১. “প্রাণ নেয়া যায় কিন্তু দেয়া যায় না। আমরা অস্ত্র হাতে নিয়েছি কারো প্রাণহরণের জন্য নয় বরং প্রাণরক্ষা করে দেয়ার জন্য।” বলেছেন, আমাদের মহাননেতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র আন্দোলনের পথ গ্রহণের প্রেক্ষিতে। এই বক্তব্য হতে বুঝা যায় তিনি প্রাণহরণের বিরোধী। কিন্তু তার উত্তরসুরী শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা জেএসএস সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান পদে থেকে আমাকে তার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও ২০০৬ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে তিন মেয়াদে (৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম কংগ্রেস) এগার বছর জেএসএস’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটি ও কার্যকরী কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ঘাতক দিয়ে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, গত ২৫ ফেব্রুয়ারী। তার কিছু স্তাবক প্রচার করতে থাকেন আমি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছি বলে আওয়ামী লীগের লোকেরাই আমাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
২. এযাবৎ শ্রী লারমার অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপ অনেক সহ্য করেছি। সহ্য করেছি তার চরম দুর্ব্যবহার। তার ঘাতকের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েও আমি প্রকাশ্যে মুখ খুলিনি। কিন্তু দিনদিন তার প্রতিহিংসামূলক, ষড়যন্ত্রমূলক ও স্বৈরাচারী কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের দলীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে আজ স্বয়ং সভাপতি সম্পর্কে এই বিবৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছি বিধায় আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। তার স্বেচ্ছাচারিতা, অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি, অসামাজিক কার্যকালাপ, গঠনতন্ত্রের অসংখ্য ধারা-উপধারা প্রতিনিয়ত লংঘন, প্রত্যাগত জেএসএস সদস্যদের কাছ হতে বাধ্যতামূলকভাবে চাউল সংগ্রহ (১,৯৬৮ জনের। প্রতিজনে বৎসরে চারশত কেজি=৭,৮৭,২০০ কেজি=৭,৮৭২ কুইন্টাল= ৭৮৭.২ মেট্রিক টন) ও খরচের ক্ষেত্রে জবাবদানে অস্বীকৃতি। এই সব বিষয়ে দ্বিমত পাষোণ করলে তিনি আমার ও পার্টির কয়েকজন শীর্ষ নেতা-কর্মীর উপর প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠেন। যার সূচনাকাল মূলতঃ ২০০৫ সালের মাঝামাঝি এবং যা পরিপূর্ণতালাভ করে ২০০৬ সালে। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও পার্টির একজন উপদেষ্টা এবং শ্রী লারমার ঘনিষ্টতম বন্ধু শ্রী অমিয় সেন চাকমাসহ অনেক বিশিষ্টজন ও ঢাকার কিছু সুশীল সমাজের শুভাকাঙ্ক্ষীকে অনুরোধ করেছিলাম তারা যেন আমাদের দলীয় সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখেন
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি তার নিজস্ব বাহিনী পার্টির জেলা কমিটির সদস্য ও বাঘাইছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান শ্রী সুদর্শন চাকমাকে রাঙ্গামাটি জজকোর্টের অনতিদূর হতে অপহরণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়। গত ২৬ এপ্রিল রাঙ্গামাটি শহরে আবার তার বাহিনী’ জেএসএস-র স্থানীয় নেতা (ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান) প্রগতি চাকমাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালায়। পরদিন সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে তার ঘাড় হতে অপারেশন করে একটি বুলেট বের করে দেয়া হয়। অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমার বাড়ীর দামী থাই গ্লাসের জানালা ভেঙ্গে দিয়ে তাকে হত্যার সুযোগ নিতে চাওয়া হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর ‘০৭ প্রাক্তন ছাত্রনেতা সুদীর্ঘ চাকমা ও আসীন চাকমাকে আঞ্চলিক পরিষদে ডেকে আমাকে ও আমার সহকর্মী রূপায়ণ দেওয়ান, সুধাসিন্ধু খীসা, তাতিন্দ্র লাল চাকমার ও গৌতম কুমার চাকমার বিরুদ্ধে শ্রী লারমা বিষাদগার করেন ও চরম পদক্ষেপ নেয়ার (গৌতম ব্যতীত) হুমকি দেন। তারা উভয়ে আমাদেরকে ডেকে বিষয়টা খোলাখুলি আলোচনা করতে অনুরোধ করেন। তিনি আলোচনায় সম্মত না হলে আমাদের বিরুদ্ধে গঠনতান্ত্রিক অবস্থায় বন্দি করতেও বলেন। আমাদের ৯ জনকে উপদলীয়-চক্রান্ত, দুর্নীতি, পার্টি-বিরোধী কর্মকান্ড ইত্যাদি অজুহাতে পার্টি হতে বহিস্কার করার জন্য তিনি গত সেপ্টেম্বরে কয়েকটি থানা কমিটি হতে একই কম্পোজ করা চিঠিতে পৃথকভাবে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি আমার কোন খোঁজ নিতে আসেননি কিংবা কাউকে পাঠাননি। এমনকি তিনি মিডিয়াকে কোন মন্তব্য করতেও সম্মত হননি। তার এক ঘনিষ্ট আত্মীয় “The Most Feudalist Shantu Larma” শিরোণামে ১লা মার্চ রূপায়ণ দেওয়ানকে লেখা এক চিঠিতে এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং এ জন্য শ্রী লারমাকে দায়ী করেছেন।
শ্রী লারমা বিগত ৩ বৎসর মেয়াদকালে আমাদেরকে মাত্র দুটি কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে (মার্চ ৪ ও ২১, ২০০৬ সাল) ডেকেছেন। ২০০৭-র ভেস্তে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ও সাম্প্রতিক ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্টির অংশ গ্রহণ সম্পর্কিত কোন নীতি নির্ধারণী আলোচনায়ও তিনি আমাদেরকে ডাকেননি। আমরা আশা করেছিলাম জরুরী অবস্থার সময় ঘরোয়া রাজনীতি উন্মুক্ত হলে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকবেন ও দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধসমূহ পদ্ধতিগতভাবে নিরসন করবেন। জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করা হলেও এযাবৎ কেন্দ্রীয় কমিটির কোন বৈঠক তিনি ডাকেননি। তবে গত ২রা মে তার পছন্দের কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে তার বাসভবনে কেন্দ্রীয় কমিটির এক বৈঠক তিনি করেন। এতে আমিসহ ১৭ জন কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপদেষ্টাকে তিনি বৈঠকে ডাকেননি। এই বৈঠকে শ্রী প্রণতি বিকাশ চাকমা (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তথা ভাগিনিজামাই), শ্রী সৌখিন চাকমা (উপদেষ্টা ও শ্যালিকাজামাই) ও তিনি স্বয়ং আমাদের বেশ কজনকে সেদিনই বহিস্কার করতে আপ্রান চেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বস্থসূত্রে জানা যায়, পাছে শ্রী লারমা বিভেদপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন সে ভয়ে আনীত অভিযোগসমূহ সামনা-সামনি আলোচনা করার প্রস্তাব দিতে গিয়েও বেশ ক’জন সদস্য সেদিন পিছু হটেছেন। ঐ বৈঠকে শ্রী লারমা বলেছেন- “আমি তাদেরকে কোন অবস্থাতেই বৈঠকে ডাকবো না। তাদেরকে বৈঠকে ডাকলেই তাদের সঙ্গে আমার মারামারি হবে।” গত ৪ঠা মার্চ কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ফলে জেএসএস খুব চরম গঠনতান্ত্রিক সংকটে আছে। এই ধরণের অবস্থা পার্টির ৩৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। সহজ কথা হচ্ছে- এই সংকটের কারনে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি অবৈধ এবং তার সকল সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমও অবৈধ। আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই- কেন শ্রী লারমা এই সংকট সৃষ্টি করলেন? এটা তার স্বেচ্ছাচারিতা না ব্যর্থতা? এর যথাযথ উত্তর শ্রী লারমাকে দিতেই হবে। এই সংকটের বৈধতা দেওয়ার জন্য শ্রী লারমার উচিত ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকা। কিন্তু তিনি তা না করে গত ২ তারিখ তার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপদেষ্টাদেরকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করার উদ্দেশ্যে গোপনে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডেকেছেন। বলতে গেলে গঠনতন্ত্রের প্রায়ই গুরুত্বপুর্ণ ধারা-উপধারাসমূহ তিনি লঙ্ঘন করে উপদলীয় চক্রান্তসহ ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন তার একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য।
৩. শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বেও তিনি পরমতঅসহিষ্ণু ও কর্তৃত্ববাদী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। একদিকে নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান অন্যদিকে কৌশলে বিভাজন করে রাখাই তার সূক্ষ কর্মীনীতি। নিজে ‘One and the only’ হয়ে থাকার জন্য কাউকে নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হতে দেননি। যেভাবে রাণীমৌমাছি ভ্রণেই স্ত্রী মৌমাছিদের হত্যা করে একক কর্তৃত্বের জন্য। প্রকান্ড বৃক্ষচারাকে ক্ষুদ্রপাত্রে রেখে যেভাবে বনসাইশিল্প চর্চা করা হয় তেমনি শ্রী লারমা তার বনসাই নীতি’ দিয়ে যোগ্য নেতা-কর্মীদের প্রতিবন্ধী করে রাখেন, তার নেতৃত্বের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য। একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে তাঁর সমসাময়িক কাউকে তিনি আন্দোলনে আনতে পারেননি। মহালছড়ির মাইসছড়ি হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক থাকাকালে নিজে এক শিক্ষককে স্কুলেই শারীরিকভাবে হামলা করেছিলেন। তার মারমুখি মনোভাবের কারণে দিঘিনালা হাই স্কুলে তার ছাত্ররা তাকে ‘শিগেরি কুরা’ (Hunting cock) নাম দিয়েছিল।
৪. সশস্ত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীভূত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশে এসেও শ্রী লারমার মৌলিক কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেয়ে তিনি বেপরোয়া হয়েছেন। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে শ্রী লারমা জেএসএস-কে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সংগঠনকে দুর্বল করেছেন। ফলে ব্যাপক কর্মীবাহিনী ও জনগণ এবং অহেতুকভাবে বিপদগ্রস্থ হয়ে আসছেন। তার চরম অহংবোধ, পরমত অসহিষ্ণুতা ও আচরণ জেএসএস ও আঞ্চলিক পরিষদকে বন্ধুহীন করে তুলেছে। আঞ্চলিক পরিষদের কমিটিসমূহকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ও দুটি কমিটির দুজন আহ্বায়ককে (রূপায়ণ দেওয়ান ও সুধাসিন্ধু খীসা) সকল কার্যক্রম হতে বেআইনীভাবে বাদ দিয়ে নিজেই সেসব নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি দম্ভভরে প্রকাশ্যে বলেন, “আমি বলপ্রয়োগের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি”। আদতে শ্রী লারমা সর্বাত্মকবাদে বিশ্বাসী। সর্বাত্মকদের দুটি ধারা- একটি মাকর্সবাদ অন্যটি ফ্যাসিবাদ । ফ্যাসিবাদের সকল বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে বিদ্যমান।
৫. বস্তুজগতে দ্বন্দ্ব চিরন্তন। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের সকল দ্বন্দ্বই সাধারনত অবৈরী। জেএসএস গঠনতন্ত্রের ১৭ নং ধারায় (গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নীতিসমূহ) এসব নিরসনের জন্য নির্দেশনাও রয়েছে। ঐক্য-সমালোচনা-এক নীতির ভিত্তিতে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা পদ্ধতিই হচ্ছে অবৈরী দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় । অথচ ২৬ নভেম্বর ২০০৬ অনুষ্ঠিত কর্মীসম্মেলনে শ্রী লারমা তার উদ্বোধনী ভাষণে তার লাইন (ধারা) যারা মানতে পারবে না তাদেরকে পার্টি হতে চলে যেতে বলেছেন। সেসময় কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শ্রী লক্ষী প্রসাদ চাকমা তার ভাষণে “আজ হতে তোমাদের সঙ্গে সীমারেখা টানা হয়ে গেল।” বলে ঘোষণা দেন। চাচা-ভাতিজার এই ঘোষণা শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা গঠনতান্ত্রিক নির্দেশনা ও পদ্ধতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়ে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে আহ্বান জানালে শ্রী লারমা তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেন। ৮ম জাতীয় সম্মেলনের পর পার্টির আভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরসনের জন্য শীর্ষ পর্যায়ে ৯জনকে নিয়ে একান্ত বৈঠক করার প্রস্তাবও এক সহ-সাধারণ সম্পাদককে দিয়ে শ্রী লারমার কাছে পাঠিয়েছিলেন শ্রী খীসা। আমিও ২০০৫ সালের শেষদিকে শীর্ষ পর্যায়ে ৫জনের মধ্যে বৈঠক করার প্রস্তাব দিই। উনি আমাদের উভয় প্রস্তাব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন। তিনি বরং ‘বৃদ্ধ হয়েছে কাজ করতে পারে না” -এই অজুহাতে ২০০৫ এর অক্টোবরে মাধবী লতা চাকমা, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্র শেখর চাকমা, গৌতম কুমার চাকমা, রূপায়ণ দেওয়ান ও তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে কেন্দ্রীয় কমিটি হতে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ফলে পার্টিতে চরম প্রতিক্রিয়া ও অস্থিরতা দেখা দিলে কৰ্মীরোষের ভয়ে তিনি কাউকে বাদ দিতে পারেননি। ৮ম জাতীয় সম্মেলন এক চরম গুমোট অবস্থার মধ্যে শুরু হলেও কেন্দ্রীয় কমিটির প্যানেলকে তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনির মাধ্যমে স্বাগত জানায়। কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে নিজে সভাপতি মনোনীত হওয়ার পরপরই জবরদস্তী করে শ্রী লারমা সম্পাদক মন্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে মনোনয়নের দায়িত্ব নেন এবং জাতীয় সম্মেলনকে স্তম্ভিত করে ঘনিষ্ট আত্মীয় ও অনুগতদের নাম ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গেই পুরো জাতীয় সম্মেলনে চরম হতাশা নেমে আসে। ৫ তারিখ, বিদায়বেলায় সীমিত সংখ্যক প্রতিনিধি ব্যতীত সকল প্রতিনিধিবৃন্দ চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে তার কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। ৮ম জাতীয় সম্মেলনের পর তিনি থানা ও জেলা কমিটিসমূহে তার নিজস্ব লোক ‘নিযুক্তি দিয়ে নির্লজ্জভাবে গঠন করেছেন।
৬. ২০০৫ এর নভেম্বরের প্রথমার্ধে ৮ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় কমিটি গ্রহণ করে। কিন্তু শ্রী লারমা শীতের তীব্রতার যুক্তি দেখিয়ে তা মার্চ, ২০০৬-র ১ম সপ্তাহে নেয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। যেহেতু জাতীয় সম্মেলনে ভোট হবে নিশ্চিত বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের শেষভাগে শ্রী লারমা আমাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেন দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে যাতে ৮ম জাতীয় সম্মেলন কোন ভোট না হয়। ‘আমি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে কথা বলে তাদের মতামতের ভিত্তিতে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিই । লিখিতভাবে প্রতিবেদন পেয়ে ও সুপারিশমালায় তিনি চরমভাবে রূষ্ট হন। আমার সুপারিশমালাকে তার তোষামোদি ও দুর্নীতিগ্রস্থ নেতা-কর্মীদেরকে দিয়ে তার পকেট কমিটি গঠন করার ষড়যন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করতে থাকেন। আমার সুপারিশ ছিল- (১) ক্ষমতার উচ্চাবিলাসী, দুর্নীতিগ্রস্থ, তোষামোদকারী ও বিতর্কিত কর্মীদেরকে কোন কমিটি না আনা; (২) যোগ্যতার ভিত্তিতে কমিটিসমূহ গঠন করা, প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নয়। প্রয়োজনে কমিটির সদস্য সংখ্যা কমানো ও (৩) সরাসরি কোন ব্যক্তিকে কোন কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত না করা।
৭. বিগত জরুরী অবস্থার সময় বহু নেতা-কর্মীকে জেলে যেতে হয়েছে। কয়েকশত কর্মী এলাকা ছাড়া হয়েছেন। এসব পরিবেশ মূলতঃ সৃষ্টি হয়েছে শ্রী লারমার হঠকারিতামূরক কার্যকলাপের কারনে। জুরাছড়ির কিনামোহন হত্যাকান্ডে কেন্দ্রীয় নেতাসহ চারজন সদস্যকে দুই বছর যাবৎ হাজত খাটতে হচ্ছে (একজন অতি সম্প্রতি জামিন পেয়েছেন) ও অনেক কর্মীর ভাগ্য অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। জেএসএস’র প্রত্যাগত সদস্য বান্দরবানের প্রিয় তঞ্চঙ্গা হত্যাকান্ডের মামলায়ও ৩ জন কেন্দ্রীয় নেতা ও আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য আগাম জামিন নিয়ে আছেন। কাপ্তাই থানা কমিটির সভাপতি বিক্রম মারমাকে মিথ্যা অস্ত্র মামলায় সাজা খাটতে হচ্ছে। ৮ সদস্যক কার্যকরী কমিটির ৫ জনই সাজাপ্রাপ্ত, জেলবন্দী ও জামিনে রয়েছেন। জরুরী অবস্থা যখন তুঙ্গে তখন বেআইনী কিছু পদক্ষেপের কারণে তিনি গ্রেফতারের আতংকে ভুগতে থাকেন। ফলে সরকারের প্রতি তার জঙ্গী মনোভাবের পরিবর্তন ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যায় । এতই আতংকিত হয়ে পড়েন যে ২০০৮ সালের এপ্রিলে বাঘাইহাট ঘটনার প্রেক্ষিতে নিজেতো সেখানে যানইনি এমনকি আঞ্চলিক পরিষদ হতেও কাউকে সেখানে পাঠাননি। আমাদেরকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য তিনি সংস্কারবাদী, সরকারের দালাল, সেনাবাহিনীর দালাল, নব্যচক্র, নিও-রেডিক্যাল, মেনশেভিক, রাজাকার-আলবদর-আলশামস, চুক্তি বিরোধী, বিভেদপন্থী ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করছেন। তিনি বলেন, তার জেএসএস সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান পদ দখল করার জন্য আমরা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছি। ঢাকার কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও আদিবাসী নেতার কাছে জরুরী অবস্থার সময় বলতেন- আমরা নাকি চরম জরুরী অবস্থার সময় তার বিরুদ্ধাচরণ করছিলাম। বিগত জরুরী অবস্থার সময় জুম্ম জনগণ ও মহান পার্টি অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ তার অনুসারীরা গত ৮ এপ্রিল রাঙামাটিতে এক সমাবেশে দাবি করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান সঠিক ছিল (৯/০৪/০৯, প্রথম আলো)। তাহলে জিজ্ঞেস করতে চাই পার্টির শীর্ষনেতা-কর্মীদের গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা ও সাজাও কি সঠিক ছিল?
৮. শ্রী লারমা তার উপর নির্ভরশীল করে রাখতে কোনদিন নেতা-কর্মীদের বৈষয়িক ক্ষেত্রেও আত্মনির্ভরশীল হতে দেননি। একটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা গড়ে তোলার জন্য অস্ত্রজমাদানের সঙ্গে সঙ্গেই সরকার হতে প্রত্যেকে প্রাপ্ত পঞ্চাশ হাজার টাকা হতে শেয়ার প্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে ২৩ দিনের মধ্যে এক কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু শ্রী লারমা বিগত ১১ বছরেও প্রতিশ্রুত এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দেননি। এ টাকা দুহাতে খরচ করে নিঃশেষ করেছেন। শান্তিচুক্তিতে প্রত্যাগত সদস্যদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিগত ১১ বছরেও তিনি এ বিষয়ে কিছুই করেননি। UNDP এর আওতায় থাকা পুনর্বাসনে তিনি কোনদিনই উদ্যোগী হননি। ফলে আমরা উদ্যোগী হয়ে এক বছর পূর্বে UNDP-র আবাসিক প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করলে এই পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। দুর্ভাগ্যজনক যে UNDP শ্রী লারমা হতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণ দেখিয়ে এই পুনর্বাসন স্থগিত করেছে।
৯. শ্রী লারমার ধ্বংসাত্মক নীতি জুম্ম জনগণ ও তাদের সকল শুভানুধ্যায়ীদেরকে চরমভাবে হতাশাগ্রস্থ করছে। জনগণ মরিয়া হয়ে শান্তি চায়। কিন্তু শ্রী লারমার বলপ্রয়োগের রাজনীতি পার্বত্য জনপদে অশান্তি ও হানাহানি ডেকে এনেছে। পার্বত্য জনপদের এই হানাহানিতে ও ব্যাপক সংগঠিত চাঁদাবাজিতে মানুষ আজ চরম অসহায়ত্বের জালে আবদ্ধ। তারা শংকিত কার মৃত্যুডাক কখন আসে। শ্রী লারমা ও সংশ্লিষ্ট সকলের উপলব্ধি করা উচিৎ ঐক্যই শক্তি ও ঐক্যই শান্তি। আজ জুম্মজাতি তথা পার্বত্যবাসী ঐক্য ও শান্তি চায়, বিভেদ নয়। শান্তি তথা বৃহত্তর ঐক্যের জন্য আমাদেরকে নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে।
১০. ২০০১, ২০০৭ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে শ্রী লারমা কারো সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যাননি। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে তিনি কর্মীবাহিনীকে আশাজাগানিয়া গান শুনিয়ে তিন জেলায় প্রার্থী দেন। পরবর্তীতে খাগড়াছড়ির আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ঠেকাবার জন্য বিএনপি’র অনুকূলে তার প্রার্থীকে প্রত্যাহার করে নেন। নির্বাচনে তার দুজন প্রাথী (রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হলে কর্মীবাহিনী চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। উপজেলা নির্বাচনেও লজ্জাজনক ফল করায় কর্মীবাহিনীর অধিকাংশ তার পাশ হতে সরে যায় । নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়া। নানিয়াচর উপজেলার এক মুরুব্বী সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে মন্তব্য করেছেন- “সন্তু লারমা অভিজ্ঞ, জ্ঞানী ও বিচক্ষণ তবে তা সঠিক সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে।” তিনি তার একগুঁয়ে মনোভাব চাপিয়ে দিয়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনে পাটিকে দুর্বল করেছেন। জুম্ম জনগণ তার চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন ভোটবিপ্লবের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সর্বকালের রেকর্ড পরিমাণ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। শ্রী লারমা কেন ধরতে পারলেন না জনগণ কি চান? তার কি উচিৎ ছিল না ২০০১ সালে নির্বাচন করার? তিনি তখন তার কর্মীবাহিনী ও ব্যাপক সমর্থকগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকায়ও নাম উঠাতে দেননি এবং নিজে এখনও ভোটার হননি। ২০০৭ সালের বাতিল হওয়া নির্বাচনে কর্মীবাহিনীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি প্রতারিত করেছিলেন যে, মহাজোট জেএসএস’র দুজনকে (রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) প্রার্থীতা দিয়েছে।
১১. তার অহংবোধ অত্যন্ত তীব্র। ড. কিবরিয়া, প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী, রাঙ্গামাটি এসেছিলেন অথচ শ্রী লারমা দেখা করার কোন আগ্রহ দেখালেন না। অর্থমন্ত্রী ড. সাইফুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন প্রাক্তন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী জনাব আলমগীর কবির। অর্থমন্ত্রী ব্যস্ততার জন্য দুইদিন পর সময় দিলে তার অহংবোধে লাগে এবং তিনি দেখা না করেই রাঙ্গামাটি ফিরে আসেন। যদিও জনাব কবির বারবার অনুরোধ করে বলেছিলেন- সন্তুদা সাইফুর রহমান সাহেব ভাল লোক, আপনাকে খালিহাতে ফিরিয়ে দেবেন না। আপনার রাঙ্গামাটির সব প্রোগ্রাম পিছিয়ে দিন। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার ৯ দিন আগে (৪/১১/০৬) সাক্ষাৎ করতে তার অফিসে আসেন PKSF এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে। পূর্ব নির্ধারিত সুচি হওয়া সত্বেও গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠির এক নেত্রীর সাথে তার ব্যস্ততার কারণে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রায় আধঘন্টা বসিয়ে রাখেন তার এপিএস-এর কক্ষে। সে ছাড়াও ঢুকিয়েছেন ও বের করেছেন পেছনের দরজা দিয়ে।
১২. শ্রী লারমরি কতিপয় উল্লেখযোগ্য স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ (১) দলীয় মতামত ছাড়া আঞ্চলিক পরিষদের সম্ভাব্য সদস্যদের নাম সরকারের কাছে পেশ করেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা নন এমন একজন ব্যক্তিকে জমি-জমার মালিকানা নেয়ার পরামর্শ দিয়ে পরিষদে আনতে চেষ্টা করে অনর্থক সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে পার্টির দূরত্ব বৃদ্ধি করেছেন এবং আঞ্চলিক পরিষদের দ্বায়িত্ব নিতে অযথা সময় নষ্ট করেছেন। (২) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব বিষয়ে দলে কারো সঙ্গে পরামর্শ না করেই শ্ৰী কল্প রঞ্জন চাকমার নাম প্রস্তাব করেন। (৩) ২০০০ সালের ভোটার তালিকা প্রণয়ণে বিরোধিতা করার ঘোষণা দলের কারো সঙ্গে না করেই দিয়েছেন। (৪) ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্তও দলকে চাপিয়ে দিয়েছেন অথচ নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে একক সিদ্ধান্তে বিএনপি’র পক্ষে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে সমর্থন দিয়েছেন। (৫) ৮ম জাতীয় কংগ্রেসে গঠনতন্ত্রের ১৯(৪) ধারা লঙ্ঘন করে দুইজন কেন্দ্রীয় সদস্যকে সম্পাদক না হওয়া সত্বেও কার্যকরী কমিটিতে এনেছেন। তাছাড়া (৬) একই ধারা লঙ্ঘন করে ৮ম জাতীয় সম্মেলনের কার্যকরী কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটি সম্পূর্ণ অবৈধ। যেহেতু এটি কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে গঠন না করে ৭জনের উপস্থিতিতে ৮জনকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে। তিনি এমনকি পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটি হতে এই কমিটির অনুমোদন নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি। (৭) গঠনতন্ত্র অনুসারে কোন মিটিং না ডেকে বা কোন গঠনতান্ত্রিক পদক্ষেপ না নিয়ে আমাকে ও অন্য ক’জন শীর্ষ নেতা-কর্মীকে পার্টি হতে বর্জন করেছেন এবং বহিস্কার ও হত্যা করার প্রচেষ্টায় আছেন। (৮) চুক্তিপক্ষের পাহাড়ী ছাত্র পরিষদকে (পিসিপি) দ্বিখন্ডিত করে দিয়েছেন ২০০৮ সালে এবং অনুসারী গুটিকয়েক শাখা নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করেন। (৯) পার্টিকে পাশ কাটিয়ে নিজের মতামত ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য তার নিজস্ব তোষামোদী ও বিশেষ বাহিনী পোষেন। (১০) জে এসএস’র আভ্যন্তরীণ সমস্যাকে আঞ্চলিক পরিষদে নিয়ে গেছেন ও আঞ্চলিক পরিষদ ক্ষমতার অপব্যবহার এর মাধ্যমে পরিচালনা করছেন। (১১) জুম্ম জাতিকে তিনটা গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন। (১২) জেএসএস প্রত্যাগত সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসার এক কোটি টাকার তহবিল নিঃশেষ করে দিয়েছেন । (১৩) তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ২০০৫ সালে একক সিদ্ধান্তে হিলট্রাক্টস এনজিও ফোরামে নিজস্ব প্যানেল দিয়ে এই ফোরামকে দ্বিধা বিভক্ত করে দিয়েছেন। আরো কতিপয় এনজিও ও হিল পয়েন্ট স্কুলে অন্যায় পক্ষাবলম্বন করে এই প্রতিষ্ঠানসমূহের চরম ক্ষতি করেছেন। (১৪) বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি হিসেবে তাকে পেয়ে দেশের আদিবাসী নেতৃবৃন্দ উজ্জীবিত হলেও ফোরামের অস্বচ্ছতা ও সুষ্ঠ জবাবদিহিতার অভাবের কারণে কিছু নেতা ফোরাম থেকে সরে গেছেন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন । (১৫) আমাদেরকে বহিস্কার করার জন্য গঠনতন্ত্র লঘন করে গত ২রা মে তিনি তার শুধুমাত্র নিরাপদ কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির এক গোপন সভা করেন।
১৩. শ্রী লারমা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় বিশ্বাসী নন। তিনি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী, সচেতন আনুগত্যে নয়। তিনি তোষামোদী কর্মী চান, ব্যক্তিত্ববান ও আদর্শবান কর্মী নয়। তার কাছে এখন সুধী সমাজের কাউকে দেখা যায় না। আঞ্চলিক পরিষদ “অসদাচারণ এর মাধ্যমে পরিচালনার ফলে চরম কর্মকর্তা শূন্যতায় আছে। খাগড়াছড়ি জেলায় তিনি যাচ্ছেন না আজ তিন বছর। তিনি এখন রাঙ্গামাটি শহরের চেয়ারম্যান। তার দীর্ঘদিনের শীর্ষনেতৃবৃন্দও তার পাশে নেই। যে কজন সৎ ও যোগ্য নেতা-কর্মী এখনও তার পক্ষে রয়েছেন তাদের সাথেও মানসিক দূরত্ব ব্যাপক | তারাও লারমাবিহীন জেএসএস’র কথা ভাবছেন। তার অন্ধঅনুগত কর্মীদেরও মোহমুক্তি ঘটেছে। তার সুবিধাভোগী কর্মীরাই দলের বিভাজন চান, দ্রুত ক্ষমতায় গিয়ে নেতা হবার মানসে। তার ভরসা পিসিপি-র একাংশ। তাদেরও মোহমুক্তি ঘটেছে সাম্প্রতিক নির্বাচনকেন্দ্রীক ব্যর্থতা, আমাদের উপর হামলা ও তার অব্যাহত হঠকারীমূলক কার্যকলাপে । শ্রী লারমা ভালই জানেন হিটলার ও মুসোলীনির পরিণতি কী হয়েছে। মার্কোস ও শাহ রেজা পাহেলভি-র জীবনের শেষ কটাদিন কাটাবার জন্য বিশাল পৃথিবীতে কোথাও ঠাঁই হচ্ছিল না। হাইলে সেলাসী ও পলপটের পতন তিনি দেখেছেন। টেলিভিশনের বদৌলতে তিনি দেখেছেন চসুশকো-র বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ও গণহামলা। তবুও তিনি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চাইছেন না। তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের সব অর্জন তিনি নিজেই ধ্বংস করলেন। মান-মর্যাদা-প্রতিপত্তি সবই। তলানির শেষটুকু থাকতেই তার সন্মানজনক অব্যাহতি নেয়াই শ্রেয়। ছিল। তার উচিত ছিল রাজনৈতিক সন্যাসে যাওয়ার। শ্রী লারমাকে বলছি- আপনার যদি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ ও গঠনতন্ত্রের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকে তাহলে গঠনতন্ত্রের ৭ নং ধারার (পার্টি সদস্যদের অধিকারসমূহ) ৩ উপ-ধারা, ৯ নং ধারার (বহিস্কার) (গ) উপ-ধারা, ১৩ নং ধারার (অভিযোগ সম্পর্কে) ২ উপ-ধারা ও ১৫ নং ধারার (পাটি শৃঙ্গলা) ৪ উপ-ধারা অনুযায়ী আমাদেরকে বিচার করতে পারেন। তা না করে কেন আপনি গোপনে বহিস্কার করতে চাইছেন?
১৪. আমার চিকিৎসার জন্য যারা আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন, যারা আমার খোঁজ নিয়েছেন, যারা শ্রী লারমার ভয়ে আসতে না পেরে ফোনে শুভকামনা জানিয়েছেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যারা আমার মঙ্গল কামনা করে এ হামলাকে নিন্দা জানিয়েছেন, যারা আমার জীবনের জন্য অশ্রু ফেলেছেন, ডাক্তার-নার্স-হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফ ও আমার সহকর্মী যারা চিকিৎসাকালীন যত্ন নিয়েছেন তাদের সবাইকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেয়ার জন্য দ্রুততম সময়ে এ্যাম্বুলেন্সখানা দেয়ার জন্য। মিডিয়াকর্মীদের ধন্যবাদ জানাই পিলখানা ঘটনার কারণে অনেক সংবাদের গুরুত্ব হারালেও আমার উপর হামলার ঘটনা দেশবাকে জানানোর জন্য।
১৫. জেএসএস’র প্রতি আস্থাশীল ছাত্র-যুব-নারী সমাজ, জুম্ম শরণার্থী, জুম্ম জনগণ ও পার্বত্যবাসী, বিদেশে বসবাসকারী জুম্মসমাজ, সুধী সমাজ ও দেশী-বিদেশী শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আমার আন্তরিক আবেদন- আসুন সবাই শ্রী লারমাকে বর্জন করে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথকে সুগম করি। মিডিয়ার বন্ধুদের প্রতি আহবান- আপনারা নির্ভয়ে শ্রী লারমার সকল অনিয়ম, বেআইনী কার্যকলাপ ও দুর্নীতির প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করুন। সংগ্রামী কর্মীবাহিনীর প্রতি আহবান- আপনারা সক্রিয়, ধৈৰ্যশীল, সতর্ক, ন্যায় ও অংইনের পথে থাকুন। প্রত্যাগত জেএসএস সদস্যদের প্রতি আহ্বান- আপনাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যাপারে শ্রী লারমার কোন মাথাব্যথা নেই। তিনি চান অধিকার আদায় আন্দোলন নতুন করে শুরু করার নামে আপনাদেরকে আবার জঙ্গলে ঢুকিয়ে তার টাকা কামাই করার মেশিন বানাতে। তাই আওয়াজ তুলুন- আমাদের পুনর্বাসন দিতে হবে ও আমাদের ব্যবসার এককোটি টাকা ফেরত দিতে হবে। জেএসএস-র কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপদেষ্টাদের প্রতি আহবান- শ্রী লারমার স্বৈরাচারী ও গঠনতন্ত্র বিরোধী কার্যকলাপের দায়দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন না। যেহেতু মহান পাটির সভাপতির দায়িত্ব সন্ত্র লারমার হাতে নিরাপদ নয় সেহেতু লারমা বিহীন একটি শক্তিশালী জেএসএস গঠনে সক্রিয় হোন। গত ২ তারিখের বৈঠকে শ্রী লারমা আমাদেরকে বহিস্কারের যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তা আপনারা (১৯জন, ভেস্তে দিয়েছেন সেজন্য আন্তরিক স্বাগত জানাই। আঞ্চলিক পরিষদের সম্মানিত সদস্যদের প্রতি আহ্বান শ্রী লারমা আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ১৪ নং ধারার (গ) উপ-ধারা লঙ্ঘন করে (অসদাচারণ বা ক্ষমতা অপব্যবহার করা। “ব্যাখ্যাঃ এই উপ-ধারায় ‘অসদাচারণ” বলিতে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ইচ্ছাকৃত কুশাসনও বুঝাইবে।”) স্বেচ্ছাচারিত চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় হতে প্রাপ্ত খাদ্যশষ্য বিতরণে কূট-কৌশল চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ‘অসদাচারণ’ এর দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন না। তাকে অপসারণের ব্যবস্থা করে আঞ্চলিক পরিষদকে রাহুমুক্ত করুন। স্থানীয় প্রশাসন তথা সরকারের প্রতি আহ্বান- শ্রী লারমা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ব্যবহার করে তার সরকারী বাসভবন ও গাড়ী আততায়ীদের নিরাপদ আশ্রয় এবং নিরাপদবাহন হিসেবে ব্যবহার করছেন ও সন্ত্রাসী লালন করছেন। সুতরাং, এসব বেআইনী কার্যকলাপ বন্ধে আইনানুগ দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
বিনীত
শ্রী চন্দ্র শেখর চাকমা
সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
বাড়ীঃ চম্পকনগর, রাঙ্গামাটি, ফোন: ০৩৫১-৬১৭০৪
১৭ মে, ২০০৯, রবিবার