ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে সিদ্ধার্থ বা গৌতম বুদ্ধ একজন বিশিষ্ট শিক্ষাগুরু ও ধর্ম সংস্কারক রুপে পরিচিত।তিনি বাস্তববাদীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই জীবন ও জগৎকে বিশ্লেষণ করেছিলেন।
ব্যাধি,শোক,জরা,মৃত্যু প্রভৃতির দ্বারা মানুষকে নিত্য নিপীড়িত হতে দেখে সিদ্ধার্থের মনে এসবের কারণ অন্বেষণের ইচ্ছা জাগে।এক শান্ত,সৌম্যদর্শন নির্ভিক সন্নাসীর দর্শন পেয়ে দুঃখের হাত থেকে পরিত্রাণ লাভ করার জন্য তিনি ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে সংসার পরিত্যাগ করেন।সমাধিমগ্ন অবস্থায় সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর মধ্যে 'বৌধি' বা 'প্রজ্ঞা'-র উন্মেষ হয়।সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধ বা সম্যক জ্ঞানী।সত্যের সন্ধান লাভ করেও তিনি তৃপ্ত হতে পারলেন না।কেবলমাত্র নিজের মুক্তির জন্য নয়,বিশ্বের সমস্ত লোককে দুঃখকষ্ট থেকে চিরমুক্ত করার জন্য তিনি তাঁর ধর্মবাণী প্রচার করেন।গৌতম বুদ্ধের এই প্রচারিত এই বাণীই বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের ভিত্তি।
ত্রিপিটক-বিনয়পিটক,সুত্তপিটক ও অভিধম্মপিটক
বুদ্ধদেবের তিরোধনের পরে তাঁর উপদেশাবলি সংরক্ষণের জন্য তাঁর শিষ্যরা সেগুলিকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন।এই সংরক্ষিত উপদেশাবলিকে পিটক বলা হয়।পালি ভাষায় লিখিত এই পিটকের সংখ্যা তিন হওয়ায় এগুলিকে একত্রে 'ত্রিপিটক' বলা হয়।এগুলি হলো (১) বিনয়পিটক, (২) সুত্তপিটক, এবং (৩) অভিধম্মপিটক ।বিনয়পিটকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের আচরণ সম্পর্কে নিয়মসমূহ আলোচনা করা হয়েছে।সুত্তপিটকে বৌদ্ধ ধর্মের উদ্দেশ্য,সাধনা ও ফল এবং অভিধম্মপিটকে বুদ্ধদেবের উপদেশের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে।
নবলব্ধ প্রজ্ঞার আলোকে দুঃখ ও দুঃখনিরোধের উপায় সম্পর্কে বুদ্ধদেবের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তাঁকে চারটি সত্যের সন্ধান দিয়েছিলো।এই চারটি সত্য 'চত্বারি আর্য সত্যানি' বা 'চারটি আর্য সত্য' নামে পরিচিত।এগুলি হলো- (১) দুঃখ আছে, (২) দুঃখের কারণ আছে, (৩)দুঃখের নিরোধ আছে এবং (৪) দুঃখ নিরোধের পথ আছে।
প্রথম আর্য সত্যঃ দুঃখ আছে-
এ সংসার দুঃখময়।দুঃখ হলো সর্বব্যাপক।জন্ম দুঃখ,জরা দুঃখ,রোগ দুঃখ,মরণ দুঃখ।উদ্বেগ,আকাঙ্ক্ষা,শোক,ক্লেশ,প্রিয়-বিয়োগ,অপ্রিয়সংযোগ বা যা কিছু আসক্তিপ্রসুত সবই দুঃখময়।এই সংসারে জীব ব্যাধি,জরা ও মৃত্যুর অধীন।সংসারের সমস্ত বস্তুই ক্ষণস্থায়ী।সংসার কেবল দুঃখময়- কোথাও সুখ বা আনন্দ কিছুই নেই।সুখ থাকলেও প্রতিটি সুখের মধ্যেই দুঃখের বীজ প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে।এই বিশ্বের সমস্তই অনিত্য এবং সেকারণেই দুঃখময়।
দ্বিতীয় আর্য সত্যঃ দুঃখের কারণ আছে-
সংসারে যেমন দুঃখ আছে,তেমনই দুঃখের কারণও রয়েছে।বুদ্ধের "প্রতীত্যসমুৎপাদ" বা কার্যকারণের সম্পর্কের ভিত্তির উপর দ্বিতীয় আর্য সত্যটি প্রতিষ্ঠিত । প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব অনুসারে এ জগতে কোনো ঘটনাই কারণ ব্যতীত ঘটতে পারেনা।অর্থাৎ দুঃখও অকারণে ঘটতে পারেনা।দুঃখেরও কারণ আছে।জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম,জাতির কারণ ভব বা পুনর্জন্ম গ্রহণের আকুলতা।ভবের কারণ উপাদান বা জাগতিক বিষয়ের প্রতি আসক্তি। উপাদানের কারণ হলো ভোগস্পৃহা বা তৃষ্ণা।তৃষ্ণার কারণ বেদনা।বেদনার কারণ স্পর্শ।স্পর্শের কারণ ষড়ায়তন বা ছয় ইন্দ্রিয় এবং ষড়ায়তনের কারণ নামরুপ বা দেহ-মন সংগঠন।নামরুপের কারণ চেতনা বা বিজ্ঞান।বিজ্ঞানের কারণ সংস্কার বা অতীত জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ।সংস্কারের কারণ হলো অবিদ্যা অর্থাৎ চারটি আর্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব।অবিদ্যার জন্যই মানুষ মিথ্যাকে সত্য ও অনিত্যকে নিত্য জ্ঞান করে।
তৃতীয় আর্য সত্যঃ দুঃখের নিরোধ আছে-
এই সত্যটি প্রথম সত্য থেকে প্রসূত একটি যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্ত বিশেষ।দুঃখের উদ্ভবের কারণগুলিকে ধ্বংসের মাধ্যমেই দুঃখের নিরোধ সম্ভব।কামনার সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন ও ইচ্ছার জাগরণ রোধের মাধ্যমেই দুঃখের অবসান ঘটানো সম্ভব।দুঃখ থেকে চিরমুক্তিই নির্বাণ।নির্বাণ নিস্ক্রিয় অবস্থা নয়।নির্বাণ লাভের পর অনাসক্তভাবে কর্ম করলে বন্ধনের সম্ভাবনা থাকেনা।
চতুর্থ আর্য সত্যঃ দুঃখ নিরোধের মার্গ বা পথ আছে-
দুঃখ থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য বৌদ্ধ দর্শনে 'আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে'র কথা বলা হয়েছে।এই পথের আটটি পথ বা মার্গ হলো- (১) সম্যক দৃষ্টি (right views), হলো চারটি আর্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। (২) সম্যক সংকল্প (right determination), বলতে বোঝায় পার্থিব বিষয়বস্তুর প্রতি অনীহা,হিংসা,দ্বেষ,রাগ পরিত্যাগের ইচ্ছা ও কামনা-বাসনা জয়ের সংকল্প। (৩) সম্যক বাক্যের ( right speech), অর্থ হলো সত্য কথা বলা ও সংযত এবং শিষ্ট আলোচনা করা। (৪) সম্যক কর্ম বা সম্যক আচরণ(right conduct) হলো প্রাণী হত্যা,চৌর্য এবং ইন্দ্রিয় সেবা থেকে বিরত হওয়া । (৫) সম্যক জীবিকা(right livelihood) অর্থ হলো সদুপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা। (৬) সম্যক ব্যয়াম(right effort) বলতে বোঝায় কুচিন্তার বিনাশ ও সৎচিন্তার সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া ।(৭) সম্যক স্মৃতি(right mindfulness) হলো দেহ ও মনের অনিত্যতা সর্বদা স্মরণে রাখা এবং (৮) সম্যক সমাধি(right concentration) হলো অষ্টাঙ্গের শেষ মার্গ।যে ব্যক্তি পূর্বোক্ত সাতটি কর্মবিধি অনুসরণ করে সকল প্রকার অসদচিন্তা ও ভাবনা থেকে মনকে মুক্ত করে নিজের আচরণকে সংযত করে ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করতে পেরেছে,তিনিই সমাধির মাধ্যমে নির্বাণলাভে সক্ষম হন।
বুদ্ধদেব তত্ত্ববিদ্যার জটিল সমস্যার আলোচনায় বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ না করলেও তাঁর দার্শনিক তত্ত্ব (১) প্রতীতসমুৎপাদ নীতি,(২) কর্মবাদ,(৩) অনিত্যবাদ ও (৪) নৈরাত্মবাদ- এই তত্ত্বগুলির উপর প্রতিষ্ঠিত।
(১)প্রতীত্যসমুৎপাদঃ নীতির অর্থ হলো যা কিছু আছে তা কারণ-পরম্পরা থেকে উদ্ভূত এবং যা ঘটে তা কোন পূর্ববর্তী কারণের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ,জগতের কোনো পরিণতি কারণ (final cause) নেই।এই নীতি অনুসারে এমন কোন শাশ্বত সত্তা নেই যা কারণ-নির্ভর না হয়ে অনন্তকাল ধরে বিরাজ করতে পারে।
(২) কর্মবাদঃ হলো প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্বের এক বিশেষ রুপ।এই সূত্র অনুসারে প্রতিটি মানুষকেই তার কৃতকর্মের ফল অবশ্যই ভোগ করতে হবে।যে যেমন কর্ম করবে তাকে তেমনই ফল ভোগ করতে হবে।কর্মের এই সূত্রটি অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম থেকে বহু প্রাচীন।কর্ম দুই প্রকারের,সকাম ও নিষ্কাম।নিষ্কাম কর্মের কোন কর্মফল ভোগ নেই ।
(৩) অনিত্যবাদঃ (ক্ষণিকত্ববাদ) অর্থ হলো সব কিছুই অনিত্য।কোন কিছুই চিরস্থায়ী বা শাশ্বত নয়।এই অনিত্যবাদ প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি থেকে উদ্ভূত।পরবর্তী বৌদ্ধ দার্শনিকেরা (অর্থাৎ সৌত্রান্তিক ও বৈভাষিকেরা ) বুদ্ধদেবের অনিত্যবাদকেই ক্ষণিকত্ববাদে রুপান্তরিত করেন।এই মত অনুসারে প্রতিটি বস্তুই একটি মাত্র ক্ষণের জন্য স্থায়ী হয়।
(৪) নৈরাত্মবাদঃবুদ্ধদেব কোন শাশ্বত বা চিরন্তন আত্মার স্বীকার করেননা।সমস্ত কিছু অনিত্য হওয়ায় চিরন্তন আত্মার কোন অস্তিত্ব নেই। আত্মা হলো মানসিক প্রক্রিয়ার অবিরাম ধারা বা প্রবাহ।বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে জন্মান্তরের অর্থ হলো বর্তমান জীবন থেকে পরবর্তী জীবনের উদ্ভব।জীব হলো মানসিক প্রক্রিয়ার প্রবাহ এবং এই মানসিক প্রক্রিয়াই এক জন্ম থেকে অন্য জন্মে প্রবাহিত হয়।
বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বরের কোন স্থান নেই।পরিণতির কারণ রুপে (final cause) কোনো জগৎ কর্তার অস্তিত্ব নেই।কারণ পরিণতি কারণ বলে কিছুই নেই।কর্মবাদ ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় প্রতিপন্ন করেছে।বৌদ্ধদের মতে কর্ম থেকে বড় কিছুই হতে পারেনা।
বুদ্ধদেব জীবিত থাকাকালীন তাঁর শিষ্যরা দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা থেকে বিরত থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পরে বৌদ্ধদর্শন চারটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে।সেই চারটি সম্প্রদায় হলো-
(১) মাধ্যমিক বা শূন্যবাদ দর্শনঃ এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হলেন নাগার্জুন ।এই মতবাদ অনুসারে বাহ্যবস্তু বা মানসিক প্রক্রিয়া সবই শূন্য।চেতনা বা অচেতন কোনো কিছুরই বাস্তব সত্ত্বা নেই।এই মতবাদ তাই শূন্যবাদ(Nihilism) নামে পরিচিত।
(২)যোগাচার দর্শনঃ এই সম্প্রদায়ের সমর্থক হলেন অসঙ্গ বসুবন্ধু মৈত্রেয়নাথ,দিঙনাগ প্রভৃতি দার্শনিকেরা।এই মত অনুসারে জড় বস্তুর সত্ত্বা নেই,কিন্তু চেতনার সত্ত্বা আছে।চেতনাই একমাত্র সত্য যার অস্তিত্ব কখনোই অস্বীকার করা যায়না।অচেতন বিশ্বব্রক্ষ্মান্ড অসত্য।এই কারণেই এই সম্প্রদায়কে বিজ্ঞানবাদ বলা হয়।
(৩) সৌত্রান্তিক দর্শনঃ তক্ষশিলার কুমারলব্ধকেই এই দার্শনিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়।সৌত্রান্তিকরা সর্বাস্তিবাদী।এই সম্প্রদায় জড়বস্তু ও মন উভয়েরই পৃথক সত্ত্বা স্বীকার করেন।বস্তুর প্রত্যক্ষ বা সাক্ষাৎ জ্ঞান সম্ভব নয়।বস্তু আমাদের মনেযে ধারণার সৃষ্টি করে আমরা কেবলমাত্র সেই ধারণাগুলি সম্পর্কেই জ্ঞান অর্জন করে থাকি'এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই অনুমানের মাধ্যমে আমরা বস্তুর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত হই।অর্থাৎ,বহির্জগতের বস্তুগুলির জ্ঞান প্রত্যক্ষ নয়,অনুমানের উপর ভিত্তি করেই অর্জন করা সম্ভব।বস্তুর অস্তিত্ব অনুমানলব্দ হলেও বস্তুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায়না।এই মতবাদ বাহ্যানুমেয়বাদ নামেও পরিচিত।
(৪)বৈভাষিক দর্শনঃ বৌদ্ধগ্রন্থ অভিধম্মের উপর বিভাষা নামে একটি ভাষ্য রচিত হয়েছিলো।এই বিভাষা অনুসরণ করে বৈভাষিকরা এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তাঁরা জড়জগৎ ও মনোজগৎ উভয়েরই স্বতন্ত্র সত্বা স্বীকার করেন।তাঁদের মতে বস্তুর অস্তিত্ব অনুমানের সাহায্যে জানা যায়না।আমরা বস্তুকে সাক্ষাৎভাবে প্রত্যক্ষ করে থাকি।অর্থাৎ,বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ কেবলমাত্র সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষণের মাধ্যমেই সম্ভবপর।চেতনা-বহির্ভূত বস্তুর নিজস্ব সত্ত্বা আছে এবং সোজাসুজি তাকে প্রত্যক্ষ করা যায়।বৈভাষিকদের তাই বাহ্যপ্রত্যক্ষবাদী বলা হয়ে থাকে।
হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়
বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রাচীনপন্থী ও নবীনপন্থী - এই দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়।প্রাচীনপন্থীরা বুদ্ধদেবের নীতি ও আদর্শকে সামান্যতম পরিবর্তিত করতে রাজী নন।এদের হীনযান সম্প্রদায় বলা হয়। নবীনপন্থীরা ছিলেন বুদ্ধদেবের নীতি ও আদর্শের পরিবর্তনের পক্ষপাতী।এদের মহাযান সম্প্রদায় বলা হয় ।হীনযান বৌদ্ধরা বুদ্ধের ধর্মোপদেশ,নীতি ও আদর্শকে যথাযত অনুসরণের পক্ষপাতী।তাঁদের মতে নির্বাণের উদ্দেশ্য হলো আত্মমুক্তি যা প্রতিটি বস্তুর লক্ষ্য।এই নির্বাণের জন্য অপরের মুখাপেক্ষী হওয়া উচিত নয়। অপরদিকে মহাযান সম্প্রদায়ের মতে আত্মমুক্তির আদর্শটি স্বার্থদুষ্ট।নির্বাণের প্রকৃত লক্ষ্য আত্মমুক্তি নয়,পরম জ্ঞান লাভ করা।এই লব্ধ পরম জ্ঞান ও ভালোবাসার সাহায্য বিশ্বের দুঃখ-দুর্দশাক্লিষ্ট মানুষের দুঃখ দূর করে তাদের মোক্ষলাভে সহায়তা করাই হলো নির্বাণের উদ্দেশ্য।
বৌদ্ধ নীতিতত্ত্ব(The Bauddha Ethics)
বুদ্ধদেব দার্শনিক বা তত্ত্বজ্ঞ ছিলেন না।তিনি ছিলেন নীতিতত্ত্বের প্রচারক।তিনি দুঃখ ও দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কে চারটি সত্যের সন্ধান দিয়েছেন।এই চারটি সত্য 'চত্বারি আর্য সত্যানি' বা চারটি আর্য সত্য নামে পরিচিত।এই চারটি সত্য হলঃ (১) দুঃখ বা এ জীবন দুঃখময়, (২) দুঃখের উদ্ভবের কারণ আছে, (৩) দুঃখনিরোধ বা দুঃখের নিবৃত্তি আছে এবং (৪) দুঃখনিরোধ্মার্গ বা দুঃখনিরোধের যথাযথ উপায় আছে।দুঃখনিরোধের পথ অনুসরণ করে দুঃখ থেকে চিরমুক্তি লাভ সম্ভব হয়।এই পথই বৌদ্ধ দর্শনে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ( Eight fold Noble Path) নামে পরিচিত।এই অষ্টাঙ্গিক মার্গই মধ্যপথ,যেহেতু এই পথ অসংযত ভোগবিলাস ও শারীরিক কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যবর্তী পন্থা।বস্তুত এই অষ্টাঙ্গিক মার্গের মধ্যেই বৌদ্ধ নীতিতত্ত্ব নিহিত রয়েছে।এই আটটি মার্গ হলোঃ (১) সম্যক দৃষ্টি (right views),(২) সম্যক সংকল্প (right determination), (৩)সম্যক বাক্য ( right speech),(৪) সম্যক কর্ম বা সম্যক আচরণ(right conduct) , (৫) সম্যক জীবিকা(right livelihood,(৬) সম্যক ব্যয়াম(right effort,(৭) সম্যক স্মৃতি(right mindfulness),(৮) সম্যক সমাধি(right concentration) ।
বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষা ও নীতিতত্ত্ব কতকগুলি দার্শনিক তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত।তত্ত্বগুলি হলো (১)প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি,(২) কর্মবাদ,(৩) অনিত্যবাদ,(৪) নৈরাত্মবাদ।(১)প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি অনুসারে এমন কোন শাশ্বত সত্তা নেই যা কারণ-নির্ভর না হয়ে অনন্তকাল ধরে বিরাজ করে।জগতের কোনো পরিণতি কারণ (final cause) নেই।(২)কর্মবাদ অনুসারে প্রতিটি মানুষকেই তার কৃতকর্মের ফল অবশ্যই ভোগ করতে হবে।যে যেমন কর্ম করবে তাকে তেমনই ফল ভোগ করতে হবে।(৩)অনিত্যবাদ অনুযায়ী সব কিছুই অনিত্য।কোন কিছুই চিরস্থায়ী বা শাশ্বত নয়। (৪)নৈরাত্মবাদ নীতি অনুযায়ী যেহেতু সমস্ত কিছু অনিত্য ও ক্ষণিক সেহেতু চিরন্তন আত্মার কোন অস্তিত্ব নেই। আত্মা হলো মানসিক প্রক্রিয়ার অবিরাম ধারা বা প্রবাহ।
বৌদ্ধদর্শন সমস্ত কামনা-বাসনাকে দমনের পক্ষপাতী বলে এই দর্শনকে কঠোর সাধনার দর্শন রুপে অবহিত করা হয়।কামনাই মানুষকে এই সংসারে জন্মগ্রহণ করতে বাধ্য করে।তৃষ্ণার বিলোপসাধন কেবলমাত্র কামনার ধবংসের মাধ্যমেই ঘটতে পারে। আর শুধুমাত্র বলিষ্ঠ ইচ্ছাশক্তির দ্বারাই কামনা দমন সম্ভবপর।কামনার দমন যদি কঠোর সাধনা হয়,তবে বৌদ্ধ দর্শনের নীতি হলো কঠোর সাধনা।
বৌদ্ধ জ্ঞানতত্ত্ব(The Bauddha Epistemology)
বৌদ্ধ দর্শনে প্রত্যক্ষ() ও অনুমান () উভয়কেই যথার্থ জ্ঞানের উৎস্রুপে স্বীকার করা হয়েছে।প্রত্যক্ষ্যের মাধ্যমে বস্তু সম্পর্কে তাৎক্ষণিক জ্ঞান অর্জিত হয়।প্রত্যক্ষ হলো বস্তুর স্বলক্ষণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক জ্ঞান।এই জ্ঞান জ্ঞাতাকে বস্তুটির প্রকৃত প্রাপ্তিতে সাহায্য করে।
কোনো বস্তুর জ্ঞান থেকে অপর কোনো বস্তুর জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি হলো অনুমান।অনুমান যথার্থ হয় তখনই যখন অনুমানের মাধ্যমে প্রকৃত বস্তুটির প্রকৃত প্রাপ্তি সম্ভব হয়।কোনো একটি বিষয়কে প্রত্যক্ষ করে সেই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে অপর একটি অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রক্রিয়াকে অনুমান বলে ।'অনু' শব্দের অর্থ পশ্চাৎ,আর 'মান' শব্দের অর্থ জ্ঞান।সুতরাং অনুমান হলো সেই জ্ঞান যা অন্য জ্ঞানকে অনুসরণ করে।যখন দুটি বস্তুর মধ্যে অপরিবর্তনীয় সহাবস্থানের সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি বস্তুর উপস্থিতি থেকে অপর বস্তুটির জ্ঞান অর্জন করা যায় তখন তাকে অনুমান বলা যায়।যেমন ধোঁয়া থাকলেই আগুন থাকে এই সম্পর্কের ভিত্তিকে ধোঁয়ার উপস্থিতি থেকে আগুনের উপস্থিতি অনুমান করা যায়।

No comments:
Post a Comment