Friday, August 14, 2020

পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি -তাতিন্দ্র লাল চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণ দীর্ঘদিন যাবত আন্দোলনে নিয়োজিত আছে। এই আন্দোলন কখনও নিয়মতান্ত্রিক কখনও অনিয়মতান্ত্রিক। এই আন্দোলনে একটি কথা প্রচলিত আছে- "আন্দোলন করে জনগণ,নেতৃত্ব দেয় পার্টি,আর পরিচালনা করে কর্মীবাহিনী।" আন্দোলনের শুরু থেকে জনগণের নেতৃত্বে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। প্রথমে ছিল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন - যাতে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সংসদের ভিতরে ও বাইরে আন্দলোন করতেন। কিন্তু ক্ষুদ্র জাতিগুলোর মধ্যেকার ঐক্যের অভাব এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূল না থাকার কারণে বিশেষতঃ বাংলাদেশে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শুরু হবার কারণে অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে মনোনিবেশ করতে হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ ২৫ বছর অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন তথা সশস্ত্র আন্দোলন চলতে থাকে। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেব ছাত্র নেতা শক্তিমান চাকমার সহযোগিতায় যোগাযোগের উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগ উভয় দলের মধ্যে পারস্পারিক বিশ্বাসের একটা ভিত্তি তৈরি করে। এই ভিত্তির উপর নির্ভর করে ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে যখন ব্যাপক আলোচনা চলছিল তখন জুম্ম জনগণের একটা মতামত ছিল - ব্যাপক সেটেলারদের উপস্থিতিতে জুম্ম জনগণের আত্মরক্ষার বিষয়টি কিভাবে নিষ্পত্তি হবে। এই মতামতটি ক্রমে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচিত হতে থাকে। তাই সেই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও তৎপরবর্তী পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্য কর্মী সম্মেলনের প্রস্তাব উত্থাপিত হতে থাকে। কিন্তু তখনকার নেতৃত্ব বিশেষতঃ সন্তু লারমা বরাবরই বলেছিলেন "সময় নেই"। অতএব অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি কি রকম হবে-তাঁর কলাকৌশলই বা কি রকম হবে সে বিষয়ে ব্যাপক কর্মী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা কিংবা সমালোচনা হতে পারেনি। জনসংহতি সমিতির উচ্চ পর্যায়ে অবশ্য সীমিত আকারে আলোচনা চলেছিল। সেই আলোচনার ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে গুটি কয়েক লোকের প্ররোচনায় জেএসএস নেতা সন্তু লারমা ঐ সিদ্ধান্ত থেকে সরে যান এবং বিকল্প কোন ব্যবস্থা ছাড়াই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী জেএসএস এর সমগ্র অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, অস্ত্র সমর্পণের বহু মাস আগে থেকে সরকারকে খুশি রাখার জন্য দলীয় চাঁদা সংগ্রহ না করার নির্দেশ দেন সন্তু লারমা। ফলে কর্মীবাহিনীর সদস্যরা সরকার প্রদত্ত ৫০ হাজার টাকা ব্যতীত এক প্রকার সহায় সম্বলহীনভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তাঁদের এই স্বাভাবিক জীবন অচিরেই অস্বাভাবিক জীবনে পরিণত হয়। একদিকে দলীয় কাজ ও রাজনৈতিক সাংগঠনিক কাজ চালাবার জন্য সন্তু লারমা কোন আর্থিক সহযোগিতা দিতে পারেননি তেমনি কোন দিক নির্দেশনাও দিতে পারেননি। কেন্দ্রীয় কমিটির এক বৈঠকে একটা সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে কেন্দ্রীয় কমিটি ২ ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করবে- তাঁদের এক ভাগ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে এবং তারাই আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য হিসেবে যোগ দেবে। আর বাদ বাকিরা সংগঠনের কাজ করবে। কিন্তু সংগঠনের কাজে প্রয়োজনীয় কোন তহবিল কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে ছিলনা। আঞ্চলিক পরিষদের উপর সন্তু লারমা এতটাই গুরুত্ব দেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান যেমন জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদিগুলোও গুরুত্ব দেননি। ফলে প্রথম থেকে আঞ্চলিক পরিষদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্যান্য সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এইসব লক্ষ্য করে যারা পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে পরিচিত ছিলেন তারা এইসব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেন। তন্মধ্যে তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পূর্ণ্মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমা এইসব ভুল ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেন এবং খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদটি জেএসএস এর লোক দিয়ে পুনর্গঠনের পরামর্শ দেন। কিন্তু সন্তু লারমা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আঞ্চলিক পরিষদকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে ঐ পরিষদে বাঙ্গালী সদস্যদেরও তিনি মনোনয়ন দিতে গিয়ে সরকারের সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত এই বিষয়টি সুরাহা হলেও সন্তু লারমা যে বাঙ্গালী সদস্যদের মনোনয়ন দিয়েছিলেন তারা পরবর্তীতে কোন কাজে সাহায্য করতে পারেনি। ফলতঃ সন্তু লারমা সরকারী কাজে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এইভাবে সন্তু লারমা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে নিজেকে দিশাহীন ও অসহায় করে ফেলেন।

অন্যদিকে চুক্তি বাস্তবায়নের পূর্বেকার পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক জুম্ম জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার করা ও জনমত সৃষ্টি করার কাজটি দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা মোটেই প্রতিপালন করেন নি। তারা তখনকার ছাত্র পরিষদের উপরেই নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু ছাত্র পরিষদের নেতারা রাজনৈতিক মতাদর্শে কতটা উচ্চভিলাষী তা তারা টের পাননি। ফলে ঐ ছাত্র পরিষদই পার্বত্য চুক্তি বিরোধীতা করার সুযোগ পায়। একদিকে সন্তু লারমা ও তাঁর দোসরেরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বিশেষতঃ খাগড়াছড়ি জেলাতে; অথচ চুক্তির সমগ্র আনুষাঙ্গিকতা শুরু হয়েছিল খাগড়াছড়িতে। এই অবস্থায় সরকার গেজেট প্রকাশের সময় চুক্তির বেশ কিছু অংশে হেরফের করে তখন নিয়মতান্ত্রিক কায়দায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেএসএস চরম বেকায়দায় পড়ে যায়। একদিকে প্রত্যাগত শান্তিবাহিনীর সদস্যরা নিয়মতান্ত্রিক বিষয়টিতে অনভিজ্ঞ ছিল অন্যদিকে সাধারণ জনগণ তথা ছাত্র সমাজ ছিল নির্লিপ্ত। স্থানীয় ব্যাপক জনগণের মধ্যেও চুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা ভুল ধারণাবশতঃ ঐ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলনা। প্রয়াত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বক্তব্য ছিল- "যাবতীয় বিচ্ছিন্নতার নীতির বিরোধীতা করা আর সম্ভাব্য সকল মিত্রদেরকে স্বপক্ষে টেনে আনার চেষ্টা করা"। কিন্তু সন্তু লারমা এই ক্ষেত্রে এই মতবাদ থেকে সম্পূর্ণ সরে গিয়ে- একাই সরকারের সাথে দ্বন্ধে জড়িয়েছেন।

তৎকালীন ছাত্র পরিষদ যারা বর্তমানে ইউপিডিএফ নামে পরিচিত তারা কিন্তু সশস্ত্র আন্দোলনে আহুত সত্ত্বেও যোগ দিতে সাহস করেন নি। তাঁদের একটা অংশ যারা সশস্ত্র আন্দোলন থেকে এসেছিলেন- যেমন পানছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান কুসুমপ্রিয় চাকমা- সন্তু লারমা ও ঊষাতন তালুকদারের আহবানে খাগড়াছড়িতে আলোচনা করতে আসেন। কিন্তু ফেরার পথেই তাঁদের আক্রমণ করা হয়। এই ঘটনা প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ ও জনসংহতি সমিতির সাথে মারাত্মক অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সন্তু লারমা সশস্ত্র আন্দোলন ত্যাগ করলেও সেই আন্দোলনের মেজাজ পরিবর্তন করতে পারেন নি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা্র সবচাইতে ক্ষুরধার সাংগঠনিক নীতি ছিল - শত্রুকে অধিকতর শত্রু না করে নিরপেক্ষ করা, নিরপেক্ষকে স্বপক্ষে টেনে আনার চেষ্টা করা আর সমর্থকদেরকে পার্টির আশা আকাঙ্খার প্রতীক করা--কিন্তু সন্তু লারমা তাঁর বিপরীতটাই করে দেখালেন। ফলে যারা নিরপেক্ষ ছিলেন তারাও ভয়ে শত্রুর শিবিরে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করেন। এইভাবে ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিপক্ষ দল ভারি হতে থাকে।

এইভাবে পার্বত্য চুক্তির বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হলো ইউপিডিএফ। চুক্তির পক্ষে সন্তু লারমা নিজে কিছুটা নিরাপত্তা পেলেও ব্যাপক কর্মীবাহিনী বিশেষতঃ যারা গ্রামাঞ্চলে অবস্থান করে থাকে তারা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়লো। এই নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে উঠার জন্য কর্মীরা নানা উপায় খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে চুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষ অমীমাংসেয় বিরোধে জড়িয়ে পড়ল। এই সুযোগ সরকারের চুক্তি বিরোধী অংশটি কাজে লাগাতে থাকে । কিন্তু সন্তু লারমা  সংগঠন কৌশলী না হয়ে পুরানো সশস্ত্র আন্দোলনের মন মেজাজে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়ে উঠেন। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের চাইতে চুক্তি বিরোধী দমনের কর্মসূচীর মাধ্যমে বেআইনি কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়তে থাকেন।

অপরদিকে ইউপিডিএফ শুরুতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দলনের কথা বললেও সন্তু লারমার সাথে বিরোধের কারণে তাঁদের আত্মরক্ষার বিষয়টিতে বেশী মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়। এই আত্মরক্ষার তাগিদে বেআইনি সরঞ্জাম সংগ্রহ,ব্যবহার ও কর্মযজ্ঞ যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে ততই অনিয়মতান্ত্রিক পথে হাঁটতে বাধ্য হয় যদিও তাঁদের এ বিষয়ে পূর্বে কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা। এর সাথে সাথে দলীয় প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য এবং দলীয় তহবিল শক্তিশালী করতে বেআইনি কাজে বেশী মনোযোগ দিতে হয়েছে। এই মাত্রাটা বর্তমানে এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে এই ইউপিডিএফ পার্টিতে সাধারণ কর্মী থেকে নেতা সবাই বেআইনি কায়দায় চলাফেরা করতে করতে এবং নিজেদের বিপ্লবীপনা জাহির করতে করতে রাষ্ট্রের চোখে বেআইনি হয়ে পড়ে এবং তারা বর্তমানে শতভাগ অনিয়মতান্ত্রিক পথের পথিক। এই অবস্থা থেকে ফিরে আসা তাঁদের পক্ষে আর সহজ নয়। তেমনিভাবে সন্তু লারমারও বেআইনি কার্যকলাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়নি। বিশেষতঃ তহবিল সংগ্রহকারীদের ক্ষমতার অপব্যবহারে সরকারী দল আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের উপর চড়াও হওয়াতে মামলা ও আইনি মারপ্যাঁচে অনিয়মতান্ত্রিক পথেই হাঁটতে বাধ্য হয়েছে।

সন্তু লারমার এই অনিয়মতান্ত্রিক পন্থা পদ্ধতির সংশোধনের চেষ্টা খুব একটা চোখে পড়েনা। বরঞ্চ সশস্ত্র আন্দোলনের হুমকি শোনা যায়। কিন্তু অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি তথা সশস্ত্র আন্দোলন কি সময়োপযোগী? অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় - সারা বিশ্বে আন্দোলনের জোয়ার থাকলেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোরও সেই সুযোগ নেয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এখন সারা বিশ্বে যেমন সেই পরিস্থিতি নেই, খোদ বাংলাদেশেও সেই পরিস্থিতি নেই। আর জুম্ম জনগণ এই মুহূর্তে সেই আন্দোলনে যেতে প্রস্তুত কিনা তা না ভেবে উপায় নেই কারণ আন্দোলনকারীদের এ কথা ভুললে চলবেনা যে এই আন্দোলনে মজুদ বাহিনী স্বতঃস্ফুর্তভাবে সামিল হতে প্রস্তুত কিনা। এই মজুদ বাহিনীকে প্রস্তুত না করে মনগড়াভাবে শুধুমাত্র অগ্রগামী বাহিনীকে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়াটা আগুনে ঠেলে দেওয়ার মতই বিপজ্জনক হবে। এছাড়াও অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ ব্যবস্থাসহ পশ্চাৎ এলাকা আছে কিনা তাঁর হিসাবে কোনরকম ভুল থাকলে আখেরে বিপদ অনিবার্য্য হয়ে দাঁড়াবে। যদিও দুই বিপরিত ধর্মী ( জেএসএস ও ইউপিডিএফ) পার্টি তারা একযোগে কাজ করবে বলে তারা নিজেরা ঘোষণা দেয় তথাপি আশু লক্ষ্য নিয়ে ভাবলে ( আপামার জনগণ যেটা জানে) -একদল চায় চুক্তি বাস্তবায়ন অন্যদল করে চুক্তির বিরোধীতা। এই অবস্থায় তারা একযোগে কতটা কাজ করতে পারবে- সেই প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া দরকার। এতদিন যাবত একে অপরকে মূখ্য শত্রু হিসেবে ভেবে এসেছে সেখানে হঠাৎ করে এই ঐক্য কতটা মজবুত ঐক্য হবে তা মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতিটা এমন যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোর মধ্যে ভাষাগত ভিন্নতা যেমনি আছে তেমনি তাঁদের আছে জাত্যাভিমান। এই জাত্যাভিমান সহ্য করে সকল জাতিগুলোকে কি পরিমাণ সহনশীল হয়ে সাংগঠনিক কাজে পারদর্শী হতে হবে তা ভাবলে দেখা যায় উভয় রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা হয়না। উভয় দল এক ব্যক্তির কর্তৃত্বে এ যাবত চলে আসছে। ইতিমধ্যে মারমা লিবারেশন পার্টির সাথে সন্তু দলের মারনাস্ত্রের ব্যবহার সকল মহলকে হতবাক করে দিয়েছে। ভূ-প্রকৃতিটাও এমন যে প্রায় ৪ ভাগের ৩ ভাগ সীমান্ত আছে ভারত, একদিকে বাংলাদেশ - এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেই সময়ে ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আগের চাইতে ঐতিহাসিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই আগের সশস্ত্র আন্দোলনের যে বৈশিষ্ট্য ছিল তাও কি বজায় আছে? প্রকৃতির এই অবস্থাকে কারোর ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় বদলানো যায়না। অতএব আমাদের সামনে উপস্থিত গতি ও প্রকৃতিকে অস্বীকার করে কেউ যদি মনগড়াভাবে অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ডাক দিলে তাঁর বিপদ যে অনিবার্য তা জুম্ম জনগণ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জানে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতিও আগের মত আর নেই। আগে ছিল প্রকৃতি অঢেল সম্পদ। সেই সম্পদ ভোগ করতে না ছিল প্রতিবন্ধকতা না ছিল প্রতিদ্বন্ধিতা। কিন্তু এখন আর অবাধভাবে বিচরণ করা সম্ভব নয়। প্রকৃতির উদারতা এখন আর নেই। সেই প্রকৃতি এখন ক্ষত-বিক্ষত। তাই এখন বাঁশ কাট্টন,গাছ কাট্টনের কথা বাদ দিয়ে জুম্ম জনগণকে ছুটতে হচ্ছে শহরের দিকে। সেই শহরে শ্রমিকের নতুন জীবনে নতুন পেশায় মানুষকে চরম প্রতিদ্বন্ধিতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এইভাবে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি -বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন সংগ্রামের ধরণ। সেই প্রকৃতির বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যা জুম্ম জনগণের জন্য খতরনাক হতে পারে।

প্রকৃতির পাহাড়ী নদীর দুর্বার গতি এখন আর নেই। কারণ সেই স্রোতধারা বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জুম্ম জনগণের বেঁচে থাকার অধিকারা যারা চায় তাদেরকে অবশ্যই বহুধা বিভক্তি কাটিয়ে একই স্রোত সৃষ্টি করতে হবে। নইলে আন্দোলনের গতি কখনই আগের মত দুর্বার দুর্জয় হতে পারবেনা।

[বিদ্রঃ এই লেখাটি সদ্য প্রয়াত পিসিজেএসএস(এমএনলারমা) এর সভাপতি শ্রী তাতিন্দ্র লাল চাকমার বইয়ে ছাপানো শেষ প্রবন্ধ। উক্ত লেখাটি ১০ই নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১৯,প্রবাহণ নামক বইয়ে ছাপানো হয়েছে (বইয়ের ২৫-৩০ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)]