Friday, March 27, 2020

অপরাধী

কালের যাত্রাধ্বনি শুনিতে কি পাও?
বিবর্ণ মরুভূমি হয়ে গেছে আজ, সবুজে ভরা প্রান্তর;
যেখানে স্বর্গের অমৃত খেলা করিত একদা,
সেখানে আজ খেলা করে লাল লাল তরল পানীয়!
জননীর বুকপাটা কান্না পৌঁছায় কি কানে?
ধুঁকে ধুঁকে মরছে জননীর সন্তানেরা;
চিৎকার করে কাঁদিতে পারেনা তারা,
নীরবে অশ্রুজলে ভীজায় অঙ্গ চারিপাশ।
একগাদা ইতিহাস জমাতে জমাতে লিখা হয়ে উঠেনা কাব্য ভাষায়,
হৃদয় ইতিহাস পরিপূর্ণ হয়ে চূর্ণ করে ছড়িয়ে পড়ে চোখের নোনাজলে।
ইতিহাস হবার প্রত্যয়ে যারা জননীর তরে
জীবনো দিয়েছিল বলি,
তুমি কি নিজেরে ভাবনা অপরাধী
দিয়েও তাদের জীবনকে বৃথায় জলাঞ্জলী?
২৭ মার্চ ২০২০

Wednesday, March 25, 2020

যে শহর 'বাড়ি' দেয়না,মাটিও দেয়না- নবনীতা চৌধুরী

প্রথম আলো,২৫ মার্চ ২০২০,অনলাইন প্রিন্ট।

করোনারভাইরাসের কারণে ঢাকা ছাড়তে মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণায় সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড়। গতকাল সকালে।  ছবি: সাজিদ হোসেনকরোনারভাইরাসের কারণে ঢাকা ছাড়তে মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণায় সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড়। গতকাল সকালে। ছবি: সাজিদ হোসেন


সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে ৫ দিনের, স্বাধীনতা দিবসের ছুটি, শুক্র–শনিবার মিলিয়ে মোট ১০ দিনের বিরতি। ছুটি মানেই এই দেশে ‘বাড়ি’ যাওয়া। হয়েছেও তাই, সোমবার বিকেল থেকে বাসস্ট্যান্ডে, ট্রেন টার্মিনালে উপচে পড়া ভিড়। সেসব ছবি ভাইরাল। আর রাত না হতেই ট্রেনের বগিতে দাঁড়িয়ে বসে শত শত মানুষের যাত্রার ভিডিও, যেখানে নিরাপদ দূরত্ব তিন ফুট তো নেই-ই, একেক যাত্রীর মুখ থেকে আরেক যাত্রীর মুখের দূরত্ব তিন ইঞ্চিও হবে না কিছুতেই। আমরা দেখলাম এক তরুণ যাত্রী ভিডিও করে বগির ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী’ অবস্থা দেখাচ্ছেন আর তিনি আর তাঁর সহযাত্রীরা মিলে করোনার ভয় নিয়ে হাসিঠাট্টা করছেন। ওই ভিডিও আর পরদিন ফেরিবোঝাই মানুষের ছবি দেশের মানুষের ‘অসচেতনতা, ‘বোকামো’ ‘বিপদ না বুঝে হলিডে যাওয়া’র জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারে হাজারে শেয়ার হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার যথেষ্ট কিট নেই, হাসপাতালে বেড নেই, আইসিইউ নেই, ডাক্তারদের নিরাপত্তা পোশাক (পিপিই) নেই। করোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোনো দেশই পারছে না। লন্ডনে সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই ডাক্তার বন্ধু চিকিৎসা দিচ্ছেন, যথেষ্ট ভেন্টিলেটর নেই, তাই যাদের বাঁচার সম্ভাবনা বেশি মানে, তরুণতরদেরই বাছাই করে নিতে হচ্ছে অনেক সময়। পরীক্ষা ব্যবস্থার অভাব সব দেশে। আমেরিকাতে শুধু পরীক্ষা করার সুবিধা অপ্রতুল তাই নয়, দোকানে সাবান, মাস্ক, স্যানিটাইজার নেই, আবার স্কুল বন্ধের সঙ্গে স্কুলের দেওয়া খাবারও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক দরিদ্র পরিবারে শিশুদের অভুক্ত থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এমন অবস্থায়, পরীক্ষার কিট আবিষ্কার নিয়ে দেশে দেশে কথা, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের লক্ষ্যে অবিরাম প্রচেষ্টা, অন্য কোনো রোগের ওষুধ করোনায় কাজ করে কি না, তা নিয়ে অব্যাহত নিরীক্ষার মধ্যে এক বিষয়ে সবাই এখন একমত যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে লকডাউনে যাওয়া, অর্থাৎ সবাই মিলে যে যার বাসায় ঢুকে পড়ে, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার গতি কমিয়ে আনাই আপাতত সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। সংক্রমণের চক্র ভেঙে দিয়ে নিজে বাঁচা, নিজের পরিবার, সমাজকে বাঁচানোই একমাত্র লক্ষ্য। বিষয়টা তাই ভয়াবহ যে সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র ৪০০–এর মতো আইসিইউ–সুবিধা (সব কটির ভেন্টিলেটর কার্যকর কি না আমি জানি না) আর সর্বোচ্চ জনঘনত্বের ১৭ কোটির দেশে লাখখানেক ডাক্তার নিয়ে আমরা এখনো লকডাউনে যেতে পারিনি।

কিন্তু আমার তবু কেন জানি হাসি আসে না বা রাগ হয় না ভিডিওতে গাদাগাদি করে ‘বাড়ি’ যেতে থাকা ট্রেনযাত্রীদের ভিডিও দেখে। আমার মনে হয়, ভিডিওকারী যাত্রীও আসলে দম বন্ধ হয়ে আসা ভয় ঠেকাতেই ঠাট্টার সুরে করোনাকে তাচ্ছিল্য করছেন। গত কয়েক দিনে যেসব তরুণ–তরুণী ভাবছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ, টিউশনি বন্ধ, কী খেয়ে কোথায় থাকবেন তাঁরা, ওঁরা আছেন ওই ভিড়ে। যে মেয়েটি এই শহরে একা থাকে, বিরান শহরে ফ্ল্যাট বাড়িতে অতি আগ্রহী দারোয়ান আর প্রতিবেশীর সঙ্গে থেকে যাওয়া কি ঠিক হতো তাঁর?

কিংবা পরিচিত ইলেকট্রিশিয়ান মোস্তফা, কয়েক দিন আগে যে স্মার্টফোন কিনে এনে দেখাল, মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করার আনন্দে যে গত মাসের শুরুতেও টগবগ করছিল? তাঁর হাতে কাজ নেই এরই মধ্যে ১০ দিন হতে চলল। কেউ বাড়িতে ঢোকাতে চায় না, আগামী কয় সপ্তাহ, কয় মাস এমন চলবে মোস্তফা জানেন না। তাই কাউকে কিছু না বলে ছোট্ট মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে চুপেচাপে রওনা হয়ে মুন্সিগঞ্জের বাড়ি পৌঁছে আমাকে ফোন করেন মোস্তফা। বলেন, বাড়িতে অন্তত খাওয়ার টেনশন নেই, সব ঠিক না হলে আর ঢাকা ফিরবেন না, কারণ বাড়িভাড়া দেবেন কীভাবে!

মুদি দোকানদার মোতালেব সাহেব স্কুল ছুটির পরেই একবার গিয়ে বউ–বাচ্চা গ্রামে রেখে আবার ফিরেছেন ঢাকায়। স্কুল–কলেজ ছুটি দিয়ে দেওয়ায় লঞ্চে ভিড় ছিল ঈদের সময়ের মতো। নিজের দোকানেই দেখেছেন মাল আসতে না আসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে, করোনা ছড়িয়ে পড়লে বাড়িতে তিন তিনটি বাড়ন্ত বাচ্চা নিয়ে স্বামী–স্ত্রী কী করবেন? তাই জানতেন ভিড় ঝুঁকিপূর্ণ, তবু ওদের দিয়ে এসেছেন গ্রামেই। পাড়ায় বিক্রি এত কমেছে যে পরশুদিন দোকানের দুই সহযোগীকে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করেছেন, তারাও ‘বাড়ি’ গেছে।

বাড়ির ছুটা বুয়াদের আমরা অনেকেই এ মাসের বেতন পুরো দিয়ে বলেছি আবার ফোন করলে আসতে। আগামী মাসে তাঁর চলবে কী করে? ড্রাইভারকে আগামী মাসের বেতনটা, স্কুল অফিস বন্ধে বাসা থেকে গাড়ি না বের করলেও, দেব তো আমরা? ঢাকা শহরে একেক ঘরে ৪ জন ৫ জন করে থাকেন এঁরা, বস্তির বাইরেও নিম্ন আয়ের মানুষের বাড়ি মানেই অন্তত তিন-চার পরিবার অথবা ৮-১০ জনের এক টয়লেট। এখানে কোনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবেন তাঁরা? তাই তাঁরা শহর ছেড়েছেন, ছাড়ছেন। এ পোড়ার শহরে কাজ আর রোজগার ছাড়া আর তো কোনো আরাম–আয়েশের ব্যবস্থা নেই এর ২ কোটির বেশি বাসিন্দার জন্য। এমনতো নয়, এখানে সবাই হোম কোয়ারেন্টিনে থাকলে ঘরে ঘরে খাবার ওষুধ পৌঁছে যাবে, রাজধানী শহর বলে উন্নত চিকিৎসা মিলবে!

এ জন্যই কি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেমন তাৎক্ষণিক কার্যকর বাধ্যতামূলক ঘরে থাকা আদেশ জারি করলেন, আমাদের সরকার কিছু সময় দিল? মঙ্গলবার রাত থেকে অবশ্য যাত্রীবাহী ট্রেন, নৌযান আর বুধবার থেকে বাস চলাচল বন্ধ হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাধারণ ছুটির ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত করেন যে করোনাভাইরাসের কারণে নিম্ন আয়ের কোনো ব্যক্তি শহরে জীবনযাপনে অক্ষম হলে সরকার তাঁকে ঘরে ফেরা কর্মসূচির অধীনে নিজ গ্রাম বা ঘরে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ভাসানচর, হতদরিদ্র গোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ারও ঘোষণা এসেছে। তার মানে এ আবার এমন এক দেশ আর বিশেষত এমন এক শহর যে নদী ভেঙে বা ঝড়ে সব হারানো এমন পরিবারও তো আছে লাখে লাখে, যাদের যাওয়ার মতো ‘বাড়ি’ও নেই। ভাবতে হচ্ছে তাদের কথাও। এত দশকেও সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা কিংবা সুরক্ষার বলয় কীভাবে শহরের নিম্ন আয়ের ছিন্নমূল মানুষ পর্যন্ত টেকসইভাবে বিস্তৃত করা যায় তাও তো আমরা বের করতে পারিনি। কাজেই এবার তাদের করোনার চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও গ্রামে গিয়ে খেয়ে বাঁচার ব্যবস্থা অন্তত করা গেল! ঠিক সেই ভরসাতেই কিন্তু দিন এনে দিন খাওয়া প্রবাসীরাও ফিরেছেন দলে দলে।

আর দুই–আড়াই কোটি মানুষের এই শহরে আসলে কতজনের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে? আছে কয়জনকে মাটি দেওয়ার সক্ষমতা? এসব আমরা বিচার করেছি কখনো? দেশ মধ্য আয়ের হলো, তবু কেন সামান্য কাশির কারণ অনুসন্ধানেও জমি বাড়ি বেচে আর কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য না থাকলে মানুষ কলকাতা যাচ্ছেন, কলকাতার হাসপাতালে আলাদা বাংলাদেশ ডেস্ক খোলা হচ্ছে, আমরা ভেবে দেখেছি? এ কি শুধুই সক্ষমতার বিলাসিতা, নাকি প্রতি ১ হাজার ৭০০ জন রোগীর জন্য একজনেরও কম ডাক্তার থাকার অক্ষমতার উদাহরণ?

এবার হয়েছে মজা! গুরুতর অসুখবিসুখ করলে নিশ্চিতভাবে আমরা যারা ধারদেনা করে হলেও সিঙ্গাপুর–ব্যাংকক যাব ঠিক করে রেখেছিলাম তারা, যাঁরা রাজপ্রাসাদ থেকে সরাসরি এয়ারলিফটেড হয়ে পৌঁছে যাবেন ভেবেছিলেন মাউন্ট এলিজাবেথে তাঁরা এবং যাঁরা কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি বানিয়ে দেশে ছিলেন একে ছিঁবড়ে বানিয়ে আরও টাকা বের করে নিয়ে যেতে, তারা সবাই এই ঘোরতর অনিশ্চয়তার যাত্রায় এক কাতারে শামিল হয়েছি।

আর ঢাকার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার যাত্রায় কিছুমাত্র অগ্রসর না হয়ে আমরা যারা ঢাকাকে সিঙ্গাপুর লন্ডনের সঙ্গে তুলনা করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছিলাম, তারা জলাবদ্ধতা, যানজটের পর এবার সংক্রমণ, অসুখ, মৃত্যু আর কবরও বোধ হয় ছড়িয়ে দিলাম ছোট ছোট শহর থেকে গ্রামে গ্রামে। তবু ভালো, গ্রামে তবু ঘর আছে, জমিতে ধান আছে, ভাগ করে নিয়ে খাওয়ার প্রিয়জন আছে, আছে মাটি দেওয়ার জমিও। এবার ঘরে পৌঁছে অন্তত যে যার ঘরে থাকি আর প্রার্থনা করি। সামনে লম্বা পথ। টিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে আমাদের।

নবনীতা চৌধুরী: একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত

Tuesday, March 24, 2020

কলমপতি গণহত্যাঃ কী ঘটেছিলো ১৯৮০'র ২৫ মার্চে

লেখাঃহিল ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম।
  ছবিঃকুঙ থাঙ

                 
খাগড়াছড়ি সদরের শাপলা চত্বর থেকে গোলাবাড়ি যাওয়ার পথের নাম শহীদ কাদের সড়ক। ১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন কাদের মহালছড়িতে মারা যান ভারতের বিদ্রোহী মিজোদের সাথে সম্মুখ সমরে। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে এই রোডের নামকরণ করা হয়।
এই ছোট্ট ইতিহাস থেকে আরো অনেক বড় ইতিহাস উঠে আসে যে ইতিহাস পাহাড়ের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে এবং সেই সাথে পাহাড়িদের উপর অত্যাচারের একটি ধারাও সবার কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার ভারতের বিদ্রোহী মিজোদের মদদ দেয় ছায়াযুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধের অংশ হিসেবে। স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে মিজোরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান করতো এবং সীমান্তের ওপারে বিদ্রোহ চালিয়ে যাবার জন্য পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহ করা হতো নিয়মিত। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মিত্র ভারতকে খুশি করতে মুক্তিবাহিনী বা মুজিববাহিনীকে প্রায়ই লড়াই করতে হতো মিজোদের সাথে। এমন একটি যুদ্ধে ক্যাপ্টেন কাদের মারা যান।
ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা কোন একটি দেশ বা স্থানের আদি বাসিন্দাদের উপর নিপীড়ন বা নির্যাতনের ইতিহাস ছোট্ট নয়। আমরা আদিবাসী আমেরিকানদের কথা জানি, এছাড়া কানাডার আদিবাসীদের উপর চালানো “সাংস্কৃতিক গণহত্যা” বা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের “স্টোলেন জেনারেশন” সবই এই নিপীড়ন-নির্যাতনের ইতিহাসকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের আদিবাসী অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামও তাই কখনো নিপীড়নের বাইরে থাকে নি। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে কাপ্তাই বাঁধের কারণে ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে নিমজ্জিত করে বড় একটি আদিবাসী অংশকে তাদের জীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এর সাথে মিজোরা পাবর্ত্য অঞ্চলে বাস করতো তাই মিজোদের সাথে সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সমগ্র বাসিন্দাদের প্রতি বিরূপভাব প্রদর্শনের সুযোগ পেয়ে যায় স্বাধীন দেশের সরকার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানের প্রতি পক্ষাবলম্বন আদিবাসীদের উপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের পথকে আরো প্রশস্ত করেছে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই, মং সার্কেলের অধীনস্ত এলাকাগুলোতে বিজয় লাভের পরমূহুর্তে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক আদিবাসী পাহাড়িদের গুলি করে হত্যা, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া সহ অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা।
বাংলাদেশের জন্মের পর দেশে গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হলেও নিপীড়ন বন্ধ থাকে নি। মুক্তিযুদ্ধ স্বপক্ষের জাতিয়তাবাদ আধিপত্যবাদে রূপ লাভ করে যা ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্যে প্রকাশিত হয়। পাহাড়ের নেতা এম.এন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত দাবিনামা নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি দাবিনামা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন “বাঙালি হয়ে যাও, নিজেদের আত্মপরিচয় ভুলে যাও”। ১৯৭৩ সালে রাঙামাটি স্টেডিয়ামে শেখ মুজিব এক ভাষণে বলেছিলেন, এদেশে অন্য কোন জাতি নাই, সবাই বাঙালি।
রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য সেদিনই ঠিক করে দিয়েছিল পাহাড়ের ভবিষ্যতকে। ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠনের পিছনে রাষ্ট্রীয় নীতির যথেষ্ট কারণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শেখ মণির রক্ষীবাহিনী পাহাড়িদের উপর যথেষ্ট হামলা-লুটপাট চালায়। এর বিপরীতে নিজেদের রক্ষার জন্য জনসংহতি সমিতি (যা ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল) প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে যা পরবর্তীতে শান্তিবাহিনী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শান্তিবাহিনী নামটিই নির্দেশ করে, তাদের উদ্দেশ্য অত্যাচার প্রতিরোধ করা এবং এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনসংহতি সমিতি ও তার শাখা সংগঠন শান্তিবাহিনীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে বাধ্য হন এর নেতারা। এরপর শান্তিবাহিনী অধিকার আদায়ের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নীতি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। ১৯৭৯ সালে ৪০ হাজার সমতলের বাঙালি পরিবারকে পাহাড়িদের যৌথ মালিকানাধীন জমির উপর পুনর্বাসন করে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যই ছিল জমি দখল, একজন উচ্চ পদস্থ আমি অফিসারের বয়ানে, “আমরা জমি চাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষগুলোকে নয়”। এভাবে শুরু। এক ৭১’র ভয়াবহতা পেরিয়ে এসে পাহাড়ে শুরু হয় অঘোষিত সামরিক শাসন এবং একে একে সংঘটিত হতে থাকে অসংখ্য গণহত্যা।
এ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে ১০টিরও বেশি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কলমপতি গণহত্যা (১৯৮০), বরকল গণহত্যা (১৯৮১), ভূষণছড়া গণহত্যা (১৯৮৪), পানছড়ি-খাগড়াছড়ি-মাটিরাঙ্গা (১৯৮৬), লংগদু গণহত্যা (১৯৮৯), লোগাং গণহত্যা (১৯৯২), নান্যাচর গণহত্যা (১৯৯৩) উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে আরো ছোটখাট গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও পাহাড়িদের ঘর-বাড়িতে নিয়মিত হামলা, ধর্ষণ, নিপীড়ন অব্যাহত আছে।

                         ছবিঃইন্টারনেট
কলমপতি গণহত্যাঃ
পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত এসব গণহত্যা, হামলা, নির্যাতনের সর্বপ্রথম এবং ব্যাপক আকারে সংঘটিত হয় ১৯৮০ সালের ২৫ মার্চ তারিখে। রাঙামাটি জেলা সদর থেকে ৩১ মাইল দূরে চট্টগ্রামের রানীরহাট থেকে মাত্র ৬ মাইল দূরে রাঙামাটির কাউখালি উপজেলার কলমপতি ইউনিয়ন। ১৯৭৯ সালে সমতলের বাঙালি পরিবারগুলোকে যেসকল স্থানে সেটলমেন্ট করা হয়েছিল, কলমপতি ইউনিয়ন তার অন্যতম।
ঘটনার সূত্রপাত হিসেবে যা বলা হয়ঃ
১০ মার্চ ১৯৮০ (মতান্তরভেদে ২২ মার্চ) তারিখে কাউখালি উপজেলার পূর্ব প্রান্তে, বরকল উপজেলার খুব নিকট এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি দল শান্তিবাহিনীর এমবুশের শিকার হয়। রিপোর্ট মোতাবেক, সে যুদ্ধে ১জন অফিসার সহ ২২ জন আর্মি সদস্য মারা যায়।
২৫ মার্চঃ কালোরাত্রির কালো দিন
কলমপতি আর্মি জোনের প্রধান এক ধর্মীয় সভার নামে কলমপতি ইউনিয়নের পাহাড়ি নেতাদের জড়ো করান। সকাল বেলায় ঘোষণা দেয়া হয় পোয়াপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরের সংস্কার কাজে আর্মিরা সহায়তা করবে এবং সাধারণ পাহাড়িদের এই সংস্কার কাজের জন্য ডাকা হয়। সাধারণ পাহাড়িরা এতে সাড়া দিয়ে মিটিংএ উপস্থিত হয় এবং এরপর তাদের এক লাইনে দাঁড়াতে বলা হয়। লাইনে দাঁড়ামাত্র আর্মি সদস্যরা তাদের উপর গুলিবর্ষণ করে। এতে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় বাজার চৌধুরী, কুমুদ বিকাশ তালুকদার, স্থানীয় স্কুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরহিদর চাকমা সহ প্রায় শত ব্যক্তি। গুরুতর আহত হন ইন্দু কুমার চাকমা, পিটিয়া চাকমাসহ প্রায় ১২ জন। এদের রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই দিন পোয়াপাড়া
হত্যাকান্ড শেষে প্রায় ৩০ জন পাহাড়ি নারীকে জোরপূর্বক আর্মি ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যায় শিশু ও বৃদ্ধাদের ছেড়ে দেয়া হলেও তরুণীদের ছেড়ে দেয়া হয়নি, যাদের হদিস আর পাওয়া যায় নি।
সেটেলারদের হামলাঃ
আর্মিদের মদদেই সেটেলাররা পাহাড়িদের উপর চড়াও হয়। তারা কাউখালি, মুখপাড়া, পোয়াপাড়া, কাউখালি বাজার, তোংপাড়া এবং হেডম্যান পাড়া তছনছ করে ফেলে। সমস্ত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং লুট করা হয়। সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। প্রাক্তন সংসদ সদস্য চাইথোয়াই রোয়াজার বাড়িও লুট করা হয়। এছাড়াও, মুখপাড়া কিয়াং, তোংপাড়া আনন্দ মোহন বৌদ্ধ মন্দির, পোয়াপাড়া মন্দিরেরও ধ্বংস সাধন করে। কিয়াংগুলোর স্বর্ণ, রৌপ্য, পিতলের বৌদ্ধমূর্তি, আসবাবপত্রসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়। হাতিরপাড়া ও কাউখালির দুইটি বৌদ্ধ মন্দির পুড়িয়েও দেয় সেটেলাররা। সেটেলারদের হামলার মুখে পাহাড়িরা দৌড়ে পালিয়ে গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেয় এবং পরে ভারতের ত্রিপুরায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
ঘটনার পরবর্তীঃ
১৯৮০ সালের ১ এপ্রিল তৎকালীন জাসদের সংসদ সদস্য উপেন্দ্র লাল চাকমা জাসদের ঢাকাস্থ দলীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে কলমপতি হত্যাকান্ডের কথা প্রথমে প্রকাশ করেন। এর পর পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য ৫ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, সেখানে এমপি উপেন্দ্র লাল চাকমাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নি।
সংসদীয় কমিটির বিপরীতে স্বাধীনভাবে হত্যাকান্ডটি তদন্তের জন্য জাসদের এমপি শাহজাহান সিরাজ, উপেন্দ্র লাল চাকমা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রাশেদ খান মেননসহ তিন সদস্য বিশিষ্ট এক সত্য অনুসন্ধানকারী দল গঠন করা হয়। দলটি নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তাঁদের পরিদর্শনের সংবাদ পেয়ে প্রায় ৫০০ জন ক্ষতিগ্রস্থ পাহাড়ি কয়েক মাইল হেঁটে চেলাছড়ায় টিমের সাথে সাক্ষাত করে এবং তাদের দুর্ভোগের কথা জানায়। প্লেকার্ড ও পোস্টারের মাধ্যমে তারা সমতল থেকে অবৈধ আগমনকারীদের হামলায় হত্যাকান্ডে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, মহিলাদের প্রতি অপমান বন্ধের উদ্দেশ্যে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষা, ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী মৃতদের দাহ, পাহাড়িদের জন্য আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার এবং সেটেলারদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানায়।
সত্য অনুসন্ধানকারী দলের বক্তব্যঃ
২১ তারিখে এক সংবাদ সম্মেলনে সত্য অনুসন্ধানী দলটি ঘটনার বিবরণ দেন। তাদের বক্তব্য অনুসারে,
“ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর, আমরা ২৫ মার্চ ১৯৮০ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেতবুনিয়া পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রাধীন কলমপতি ইউনিয়নস্থ কাউখালি বাজারের আর্মির এক ইউনিট কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকান্ড ও নৃশংসতার প্রমাণ পেয়েছি। সদ্য আগত সেটলাররাও হত্যাকান্ড ও লুটতরাজে অংশ নেয়। এমনকি ঘটনার ১ মাস পরও গোটা এলাকা ভয়ের রাজত্ব বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উচ্ছেদের শিকার হওয়া গরীব পাহাড়িরা নিজেদের ধ্বংস হয় যাওয়া গ্রামে ফিরে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে। কারণ হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার, যখন তখন মানুষ হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, সেটলারদের হুমকি প্রদান এসব চলছে।“
তারা আরো বলেন,
“একই সাথে আমরা সেটলারদের বাসকৃত বাড়িগুলোকে খুব ভালো অবস্থায় দেখেছি। এগুলো পাহাড়িদের জমিতে তৈরি করা হয়েছিল। এই সেটলারদের ভিন্ন জেলা থেকে সাপ্তাহিক রেশন ও আশ্রয়ের প্রলোভনে। একজন স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের জানিয়েছেন যে ২৬৩৭ পরিবারকে বাড়ি নির্মাণের জন্য প্লট এবং ৩০০ পরিবারকে চাষের জমি দেয়া হয়েছে। প্রতি পরিবারকে সপ্তাহে ১২ সের গম প্রদান করা হয়। কিন্তু যখন সরকার কি সিদ্ধান্তের কারণে এখানে সেটলারদের নিয়ে আসা হয়েছে বলে জিজ্ঞেস করা হয় তখন স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। তারা আমাদের বলেন যে সেটলারদের ক্রমাগত আগমন বন্ধ হয়েছে। কিন্তু এ সময়ে ইতিমধ্যে ২০ হাজার সেটলার পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে।“
সবশেষে তাঁরা বলেন,
“এটি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে কলমপতির ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা ও পন্থায় সংঘটিত করা হয়েছে। “
সংবাদ সম্মেলনে তারা যেসকল সুপারিশ করেছিলেনঃ
১। কলমপতি ইউনিয়নে ২৫ মার্চ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও ঘাতকদের শাস্তি;
২। ক্ষতিগ্রস্থদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসহ পুনর্বাসন;
৩। ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃর্নিমাণ, মন্দির ধ্বংস সাধনের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান ও ধর্মীয় অনূভুতিতে আঘাত দানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা;
৪। সেটেলারদের আগমন বন্ধ করা;
৫। যেসব সেটেলার ইতোমধ্যে এখানে বসতি গড়েছে তাদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নেয়া
৬। বাজারগুলোতে মালামাল আনা-নেয়ার ব্যাপারে বাঁধা প্রত্যাহার।
গণহত্যায় নিহতের সংখ্যাঃ
এখনো সঠিক সংখ্যা জানা যায় নি যে আসলে সেদিন কতজন মারা গিয়েছিলেন। গণহত্যায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া গুরুদাস চাকমা পরে সত্য অনুসন্ধান দলের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি পোয়াপাড়া হাইস্কুলের পশ্চিম কোণায় একমাত্র সেনাছাউনির পিছনে ৫০ জনেরও বেশি লাশকে গণকবরস্থ করতে দেখেছিলেন। ১ এপ্রিল ১৯৮০ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে উপেন্দ্র লাল চাকমা লাশের সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি। “সঠিক নিহতের সংখ্যা অজানা, তবে অবশ্যই ২০০ এর কম নয়”।
১৯৮০ সালের ১৩ এপ্রিল তারিখে নিউ নেশন পত্রিকায় ছাপা হয়, একটি সূত্র মতে জানানো হয়েছে যে কাউখালির এই সংঘাতে মাত্র ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আনুমানিক ধারণা করা হয় প্রায় ৩০০ জন এই গণহত্যায় নিহত হয়েছিল।
পোস্টস্ক্রিপ্ট
বাংলাদেশ সরকার সত্য অনুসন্ধান দলের সুপারিশ গ্রহণ করেনি এবং কোন ধরণের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেনি। সংসদীয় কমিটি নামেমাত্র গঠন করা হয়েছিল। কোন ধরণের তদন্ত রিপোর্ট এখনো প্রকাশিত হয়নি। বরং বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই গণহত্যার হোতাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী গণহত্যাগুলো সংঘটিত হওয়ার পথকে প্রশস্ত করে দেয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতকে কালো রাত হিসেবে অভিহিত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার জন্য বিভিন্ন তৎপরতা যথেষ্ট লক্ষ্যণীয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৯ বছর পর অপারেশন সার্চলাইট সংঘটিত হওয়ার দিনেই সংঘটিত হয়েছিল “কলমপতি গণহত্যা” যার ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার পথে।
ইতিহাস ফিরে আসে প্রতিবছর, প্রতিবার। ২৫ মার্চের ভয়াল কালোরাত্রিও ফিরে আসে জীবনে। কিন্তু ২৫ মার্চের ‘কলমপতি গণহত্যা’ ফিরে আসে নিভৃতে।
বেঁচে থাকুক কলমপতি,
বেঁচে থাকুক লোগাং-লংগদু,
বেঁচে থাকুক পাহাড়ের সকল নাম না জানা শহীদরা।
তথ্যসূত্রঃ
  1. CHT Commission (1991): Life is not Ours: Land and Human rights in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh, IWGIA.
  2. Amnesty International (1986): Bangladesh: Unlawful Killing and Torture in the Chittagong Hill Tracts, Amnesty International, AI Index: ASA/13/21/86.
  3. Houssain Hayat, 1986. “Problem of National Integration of Bangladesh” in S.R. Chakravarty and Virendra Narain (edits), Bangladesh, Vol 1: History and Culture. Delhi: South Asian Publishers.
  4. Chakma Bhumitra (2010): Structural Roots of Violence in CHT, March 20, Economic & Political Weekly India.
  5. Mey, W (1984): Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh: International Working Group of Indigenous Affairs (IWGIA), Doc No. 51.
  6. Anti-slavery Society (1994): The Chittagong Hill Tracts: Militarization, Oppression and the Hill Tribe, Anti-Slavery Society Publication.
  7. Adnan, S (2004): Migration, Land Alienation, and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh, Research & Advisory Service, Dhaka.
    এই লেখায় প্রকাশিত দৃষ্টিভঙ্গি হিল ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরামের নিজস্ব, আর লেখা বিষয়ক সমস্ত দায়ভারও তাদের।

Saturday, March 14, 2020

দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী;কার্ল মার্ক্স কি এখনো প্রাসঙ্গিক?

পিটার সিংগার
প্রথম আলো 


অনেক দেশেই কার্ল মার্ক্সের জন্মদিন উদ্‌যাপন করা হয়েছেঅনেক দেশেই কার্ল মার্ক্সের জন্মদিন উদ্‌যাপন করা হয়েছেচীনের গৃহযুদ্ধে মাও সে-তুংয়ের কমিউনিস্ট বাহিনী ১৯৪৯ সালে জয়ী হওয়ার ৪০ পর বার্লিন দেয়াল ভাঙা পর্যন্ত কার্ল মার্ক্সের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল অলঙ্ঘ্যেয়। পৃথিবীর প্রতি দশজনের প্রায় চারজনই এমন সরকারগুলোর অধীনে ছিল যে সরকারগুলো নিজেদের মার্ক্সবাদী বলে দাবি করত। এর বাইরে বহু দেশে বামপন্থীদের অনুকরণীয় আদর্শ ছিল মার্ক্সবাদ এবং মার্ক্সবাদকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, সেটিই ছিল সেসব দেশের ডানপন্থীদের মূলনীতি।
সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার পরও সেখানে মার্ক্সের প্রভাব রয়ে যায়। ১৮১৮ সালের ৫ মে মার্ক্সের জন্ম হয়। চলতি মাসে তাঁর জন্মের ২০০ বছর পূর্ণ হলো। এই এত দিন পরও এটি বলা মোটেও ঠিক হবে না যে, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ভুল ছিল; তাঁর তত্ত্ব আস্থা হারিয়েছে বা একেবারে সেকেলে হয়ে গেছে। তাহলে আমাদের সামনে প্রশ্ন আসতে পারে, এই একুশ শতকে এসে তাঁর তত্ত্বের উত্তরাধিকারকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? নিজেদের মার্ক্সবাদী বলে দাবি করা শাসকেরা বিভিন্ন সময়ে উৎপীড়কের ভূমিকা নিয়ে মার্ক্সের সুখ্যাতিকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন; যদিও মার্ক্স নিজে কখনো এসব অন্যায় প্রশ্রয় দেওয়ার কথা বলেছেন বলে কোথাও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সোভিয়েত ব্লক এবং মাও-শাসিত চীনে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার মূল কারণ হলো সেখানকার সরকার জনগণকে মানসম্মত জীবনব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে টেক্কা দিতে পারার মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তারা গড়তে পারেনি।
এই ব্যর্থতাকে মার্ক্সের দেওয়া সমাজতন্ত্রের নকশার ত্রুটি বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না, কারণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে, মার্ক্স কস্মিনকালেও সেই পথ বাতলে দেওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাননি। আমাদের বরং সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণকে আরও গভীর ত্রুটির মধ্যে তলিয়ে দেখতে হবে। এই গভীর ত্রুটি হলো, মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে মার্ক্সের ভ্রান্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
মার্ক্স মনে করতেন, বংশগত বা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাবের মতো আর কিছু নেই। ‘থিসিস অন ফয়েরবাখ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভে তিনি লিখেছেন, ‘সামাজিক সম্পর্কগুলোর যূথবদ্ধতাই মনুষ্যচরিত্রের সার।’ পরে তিনি বলছেন, ধরা যাক, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে ফেলার মাধ্যমে আপনি সামাজিক সম্পর্কগুলো পাল্টে দিলেন এবং পুঁজিবাদী ও শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক বিলুপ্ত করে দিলেন; তাহলে দেখা যাবে পুঁজিবাদী সমাজে বেড়ে ওঠা মানুষের চেয়ে এই নতুন সমাজের মানুষ একেবারে আলাদা ধরনের হয়ে উঠেছে। ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে থাকা মনুষ্য-প্রকৃতির ওপর বিশদ পড়াশোনা করে মার্ক্স এমন সিদ্ধান্তে এসেছেন বলে মনে হয় না। বরং তিনি ইতিহাস সম্পর্কে হেগেলের দৃষ্টিভঙ্গিকেই এখানে প্রয়োগ করেছেন। হেগেলের মতে, মনুষ্য-চেতনার মুক্তিই ইতিহাসের অভীষ্ট লক্ষ্য। তিনি মনে করতেন, যখন আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারব যে আমরা বিশ্বজনীন মানবসত্তার একেকটি অংশ, তখনই সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
মার্ক্স এই ‘আদর্শিক’ ব্যাখ্যাটিকে এমন একটি ‘বস্তুগত’ আদর্শে রূপান্তরিত করেছেন, যে আদর্শে আমাদের জাগতিক বস্তুগত অভাব মেটানোর সন্তুষ্টিই ইতিহাসের চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং যে আদর্শে একমাত্র শ্রেণিসংগ্রামকেই মুক্তি অর্জনের পথ মনে করা হয়। শ্রমিক শ্রেণিই হবে বিশ্বজনীন মুক্তির হাতিয়ার; কারণ এই আদর্শ ব্যক্তিগত সম্পদের ধারণাকে অস্বীকার করে এবং যৌথ মালিকানাভিত্তিক উৎপাদনের পথ দেখিয়ে দেয়।
মার্ক্স মনে করতেন, যখন কর্মীরা যৌথ মালিকানাভিত্তিক উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করবে, তখন মার্ক্সের ভাষায় ‘সহযোগিতামূলক সম্পদের ঝরনাধারা’ ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ যে গতিতে ছড়ায়, তার চেয়ে অনেক বেশি পর্যাপ্ত আকারে সমাজে প্রবাহিত হবে। সম্পদের এই প্রবাহ এতটাই প্রয়োজনাতিরিক্ত হতে পারে, যা বণ্টনের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ কারণে মার্ক্স আয় ও সম্পদ কীভাবে বণ্টন করা হবে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন দেখেননি। মার্ক্স যখন দুটি জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের একীভূত হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন, তখন তাঁকে ‘সুষম বণ্টন’ এবং ‘সমানাধিকার’-এর মতো শব্দগুচ্ছকে ‘সেকেলে মৌখিক বাজে কথা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে দেখা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রমাণ করেছে, বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বিলুপ্ত করলেই মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব পরিবর্তন হয় না। বেশির ভাগ মানুষই স্বভাবজাত কারণে সর্বজনীন কল্যাণের দিকে নিজেকে সঁপে দেওয়ার বদলে নিজের হাতে ক্ষমতা ও অগ্রাধিকার চায়, অন্যদের চেয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে চায়। মজার বিষয় হলো এখনো যে দেশগুলো নিজেদের মার্ক্সবাদের অনুসারী বলে দাবি করে, সে দেশগুলোর ইতিহাস বলছে, সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পদের প্রবাহ যৌথ মালিকানাভিত্তিক সম্পদ প্রবাহের চেয়ে অনেক জোরালো ছিল।
মাও সে-তুংয়ের আমলে চীনের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র ছিল। মাওয়ের পর ১৯৭৮ সালে তাঁর উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং (যিনি বলেছিলেন ‘বিড়াল সাদা কি কালো সেটা বড় কথা নয়, সেটি ইঁদুর ধরছে কি না, সেটাই বড় কথা’) ক্ষমতায় বসায় চীনের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। এর কারণ হলো দেং জিয়াওপিং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎপাদন অনুমোদন করেছিলেন। তাঁর এই সংস্কারের কারণেই চীনের ৮০ কোটি দরিদ্র মানুষ উঠে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই সংস্কার চীনে ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। যদিও চীন এখনো বলে যাচ্ছে তারা ‘চীনের নিজস্ব আদলের সমাজতন্ত্র’ গড়ে তুলছে। যদিও সেই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের মিল প্রায় নেই বললেই চলে।
চীন যদি মার্ক্সের চিন্তাভাবনার দ্বারা এখন আর প্রভাবিত না হয়, তাহলে আমরা এই উপসংহারে আসতে পারি যে চীনের অর্থনীতির মতো রাজনীতিতেও তিনি এখন আর প্রাসঙ্গিক নন। তারপরও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব রয়েই গেছে। ইতিহাস সম্পর্কে দেওয়া তাঁর বস্তুবাদী তত্ত্ব আমাদের মানবসমাজের চালিকাশক্তির গতি-প্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে মার্ক্সের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
পিটার সিংগার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক

Friday, March 13, 2020

ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধ কর-জুম্ম জনগণের একটিই দাবি

লেখকঃসুদীর্ঘ চাকমা,অংশুমান চাকমা,তাতিন্দ্র লাল চাকমা
[এই লেখাটি শুরু করেছিলেন সুদীর্ঘ চাকমা।কিন্তু লংগদু এলাকায় জনমত জরিপ করতে যেয়ে শত্রুরা তাঁকে ও তার সফর সঙ্গীদের ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।তাই তার অসমাপ্ত কাজটা এগিয়ে নেয়া হয়েছে]

১৯৮৩ সালের ১৪ই জুন প্রথম সংঘটিত হয় জুম্ম জনগনের মধ্যেকার ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ।এই সংঘর্ষের প্রথম বলি হয়েছিলেন বলিওস্তাদ।তারপর এই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ কেড়ে নিয়েছে বহু তাজা প্রাণ।১০ই নভেম্বর ১৯৮৩তে অসুস্থাবস্থায় নিহত হন জুম্ম জাতির কান্ডারী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা(প্রবাহণ)।দীর্ঘ ২৩ মাস পর এই সংঘাত(এই গৃহযুদ্ধের) অবসান হলেও জুম্মজাতি আজো জানেনা এই যুদ্ধে জাতির ক্ষতির পরিমাণ কত?শত শত বছর ধরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলো যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস হচ্ছিল,সেই জাতিকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়ে হাতে নেয়া হয়েছিল অস্ত্র ।অস্ত্রের গর্জনে জুম্মজাতি জেগেছিল সত্যি,কিন্তু সেই অস্ত্রের ব্যবহারের প্রকৃত শিক্ষা কি এই জাতি গ্রহণ করতে পেরেছিল?সেটাই হচ্ছে আজকের জনগণের প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ব্রিটিশ প্রদত্ত যে নূন্যতম শাসনতান্ত্রিক অধিকার পাকিস্তান শাসনামলের দুই-তৃতীয়াংশ কাল পর্যন্ত স্বীকৃতি ছিল,তা ১৯৭২ সালে রচিত স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক -সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃতি হয়নি।The Chittagong Hill Tracts Regulation ,1900(1 of 1900) এর স্বীকৃতিও সংবিধানে সুস্পষ্ট করা হয়নি।উপরন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোকে 'বাঙালী' হয়ে যাবার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জুম্ম জনগ্ণ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক সশস্ত্র আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।২৫ বছর পর বাংলাদেশ সরকার যখন রাজনৈতিক অধিকার দিতে সম্মত হয় এবং নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়,তখন জুম্মজাতি এই সশস্ত্র সংগ্রাম ত্যাগ করে সরকারের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে ।
কিন্তু চুক্তিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় মতভিন্নতা।চুক্তিপক্ষ ও বিপক্ষ।তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের চেনা পরিচিত এবং নিজস্ব পার্টি হিসেবে জানা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।কিন্তু এই সমিতির নেতৃত্ব তাদের প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।তারা চুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষের মধ্যেকার দ্বন্ধের সঠিক মীমাংসা করতে পারেনি এবং এই দ্বন্ধের সঠিক মীমাংসার বদলে সেই পুরোনো অস্ত্রধারী মেজাজে এই সমস্যার সমাধানে অগ্রসর হয়।ফলে আরেকদফা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।এই সংঘাতের বয়স আজ ১৬ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।যাদের মগজে এত সামরিক মেজাজ,যাদের এত সংঘাতের দক্ষতা,তারা এই দীর্ঘ ১৬ বছরেও কেন সমস্যার সমাধান দিতে পারলনা?
জীবিত অবস্থায় এমএন লারমা প্রায়ই বলতেন-"এই অস্ত্র কার হাতে তুলে দেয়া হবে?অস্ত্র তো আর যার তার হাতে তুলে দেয়া যায়না।" কিন্তু তাঁর এই কথাটা আজ আর কেউ স্মরণ করেনা ।কেননা আজ ভায়ের বুকে ভাই অস্ত্র চালাচ্ছে,নিরীহ লোকজনও এই অস্ত্রের হাতে প্রাণ দিতে বাধ্য হচ্ছে ।শিক্ষক,ছাত্র,বোবা এমনকি ২০ মাসের অবুঝ শিশুও আজ এই অস্ত্রের শিকার।তাহলে এই অস্ত্র কার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে?কার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব অস্ত্র?
বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ হয়,মানুষ মারা যায়,লাশও শনাক্ত হয়;কিন্তু এই যুদ্ধের,এই হত্যার দ্বায় কেউ স্বীকার করেনা।কিন্তু সংঘটিত এলাকার মানুষ জানে ,কোন দলের  সাথে কোন দলের লড়াই হয়েছে;কোন দল কর্তৃক অপহরণ কিংবা হত্যা করা হয়েছে।কিন্তু তারপরেও তারা স্বীকার করেনা!আর কেউ স্বীকার না করলেও জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা যায়না।তবে জনগণের সামনে কারা মিথ্যা বলছে,কারা ভন্ড রাজনীতিক সাজছে জনগণ ঠিকই জেনে যায়।
এমএন লারমা বলে গেছেন-"মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া যায়,কিন্তু সে জীবন দান করা যায়না।" তবে তার মৃত্যুর ৩০ বছর পর দেখা যাচ্ছে জীবন কেড়ে নেয়াটাই নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।কিন্তু সে জীবন আর কারোর নয়-সেই জুম্ম স্বজাতি ভাইয়ের জীবন।কারো জীবন নাশ করতে পারলে কেউ হয়তো খুশী হয়,কিন্তু জনগ্ণ খুশী হয়না;তারা ব্যথিত হয়।কারণ সেই জীবনের সাথে আরও বহু জীবন নানাভাবে জড়িত।বিগত ১৬ বছরে অপহরণের উচ্চমাত্রার রেকর্ড আছে কার? আমরা হয়তো জানিনা,কিন্তু জুম্ম জনগণের সচেতন অংশ অবশ্যই জানে।
তাই মানুষ দিন দিন সোচ্চার,প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে।গত ৩১ আগস্ট বরকল উপজেলাধীন সুবলং ইউনিয়নের মেম্বার বিমলেন্দু চাকমাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে ।এই ঘটনার জন্য ৩০০জনের বেশী মানুষ প্রতিবাদে নেমেছে।প্রতিবাদের মাধ্যেমে তারা হত্যাকারীকে চিহ্নিত করতে পেরেছে কিন্তু সুবিচার পায়নি।প্রতিবাদের পরও যখন সুবিচার পায়নি,তখন ভবিষ্যতে প্রতিরোধের কথা ভাবতে বাধ্য হবে।এইভাবে রাজনৈতিক দল্গুলো দিন দিন এই সংঘাতের কারণে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে।
এক সাধারণ সমীক্ষায় দেখা গেছে -পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন চায় ৯০% পাহাড়ী মানুষ।আর আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায় ৮০ শতাংশেরও বেশী মানুষ।তাই জনগনের সচেতন অংশের দাবী তিনটা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল এক ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করুক-সংগ্রাম করুক।কিন্তু বিপরীতে দেখা যায়-সংঘর্ষে লিপ্ত দলগুলোর অধিকাংশ জনশক্তি ও অর্থশক্তি নিয়োজিত রয়েছে ঐ সংঘাতময় কাজে এবং দল্গুলোর সমস্ত মনোযোগও সন্নিবেশীত রয়েছে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করার কাজে।কিন্তু সংগ্রামের যে কোন কর্মসূচীতে সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া তা কখনও সফল হতে পারেনা।যে কারণে ১৬ বছর ধরে চলে আসা ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের আজো কোন কূল-কিনারা নেই।জুম্ম জনগণের ৪(চার) ভাগের ৩(তিন) ভাগ মানুষ এখনও জানেনা এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কারণ কি ও উদ্দেশ্য কি।সমাজের অধিকাংশ মানুষ ভয়ে কিছুই বলতে চাননা ।তবে সমাজের অধিকাংশ মানুষ চুক্তির পর আর সংঘর্ষ চাননা।তাই এই সংঘাত বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা সদরে  মানববন্ধন করা হয়েছে।
বিগত পাঁচ বছরে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে জুম্ম জনগণ কয়েকবার সাম্প্রদায়িক মুখোমুখি হয়েছে।ইসলামী সম্প্রসারণবাদের ধারক-বাহকেরা বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে খুবই সক্রিয়।তারা একদিকে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে একত্রিত করে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালাচ্ছে,অপরদিকে পাহাড়ী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য নানাভাবে উস্কানী দিচ্ছে।এই উস্কানীর উদাহরণ দেখা যায় দল্গুলোর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।কোনো দল নির্মূল করার ঘোষণা দেয়,নিষিদ্ধ করার দাবী জানায়,কোনো দল আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগের দাবী জানায় ।যার ফলে সাম্প্রদায়িক শক্তির নৃশংস আক্রমণেও দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনা।তারা এককভাবে সর্বশক্তিমান হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়,আর অন্যদের সহযোগীতাকে প্রত্যাখ্যান করে।বিগত সময়গুলোতে দেখা গেছে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো একজোট হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচী দিয়েছে।কিন্তু চুক্তির পক্ষে সেভাবে কোন জোড়ালো কর্মসূচী কার্যকরী হতে পারেনি।
বর্তমানে ইসলামী সম্প্রসারণবাদী শক্তি কোনো পাহাড়ী দলকে শক্তিশালী হতে দেয়না।যে দলটি একটু শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করে,সে দলকে আঘাত করে এবং সেই দলের প্রতিপক্ষকে নানাভাবে মদত দিতে চেষ্টা করে।ফলে ইচ্ছা করলেও তার প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন বা ধ্বংস করতে পারেনা।এতে শত্রুপক্ষের ভাগ করা ও শাসন করার নীতি কার্যকরী করতে সহজ হচ্ছে।বিপরীতে জুম্ম জনগণ দিন দিন ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে।কিন্তু জুম্ম জনগণ নিজেদের ধ্বংস করতে চায় না। এই ধ্বংস না হওয়ার তাড়না থেকে দাবী -আঞ্চলিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করুক।
জুম্ম জনগণের এই দাবীর যৌক্তিকতা আছে।কারণ এতদিন যারা মনে করতেন যে,চুক্তি বাস্তবায়নে সন্তু লারমার প্রয়োজনীয়তা আছে,কিন্তু এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কারণে সন্তু লারমা ১৬ বছর পর বরঞ্চ নিজেই কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন।যার কারণে চুক্তি বাস্তবায়নের আগে ইউপিডিএফ-কে নির্মূল করতে হবে বলে ঘোষণা দেন।বিগত ১৬ বছরে যা পারেননি আগামীতে এত সহজে ওদের নির্মূল করতে পারবেন তা কিন্তু কেউ আর বিশ্বাস করতে চায় না।অপরদিকে ইউপিডিএফের যে অভিযাত্রা তারও কোন কূল কিনারা নেই।অথচ দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি,যে চুক্তির বাস্তবায়নে সরকার শুধুমাত্র তালবাহানা করেই চলেছে।সাধারণ মানুষের ধারণা-সকল দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কিছু না কিছু দেশপ্রেম আছে,অথচ কোন দলই ততটা শক্তিশালী নয় ।অতএব,সবাই মিলে একটা বড় শক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন-যা দিয়ে বাস্তবসম্মত একটা লড়াই এর জন্য প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হতে পারে।
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক লাইন ঠিক থাকলে দলগুলোর নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।তারা সংঘাতে জড়িত না হয়ে সাংগঠনিক উপায়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে নিতেই পারে।তাই জনগণ মনে করে -এই সংঘাত বর্জন করা সম্ভব এবং কর্মসূচীগত জুম্ম জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাও সম্ভব।জুম্ম জনগণ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল্গুলোকে বিবেচনাস করে সেই দলের মেজাজ,বিশেষতঃ জাতীয় স্বার্থে তারা কতটুকু ঐক্যবদ্ধ হতে প্রস্তুত;সেই বাস্তবতার উপর।তাই বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে,যে দল ঐক্যের পক্ষে কাজ করবেনা সেই দল জুম্ম জনগণের সমর্থন ও সহানুভূতি হারাতে থাকবে।
এই সংঘাতে জড়িত একটি দল (সন্তু লারমার দল) নিজের কর্মীদের সামনে একটি কথার ব্যাখ্যা দেয়-"এটা কোন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ন্য-এটা হচ্ছে শ্রেণী-সংগ্রাম।"কিন্তু মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা লিখেছেন-"প্রগতিশী চিন্তাধারা কঠোরভাবে শ্রেণীসংগ্রাম পরিচালনা করতে পারেনি ঐতিহাসিক কারণেঃ-যেহেতু জুম্ম সমাজ সব দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া,শিক্ষা-সংস্কৃতি-আর্থিক সব দিক দিয়ে অনুন্নত,লোকসংখ্যা অত্যন্ত কম এবং জন্মভূমিও ক্ষুদ্র;সেহেতু জুম্ম সমাজ সবদিক দিয়ে পরনির্ভরশীল। এমন পরনির্ভরশীল জাতি পৃথিবীতে খুবই কম রয়েছে।এমন জাতিকে আজ অবলুপ্তির পথ থেকে মুক্তি পাবার জন্য সংগ্রামের পথে এগিয়ে আসঅতে হয়েছে।
---সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা যদিও বেশী কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইহা পাওয়া যায় যে,প্রগতিশীল চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ সক্রিয় ও উদ্যোগী কর্মীর সংখ্যা খুবই কম।তাই প্রগতিশীল চিন্তাধারার আলোকে জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের বিচার করলে এবং সেভাবে বাছাই প্রক্রিয়া চালু করলে বিপরীত ফলই পাওয়া যাবে"
এমএন লারমার এই বক্তব্য বিশ্লেষণ খুবই বাস্তবসম্মত।কারণ সংঘাতে লিপ্ত দলগুলো দিন দিন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবংসেই দলগুলোতে নূতন কর্মীর সমাগম হতে পারছেনা।তাই এমএন লারমার বক্তব্য এবং বর্তমান জুম্ম জনগনের দাবী সেই একই কথাঃ-কঠোরতা নয়,চাই নমনীয়তা;সংঘাত নয়,চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।

প্রকাশঃ প্রবাহণ,১০ নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১৩,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।







সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ১০০ বছর

তামান্না মিনহাজ
কালের কন্ঠ
২০১৭

যুগ যুগ ধরে শোষণহীন, সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখেছে মানুষ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন কার্ল মার্ক্স ও ফ্র্রেডরিক এঙ্গেলস।
তাঁদের মতাদর্শকে ধারণ করে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের পরিচালনায় ও বলশেভিক পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টি) নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে (পুরনো জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ২৫ অক্টোবর, আর নতুন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৭ নভেম্বর) রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ বিপ্লবকে মহান ‘অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ আখ্যায়িত করা হয়।
বিপ্লবের আগের রাশিয়া
অক্টোবর বিপ্লবের আগে রাশিয়া ছিল পিছিয়ে থাকা একটি দেশ। রাশিয়াকে বলা হতো ‘ইউরোপের পশ্চাদ্ভূমি’। জারশাসিত রাশিয়ায় (দেশের রাজাকে জার বলা হতো) অনাহার, দারিদ্র্য ও অসহনীয় শোষণ ছিল জনগণের নিত্যসঙ্গী। উন্নত শিল্প দূরের কথা, সাধারণ মাপের শিল্প উত্পাদনের ব্যবস্থাও তখন ছিল না। দ্য ‘গ্রেট রাশিয়ান’রা অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোকে শাসন-শোষণ করত।
বিপ্লব শুরুর প্রক্রিয়া
রাশিয়ার বিপ্লবী শক্তিগুলো জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলে। এসব সংগ্রাম ধীরে ধীরে বিপ্লবে রূপ নেয়।
১৯০৫ সালে এ ধরনের একটি বিপ্লব ব্যর্থ হয়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরেকটি বিপ্লব হয়। সেই বিপ্লবে জার স্বৈরতন্ত্র উত্খাত হয় এবং ‘অস্থায়ী সরকার’ গঠিত হয়। এই সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর সঙ্গে আপস করে গঠন করা হয়েছিল। তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ক্রমে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অস্থায়ী সরকার শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে পড়ে। গড়ে ওঠে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের নতুন এক ধরনের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সংস্থা ‘সোভিয়েত’। বলশেভিক তথা কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে শ্রমিক বিক্ষোভ। শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে। সৈন্যরাও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯১৭ সালের ১০ অক্টোবর লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে। ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) শ্রমিকদের সশস্ত্র অংশ ও বিপ্লবী সেনারা অস্থায়ী সরকারকে উত্খাতের প্রস্তুতি নেয়। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে যুদ্ধজাহাজ ‘অরোরা’ থেকে একটা ফাঁকা শেল ছোড়ার মধ্য দিয়ে বিপ্লবী সেনা (যারা আসলে উর্দি পরা কৃষক) ও রেড গার্ডের সহায়তায় রাজধানী পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকরা বুর্জোয়া সরকারের কেন্দ্র ‘উইন্টার প্যালেসে’ অভিযান শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই পতন হয় উইন্টার প্যালেসের। অস্থায়ী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা চলে আসে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের ‘সোভিয়েতের’ হাতে। পরের কয়েক সপ্তাহে রাশিয়া ও পুরনো জার সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে ক্ষমতা দখল করে বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণি।
নতুন সরকার
বিপ্লবের পরে লেনিনের নেতৃত্বে জনগণের কমিশারদের পরিষদ নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়। জমি, শান্তি ও রুটির স্লোগানে বলশেভিকরা জনগণকে সংগঠিত করেছিল। নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল জমি ও শান্তির জন্য ডিক্রি জারি। ‘শান্তির ডিক্রি’র মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরুর ডাক দেওয়া হয়। ‘জমির ডিক্রি’র মাধ্যমে খোদ কৃষককে জমির ওপর অধিকার দেওয়া হয়। অন্য ডিক্রিগুলো ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, বিনা মূল্যে চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের নতুন ইউনিয়ন গঠন সম্পর্কিত।
রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজ শুরু করার আগেই অক্টোবর বিপ্লব প্রতিবিপ্লবী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে। বেধে যায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। চার বছরের গৃহযুদ্ধের পর ‘লাল ফৌজ’ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ধ্বংস করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। সোভিয়েতবিরোধী চক্রান্ত ঘৃণ্যরূপ ধারণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। হিটলার যুদ্ধ শুরু করে দেশের পর দেশ দখল করে নিতে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ‘লাল ফৌজে’র বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাছে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল হিটলারের বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
দ্রুত উন্নয়ন
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। মাত্র দুই দশকের মধ্যেই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা হয় কাজ, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিত্সাসহ সাধারণ মৌলিক চাহিদা। এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করা হয়।
কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য আসে। নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক সরকার ১৯২৭ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দু-তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়। ১৯২৯-৩৩ সালের মহামন্দায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আক্রান্ত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে স্পর্শ করতে পারেনি। সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মর্যাদা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও ঘটে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মহাবিশ্বকে স্পর্শ করে স্পুটনিক। ১৯৫৯ সালে মহাশূন্যে প্রথম পাড়ি দেয় সোভিয়েত নভোচর ইউরি গ্যাগারিন। সব মিলিয়ে সোভিয়েতব্যবস্থা উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হয়। একটি পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে ওঠে ‘পরাশক্তি’।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই বেগবান হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় একডজন দেশ সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করে। চীনে বিপ্লব সফল হয়। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশ অর্জন করে রাজনৈতিক স্বাধীনতা। সদ্য স্বাধীন এসব দেশের জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা এর একটি অকাট্য প্রমাণ।
ব্যর্থতার কারণ
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে মার্ক্সবাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। এর পতনের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের বৈষয়িক সম্পদ ভোগের তৃষ্ণা পুঁজিবাদী দুনিয়ার মানুষদের চেয়ে কম ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের নাগরিকদের পরিপূর্ণ চাহিদা মেটাতে পারেনি। আরেকটি বিষয়ও রয়েছে—ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার অধিকার। শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে কোনো ইনসেনটিভ না থাকায় উত্পাদনে নিরুত্সাহ দেখা দেয়। মার্ক্সীয় সমাজতান্ত্রিকব্যবস্থায় সব ক্ষমতা ও সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে বলে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বা স্টেট ক্যাপিটালিজম। আর এই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ ভোগ করে মুষ্টিমেয় কিছু পার্টিনেতা ও আমলা। যে পুঁজিবাদী শোষণ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মার্ক্সবাদের জন্ম, শেষ পর্যন্ত তাদের আত্মসমর্পণ করতে হয় সেই পুঁজিবাদের কাছেই।

চীনে মাও জেদং-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্মৃতি

১৯৬৬ সালে চীনে মাও জেদং শুরু করেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এতে তার সহযোগী ছিলেন লক্ষ লক্ষ তরুণ - যাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল রেড গার্ড নামের এক বাহিনী।

তারই এক সদস্য বিবিসির লুসি বার্নসকে বলেছেন সেই বিপ্লবের সময় তারা কি করেছিলেন ।

তিনি বলছিলেন, "জন্ম থেকেই আমাদের শেখানো হয়েছে যে তিনি হচ্ছেন একজন মহান নেতা। আমরা মনে করতাম, তিনি একজন ঈশ্বর।"

সাংস্কৃতিক বিপ্লব যখন শুরু হয় তখন সো ইয়ংএর তখন বয়েস ছিল মাত্র ২০। চেয়ারম্যান মাও এর ব্যাপারে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ।

"তিনি পুরো দেশকে এবং দেশের মানুষকে মুক্ত করেছেন। তিনি গরীব মানুষকে উদ্ধার করেছেন। তাই তিনি আমাকে যা-ই করতে বলবেন, তার জন্য আমি আমার সমস্ত শক্তি এমনকি আমার জীবন দিয়ে দিতে রাজী ছিলাম।"

মাও্র সিদ্ধান্ত নিলেন তার পক্ষে তরুণদের সমবেত করতে। কমিউনিস্ট পার্টিকে পরিশুদ্ধ করতে তার এই বিরাট অভিযানে তারাই হবে তার আসল শক্তি। মাও তাদের নাম দিলেন রেড গার্ড।

"এটা হবে এক নতুন বিপ্লব - এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। যে বিপ্লব ঘটবে মানুষের চিন্তায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মনে যে সব পুরোনো ধ্যানধারণা আর অভ্যাস ছিল - সেগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। মাও বিশ্বাস করতেন, এগুলো কমিউনিজমের পথে অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।"

চীন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব
ছবির ক্যাপশান,

তিয়ান আন মেন স্কোয়ারে লাল বই হাতে রেড গার্ডরা

সো বলছিলেন, "আমি এতে যোগ দিলাম - কারণ এটা একটা গৌরবজনক ব্যাপার ছিল। শুধু মাত্র ভালো শ্রেণীর লোকেরাই এতে যোগ দিতে পারতো। এই 'গুড ক্লাস' মানে হলো শ্রমিক, কৃষক, ও বিপ্লবীরা। আর খারাপ শ্রেণী মানে হলো - বুর্জোয়া, জমিদার বা বিপ্লব বিরোধীরা।"

আনুষ্ঠানিকভাবে রেড গার্ড তখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তার আগেই বেজিংএর ছাত্রদের কাছে এটা হাজির হলো কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা প্রমাণের একটি সুযোগ হিসেবে।

খুব শিগগীরই সারা দেশে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো। ছাত্ররা এমনকি স্কুলের বাচ্চারাও হাতে লাল রঙের ব্যান্ড পরতে শুরু করলো তাদের আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য। তাদের বেজিং-এ আমন্ত্রণও জানানো হলো স্বয়ং মাওয়ের সামনে বিশাল সমাবেশে অংশ নেবার জন্য।

"আমরা অনেক আগে ঘুম থেকে উঠলাম। বাইরে তখনো অন্ধকার। আমরা বড় রাস্তার পাশে একটা গলিতে ঢুকলাম। সেখানে আমরা বাকি রাতটা অপেক্ষা করলাম। কারণ সকালে আমরা তিয়ান-আন-মেন স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে পদযাত্রা করে যাবো - আমাদের মহান নেতাকে দেখার জন্য।"

"মাও সেখানে ছিলেন তার আরো কয়েকজন কমরেডকে নিয়ে। সারা জীবন আপনি এই মহান নেতার জন্য দেশের জন্য কাজ করেছেন। আর আজ সেই মহান নেতা আমাদের স্বাগত জানাচ্ছেন, আমাদের কাছে দেখা দিচ্ছেন।"

কিন্তু তাদের বিপ্লবী উদ্দীপনা প্রদর্শন ছাড়া রেড গার্ডএর কাজটা ঠিক কি হবে তা কিন্তু তখনও স্পষ্ট ছিল না।

"আমরা কি করবো - এ ব্যাপারে কোন স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। কিন্তু আমরা নিজে নিজেই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। কারণ এতদিন কমিউনিস্ট চীনে থাকার পর এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে তারা পুরোনো সংস্কৃতিকে, কনফুসিয়াসের মতাদর্শকে ধ্বংস করে দেবার কথা বলছে । তাই সব রেডগার্ড ছাত্ররাই পার্টির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য ওই ক্ষেত্রেই লক্ষ্যবস্তু ঠিক করলো।"

তাদের ভাষায় যা-ই পশ্চাৎপদ, বা ক্ষয়িষ্ণু - তার বিরুদ্ধেই রেড গার্ডরা এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলো। তারা লোকের বাড়িঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ভেঙে দিতে লাগলো। যেসব প্রসাধনী বিক্রি করে এমন দোকানও ভেঙে দিতে লাগলো তারা। করো চুল বেশি লম্বা মনে হলে তাকে ধরে চুল কেটে দেয়া হতে লাগলো।

চীন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব
ছবির ক্যাপশান,

রেড গার্ডের সদস্যরা

চারটি পুরোনো জিনিসের বিরুদ্ধে শুরু হলো তাদের অভিযান । পুরোনো অভ্যাস, পুরোনো ধ্যান ধারণা। পুরোনো ঐতিহ্য আর পুরোনো সংস্কৃতি। পুরোনো যে কোন কিছুই আক্রান্ত হলো।

আপনি যদি পুরোনো আমলের কোন সামগ্রী পান - যে কোন আসবাব, আপনার যদি মনে হয় যে এটা আধুনিক নয়- আপনি ধরে নিলেন যে সেটা পুরোনো।যদি এমন কোন কাপড় চোপড়ও পাওয়া যায় - যা খুব বেশি রকমের সুন্দর - বেশি রংচঙে - আপনি বলে দিলেন, এটাও পুরোনো। এ ক্ষেত্রে রেডগার্ডের তরুণরা যা বলবে তাই।

সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বস্তু ছিলেন ভূস্বামীরা। এরা ছিলেন এক সময়কার ধনী এলিট।

"কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়টায় এই ভূস্বামীরা আর ধনী ছিলেন না। তারা ধনী ছিলেন ১৯৪৯ সালের আগে।কিন্তু আমরা ভাবলাম, তাদের বাড়িতে গেলে পুরোনো জিনিস পাওয়া যাবে। আমার মনে আছে, একটি পরিবার আতংকিত হয়ে পড়েছিল। তারা বললো - তোমরা যা নিতে চাও, নিয়ে যাও। কোন বাধাই দেয় নি তারা।"

চীন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব
ছবির ক্যাপশান,

রেড গার্ডদের সমাবেশ

সু-র মতো রেডগার্ডদের জন্য এই আন্দোলন ছিল খুবই উত্তেজনাকর। হঠাৎ তারা উপলব্ধি করলো তারাই যেন দেশ চালাচ্ছে। তারা দেশের সব জায়গায় যেতে পারছে। তারা যা বলছে সবাই তা করতে বাধ্য হচ্ছে।

যারা তাদের কথা শুনছিল না। তাদের জন্য প্রকাশ্যে অপমান করা হতে লাগলো। তাদের ভুল ধরিয়ে দেয়া হতে লাগলো। পুরো চীন জুড়ে রেডগার্ডরা এই কর্মসূচি চালু করলো - এর শিকার হলেন স্থানীয় কর্মকর্তারা এমন কি ছাত্ররাও। তাদের প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হতো, কখনো কখনো শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হতো।

"আমার কাজ ছিল শুধু সেখানে বসে থাকা এবং নানা রকমের শ্লোগান দেয়া। তবে কখনোই তা শারীরিক লাঞ্ছনার পর্যায়ে যায় নি।"

এই রকম গণ অপমান কর্মসূচির একটা বড় লক্ষ্য ছিল শিক্ষকরা। সারা চীন জুড়ে ক্লাসরুম আর লেকচার হলে শিক্ষকদের গালাগালি এবং অপমান করতো ছাত্ররা। তাদের পরিয়ে দেয়া হতো গাধার টুপি, বা তাদের ভুল স্বীকারের চিহ্ন । কাউকে কাউকে কলমের কালি খাইয়ে দেয়া হতো, বা মাথার চুল কামিয়ে দেয়া হতো। কারো কারো গায়ে থুথু ছিটানো হতো। অনেককে আবার মারধরও করা হতো। কিছু ক্ষেত্রে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।

"অল্প কিছু ছাত্র ছিল - যারা সত্যি খারাপ লোক ছিল। আমি তাদেরকে দেখেছি। এদের কেউ কেউ খুব পড়াশোনা করতো, কিন্তু হয়তো শিক্ষকের সমালোচনার শিকার হয়েছিল, তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সেটার প্রতিশোধ নিয়েছে। "

এদের কথায়, শিক্ষকরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী তাই তাদের বিশ্বাস করা যাবে না।

"আমার একজন মহিলা শিক্ষক ছিলেন তাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। তিনি খুব ভালো ছিলেন। তিনি সুন্দর সুন্দর পোশাক পরতেন। তার চেহারার যত্ন নিতেন। একজন তরুণ তার বেডরুমে ঢুকলো। তার সঙ্গে আরো ছেলেমেয়ে ছিল। একটি মেয়ে তার চুল কেটে দিল। আমি যখন সেখানে গেছি তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার চুল তখন কেটে দেয়া হয়েছে।

তাকে এভাবে অপমান করা হলো - কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না। তাকে উদ্ধার করতে পারলাম না। সে যে কি লজ্জা, কি বলবো। "

"১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আমি ভাবতে শুরু করলাম যে এটা আমরা কি করছি। আমি উপলব্ধি করলাম যে পরিস্থিতি মাও-এর নিয়ন্ত্রণে নেই। সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ন্ত্রণ করার কোন উপায়ও তার হাতে নেই। "

চীন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব
ছবির ক্যাপশান,

মাও জে দং, তিয়ান আনমেন স্কোয়ারে রেডগার্ডদের সমাবেশে

মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন পার্টির শোধনের জন্য। কিন্তু রেড গার্ডকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়লো। যে কেউ তাদের শিকার হতে পারতো।

"আমার মনে হলো, যদি কোন ভাবে আমার বাবার পারিবারিক পরিচয় প্রকাশ পায় - তাহলে আমার নিজের জীবনের কি হবে। আমাদের ভাগ্য যে আমরা দক্ষিণ চীনের বাসিন্দা ছিলাম। তাই আমাদের সামনে একটা বিকল্প ছিল : পালিয়ে হংকং চলে যাওয়া।"

সু ১৯৬৮ সালে হংকং পালিয়ে গেলেন। সেখানে তার সাথে কিচু আমেরিকান শিক্ষাবিদের পরিচয় হলো। তারা রেডগার্ডের সদস্য হিসেবে সুর অভিজ্ঞকতা নিয়ে একটি বই বের করলেন। সু ভবিষ্যত পরিকল্পনার ব্যাপারেও সাহায্য করলেন তারা।

"আমি সমাজ বিজ্ঞান পড়লাম , তার পর পলিটিকাল সায়েন্স পড়তে বার্কলি বিশ্ব বিদ্যালয়ে গেলাম। এখানে আমি আমার পরিবার ছেলেমেয়ে নাতিনাতনী নিয়ে বসবাস করছি। এখানে আমি তারা কেরিয়ার গড়েছি, ব্যবসা শুরু করেছি। আমার অর্ধনে এখন ১০০র বেশি লোক কাজ করে।"

সু এখন থাকেন সান প্রান্সিসকোর কাছে। এখানে তিনি একটি সফল কম্পিউটিং কোম্পানি চালান। কিন্তু এখনো তার মনে পগে রেড গার্ড হিসেবে তার অতীত জীবনের কথা।

"আমার বয়েস এখন ৭০। সেই রেড গার্ড প্রজন্মের বয়েসও এখন ৭০এর কোঠায়। আমি আশা করি যে তারা তাদের কৃতকর্মের কথা নতুন করে ভাববে, অনুশোচনা বোধ করবে। যাতে এই সাংস্কৃতিক বিপ্লেবর মতো মানবিক ট্রাজেডি আর কখনো না ঘটে।"

বিবিসি বাংলা

নারী দিবসের ইতিহাস

নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে আজকের পৃথিবী। আধুনিক বিশ্বে নারী-পুরুষ সমান অধিকার নিয়ে একইসঙ্গে সব স্তরে কাজ করছে। তবে নারীর ন্যায্য অধিকার নিয়ে কর্মস্থলে সফলভাবে কাজ করতে পারার পেছনে রয়েছে এক সাহসী সংগ্রামের ইতিহাস।
ঢাকা: নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে আজকের পৃথিবী। আধুনিক বিশ্বে নারী-পুরুষ সমান অধিকার নিয়ে একইসঙ্গে সব স্তরে কাজ করছে। তবে নারীর ন্যায্য অধিকার নিয়ে কর্মস্থলে সফলভাবে কাজ করতে পারার পেছনে রয়েছে এক সাহসী সংগ্রামের ইতিহাস।
১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা তাদের কাজের সময় ১২ ঘণ্টা থেকে আট ঘণ্টায় কমিয়ে আনার দাবিতে ও বৈষম্যহীন ন্যায্য মজুরি আদায়ের তাগিদে পথে নামেন। তাদের এ আন্দোলনে আটক হন অনেক নারী শ্রমিক।
পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে বস্ত্র শিল্পের নারী শ্রমিকরা কাজের সুস্থ পরিবেশ, সময় ও যোগ্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেন। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সেবছর সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নারীদের সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক দল পরের বছর অর্থাৎ ১৯০৯ সালে ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ জাতীয়ভাবে নারী দিবস পালন করে।
এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এতে অংশ নেয় ১৭টি দেশ থেকে আসা ১শ জন নারী প্রতিনিধি। এতে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ০৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন।
সম্মেলনে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯১১ সাল থেকে ০৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়।
এ ঘোষণা আলোড়িত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে। ১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথমবারের মতো অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মান ও সুইজারল্যান্ডের এক মিলিয়নেরও বেশি নারী যোগদান করে নারী দিবসের ৠালিতে। একই সঙ্গে এগিয়ে আসে পুরুষরাও। তারা নারীদের ভোটদান ও সরকারি অফিসে কাজ করার অধিকার আদায়ের দাবি জানান।
ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যেতে থাকে নারী অধিকার বিষয়ক সচেতনতা।
১৯১৩ সাল থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে রাশিয়া ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার পালন করে আন্তির্জাতিক নারী দিবস। ১৯১৪ সালের ০৮ মার্চ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার দাবিতে ইউরোপে নারীরা ৠালি বের করেন। সেবছর বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশেই দিনটি পালন করা হয়।
এদিকে, ১৯৭১ সালে ০৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম পালিত হয় নারী দিবস। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তজার্তিক স্বীকৃতি পায় নারী দিবস। সেই থেকে ০৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি'র বান্দরবান জেলা সম্মেলন সম্পন্ন

প্রেস বিজ্ঞপ্তি 

অদ্য ১৩ মার্চ ২০২০ ইং রোজ শুক্রবার সকাল ১১.৩০ ঘটিকার সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি  সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে দিনব্যাপী বান্দরবান জেলা শাখা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন শ্রীঃ রতন তঞ্চঙ্গ্যাঁ এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন শ্রীঃ বিমল কান্তি চাকমা, সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন শ্রীঃ অংশুমান চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন যথাক্রমে  - পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য শ্রীঃ চিত্র বিকাশ চাকমা, শ্রীঃ কমলেশ্বর চাকমা, শ্রীঃ আপ্রু মার্মা, শ্রীঃ চিংথোয়াইমং চৌধুরী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্রীঃ জ্ঞানপ্রিয় চাকমা। সম্মেলন সঞ্চালনা করেন শ্রীঃ রমেল চাকমা, সভাপতি, আদিবাসী শ্রমজীবী কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম, মহানগর। সম্মেলনে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন শ্রীঃ শান্তি বিজয় চাকমা, অর্থ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি।

    সম্মেলনে প্রধান অতিথি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হলে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি তিনি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার উপর জোর দাবী জানান। এছাড়া অন্যান্য বক্তারা সংগঠন জোরদার করার উপর গুরুত্বারোপ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও সকল প্রকার প্রতিক্রীয়াশীল অপশক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার করার জন্য সম্মেলনে উপস্থিত সকল প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকদের উদাত্ত আহ্বান জানান। বক্তারা আরো বলেন, বান্দরবান জেলায় পার্টি সংগঠন, যুব সংগঠন ও ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলার জন্য সংগ্রামী দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান।

 সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকের সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি হিসেবে শ্রীঃ রতন তঞ্চঙ্গ্যাঁ, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শ্রীঃ উবাথোয়াই মার্মা ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে শ্রীঃ মালেক বমকে নির্বাচিত করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট বান্দরবান জেলা কমিটি গঠন করা হয়।

পরিশেষে সম্মেলনে সভাপতি সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করে সম্মেলন সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

শুভেচ্ছান্তে 

(কমলেশ্বর চাকমা)
সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক 
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, 
কেন্দ্রীয় কমিটি।




Thursday, March 12, 2020

আমার ভাবনা

তারুণ্য শক্তির প্রতীক ছাত্র সমাজই
আজ অবহেলিত, উপেক্ষিত।
শুধু নেতৃত্বের অভাবে তারা আজ
দিশেহারা, পথভ্রষ্ট,বিপথগামী।
পার্বত্যচট্টগ্রামেরর জুম্ম ছাত্র সমাজ
আজ অবহেলায় রয়েছে।
তারা সভ্যজাতির মত আজ নাচে-গানে,
মদ-গাঁজা,প্রেম ভালোবাসার কাজে লিপ্ত।
মনে হয় আমরা পৃথিবীর একমাত্র সভ্যজাতি।
আজ সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্বভার
প্রবীণ, পরমত-অসহিষ্ণুদের হাতে।
তারা ভুলে গেছে ছাত্র সমাজের মধ্যেই
রয়েছে  অনন্ত শক্তি।
ভুলে গেছে সামাজিক কল্যাণব্রতে এ অমিত
শক্তিকে জাগ্রত করতে।
এর পেছনে রয়েছে নেতৃত্বের ছদ্মবেশে
এ দুরন্ত যৌবন শক্তিকে বিপথগামী
করার দুরভিসন্ধি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের যে ছাত্র সমাজ
জুম্মজনগনের নতুন আলো জ্বালাতে
পারত,কিন্তু পার্বত্যচট্টগ্রামেরর নেতৃত্বদানকারী
সংগঠনগুলো ছাত্র সমাজকেও
করে ফেলেছে বিভক্ত।
যারা জুম্মজনগনের  অধিকার রক্ষা,সংস্কৃতিকে
রক্ষা,ভাষা রক্ষা ইত্যাদি সমাজের কল্যাণ
করার কথা কিন্তু তারাই আজ নৈষ্কর্মের সহজ শিকার।
তাদের সামনে আজ নানা বাধা-নিষেধের প্রাচীর।
স্বার্থান্ধ নেতৃত্বই আজ ছাত্রসমাজকে
দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে।।ক্ষুদ্র দলাদলির
মধ্যে টেনে এনেছে।
তাদের হঠকারিতার জন্যই জুম্মছাত্রসমাজ
আজ বিচ্ছিন্ন, নিরুপায়, পথভ্রষ্ট।
জুম্মসমাজের অশৃঙ্খলতায়
মেতে উঠতেও দ্বিধাবোধ করেনা।
নৈরাজ্যে, হতাশায় বেছে নিচ্ছে
উচ্ছৃঙ্খলতার পথ।

আসুন জুম্মছাত্রসমাজকে দলীয় স্বার্থে
ব্যবহার না করে জুম্মজাতীয় স্বার্থে
কাজ করার সুযোগ দিই।
১৩ই মার্চ ২০১৫

Wednesday, March 11, 2020

আমার ভাবনা

আমাদের পূর্ব পুরুষেরা আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের জুম্ম জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন ।আমাদের মাঝে রোপন করেন করে গিয়েছিলেন এক বৈপ্লবিক চেতনার।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ১০ ভাষাভাষী ১১টি জাতিগোষ্ঠীকে জুম্মজাতীয়তাবাদের মাধ্যমে এক কাতারে নিয়ে এসে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আগামীর এক সম্ভাবনার।যার মূল নায়ক হলেন পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা।পাহাড়ী মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীর বুকে আমরাও যেন নিজ নিজ ভাষা,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করতে পারি সেই প্রচেষ্টাতেই জুম্মজাতীয়তাবাদ এবং জনসংহতি সমিতির উথথান।পাহাড়ী মানুষের প্রাণের সংগঠন জনসংহতি সমিতির আন্দোলনের সূচনা হতে জনগন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগীতার ফলে বিভিন্ন সময়ে জনসংহতি সমিতি বিপর্যের মধ্যেও আজো ঠিকে রয়েছে।পাহাড়ী মানুষের আন্দোলনের সূচনা হতে প্রতিক্রিয়াশীলগোষ্ঠী তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল,আজো আছে।এবংকি তৎকালীন জনসংহতি সমিতির মধ্যেও ছিল,যাদের কারণে আমাদের মহান নেতাকে জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছিল।মহান নেতাকে ৮৩' এর গৃহযুদ্ধে হারানোর পরও আমাদের পূর্বপুরুষের দমে যায়নি।আমাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা পুনরায় মহান নেতার দেখানো পথে হাটঁতে শুরু করেছিল।দুই দশকের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামের পর ৯৭' এ চুক্তির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলেও ছাত্র পরিষদের কিছু নেতা চুক্তির বিরোধীতা করে পাহাড়ে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করলে শুরু হয় পুনরায় গৃহযুদ্ধ।যার কারণে জনসংহতি সমিতির চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রামে ভাটা পড়ে যায়।ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুনের লাশের সংখ্যা শুধু বাড়তেই থাকলো।চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা ইউপিডিএফের পূর্ণস্বায়ত্বশাসন আদায়ের সংগ্রাম তা শুধু অধরাই রয়েগেল।যে আশা-আকাঙ্খা নিয়ে আমাদের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সে সব আশা-আকাঙ্খা থেকে আমরা ছিটকে যাচ্ছি আর যাচ্ছি।
দেশে জরুরী অবস্থার সময় জনসংহতি আবার আত্মকোন্দলে জড়িয়ে পড়লে পরবর্তীতে প্রকাশ্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং ১০ এপ্রিল ২০১০ জনসংহতি সমিতির এক পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা জনসংহতি সমিতি ঘোষণা করে ।ফলে পাহাড়ে ৩টি রাজনৈতিক সংগঠনের আবির্ভাব হয়,এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গড়ে উঠা শক্তিগুলো দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হয়ে গেল।পাহাড়ে রক্তের বন্যা বইতেই থাকলো অবিরাম! ১৫সালের দিকে এই সংঘাত কিছুটা কমে এলেও ১৭ সালের শেষের দিকে ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামে নতুন আরেকটি সংগঠ্নের আবির্ভাবে পাহাড়ে পাহাড়ে লাশের মিছিল চলতে থাকলো,যা আজো চলমান।
আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস গৌরব্বজ্বল ইতিহাস,তাদেরকে নিয়ে আমরা বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারি।কিন্তু আমরা কেন এমন হলাম? আমরা কি পারিনা সেই আন্দোলনের সূচনালগ্নে এমএনলারমার দেখানো পথে নিজেদের অগ্রসর করতে?যেখানে আমরা আমাদের ইতিহাসকে অক্ষুন্ন রাখার সেখানে আমরা ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে নিজেরা নিজেরা মরছি! পাহাড়ের মানুষ কখনো চায়নি তাদেরকে ঘিরে ৪-৫টি সংগঠন গড়ে উঠুক আর তাদেরকে নিয়ে রাজনীতি হোক।তারা চেয়েছিল সকলের সম্মিলিত একটি আন্দোলন,একটি বিপ্লব।যে বিপ্লবের মাধ্যমে পাহাড়ের অধিকার হারা মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে,বেঁচে থাকার ঠাঁই হবে।আমরা এখনো স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি সেখানে সাধারণ মানুষদের নিয়ে রাজনীতি গড়ে উঠা কখনো সুফল বয়ে আনতে পারেনা।আমাদের অধিকার আদায়ের প্রশ্ন যখন এক ও অভিন্ন তখন আন্দোলনে এক ও অভিন্ন কেন নয়?
জুম্ম জনগনের অধিকার আদায়ের পথে আমরা অসংখ্য সহযোদ্ধা,বন্ধু জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের এই বলিদানকে আমরা ব্যর্থ হতে দিতে পারিনা।আমরা নিজেরা নিজেরা অনেক মরেছি ,এখন সেই রক্তের বদলা হবে সম্মিলিতভাবে এক বিপ্লব,যার প্রতিপক্ষ হিসেবে সবসময় থাকবে শাসকগোষ্ঠী।

১২ই মার্চ ২০২০