখন তুঙ্গে যুবসমাজকে আন্দোলন বিমূখ করার জন্য বিভিন্ন বিভাগে স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল এরশাদ চাকরি দেয়। উদ্দেশ্য যাতে শিক্ষিত যুবকেরা আন্দোলনে অংশ না নেয়। অন্যদিকে জেলা-উপজেলা সদরে সেনাবাহিনির প্রত্যক্ষ পৃষ্টপোষকতায় গড়ে উঠে নানা নামের তথাকথিত ক্লাব। ক্লাবের নাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও কাজ কিন্তু একটাই-সেনা কর্মকর্তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।ক্লাবে ক্লাবে মদ-জুয়ার আসর বসে প্রতিনিয়ত। একদিকে দমন-পীড়ন,নির্যাতন-নিপীড়ন অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয় ঘটানোর সমস্ত আয়োজন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় - শিকলওয়ালা বাঁধে বটে কিন্তু ভোলায় না,আফিমওয়ালা বাঁধেও ভোলায়াও। লোগাং-নান্যাচড়-ভূষণছড়া-লংগদু-কলমপতির মত গণহত্যা যখন সংগঠিত হয় এসব ক্লাবের ভূমিকা থালায় জল দেওয়ার মত। বর্তমানেও ঐ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কোন পরিবর্তন সাধিত হয়নি।
আমেরিকাতেও নির্জীব যুবসমাজ তৈরীর কাজ সেখানকার শাসকেরা সম্পন্ন করেছে। আমারিকা যখন ভিয়েতনাম আক্রমন করে তখন খোদ আমেরিকাতেই হাজার হাজার ছাত্র-যুব রাজপথে নেমে অন্যায় হামলার প্রতিবাদ জানায়। শাসকেরা ভয় পেয়ে গেলো। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের চাইতে তার দেশের প্রতিবাদের তাৎপর্যতা উপলব্ধি করে অন্যায়ের প্রতিবাদহীন আমেরিকা বানানোর আয়োজন করলো। আমেরিকার সাবেক শিক্ষাদপ্তরের রাষ্ট্রসচিব উইলিয়াম জে বেনেট ১৯৯৩ সালে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ২০তম বার্ষিকীতে এক ভাষণ দেন।বক্তব্যটি vital speeches of the day পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।তিনি বলেছেন-"যদিও আমরা জাগতিক ভোগসুখে আছি,কিন্তু আমরা চরিত্র নিয়ে বেঁচে নেই। ...গত ৩০ বছরে হিংসাত্মক ঘটনা বেড়েছে ৫৬%,অবৈধ সন্তানের জন্ম বেড়েছে ৪০০%,বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে ৪০০%,পিতামাতা পরিত্যক্ত সন্তান বেড়েছে ৩০০%,অল্পবয়সীদের আত্মহত্যা বেড়েছে ২০০% আর হাই স্কুলে ছাত্র_ছাত্রীদের গড় মেধা কমেছে ৭৫% পয়েন্ট। ...১৯৪০ সালে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে মূল সমস্যা আসত অসংলগ্ন কথা বলা,চুয়িংগাম চিবানো,রুমে দৌঁড়াদৌঁড়ি করা,স্কুলের ড্রেস পরে ক্লাসে না আসা,আর্বজনা ফেলা ইত্যাদি। ১৯৯০ সালে সমীক্ষায় সমস্যা দেখা গেল - ড্রাগ খাওয়া,মদ খাওয়া,গর্ভবতী হয়ে পড়া,আত্নহত্যা, ধর্ষণ,ডাকাতি এবং হিংস্র আক্রমণ। আর গর্ভপাত,ডিভোর্স,বিবাহবর্হিভূত সন্তান জন্মের তালিকায় আমেরিকা প্রথম স্থান অধিকার করেছে। "ফলে আমেরিকা যখন আফগানিস্থান,ইরাক,পাকিস্তানের নিরাপরাধ মানুষের উপর মনুষ্য বিহীন বিমান থেকে বোমা হামলা চালায় আমেরিকার রাজপথে ছাত্র যুবকদের মিছিল তেমন দীর্ঘ হয়না। সাবেক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কিসিঞ্জার কয়েকমাস আগে এক ভাষণে বলেছেন- "আমরা আমেরিকার শিশুদের অস্ত্রের খেলনায় খেলতে উৎসাহিত করছি যাতে তারা মেশিনগান,ট্যাংক, বোমারু বিমান ভালোবাসে,যুদ্ধ ভালবাসে।" আমেরিকার একটি সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গেইটে ঠিক এভাবে লেখা আছে-শেখার জন্য আস,খুন করার জন্য বের হও।
গত বছরের শেষান্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বান্দরবান সফরের সময় বলেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনার কথা। বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে কোন প্রকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা ছিলনা। কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাঁর দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার কী কারণে রক্ষা না করে ভঙ্গ করা হচ্ছে তার ব্যাখ্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ পেলোনা। মানুষের মৌলিক অধিকার পুরণ না করে এসব পর্যটন শিল্প করে গরীব মানুষের যে চরম পরিনতি ঘটবে তা বলা বাহুল্য। শাসকশ্রেণীর তথাকথিত পর্যটন শিল্পের মাধ্যমেও একধরনের সুচতুর রাজনীতি রয়েছে। আমরা ফিলিপাইন,দক্ষিণ কোরিয়া,থাইল্যান্ড ও ভারতের দিকে তাকালে এইসব ভয়াবহ পরিনতি দেখতে পাই। এশিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর প্রধান ব্যবসা হচ্ছে পর্যটন শিল্প। আর এই শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হল 'মনোরঞ্জক মহিলা' (hospitality girls) পরিস্কার ভাষায় পতিতার ব্যবসা। থাইল্যান্ডের রোজি ট্রাভেল কোম্পানী একটি বিজ্ঞাপনে লিখেছে-" বিদেশীদের কাছে থাইল্যান্ড এক আকর্ষণীয় দেশ । বিশেষ করে এ কথাটা খাটে মহিলা সংক্রান্ত বিষয়ে। কিন্তু অনেক সময় বিদেশীরা বুঝতে পারেননা কোথাই গেলে এই অনাস্বাদিত আনন্দের খোজঁ কোথায় গেলে পাওয়া যাবে। আমাদের কোম্পানী এই সমস্যা মেটাচ্ছে।ইতিহাসে প্রথম আপনি এই সুযোগ পাচ্ছেন। আমাদের তালিকা দেওয়া আছে সেটা দেখুন এবং থাইল্যান্ডে অনাস্বাদিত আনন্দ ভোগের জন্য টিকিট বুক করুন।"ফিলিপাইনে সরকারি সম্পদ বৃদ্ধির অন্যতম ব্যবসা হল পর্যটন।এটা প্রচুর বিদেশী মুদ্রা আনে। খদ্দের বেশীরভাগ বিদেশী ধনাঢ্য ব্যক্তি,পুঁজিপতি ও তাদের বংশধর অফিসার। সরকারি হিসেবে এই মনোরঞ্জক মহিলা কয়েক লাখ। দক্ষিণ কোরিয়ার পতিতাদের নাম 'কিয়াসায়েঙ' রয়েছে কিয়াসায়েঙ রেস্টুরেন্ট। ওরা ওদের দেহ নিংড়ে সরকারকে প্রতিবছর ২৭ কোটি ডলার মুনাফা দিয়ে থাকে।ভারতের শহর গোয়া আন্তর্জাতিক টুরিস্ট স্পট। মার্কিন বহুজাতিক সংস্থা এল ১৯৭৬ সালে।বড় বড় ফাইভ স্টার হোটেল,কমপ্লেক্স নিয়ে গড়ে উঠল 'লাইফ ইন গোয়া'।সরকার ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে ঘোষণা করল পর্যটন হবে গোয়ার মূল শিল্প।হোটেল ব্যবসায় সরকারি ভূর্তুকি ২৫ শতাংশ।হোটেলের জন্য জমি চাইলে অবশ্যই বিক্রি করতে হবে। জমির মালিকের ইচ্ছে-অনিচ্ছা মূল্যহীন।স্থানীয় মানুষেযা জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেন।মৎস্যজীবিদের মাছ শিকার বন্দ হয়ে গেল। হোটেল ব্যবসার জন্য পানি সরবরাহ করতে গিয়ে স্থানীয়রা পানি নিয়মিত পেল না। পানি সংকট তৈরী হল।নিজস্ব উপার্জন ছেড়ে হোটেলে স্থানীয়রা কিছু চাকরী পেল হোটেল বয়,বেয়ারা,সাহেব মেমদের সেবা করার জন্য (তথ্য সুত্র:সর্বগ্রাসী অক্টোপাস)। ইতিমধ্যে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসব কিছু লক্ষণ তথাকথিত পর্যটন শিল্পে দেখতে পাচ্ছি যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোর সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের উপর আঘাত হানতে শুরু করেছে।
গোটা দেশব্যাপী মাদক আর মাদক, ভিডিও দোকানে অশ্লীল ছবি, মোবাইল-ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি।প্রশাসন নির্বিকার। তিন পার্বত্য জেলায় সেনাবাহিনীর পৃষ্টপোষকতায় তথাকথিত ব্যান্ডশো,বাণিজ্যিক ছায়াছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুবসমাজকে রঙ্গ তামাশায় মত্ত রাখার আয়োজন করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের আয়োজনে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজে যখন বানিজ্যক ছবি 'দ্য স্পিড'প্রদর্শিত হয় তখন অবাক হওয়ার কিছু থাকেনা।যে গৌরবজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৃষ্টি সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর অনেক ছায়াছবি থাকা সত্বেও সেনা প্রশাসন ছাত্রছাত্রীদের সচেতনভাবে বঞ্চিত করেছে। তীব্র শীতে যখন লক্ষ-কোটি মানুষ কষ্ট পাচ্ছে,মারা যাচ্ছে সেসময় সেনাবাহিনী আর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে লক্ষটাকা খরচ করে ব্যান্ডশো আয়োজন অভাবি শীতার্থ মানুষদের সাথে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা ছাড়া আর কিছু নয়। স্বৈরাচারি এরশাদও নব্বইয়ের গণআন্দোলনের সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে উত্তম-সুচিত্রার ছায়াছবি প্রচার করে আন্দোলনের মিছিল নতিদীর্ঘ করতে চেয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশে শাসকশ্রেণী সচেতনভাবে এসব করে যাচ্ছে। যুব সমাজ যাতে অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে,ঘৃণা না জানায়। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়না অথচ প্রশাসনের সম্মতিতে বিজয় মেলার নামে চলে স্বল্প বসনা নর্তকীর উদ্দাম নৃত্য আর বাম্পার-হাউজিসহ নানা রকমের জুয়া।
সমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় রোধে দেখি এক শ্রেণীর মানুষ দলেদলে ধর্ম চর্চায় মহাব্যস্ত। আসলে ধর্ম চর্চার মধ্য দিয়ে কী এই পরিস্থিতির মোকাবেলা সম্ভব?শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় গোটাদেশে স্বাধীনতার পর কয়েকগুন মন্দির-মসজিদ-প্যাগোডা-গির্জা বেড়েছে। সাথে সাথে বেড়েছে অপরাধ আর অনৈতিক কার্যকলাপ।কথকক্ষেত্রে ধর্মীয় গুরুরা এ অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি।পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক অর্ধশিক্ষিত,উচ্চশিক্ষিত পরিচিতমুখ ধর্মীয় গুরুদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের ঘটনা বহুল আলোচিত। কয়েকবছর আগে অন লাইনে খ্রিস্টানদের পবিত্র ধর্মীয় উৎসব বড়দিন উপলক্ষে এক জরিপ চালানো হয়,প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি বড় দিনের রাত কার সাথে কাটাতে চান?উত্তরে যিশু খ্রিস্ট,পোপকে পেছনে ফেলে টপ হন পপ গায়িকা ব্রিটনি।যার কিনা বিবাহ বন্ধনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিচ্ছেদের রেকর্ড রয়েছে।
রাজনীতির প্রভাব সমাজের সর্বক্ষেত্রে। রাজনীতি ভালো না হলে,আদর্শবান নেতৃত্বে সমাজ পরিচালিত না হলে ধর্মচর্চা করেও মানুষের নৈতিকতা রক্ষা করা যায় না। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি যখন সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটায় তখন আমরা দেখি কি অদম্য গতিতে অর্থনীতি,রাজনীতি, সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়া এগিয়ে যায়। জোর গলায় সেদিন লেনিন বলতে পেরেছিলেন আমাদের সোভিয়েত ইউনিয়নে কোন গরীব নেই,বেকার নেই,ভিক্ষুক নেই,ক্ষুধার জ্বালায় কোন নারীকে দেহ বিক্রি করতে হয় না। লেনিন পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান স্টালিনের সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে শিক্ষা,চিকিৎসা,পরিবহন ছিল বিনামূল্যে। খাবার কিনতে জনগণকে সামান্য খরচ করতে হতো। স্টালিনের পরিকল্পনা ছিল বিনামূল্যে খাবার দেয়ার। শ্রমিকদের কাজ করতে হতো ৬ ঘন্টা,লক্ষ্য ছিল ৪ ঘন্টা করার। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গিয়ে পুঁজিবাদ ফিরে আসলে আমরা দেখি শুধুই হাহাকার। বর্তমানে রাশিয়া বিশ্বে যেসবে প্রথম-মানসিক রোগগ্রস্থ মহিলা,শিশু-কিশোর ও বয়স্ক মানুষের আত্মহত্যা,পরিত্যক্ত শিশু,গর্ভপাত ও প্রসবকালিন মৃত্যু,বিবাহবিচ্ছেদ আর বিবাহ বর্হিভূত শিশু,মাদক-তামাকের ব্যবহার,হার্ট ও ধমনী সংক্রান্ত মৃত্যু,পথ ও বিমান দুর্ঘটনা,চীনা গাড়ি আমদানি, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাকৃঅক সম্পদের পরিমান। যেসবে দ্বিতীয়- ভেজাল ঔষুধ,ধনপতি,মোট জনসংখ্যানুসারে আত্নহত্যা ও খুন,দশ বছরে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা,আমলাতন্ত্রের প্রসার, পশ্চিমাদেশে আশ্রয়প্রার্থী,প্রতি হাজারে জেলবন্দী,মার্কিন নাগরিক কর্তৃক দত্তক নেয়া শিশু।যেসবে বিশ্বে তৃতীয়-সিগারেট উৎপাদন, শিশু পর্ণোগ্রাফি (অশ্লীল ছবি,পত্র-পত্রিকা),ধর্মীয় গোষ্ঠির সংখ্যা, গাড়ি চুরির ঘটনা।
পুঁজিবাদীর যুগে মিডিয়া আজ বিরাট শক্তিশালী অস্ত্র যা দিয়ে মানুষের মনন জগতে প্রতিনিয়ত আঘাত করে চলেছে। বাংলা-হিন্দি-হলিউডের সিনেমার তথাকথিত নায়েকরা যে আচরণ করে তা যৌন নিপীড়ন বা ইভটিজিং নয়? যে শিশু কিশোর এসব দেখে বড় হচ্ছে স্কুল-কলেজে সহপাঠিদের সাথে এসব ফিল্মি আচরণ করছে। সে মনে করেছে এসব নায়কের আচরণ। গত বছর ২৮ অক্টোবর ২০১২ চট্রগ্রামে নাসিরাবাদ স্কুলের ছাত্র পিয়ার্স চাকমা ও তার সহপাঠীদের দ্ধারা এক সহপাঠী স্কুলছাত্রী ধর্ষিত হয়।জানা যায় পিয়ার্স চাকমার সাথে ঐ মেয়েটির প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিকল্পনানুযায়ী নির্জনে মেয়েটিকে নিয়ে আনে শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। তা বন্ধুরা জানতো। বন্ধুরা হবে দর্শক। ঐ দর্শকরাই পরবর্তীতে ধর্ষক বনে যায়। সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ধর্ষকদের মুক্তির জন্য অভিভাবকরা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দিচ্ছে।নৈতিকতা লংঘনের দিক দিয়ে জুম্মরাও কোন অংশে কম নয় ত বোঝা যাচ্ছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী গত বছর জুরাছড়ি বন বিহারে কঠিন চীবরদানের সময় স্ব-জাতি কর্তৃক এক ত্রিপুরা কিশোরী ধর্ষিত হয়। ভাইয়ের সাথে বেড়াতে এসে ২১ নভেম্বর ২০১২ রাঙ্গামাটিতে রমেশ ত্রিপুরা কর্তৃক এক মেয়ে গণ ধর্ষিত হয়। এমন যুব সমাজই শাসকেরা চায়। শিশু কিশোরদের খেলার পর্যাপ্ত মাঠ নেই,পর্যাপ্ত পাঠাগার নেই, পাঠাগারে বই নেই,লেখাপড়ার জন্য স্কুল নেই,স্কুলে শিক্ষক নেই, অনেক শিক্ষকের যোগ্যাতা নেই কারণ ঘুষ দিয়ে চাকরি কেনা হয়েছে।ফলে আমাদের সমাজে শিশু আছে মায়াভরা শৈশব নেই,কিশোর আছে সেই দূরন্ত কৈশোর নেই,তরুণ আছে প্রাণ চঞ্চল তারণ্য নেই,যুবক আছে সেই তেজি যৌবন নেই। মুনাফার ভিত্তিতে গড়া সমাজ সেসব দিতে পারননি। এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাথমিক স্তরে ৫৯% ও মাধ্যমিককে ১৭%ছাত্র ঝড়ে পড়ে (প্রথম আলো ২৭-৯-২০১২)। তারপরও যাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সৌভাগ্য হয় ঝড়ে পড়াদের প্রতি,সুযোগ না পাওয়াদের প্রতি কী কোন দায়িত্ব থাকবে না?রামুর আগুনে যে উত্তপ্ত হয়না,রাঙ্গামাটি হামলায় যে ব্যথা পায়না,ধর্ষিত বোন থুমাচিং মারমার চিৎকার যে শুনতে পায়না,অপহৃত নেত্রী কল্পনার জন্য যার আকুতি জন্মে না সেতো যুবক নয়! সে মানুষও নয়!ভারতে নয়াদিল্লীতে দামিনীকে ধর্ষনের বিরুদ্ধে যুবসমাজ কীভাবে ফুঁসে উঠেছে। তীব্র শীতে পুলিশের জলকামান,লাঠি,টিয়ার গ্যাস,ভারত-পাকিস্তান টি টুয়েন্টি ক্রিকেট বা কারিনা-সোনাক্ষি-বিদ্যাবালনের রগরগে ছবি যুবসমাজকে প্রতিবাদী মিছিল থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। এই যুবসমাজ হয়তো সবাই সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত নয়।
যুবসমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় সমাজের প্রগতিশীল রাজনৈতিক বিকাশের মাত্রাগত অভাবকে ইঙ্গিত বহন করে।এর জন্য যুবসমাজ দায়ী নয়। পুঁজিবাদী সমাজ আজ চরম প্রতিক্রিয়াশীল। সমাজ অগ্রসর না হলে ব্যক্তির অগ্রসরতা সম্ভব নয়।কথায় আছে মাছ পঁচলে আগে মাথা পঁচে। সমাজের মাথা হচ্ছে রাজনৈতিক নেতারা। যারা দেশ ও দল পরিচালনা করেন।বর্তমানে তাদের আদর্শগত ঘাটতি সমাজের প্রতিফলিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও ভোগবাদী সংস্কৃতির ধারকবাহক পুঁজিবাদী রাজনীতির প্রভাব বর্তমানে তীব্রভাবে আঘাত হানছে।রাজনীতি একধরনের বিনিয়োগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।অতীতে বিভিন্ন সময় শাসকশ্রেণির লেজুর,প্রতিক্রিয়াশীল,সুবিধাভোগিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের নানা পদে রয়েছেন। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনির্বাচিত পার্বত্য জেলা পরিষদ দলীয় কর্মীদের পুনর্বাসন এবং দুর্নীতির আখরায় পরিনত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চলমান রাখার একটা স্পন্সর পরিষদে পরিণত হয়েছে।ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত অব্যাহত থাকার ফলে কিছু সুযোগসন্ধানী,চতুর, ধান্ধাবাজ লোক পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দলের নেতারাও যেনতেনভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এদের দলে টানছে। ফলে আগে নেতা-কর্মীদের আচার আচরণ,আদর্শ ও ত্যাগের মহিমায় জনগণ শির অবনত করতো বর্তমানে ভয়ে মাতানত করতে বাধ্য হচ্ছে। কতিপয় সর্বজন পরিচিত নেতাদের ব্যক্তিগত জীবন,পারিবারিক জীবনের কেচ্ছাকাহিনী এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও মনিকা লিওনেস্কির কেলেংকারীর ঘটনাকেও হার মানাচ্ছে। একজন আদর্শবান নেতা কখনই জনমতকে অশ্রদ্ধা বা প্রত্যাখ্যান করেননা। বরং জনমতকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেন। মহান নেতা মাও সেতুং বলেছেন- জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস কিংবা জনগণ হচ্ছে মা বাবা,রক্ষাকর্তা।ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধে গোটা জুম্মজাতি যেখানে ঐক্যমত সেখানে জনমতের বিপক্ষে গিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূলীকরণের নীতি শাসকগোষ্ঠির হাতকে শক্তিশালী করেছে। ফলে অনেক সংগ্রামি সোনালী অতীত থাকা সত্বেও ক্ষমতার মোহে বর্তমানে অনেক নেতা জুম্ম জাতির ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। তাই সময় এসেছে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোন স্বার্থের পেছনে না ছুটে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধসহ জুম্মজনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করে যাওয়ার। রাজনীতি করলে টাকা পয়সার মালিক হবো,স্কলারশীপ পাবো, দেশে-বিদেশে,সেমিনার-ওয়ার্কসপে-প্রশিক্ষণে যাবো,প্রজেক্ট পাবো এসবতো উদ্দেশ্য হতে পারেনা। উদ্দেশ্য হতে হবে উন্নততর আদর্শ, মূল্যবোধ যার মধ্য দিয়ে শুধু নিজের জীবনের নয় সমগ্র জনগণের আমুল পরিবর্তন সাধনের।রাজনৈতিক দলগুলো হবে আদর্শবান মানুষ তৈরির প্রতিষ্ঠান। যার স্পর্শে পরশ পাথর সোনায় পরিনত হবে। অতীতে আমরা দেখেছি মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে সেই ধরনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। তাঁর ছোঁয়ায় গ্রাম্য নির্বোধ,দিগভ্রান্ত যুবক কিভাবে সাহসী বিচক্ষণ কমান্ডার হয়ে শক্রর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অমিত তেজে। তাঁর সংস্পর্শে ভীরুরা অসীম সাহসী, চরিত্রহীনরা চরিত্রবান,অশিক্ষিতরা শিক্ষিত হয়ে উঠে। একদিকে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে মৃত্যু অন্যদিকে মনুষ্যত্বের মৃত্যু এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে দরকার প্রগতিশীল আদর্শের রাজনীতির। শুধু কথায় নয়,নেতা কর্মীদের জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে যার প্রভাব ব্যাপক জনগণের উপর পড়বে।
অনেকেই রাজনীতি করা পছন্দ করেন না।প্রচ্ছন্দভাবে রাজনীতির প্রতি ঘৃণাও প্রকাশ করতে দেখা যায়। কিন্তু এটাও ঠিক যে,রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাইলেও দূরে থাকা যায়না। কারণ সমাজের অর্থনীতি,সংস্কৃতি,শিক্ষা,সরকার পরিচালনা,আইন প্রনয়ণসহ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। যে বলে রাজনীতি করেনা সেও কিন্তু রাজনীতির মধ্যেই রয়েছে। ব্যাপারটা হলো কেউ সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত হয় কেউ পরোক্ষভাবে সচেতন বা অবচেতনভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকে। সমাজের খুব কম লোকই সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকে। কিন্তু যে কোন রাজনৈতিক আদর্শের পেছনে থাকে কম-বেশী মানুষের সমর্থন।সক্রিয়ভাবে রাজনীতি সবাইকে করতে হবে তেমন যেমনি কথা নেই তেমনি সেটা বাস্তবও নয়। সমাজের অন্যান্য ভালো কাজে কি আমরা তাদের পেতে পারিনা? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যেমন বিধবা বিবাহ প্রথা চালু ও শিক্ষা বিস্তারের অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন,রাজা রাম মোহন রায় যেমন সতী দাহ প্রথা বন্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন,বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র গঠনের মাধ্যমে অধ্যাপক আবু সাইয়িদ যেমন আলোকিত মানুষ তৈরির কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন,মুহাম্মদ জাফর ইকবাল সহ অন্যরা যেমন গনিত অলিম্পিয়াডের মাধ্যমে বিঞ্জান আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন,প্রথম আলোর মত প্রতিষ্ঠান যেমন মাদকের বিরুদ্ধে,এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করার প্রয়াস চালাচ্ছেন আমরা কি আশা করতে পারিনা আমাদের জুম্ম সমাজেও সরকম একদল মানুষ সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন।
প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক,কেন্দ্রীয় কমিটি,পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।
[উন্মেষ "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সংখ্যা" প্রকাশকাল-ফেব্রুয়ারি ২০১৩]
[উন্মেষ "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সংখ্যা" প্রকাশকাল-ফেব্রুয়ারি ২০১৩]

No comments:
Post a Comment