Friday, September 19, 2025

জুম চাষ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী এবং বর্তমান অবস্থান- দয়ানন্দ ত্রিপুরা

দয়ানন্দ ত্রিপুরা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে যে বিস্তৃত পাহাড়ীয়া অঞ্চল তারই নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি এই তিনটি জেলা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। ভৌগলিকগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমনি বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে সম্পূর্ন স্বাতন্ত্রের অধিকারী তেমনি এই অঞ্চলের গাছপালা, পশু পাখি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জনসমষ্টি এবং জনসমষ্টির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষা ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন প্রকৃতির। আর এই ভিন্ন প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিপুরা হচ্ছে এই অঞ্চল তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অন্যতম আদিবাসী জনগোষ্ঠী।

ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছে। তৎমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলাতেই বাংলদেশের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের বসবাস। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল তথা কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকার রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায়ও অদ্যাবদি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসতি লক্ষ্য করা যায়।
পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা মূলতঃ জুমচাষের উপরই নির্ভরশীল। যদিওবা সময়ের বিবর্তনের কারনে শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতির ফলে পেশাগতভাবে ত্রিপুরাদের মধ্যে কিছুটা পরির্বতন এসেছে এবং সমতল ভূমি তথা জমি চাষের ক্ষেত্রে অনেকাংশ অভ্যস্থ হয়েছে। তথাপি পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ অদ্যাবদি ঐতিহ্যগতভাবে জুম চাষের উপরই নির্ভরশীল এবং জুমচাষের মধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। জুমচাষ এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যে এতটাই গভীরে প্রোথিত এবং প্রভাবিত করেছে যে, একে ঘিরেই ত্রিপুরাদের রীতিনীতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি কাঠামো অনেকাংশে গড়ে ওঠেছে। কিন্তু বর্তমানে জুম চাষের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তবে সেই পরির্তন যতনা পদ্ধতিগত তার চাইতে উৎপাদনের ক্ষেত্রেই বেশি হয়েছে। এবং এই উৎপাদনীয় পরিবর্তন ইতিবাচক নয়, নৈতি বাচক। নৈতিবাচক হল জুম চাষে আর আগেকার মত উৎপাদন না হওয়া কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধি করনের জন্য যথাযথ আধুনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে না পারা। ফলশ্রুতিতে জুমচাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। আর এই অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়াতে সকল ক্ষেত্রে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সার্বিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ন্যায় অগ্রসর হতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জুম চাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সার্বিক চিত্র কী রকম (?) সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। একটি এনজিওর "অংশ গ্রহনমূলক গ্রামীন সমিক্ষা "জরিপে অংশগ্রহনের সুবাদে এবং ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরামের কর্মী হিসাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ত্রিপুরা গ্রামগুলোতে সাংগঠনিক সফরে অংশ গ্রহণ, সর্বোপরি আমার একান্ত ব্যাক্তিগত আগ্রহে পাবর্ত্য অঞ্চল, বিশেষ করে খাগড়াছড়ি জেলার অনেক দূর্গম পাহাড়ীয়া অঞ্চলের ত্রিপুরা পল্লীগুলোতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এবং সেই সুবাদে সেই সব জুমচাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থা, জীবনবোধ এবং জীবিকা নির্বাহের প্রকৃত অবস্থা একান্ত আপনভাবে কাছে থেকে দেখেছি, শুনেছি, সর্বোপরি বুঝতে চেষ্টা করেছি।
আসলে যা দেখেছি, যা শুনেছি এবং যা উপলব্ধি করতে পেরেছি বাস্তবে মুখোমুখি না হলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের সামগ্রিক অবস্থা জানা ও উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন হবে বৈকি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মত একটি ক্ষুদ্র পরিসরে, একটি ক্ষুদ্র ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে এত ভিন্নতার শেকড় ছড়াতে পারে ভাবতে অবাক লাগে। অথচ যখন কিছুটা শহর অঞ্চল তথা রাঙামাটি সদরের ত্রিপুরা পরিবারগুলোতে যাই কিংবা খাগড়াছড়ির মিলনপুর, খাগড়াপুরের ত্রিপুরা পরিবার গুলোতে যাই তখন মনে হয় ত্রিপুরারা বুঝি সবাই অগ্রসর হয়েছে, সবাই সচেতন হয়েছে। আর যখন ঐ সব প্রত্যন্ত অঞ্চলের ত্রিপুরা গ্রামগুলোতে যাই তখনই বুঝতে পারি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ কোন অবস্থায় আছে, কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে, জীবন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। বলতে গেলে উপত্যকা থেকে পাহাড় চূড়ার চড়াই উৎড়াইয়ের মতো তাদের জীবন প্রবাহ। পার্বত্য অঞ্চলের কালো পাহাড়কে ঘিরেই তাদের দিন রাত্রি, হাসি কান্না, বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। তাদের বেশি কিছু চাওয়া নেই, বেশি কিছু স্বপ্ন নেই, নেই বেশি কিছুর প্রত্যাশা। তাদের চাওয়া বলতে, স্বপ্ন বলতে, প্রত্যাশা বলতে, শান্তিতে শত পরিশ্রমের পর দু'মুঠো ভঙ, ভালো জুম ভূমি এবং জুম চাষে ভালো ফসলের প্রত্যাশা। একবিংশ শতাব্দিতে এসে অন্যান্য জনগোষ্ঠী যখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগ পেরিয়ে তথ্য প্রযুক্তি
যুগে প্রবেশ করেছে, সেখানে একটা জাতির বৃহৎ অংশের এই পশ্চাদপদতা একটু হতাশাজনক বৈকি।
আগেকার দিনে, এমনকি কয়েক দশক আগেও জুমচাষ একটি লাভজনক পেশা ছিল। জুমে নাকি এমন সব ফসল উৎপাদন করা যেত, বাজার থেকে শুধু মাত্র লবন ছাড়া কিছু কিনতে হত না। জুমচাষে তখন উৎপাদনও হত প্রচুর। কয়েক কাঠা ধান বপন করলে প্রচুর ধান পাওয়া যেত। কিন্তু জুমচাষীদের কাছে সেই সব কাহিনী এখন গল্পের মত শোনায়। জুম চাষে এখন আর আগের মত উৎপাদন হয় না। জুমচাষ করার জন্য এখন আর আগের মত উর্বর এবং ভাল জায়গা পাওয়া যায় না। আগে জুম চাষ করার জন্য প্রচুর জায়গা ছিল। কিন্তু এখন? এখন তা আর নেই। সময় বদলানোর সাথে সাথে কৃত্রিমভাবে-বিশেষ করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মান, অবৈধ বসতি স্থাপনসহ বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভূমি বেদখল ইত্যাদি কারণে জুমভূমিগুলো এখন জনপদে পরিনত হয়েছে। কিংবা কোন অলাভজনক সরকারী বা বনবিভাগের বাগানে পরিনত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা কিন্তু এত ব্যাপক হারে জুম চাষী হওয়ার কথা ছিলনা। বরং বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার অনেক চাষযোগ্য সমতল জমি ত্রিপুরাদের আওতায় ছিল। বর্তমানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা কেন সেই সব সমতল জমিগুলো হারিয়েছে হয়ত অনেকেরই সেই প্রশ্নের উত্তর জানা আছে।
১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের কারণে যে হাজার হাজার জমি ডুবে গিয়েছিল এবং জমি ডুবে যাওয়াতে অনেক আদিবাসী বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকেরা খাগড়াছড়িতে উদ্বাস্ত হয়ে চলে আসে। কিন্তু ঐ সমস্ত উদ্বাস্তরা খাগড়াছড়িতে আসার আগে মূলতঃ ত্রিপুরারাই ছিল খাগড়াছড়ি জেলার অন্যতম জনগোষ্ঠী। এবং ত্রিপুরাদের তৎকালীন সময়ে অনেক সমতল জমিজমা ছিল বলে জানা যায়। ঐ সমস্ত জমি জমাগুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দখলীয় ছিল, বন্দোবস্ত ছিল না। ফলে অনেক বছর ধরে ভোগ দখলকৃত জমিগুলো বন্দোবস্তহীনতার অজুহাতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উদ্ভাস্ত হয়ে আসা চাকমাদেরকে দিয়ে দেয়। এবং কোন কোন ক্ষেত্রে চাকমাদের দ্বারা জমিজমাগুলো কৌশলগত আগ্রাসনের শিকার হয়। যার ফলে অনেক ত্রিপুরা পরিবার তৎসময়ে জমি হারিয়ে, জমিচাষ সেরে জুম চাষে ঝুঁকে পরে।
এরপর ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮৭-৮৯ সালের দিকে সুদূর প্রসারি চিন্তা করে সম্পূর্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পার্বত্যাঞ্চলে বাঙালী বসতি স্থাপন করেন। এই বাঙালী বসতি স্থাপন এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগনের উপর এততাই বিরুপ প্রভাব ফেলেছে যে, সেখানে শুধু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী নয়, এই অঞ্চলের সমগ্র আদিবাসী জনগন এখন অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকির সম্মুখীন। অধিকন্তু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর যে কিছু অংশের সমতল ভূমিগুলোতে বসতি ছিল সেখান থেকে উচ্ছেদ হতে বাধ্য হয়েছে। যারা উচ্ছেদ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিকগত গঠনের কারণে তারাও পাহাড় তথা জুমচাষ যোগ্য অঞ্চলগুলোতে উদ্বাস্ত হতে বাধ্য হয়েছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার জুম চাষে ঝুঁকে পড়েছিল।
আজ যখন, খাগড়াছড়ির গুমতি, রাম্ভাদেবা, গরগরিয়া নাল, অযোধ্যা, বেলছড়ি, চোংড়াকাপা, তাইনদং, ত্ববলছড়ি, বড়নাল, বান্দরছড়াসহ অনেক এলাকাগুলোতে গেলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সমতল ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার জলন্ত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই। এই সমস্ত এলাকার বিস্তৃত জমিগুলো কয়েক দশক আগেও ত্রিপুরাদের ছিল। কিন্তু এখন সেই সমস্ত এলাকায় ত্রিপুরাদের জমি-জমাগুলো বসতিকারীদের দখলে। কোন কোন এলাকায় এমনও আছে যে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা নিজেদের জমিজমাগুলো বাঙালীদের কাছে হাতবদল হয়ে উল্টা নিজের জায়গায় ভাড়াটিয়া হিসাবে থাকতে হচ্ছে। কি নির্মম পরিহাস! তাই আজ সেই সমস্ত এলাকার পাহাড়ী নদী ও ঝর্নাগুলোতে মিশে আছে জমি হারানো অনেক ত্রিপুরার চোখের পানি, বাতাসের সাথে মিশে আছে ক্রন্দনের দীর্ঘ শ্বাস।
এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সামাজিক রাজনৈতিক কারনসহ বৃহৎ জনগোষ্ঠী কর্তৃক কখনো সলে, কখনো বলে, কখনো কৌশলে আগ্রাসনের ফলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী আজ অস্তিত্বের সম্মুখীন। সুতরাং বলা যায় যে শহর অঞ্চলের কয়েকটি ত্রিপুরা পরিবার দেখে সমগ্র ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মূল্যায়ন করা যায়না। অধিকন্তু একটা বৃহৎ অংশের এই পশ্চাদতা ও অনগ্রসরঅবস্থা জাতীর সার্বিক অগ্রগতির জন্য মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। সুতরাং সমগ্র ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সকলের মতপার্থক্য ভুলে কাজ করতে হবে আমাদের, এগিয়ে যেতে হবে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে।

প্রকাশিত বই ও সময়ঃ সান্তুআ জার্নাল, বৈসু ও ত্রিপুরা নববর্ষ সংখ্যা, এপ্রিল ২০০২ খ্রি., ১৪১২ ত্রিপুরাব্দ, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ।

Friday, August 22, 2025

অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা- সুধাসিন্ধু খীসা

লেখক- সুধাসিন্ধু খীসা
বিভিন্ন ভাষা-ভাষী জুম্ম জাতির আবাস ভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস শাসন শোষণ ও নির্যাতনের ইতিহাস। বৃটিশ শাসনামলে ও পাকিস্তানী শাসনামলে এই দেশে ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্মদের কোন ভাবেই ছিলোনা শাসন ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের অধিকার, ছিলোনা সত্যিকার অর্থে কোন গণতান্ত্রিক অধিকার। যখনই জুম্ম জাতির উপর কোন না কোন ভাবে নেমে আসতো প্রচুর শোষণ ও নির্যাতন, তখনই তারা নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তো। গণতান্ত্রিক অধিকারের অনুপস্থিতির কারণে ঘরবাড়ী ছেড়ে পালানোই ছিল তাদের একমাত্র পথ।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ সমাপ্তের পর লক্ষাধিক জুম্ম হারালো তাদের জমি ও বাস্তুভিটা। কোন প্রতিবাদ ছাড়াই হারালো দেশ, পাড়ি জমালো ভারত ও বার্মায়। তাদের আর নিজের দেশে, ঘরে ফেরা হলো না। ৫০ দশকের শেষ ও ৬০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে জুম্মদের শিক্ষিত যুবশক্তির একটি ক্ষুদ্র অংশ বুঝতে পারলো, পৃথিবী নামক গ্রহে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত সূচাগ্র জায়গাও আর তাদের জন্য অবশিষ্ট নেই। অপর দিকে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিকে ফাঁকি দিয়ে পার্বত্য জনতার অজ্ঞাতগোচরে উক্ত শাসন বিধিতে চলেছে দফায় দফায় কাটা ছেঁড়া।
শাসকগোষ্ঠীর আশীর্বাদে পার্বত্য চট্টগ্রামে হু হু করে বেড়ে চলেছে অ-উপজাতীয় অনুপ্রবেশ। পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময় এবং তার আগে ও পরে তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে এবং বাংলাদেশের সূচনালগ্নে বাম, মধ্য ও দক্ষিণ- প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তিত্ব ও নেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিলো। কোন রাজনৈতিক নেতাই তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। অনেকে সমস্যার কথা ধৈর্য্য সহকারে শুনতে পর্যন্ত রাজী ছিলেন না, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি, বরং অত্যাচার নিপীড়ন বেড়েছে বহু গুণে এবং অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত শাসনতন্ত্রের ছত্রছায়ায়। চিন্তায়, চেতনায় গুণে, গরিমায়, ত্যাগ, তিতিক্ষায় সবচেয়ে অগ্রগামী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও জ্যোতিরিন্দ্র বোধি প্রিয় লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে গড়ে উঠলো অধিকার আদায়ের আন্দোলন। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ যখন হলো একেবারে রূদ্ধ, তখন সে আন্দোলন সশস্ত্র আন্দোলনে রূপান্তরিত হলো, শাসক গোষ্ঠী হয়ে উঠল ব্যতিব্যস্ত, হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য, চালাতে শুরু করলো অত্যাচার ও নিপীড়নের স্টিম রোলার। শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘ দিনের নগ্নরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়লো, শুরু হলো শক্তি প্রয়োগ করে জুম্মদের উচ্ছেদ কার্যক্রম, সেই সাথে সরকারের উদ্যোগে হাজার হাজার অ উপজাতীয় পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা শুরু হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের কথা বিশ্বের মানবতাবাদী, গণতন্ত্রমনা ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব বুঝতে পারলো। বুঝতে পারলো শাসকগোষ্ঠীর আসল রূপ। অনেক পরে আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও ন্যায় পরায়ণ ব্যক্তিত্ব কিছুটা বুঝতে পারলো প্রতিটি বস্তুর থাকে দুটি দিক এবং তা পরস্পর বিরোধী ভালোর সাথে মন্দের, হাসির সাথে কান্নার, পতনের সাথে উত্থানের, জন্মের সাথে মৃত্যুর, প্রগতির সাথে প্রতিক্রিয়ার, জয়ের সাথে পরাজয়ের ইত্যাদি। স্বাভাবিক ভাবেই আন্দোলনেরও দুটি দিক রয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর চুক্তি করে কিছু অধিকার আদায় হয়েছে।
অপরদিকে অধিকাংশ আদিবাসী জুম্ম হয়েছেন বাস্তুচ্যুত। তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে হয়েছে চুরমার। ৬০ হাজারেরও অধিক মানুষ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পাড়ি জমালো ভারতে। দুর্বিষহ শরণার্থী জীবন কাটালো প্রায় এক যুগ ধরে। আর যারা স্বদেশের মধ্যে রয়েছে অথচ বাস্তুচ্যুত হয়নি এমন সংখ্যা শতকরা ১০ জনেরও কম হবে নিঃসন্দেহে। সাধারণভাবে অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা বাস্তবে সত্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের বাস্তুহারা জীবন শুরু হয় মূলত ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পর থেকে। সেসময় লাখেরও অধিক জুম্ম উদ্বাস্তু হয়, তাদের যথাযথ পুনর্বাসন করা হয়নি। তারা স্থিতিশীল অবস্থায় আসতে না আসতে শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম। মুক্তি সংগ্রামের সময় শত শত পরিবার উদ্বাস্তু হয়, বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলের অধিকাংশ জুম্ম বাস্তুচ্যুত হয়। কোন সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের পুনর্বাসন দেয়নি। বিগত দুই যুগ ধরে বিরাজ করছিলো অস্থিতিশীল, অশান্ত পরিস্থিতি। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের অর্থনেতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে হয় চূর্ণ-বিচূর্ণ।
সাধারণত মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি জীবন তার অর্থনৈতিক জীবনধারাকে অনুসরণ করে থাকে। মানুষের অর্থনৈতিক জীবনধারায় স্থিতিশীলতা বিরাজ না করলে স্বাভাবিকভাবেই তার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি জীবনধারাও স্থিতিশীল হয় না। তাই আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি মূল্যবোধে খুবই অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। এ সমস্ত বিষয় স্মরণে রেখে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন করাকে গুরুত্ব দিয়ে চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করার নিমিত্তে বাংলাদেশ সরকার ৮ এপ্রিল ১৯৯৭ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত কার্যাবলী সম্পাদনের লক্ষ্যে তথা সরকার ও শরণার্থী নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নের নিমিত্তে গঠিত টাস্কফোর্স ২০ জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুনর্গঠিত হয়। এই পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের বৈঠক আজকের দিন পর্যন্ত এক বছরের অধিক সময়ে সর্বমোট ৭টি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ৭টি বৈঠকের মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ঘন্টাখানেকের মতো। সেখানেও শুধু সাধারণ কতগুলি নিয়ম কানুন আছে, নিয়মকানুনগুলো হলো এক বৈঠকের কার্যবিবরণী তার পরবর্তী বৈঠকে পড়ে শোনানোর পরে সেটা সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। শরণার্থী কল্যাণ সমিতির নেতা উপেন্দ্রলাল চাকমার সাথে আমাদের টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান দীপঙ্কর বাবুর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পরে বৈঠক সমাপ্ত হয়।
প্রথম বৈঠক শুরু হয় ২১ মার্চ, দ্বিতীয় বৈঠক শুরু হয় ৬ জুন- প্রথম বৈঠকের অনেক দিন পরে। দ্বিতীয় বৈঠকে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনার পরে হলো অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে খুব অল্প সময়ের জন্য আলোচনা। যদিও উনারা-টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব উন্মুক্ত আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন, সে সময় আমি জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি হিসাবে একটা প্রস্তাব পেশ করি, লিখিত ভাবে। আমার লিখিত প্রস্তাবটা হলো এমন, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু কাহাকে বলে এটা প্রথমে সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত এবং সেটার জন্য কি কি ক্রাইটেরিয়া থাকা উচিত এবং সেটা কারা নির্ধারণ করবে এবং তাদেরকে কি করে, কি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হবে, ইত্যাদি।
আমার লিখিত প্রস্তাবটা হলো এই, (এক) অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা- পার্বত্য চট্টগ্রামের (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিজনিত কারণে যে সকল উপজাতি নিজ গ্রাম, মৌজা, অঞ্চল ত্যাগ করে স্বদেশের মধ্যে অন্যত্র চলে গেছেন বা চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে বিবেচিত হবেন। আর সেটা হচ্ছে স্বীয় গ্রাম হতে অন্য কোন গ্রামে বা গ্রাম স্থাপন করে বসতি স্থাপন করেছেন। স্বীয় মৌজা হতে অন্য কোন মৌজায় চলে গেছেন। যাদের সরকার কর্তৃক গুচ্ছ গ্রামে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বীয় গ্রাম হতে অন্যত্র যাওয়ার পর যারা স্বগ্রামে বা স্বগ্রামের নিকটস্থ স্থানে ফিরে এসেছেন, কিন্তু নিজেদের সঠিক স্থানে ফিরে যেতে পারেননি, অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় ভুগছেন। (দুই) অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা প্রণয়ন পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যানের নিকট তালিকা পেশ করা। যে কোন কারণে হেডম্যান বা চেয়ারম্যান অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর তালিকা তৈরি করতে অনিচ্ছুক বা অপরাগ হন, সেক্ষেত্রে জনসংহতি সমিতি কর্তৃক তালিকা প্রস্তুত করা এবং টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রদান করা। (তিন) পুনর্বাসন সাহায্য সম্পর্কে আমাদের প্রস্তাব ছিলো, বাস্তুভিটা ও জমিজমা প্রদান করা। এককালীন অর্থ সাহায্যে ১০ হাজার টাকা প্রদান করা। এক বছরের রেশনসহ তেল, ডাল, লবণ প্রদান করা। জমির মালিকদের হালের গুরু ক্রয় করার জন্য ১৫ হাজার টাকা প্রদান করা এবং ভূমিহীনদের গাভী ক্রয় করা বাবদ ৪ হাজার টাকা প্রদান করা। ভূমিহীনদের ভূমি প্রদান করা। পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা। চাকুরীতে পুনর্বহাল করা ও জ্যেষ্ঠতা প্রদান করা। হেডম্যান পুনর্বহাল করা। ঋণ ও খাজনা মওকুফ করা। মামলা প্রত্যাহার করা। এ প্রসঙ্গে এই সমস্ত জিনিসগুলি কেমন যেন লাগবে। আমি নিজেও মনে করি, আমি যদি ঐখানকার অধিবাসী না হয়ে এখানকার অধিবাসী হতাম তাহলে বোধহয় প্রশ্নগুলো শুনতে খারাপ লাগতো।
আজকে বস্তুভিটা সহ জমিজমা ফেরত দেয়ার প্রশ্নটি এখানে আসল কেনো? কারণ, এই পরিস্থিতিতে একদল নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে গেলো ভারতে। অপর দল শুধু নিজ গ্রাম ছেড়ে স্বদেশের মধ্যেই বনে-জঙ্গলে জীবন যাপন করছে, সেই জায়গা জমিগুলো এখন সরকার বাইরে থেকে যাদের নিয়ে এসে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেছে, ঐ জায়গাই ওদেরকে দেওয়া হয়েছে। এখন এদেরকে ফিরে আসতে হলে, পুনর্বাসন দিতে হলে তাদের জায়গা জমিগুলো প্রথমে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন। এইভাবে অনেক হেডম্যান প্রাণের দায়ে চলে গেছে, হেডম্যানের জায়গায় আর একজন নতুন এখান থেকে পুনর্বাসন করা হেডম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। আর অনেকে চাকরীর চেয়ে জীবন বেশী বড় মনে করে চলে গেছে। ঠিক এইভাবে আমরা দ্বিতীয় বৈঠকে বললাম, এই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো- শুধু উপজাতীয়দের নয়, অ-উপজাতীয়দেরও পুনর্বাসন করা প্রয়োজন। তখন আমি বলেছি, চুক্তি মোতাবেক এখানে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসনের প্রশ্নই উঠতে পারে না। কারণ এখানে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, চুক্তির যে স্পিরিটটা ছিলো, আজকে দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে একদল গেলো ভারতে, অপরদল নিজ জায়গা ছেড়ে বনে-জঙ্গলে যে যেখানে পারলো সেখানে।
কাজেই তাদের মাথায় রেখে জনসংহতি সমিতি এবং সরকারে মধ্যে চুক্তি হয়। এখানে যদি আবার অ-উপজাতীয় পুনর্বাসনের বিষয়টা আনা হয়, তাহলে পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটা আরো জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ঠিক এ অবস্থাটা বর্তমানে বিরাজ করছে। কারণ যখনই আলোচনা হচ্ছে যে এখানে অ-উপজাতীয় পুনর্বাসন করা হবে, সেখানে অ-উপজাতীয় ঢুকে পড়ছে প্রতিনিয়ত এবং এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ভিতর যারা নিজেদের জায়গায় ফিরে এসেছেন, তারাও এখন ফিরে যাচ্ছে ওখানে। এই যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে সরকার, এই অবস্থার দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টির জন্য বলেছে যে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন করতে হবে সেখানে। এটা আমরা জনসংহতি সমিতি মনে করি চুক্তির পরিপন্থী। যদি সেখানে চুক্তির বাস্তবায়ন করা না হয়, ওখানে যদি আবার অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন করা হয় তবে তার ফলে অ-উপজাতীয় অনুপ্রবেশকেই আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে, সেটা কারো কোন হিসাব নিকাশের মধ্যে নেই।
এভাবেই আজ অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় পুনর্বাসন সমস্যাটা এখানেই স্থগিত হয়ে আছে।
সরকারের পক্ষে থেকে বারে বারে ওনারা এটাকে পুনর্বাসনের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এমন ভাবে তারা এটা করছে, এইযে ডেফিনেশন হলো, ডেফিনেশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় পুনর্বাসন ফরম একটা নির্ধারণ হলো এবং সেটা টাস্কফোর্সের অনুমোদন হলো, অ-উপজাতীয়দের জন্যে কোন ফরম অনুমোদন হয়নি, আর টাস্কফোর্সেও আলোচিত হয়নি। এখানে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একটা ফরম ব্যবহার করে টাস্কফোর্সের ক্ষমতাকে উনারা অপব্যবহার করেছেন অথচ টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে, তারা বসে আলোচনা করে। প্রত্যেক জিনিসকে আলোচনার মধ্যে এনে সেটা করা হবে কিন্তু তা না করে ওনারা শুধু সরকারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা করেছে। এখানে ৭টা বৈঠক করে আজও তেমন কোন ফল আশা করা যাচ্ছে না। এই ডেলিগেশনের আরেকটা দিক এখানে উল্লেখ্য যে, এই ডেলিগেশনটা যখন আমরা করেছি তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে ১৯৯২ সালের ১০ আগষ্ট বিরতির শুরুর দিন পর্যন্ত আমাদের জনসংহতি সমিতির ডেফিনেশনের সঙ্গে এই ডেফিনেশন যোগ করে এটা করা হলো।
এই ডেফিনেশনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং থানা পর্যায়ে দুটো কমিটি করা হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হলো আহ্বায়ক, জনসংহতি সমিতির একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের মেম্বার আর থানা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট থানার টিএনও নিরাপত্তা বাহিনীর একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তা, থানা সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তা জন সংহতি সমিতির একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমিতির প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার হেডম্যান সমিতির প্রতিনিধি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, যখনই কমিটিগুলি গঠন করা হলো, কমিটির দায়িত্ব ছিলো এই ডেফিনেশন অনুসারে তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু চিহ্নিত করবে এবং নির্ধারণ করবে, সেটা এই ফরমগুলো পূরণ করে তা টাস্কফোর্সের এখানে উপস্থাপন করা। কিন্তু তারা এটা না করে হেডম্যানদেরকে এবং চেয়ারম্যানদেরকে নানাভাবে প্রভাবিত করে অ-উপজাতীয় ফরমেও সই করার জন্য বাধ্য করেছে। নানাভাবে তারা ভয় প্রদর্শন করেছে যে অ-উপজাতীয়দের ফরমে যদি সই করা না হয়, তখন হেডম্যানের হেডম্যানশীপ চলে যাবে, চেয়ারম্যানদের বন্দি করে বিভিন্ন ভয় ভীতি দেখানো হয়েছে তারপরও নানা ধরনের ফন্দিফিকির এখনো চালানো হচ্ছে। পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের আজ অবধি মোট ৭টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, দ্বিতীয় বৈঠক হতে সপ্তম বৈঠক পর্যন্ত নানা কৌশল অবলম্বন করে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সরকার পুনর্বাসনের বিষয়টা অব্যাহত রেখেছে।
তৃতীয় বৈঠকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাত্ত্ব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক ভাবে টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত লংঘন করে সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ভুল ফরমের মাধ্যমে অ-উপজাতীয়দের তালিকাভুক্ত করার কাজ চলছে এবং সরকার কর্তৃক তা টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা পার্বত্য চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য হিসেবে জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি এ বিষয়ে গোড়া থেকেই বিরোধিতা করে আসছে।
উল্লেখ্য যে, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে অ-উপজাতীয়দের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও হেডম্যানদের উপর নানা কায়দা কৌশলে প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা চলেছে। অধিকাংশ হেডম্যান অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক নানা ভয় প্রদর্শন, আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের প্রভাব মুক্ত হতে পারেনি। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিশেষত টিএনও-র দ্বারস্থ হতে হয়। ফলত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশ চেয়ারম্যান যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অশান্ত পরিস্থিতিতে অনেক মৌজার জনগণ নিজ মৌজা ত্যাগ করে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছেন। এই সমস্ত মৌজায় সমতল ভূমি থেকে আসা অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন দেয়া হয়।
এই সব অ-উপজাতীয়দের কিছু সংখ্যক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং কিছু এলাকায় উপজাতীয়দের উদ্দেশ্যমূলকভাবে হেডম্যানও নিয়োগ দেয়া হয়। এই সব হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাদের এলাকায় কোন উদ্বাস্তু নেই বলে উপজাতীয় ফরমে স্বাক্ষর প্রদানে বিরত থাকে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা অনুসারে অ-উপজাতীয় ফরমে চেয়ারম্যান ও হেডম্যানগণ স্বাক্ষর প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। তাই সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাগণ নানাভাবে উপজাতীয় চেয়ারম্যান ও হেডম্যানদের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি থানা কমিটির আহ্বায়ক কর্তৃক নানা ওসিলায় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ফরম থেকে উপজাতীয়দের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুসারে অ-উপজাতীয়দের অনুপ্রবেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তির পরিপন্থী অপর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসতি করা হচ্ছে এই মর্মে প্রচারিত হওয়ায় পরোক্ষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতীয়দের অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে চুক্তি সম্পাদনের পরেও অনেক অ-উপজাতীয় পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকে পড়ছে এবং প্রতিনিয়ত অনুপ্রবেশ হচ্ছে।
সরকার কর্তৃক অবৈধভাবে পুনর্বাসিত শত শত অ-উপজাতীয় বিগত অশান্ত পরিস্থিতির সময়ে স্ব স্ব স্থানে বা জেলায় নিজ উদ্যোগে ফিরে গিয়েছে, কিন্তু বর্তমানে অ-উপজাতীয়দের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের বিষয়টা ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রচারিত হওয়ায় সেই সব অ-উপজাতীয়রা পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেরত আসছে। এক দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে অত্যন্ত ধীর গতি হওয়া অন্যদিকে টাস্কাফোর্সের কার্যকলাপ চুক্তি পরিপন্থী বিধায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সাবিক পরিস্থিতি বর্তমান পর্যায়ে খুবই জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি শৃংখলা ও উন্নয়নের স্বার্থে চুক্তি মোতাবেক ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তুদের টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা একান্ত অপরিহার্য ও বাঞ্ছনীয় মনে করি।

সিনিয়র সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
সদস্য, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স ।

বই- পার্বত্য চট্টগ্রামঃ সংকট ও সম্ভাবনা (সম্পাদনা- মেসবাহ কামাল, শারমিন মৃধা)
[প্রবন্ধটি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও তার সমাধানের সম্ভাব্য দিকসমূহ নিয়ে ১৯৯৯ সালের ২২ ও ২৩ মে দু'দিন ব্যাপী ওয়ার্কশপের ফল]

Wednesday, August 20, 2025

সমগ্র বাঙালি জাতিকে বিশ্বাস করে আমরা চুক্তি করেছি- রূপায়ন দেওয়ান

লেখক- রূপায়ন দেওয়ান



পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নির্যাতনের ইতিহাস, অত্যাচার-লাঞ্ছনা-বঞ্চনার ইতিহাস। এই যে অন্যায় অত্যাচার নিপীড়ন এর বিরুদ্ধে আমাদেরকে যুগে যুগে আন্দোলন করতে হয়েছে, অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছে। মোগলদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে, আমাদের স্বকীয় ঐতিহ্য, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমরা আন্দোলন করেছিলাম সশস্ত্রভাবে। পৃথিবীর সমগ্র অঞ্চলে আমরা দেখেছি যে উপনিবেশিক শক্তির কাছে দূর্বল জাতীয়সত্তাগুলো-জাতিগুলো-দেশগুলো পরাধীনতার শিকল পরতে বাধ্য হয়েছিলো। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শক্তি হিসাবে আমরাও বিদেশী ইনভেডরদের কাছে আমাদের স্বাধীনতা, স্বকীয় অস্তিত্ব হারিয়েছি। বৃটিশ গভর্ণমেন্ট ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম তার দখলে নিয়ে যায়। তার আগে নিজেদের অধিকার নিয়ে এ অঞ্চলে আমরা বসবাস করছিলাম। ১৮৬০ সালে বৃটিশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলের শাসনভার হাতে নিলেও ১৯০০ সালে প্রত্যক্ষভাবে হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ বিধি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পরিপূর্ণভাবে তার দখলে নিয়ে যায়। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত আমরা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই করছি। নিজের অধিকার নিজের জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে আমরা লড়াই করছি।
আমি একটু সংক্ষেপে ব্যাকগ্রাউন্ডটা টানছি এর কারণ আছে। আমি দেখেছি বা আমরা বুঝেছি যারা রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা করেন, যাদেরকে আমি আমার ভাষায় পলিটোক্র্যাট বলি, তারা চিটাগাং হিল ট্রাক্টসের বিষয়টা হয় বোঝেন না, অথবা বুঝেও বুঝতে চান না। কিছুক্ষণ আগে আমার পূর্ববর্তী বক্তা শ্রদ্ধেয় লুৎফর রহমান শাহজাহান সুষ্পষ্টভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার বিষয়ে তাঁর মতামত রেখেছেন। এই ধরনের অভিমত পোষনকারী কতজন বক্তা আমাদের পক্ষে পেয়েছি সেটা আমাদের জানার বিষয় আছে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছে, যখন সংবিধান রচিত হতে যাচ্ছিলো, তখন তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত নেতা, জুম্ম জাতির কর্ণধার মানবেন্দ্র লারমাকে বিভিন্নভাবে পার্লামেন্টে বিরোধীতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। বাঙালি জাতি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে ১৯৭২ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে যখন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হতে যাচ্ছিলো, যদি সেই সংসদের কার্যবিবরণীগুলো আমরা পড়ে দেখি যা এখনো ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি, আমার এ কথার প্রমাণ সেখানে আছে। আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানবেন্দ্র লারমা যে বক্তব্য রেখেছিলেন, যে আওয়াজ তুলেছিলেন সমগ্র দেশবাসীর কাছে, সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে করজোড়ে আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস না করে দেওয়ার জন্য যে আবেদন করেছিলেন- কাকুতি করেছিলেন সেগুলো ধুলিস্যাত করে দেওয়া হয়েছিলো। আমরা ৭১ সালে আমাদের দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি। কিন্তু যে চিন্তা চেতনা নিয়ে আমরা আমাদের দেশকে স্বাধীন করেছি -অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় সে দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার সেখানে সংরক্ষিত করা সম্ভব হয়নি। আমরা জানি যে উগ্র জাতীয়তাবাদের চিন্তা চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে আমাদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছে, আমাদের সংবিধানে স্থান দেওয়া হয়নি। স্বয়ং স্পীকার পর্যন্ত বলেছিলেন, তৎকালীন নেতৃবৃন্দ যারা সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা মি: লারমাকে বলেছিলেন, মি: লারমা আপনার বাঙালি হতে লজ্জা কিসের?
আমাদের যে সাংবিধানিক অধিকার ছিলো যেটা বৃটিশ সরকার ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি দিয়ে করে দিয়েছিলো এবং যেটা ভারত শাসন আইন ১৯৩৫ স্বীকৃতি দিয়েছে, পাকিস্তান হওয়ার পর সেই আইনটাকে পাকিস্তান সরকার কার্যকরী করেছিলো এবং পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ১৯৫৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক্সক্লুডেড এরিয়ার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। পাকিস্তানের সেই সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংবিধানিক মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রাখা হয়েছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৬৩ সালে যখন পাকিস্তানের ২য় সংবিধান রচিত হয়, তখন সংবিধানের ২৪২ নং ধারা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দিয়ে পার্বত্য জেলার বিশেষ অধিকারের মর্যাদা খর্ব করে দেওয়া হয়েছিলো। পাকিস্তান মুসলিম চিন্তা চেতনায় ইসলামিক চিন্তা চেতনায় পরিচালিত হয়েছিলো, পাকিস্তান সরকারগুলো তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলো।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে সাম্যবাদ, যে সমাজতন্ত্র, যে গণতন্ত্র, যে ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের মূল শ্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার, দেশ-জাতি পরিচালনার মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছিলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘুদের, জাতিগুলোর অধিকার তারা অগ্রাহ্য করে আসছেন। এবং আমরা শেষে এমন দেখেছি যে এখানে সাইলেন্ট ইনভেশন শুরু হয়েছে। আমরা জন সংহতি সমিতির নেতৃত্বে, যে সশস্ত্র আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছি, আমাদেরকে বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী, বৃহৎ জনগোষ্ঠী, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো আমাদেরকে এটা করতে বাধ্য করেছে। আমাদের অধিকার যদি ৭২-এর সংবিধানে সংরক্ষিত হতো, আমাদের মৌলিক অধিকার যদি স্বীকৃতি দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দু'দশক ধরে লিপ্ত হতে হতো না। আজকে আমরা অনেক মা-বোনকে হারিয়েছি সে উপজাতি হোক, সে পাহাড়ি হোক, সে বাঙালি হোক। তাহলে দেখা যাচ্ছে সরকার সশস্ত্র উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন এ জিনিসটা সুষ্পষ্ট। এখন আমাদেরকে একটা চুক্তির মাধ্যমে সরকারের সাথে সমঝোতায় যেতে হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি চুক্তির মাধ্যমে শান্তির অন্বেষায় একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে চেয়েছে। আমরা যে আন্দোলন করেছি তা একটা নিছক অশান্তি সৃষ্টির জন্যে নয়। আমরা সশস্ত্র আন্দোলন করেছি শান্তির জন্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, অস্তিত্ব রক্ষার জনা, ব্যক্তিগত অধিকার-জাতিগত অধিকার-মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদের এ আন্দোলন বাংলাদেশের সমগ্র আন্দোলনের অংশ, বাংলাদেশের বৃহৎ আন্দোলন থেকে এটা বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের দেশের সংবিধানে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে জনগোষ্ঠীগুলো আছে, যাদেরকে উপজাতি বলা হয়েছে, কেবল তাদের অধিকারকেই অস্বীকার করা হয়নি, সমগ্র দেশের ন্যাশনাল মাইনোরিটিজ অন্যান্য যারা আছেন তাদের অধিকারকেও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আজকে নতুন পরিবেশে নতুন পরিস্থিতিতে সরকার এবং বাংলাদেশের যে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আছে, যে বুদ্ধিজীবীরা আছেন তাদের এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করা উচিত। সুসংগঠিতভাবে এটা শুরু করা উচিত যাতে সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের যে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো আছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আছে তাদের ধর্ম, ধর্মের অধিকার এবং তাদের জাতিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আজকে যদি আমরা সংবিধান দেখি, দেখি ধর্মের স্বাধীনতা, খর্ব করা হয়েছে। তাহলে কিভাবে বলবো আমাদের দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ? যে দেশের সংবিধান শুধু একটি বিশেষ ধর্মের নেতৃত্ব দেয়, প্রতিনিধিত্ব করে, সেই দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বা ধর্মীয় সংখালঘুদের অধিকার কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?
আজকে শুধু এটা নয়, বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষকেও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সিকি শতাব্দীকালের ইতিহাস যদি আমরা দেখি তাহলে দেখবো বাংলার আপামর জনগণের মৌলিক অগ্রগতি কিছু হয় নাই। অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গরীব মেহনতি মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনি, তারা গরীব থেকে গরীবতর হচ্ছে, আর ধনীর সংখ্যা দু'থেকে দু'হাজার হতে যাচ্ছে। সুতরাং আজকে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য, অর্থনৈতিক অধিকারের জন্য, এগিয়ে আসা দরকার। পূর্ববর্তী বক্তা শ্রদ্ধেয় লুৎফর রহমান শাহজাহান বলেছেন আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক শুধু নয়, সমগ্র বাংলাদেশভিত্তিক দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। আমি মনে করি আমাদের আন্দোলন কোন দিন বিচ্ছিন্ন ছিলো না, বাংলাদেশের আপামর জনগণের মৌলিক সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো না, আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে দূরে ছিলো না। আমাদের ইতিহাস আছে, ৬৯-এর গণআন্দোলনে বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মানুষ যেমন শরীক হয়েছিলো, মাঠে নেমেছিলো, রাজপথে নেমেছিলো, তেমনি নেমেছিলো পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং পরবর্তীতে যে নেতৃত্ব এখানে ছিলো, তারা গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে, মূল আন্দোলন থেকে কোনদিন বিচ্ছিন্ন হয়নি।
আজকে আমি কয়েকটি বিষয় সুবিবেচনার জন্য আপনাদের কাছে তুলে ধরতে চাই। আমরা শান্তিচুক্তি করেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে আগে যে পরিস্থিতি ছিলো সে পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে এটা আমরা বলতে পারি। কিন্তু খুব বেশী পরিবর্তন হয়েছে বা হবে এই জিনিসটা ধরে নিয়ে আমরা নিশ্চিত থাকবো তা হতে পারে না। আমরা শুধু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করি নাই, সমগ্র বাঙালি জাতিকে বিশ্বাস করে আমরা চুক্তি করেছি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে জন সংহতি সমিতিকে বা মি: সন্তু লারমাকে দায়িত্ব নিতে দীর্ঘদিন সময় নিতে হয়েছে, চুক্তি মোতাবেক সংসদে আইনগুলো গৃহীত না হওয়ার জন্য। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলছি পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিকে লংঙ্ঘন করে ১২ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৪০টি সংশোধনী করে, পরিবর্তন করে অর্থাৎ চুক্তি অমান্য করে ওখানে ৪টি বিল উত্থাপন করা হয়েছিলো। আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম এবং ১৮, ১৯, ২০ এই তিনদিন ঢাকায় বিশেষ বৈঠক হয়েছিলো। তখন সরকারী প্রতিনিধি দল আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন সবকিছু ঠিক রেখে বিলগুলো ঠিক করে আইনগুলো পাশ করবেন। অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয় যে সেই বিলগুলো ঠিকভাবে সংসদে উত্থাপন করা হয়নি। গৃহীত হয়নি এবং মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন ক'রে, চুক্তি বিরোধী ধারা রেখে সেগুলো পরিবর্তন করা হয়েছিলো যার ৪টা বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আজকে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, প্রায় দেড় বছর হয়ে গেলো এখনো ৫২৫টা যে সেনাছাউনী আছে ওখান থেকে মাত্র ২১টা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখনও সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পগুলো সেখানে কেনো রাখা হলো, কাদের স্বার্থে? শান্তিচুক্তির স্বার্থে যদি রাখা হয়, যদি বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখার জন্যে হয়, তাহলে আমাদের উচিৎ বিশ্বাস যেনো ভঙ্গ না হয় সেজন্য দ্রুত এগুলো প্রত্যাহার করা। আমি এখানে একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, গত মাসের ২ তারিখে বাঘাইহাট বাজারে একটা বড় ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। সেখানে ৫০ জনের মতো লোক সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে জন সংহতি সমিতির উদ্যোগে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে হয়েছে। কিন্তু কেনো? সামান্য একটা বিষয় যেটা সহজে মিটমাট করা যেতো তা করতে কেনো আজকে আমরা ব্যর্থ হলাম? এটা দুঃখজনক বিষয়।
কয়েকদিন আগে এক পরিচিত ব্রিগেড কমান্ডার-এর কাছে আমি জিনিসটা বলছিলাম আমি বলেছি এটা অনাকাঙ্খিত। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা সহযোগিতা দিতে রাজী আছি, কিন্তু সামরিক বাহিনী যাতে এ ধরণের তৎপরতা না নেয়। শান্তিচুক্তির স্বার্থে, শান্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে, এই ধরণের কাজ থেকে যেন বিরত থাকা হয় আমি সেই মর্মে উনাদের অনুরোধ করেছি। আমাদের ১৯ জন বন্দী ছিলো যখন শান্তিচুক্তি হচ্ছিলো, এখনো ১১ জন বন্দী জেলখানা থেকে মুক্তি পাননি। অথচ তাদের মুক্তির কথা চুক্তিতে আছে। মৌখিকভাবে আমরা বার বার বলেছি, লিখিতভাবে বলেছি। কি অসুবিধা আছে? সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ার মতো কোন যুক্তি আছে ব'লে আমি মনে করি না। জাতীয় কোন পার্টিই এখানে বাধা সৃষ্টি করছে না, বলছেনা যে জন সংহতি সমিতির ১৯ জন কর্মীকে মুক্তি দেওয়া যাবেনা। কেন এত মাস চলে যাচ্ছে তবু তারা মুক্তি পাচ্ছে না? ২৭ তারিখে সরকার মহাজলসা করতে যাচ্ছে রাঙামাটিতে। আঞ্চলিক পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে গ্র্যান্ড রিসেপশন, গ্র্যান্ড ফাংশন হচ্ছে। কিন্তু তার আগে যদি আমাদের এই ১১জন কর্মী মুক্তি না পায় তাহলে শান্তিচুক্তির স্বার্থকতা কোথায় আছে এই জিজ্ঞাসা আজকে আপনাদের কাছে। আজকে যে বন্ধুরা জেলে আছে তাদেরকে রেখে আমরা কিভাবে শপথ গ্রহণ করতে পারি? এর সুবিবেচনার ভার আমি আপনাদের কাছে দিতে চাই।
আর একটা জিনিস আপনাদের কাছে তুলে ধরা দরকার। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, রাজনৈতিক স্ট্যান্ড থেকে শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করেছিলো। এখন তারা নীরব। সেরকম সক্রিয়তা আমরা দেখছি না। আশাকরি তারা জিনিসটাকে পজিটিভলী চিন্তা করছেন। কিন্তু আমাদের পাহাড়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে, পার্বত্য স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের দাবী উত্থাপন করে, আজকে শান্তি বিঘ্নিত করার সকল প্রকার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। প্রশাসনের একপক্ষ তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য। দুর্ভাগ্য যে আজকে দেশের কিছু রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন জন সংহতি সমিতিকে চরমভাবে বিরোধীতা করে। আজকে সমগ্র বিশ্বের রাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং বাংলাদেশের বা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অবস্থাকে বিচার করে শান্তিচুক্তি করতে আমরা এগিয়ে এসেছি।
শান্তি আমাদের দরকার ছিলো, সেজন্য শান্তিচুক্তি করেছি। দেশে-বিদেশে সবদিক থেকে আজকে শান্তিচুক্তির স্বীকৃতি মিলছে। এই শান্তিচুক্তির জন্য পুরষ্কার মিলেছে। কিন্তু পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে বা নামে আজকে জন সংহতি সমিতিকে ধ্বংস করার জন্য কিছু যুবক যে কর্মতৎপরতা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যদি আপনারা দেশবাসী ও সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন তাহলে সমস্যা অন্যদিকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি বিভিন্ন ফোরামে বলেছি যে আজকে জন সংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দের ঘাড়ে তারা তাদের বন্দুকের নল তাক করেছে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবী আদায়ের জন্যে। আমি দেখেছি সর্বহারা পার্টি শ্রেণী সংগ্রাম করার জন্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের মধ্যে গিয়ে আন্দোলন করতে চেয়েছিলেন। এমন শ্রেণী সংগ্রাম উনারা করেছিলেন জনগণ তাদেরকে সেখান থেকে উৎখাত করেছিলো। রাজনীতির মূল্যায়নে ভুল থাকার কারণে, রণনীতিগত বিশ্লেষণে ভুলের কারণে সর্বহারা পার্টি এক বিশেষ জনগোষ্ঠিকে নিয়ে ওখানে আন্দোলন করেছিলো, রণনীতি সঠিক ছিলোনা বলে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
আজকে বাংলাদেশেও কিছু বুদ্ধিজীবী দুর্ভাগ্যজনকভাবে শান্তিচুক্তি বিরোধী পাহাড়ি যুবকদের সমর্থন করছেন। এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আবেদন রাখতে চাই, এই ব্যাপারে আপনাদের দায়িত্ব আছে। আজকের এই ফোরামে আমি বলতে চাই যে এই শান্তিচুক্তি হত্যা করা হলে যে ক্ষতি হবে সেই ক্ষতির দায়ভার শুধু সেই পাহাড়ি যুবকদের বইতে হবে না। সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও এটার দায়ভার বইতে হবে, কৈফিয়ত দিতে হবে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি মানুষদের কাছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণের কাছে তাদের কৈফিয়ত দিতে হবে যারা ঢাকায় বসে তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছেন, সর্বপ্রকার মদদ দিচ্ছেন। আপনাদের সুবিবেচনার জন্য আমি এই বক্তব্য দিলাম।
আমার বক্তব্য আমি এই বলে শেষ করছি যে, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যা করা প্রয়োজন তা করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমরা দীর্ঘ যুগের পর যুগ ধরে আত্মনিয়ন্ত্রণ আদায় আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছি। বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, যে সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো আছে তাদের আন্দোলনের জন্য আমরা সক্রিয়ভাবে জাতীয়ভিত্তিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমাদের আন্দোলন বাংলাদেশের যে আন্দোলন তার মূল স্রোতধারা থেকে কোনদিন বিচ্ছিন্ন ছিলোনা। আমরা কোনদিন বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা করি নাই। আজকে আমি জন সংহতি সমিতির পক্ষে এই জিনিসটা অকপটে বলতে চাই, আমরা দেশেরই মানুষ। দেশের স্বার্থ আমাদের স্বার্থ। দেশের সন্তান হয়ে, সুযোগ্য সন্তান হিসাবে, আমরা দায়িত্ব পালন করতে চাই।

সিনিয়র সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
বই- পার্বত্য চট্টগ্রামঃ সংকট ও সম্ভাবনা (সম্পাদনা- মেসবাহ কামাল, শারমিন মৃধা)
[প্রবন্ধটি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও তার সমাধানের সম্ভাব্য দিকসমূহ নিয়ে ১৯৯৯ সালের ২২ ও ২৩ মে দু'দিন ব্যাপী ওয়ার্কশপের ফল]

Monday, August 18, 2025

DIGHINALA DECLARATION- PCJSS

 Parbatya Chattagram Jana Samhati Samity (PCJSS)
Special Workers' Conference 2010
DIGHINALA DECLARATION
10 April, 2010

At a time when the present government is in power with the pledge in its Election Manifesto to execute the CHT Accord in full and to that end the PCJSS is in need of greater unity and stronger leadership; widespread protest and indignation against the recent horrific incident at Baghaichari-Khagarachari is sweeping across the world; Jumma people irrespective of their class and clan, burying their differences, are mounting protests against it; the desolated among them across the hills are pleading the political elders for peace to redeem them of the scourge of fratricidal conflict, Jyotirindra Bodhipriya Larma alias Santu Larma demonstrated before the party, Jumma people, and at national and international arena his penchant for undemocratic leadership by convening the one-sided 9th National Conference (29-31 March, 2010), violating all the directives of the party constitution. Appeal by the party workers and leaders, well-wishers, sensible section of the society for "keeping the PCJSS unified", and even the forceful plea to Larma by an octogenarian in folded hands fell through paving his way to make his monolithic leadership stronger.
Mr. Larma's unbridled self-will has heightened lack of transparency, moral debasement and degradation of values to such a proportion that it becomes well nigh impossible for him to work with those workers and leaders known for their honesty, ideals and self-esteem. In order to remove these workers and leaders and to establish his unchallenged leadership, he started unfolding factional clique from mid 2005. He irregularly debarred some of the central committee members elected in the 8th National Conference from performing their work in the party as well as in the central committee, soon after the 8th National Conference. Taking advantage of the state of emergency in the country he resorted to vilification campaign against these workers and leaders. However, what is more painful is that the efforts by these leaders along with some central committee members belonging to his camp to keep the party unified ran aground at last due to his obduracy. He continues to practice his "politics of coercion or violence" by removing some of the most veteran workers and leaders known for their ideals and principles by violating section 7 (rights of the party members), section 9 (expulsion of the party members) and section 16 (punitive action) of the party constitution. He introduced politics of his own brand, disregarding the principles, strategies and directives followed by late M.N. Larma and infringing the trust or the pledge enshrined in section 2 (principles and ideals) & section 3 (objectives & goals). He has rested the party on the brink of disaster by adhering to a wrong party workers policy in place of one introduced by M.N. Larma.
Without the plenary meeting of the outgoing central committee, he unilaterally finalized almost all the programs of the 9th National Conference and then convened a meeting of the truncated central committee on 25th March, 2010 and expelled and also excluded a number of high ranking leaders in the 9th National Conference. It was demonstrative of his autocratic leadership. In any case, it is no longer possible to wage movement for the emancipation of the Jumma people with such a debased and obstinate leadership. In such a backdrop, the conscious section of the workers and leaders of the party in this critical time organized a conference of the party workers and leaders at Baradam High School of Dighinala Upazila under Khagarachari Hill District. Following a thorough discussion, review and exchange of opinions, the leaders and workers and well-wishers from different areas unanimously adopted Dighinala Declaration today, Saturday, the 10th April, 2010.
On the Party:
1. This conference rejects the 9th National Conference convened by Mr. Santu Larma as ex-parte, unconstitutional and undemocratic.
2. (a) This conference announces the formation of a 7 member Convening Committee with Mr. Sudhasindhu Khisa and Mr. Rupayan Dewan as Co-chairperson, Mr. Tatindra Lal Chakma as Member Secretary, and Engr. Mrinal Kanti Tripura, Advocate Shaktiman Chakma, Mr. Uday Kiran Tripura and Ms. Kakoli Khisa as members to form a central committee by holding a National Conference.
(b) This conference empowers the Convening Committee to form a central committee by holding National Conference at a suitable time.
(c) This conference authorizes the Convening Committee to carry out the party activities until the central committee is formed.
(d) This conference announces to publish a white paper containing the anti-charter (party constitution) activities of Mr. Larma.

On the Implementation of the CHT Accord:
1. This conference demands full implementation of the CHT Accord signed between the Government of the People's Republic of Bangladesh and the PCJSS.
2. This conference proclaims that it will play positive role to help implement the CHT Accord by identifying the major hindrances to the Accord.
3. This conference also calls for taking proper initiative to resolve the land disputes by amending the "CHT Land Dispute Resolution Commission Act, 2001" in line with the provision of CHT Accord.

On recent Baghaihat-Khagarachari Brutal Violence:
1. This conference presses for a neutral investigation into the recent horrifying and bestial violence that shook Baghaihat and Khagarachari District town under Rangamati Hill District and exemplary punishment to the perpetrators.
2. This conference also insists on paying adequate compensation to the affected people and proper rehabilitation of them and immediate withdrawal of all the false cases filed.

On the Constitutional Recognition of the Indigenous Peoples:
1. This conference demands that the indigenous peoples should be given constitutional recognition.
2. This conference pronounces for taking proper initiatives to wage a unified struggle in order that the land rights of all the indigenous communities are ensured along with their proper development and progress.
3. This conference expresses its concern over a secret circular issued by the Ministry of CHT Affairs and insists on withdrawing it. The circular containing objectionable discourse was intended to identify the indigenous peoples as "tribe".
4. This conference also calls upon all political parties, progressive and democratic forces in the country to adopt an indigenous policy and programs of their own so that they can play a positive role in ensuring the rights of the indigenous peoples.

An Invocation:
This conference calls upon all to forge greater Jumma national solidarity for the full implementation of the CHT Accord, protection of Jumma national entity and their parental land.
It also calls upon all political parties, individuals, institutions and bodies at the local, national, international level to play more active and effective role in helping to implement the CHT Accord in full.
NB: The word 'workers' is meant for the party members. This is a translation from the original Bengali text.

দীঘিনালা ঘোষণা- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি

পার্বত্য চট্টগাম জনসংহতি সমিতি
বিশেষ কর্মী সম্মেলন ২০১০
দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা

দীঘিনালা ঘোষণা
এপ্রিল ১০, ২০১০ খ্রিস্টাব্দ

যে সময়ে বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় রয়েছে এবং এর জন্য জনসংহতি সমিতির অধিকতর ঐক্য ও সুদৃঢ় নেতৃত্বের প্রয়োজন; বাঘাইহাট-খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক বর্বরোচিত ঘটনার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যখন প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে; জুম্মজাতির সকল শ্রেণী-গোষ্ঠী নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর এবং যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়-কন্দরের অসহায় মানুষ ভ্রাতৃঘাতি হানাহানির চরম অভিশাপ হতে মুক্তির প্রত্যাশায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে শান্তির ভিক্ষাপ্রার্থী ঠিক তেমনি সময়ে শ্রী সন্তু লারমা গঠনতন্ত্রের সকল নির্দেশনা লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৯ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে (২৯-৩১ মার্চ, ২০১০) পার্টি, জুম্মজাতি, দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের চরম অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রমাণ দিলেন। সমিতির নেতা-কর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সমাজের সচেতন মানুষের "জেএসএস-কে ঐক্যবদ্ধ রাখার" সকল আবেদন এমনকি অশীতিবর্ষীয় বিবেকবান ব্যক্তির করজোড়ে প্রার্থনা করা আকুতিও অবজ্ঞাভরে ঠেলে দিয়ে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজটি আরও সুদৃঢ় করলেন।
শ্রী লারমার লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি পেয়ে তার অস্বচ্ছতা, নৈতিক অধঃপতন ও মূল্যবোধের অবক্ষয় এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যার কারণে সৎ, আদর্শবান ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার কাজ করা আর কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। তাই, তার এইসব নেতা-কর্মীদের পার্টি হতে বিতাড়িত করে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ২০০৫ সালের মাঝামাঝি হতে উপদলীয় চক্রান্ত শুরু করেন এবং ৮ম জাতীয় সম্মেলনে নির্বাচিত বেশকিছু কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যকে এই জাতীয় সম্মেলনের পরপরই কেন্দ্রীয় কমিটি ও পার্টির সকল কার্যক্রম হতে অপদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে দেন। বিগত জরুরী অবস্থার দোহাই দিয়ে এইসব নেতা-কর্মীবৃন্দকে বিভিন্ন আপত্তিকর বিশেষণে বিভূষিত করে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাজনক বিষয় যে, তৎসত্ত্বেও এইসব দায়িত্ববান নেতা-কর্মী ও শ্রী লারমার সঙ্গে থাকা বেশ ক'জন কেন্দ্রীয় সদস্যের পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সকল প্রচেষ্টা তার একগুঁয়েমির কারণে ব্যর্থ হয়ে যায়। গঠনতন্ত্রের ৭ নং ধারা (পার্টি সদস্যের অধিকারসমূহ), ৯ নং ধারা (বহিস্কার), ১৬ নং ধারা (শাস্তিমূলক ব্যবস্থা) ও অন্যান্য ধারা লঙ্ঘন করে বেশ কিছু পুরানো-অভিজ্ঞ, আদর্শবান ও নীতিবান নেতা-কর্মীকে পার্টি হতে বহিস্কার ও বাদ দিয়ে তার "বল প্রয়োগের রাজনীতি" অর্থাৎ সহিংস রাজনীতির চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। গঠনতন্ত্রের ২ নং ধারা (নীতি ও আদর্শ) ও ৩ নং ধারায় (উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য) বিধৃত সকল বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে জুম্মজাতির মহাননেতা প্রয়াত এমএন লারমার অনুসৃত নীতি, কৌশল ও নির্দেশনাকে পরিত্যাগ করে নিজের মনগড়া রাজনীতি চালু করেছেন। এমএন লারমার প্রদর্শিত সঠিক কর্মীনীতি অনুসরণ না করে ভ্রান্ত কর্মীনীতি চালু করে পার্টি সংগঠনের সর্বনাশ ডেকে এনেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে শ্রী সন্তু লারমা বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ বৈঠক ব্যতীত একক সিদ্ধান্তে নবম জাতীয় সম্মেলনের প্রায়ই কার্যাবলী চুড়ান্ত করে তবেই ২৫ মার্চ, ২০১০ এক খণ্ডিত কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত করে তার চরম স্বৈরাচারী নেতৃত্ব আরও একবার প্রদর্শন করেন এবং এই সম্মেলনে পার্টির শীর্ষ অনেক নেতাকে বহিস্কার ও বাদ দেন। তার এমন স্বেচ্ছাচারী ও অধঃপতিত নেতৃত্ব দিয়ে আর কোন অবস্থায় আন্দোলন পরিচালনা করা কিংবা জুম্মজাতির মুক্তি আদায় সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে পার্টির সচেতন নেতা-কর্মীবৃন্দ পার্টির এই চরম দুঃসময়ে পার্টি তথা জুম্মজাতির করণীয় বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন দীঘিনালা উপজেলার বড়াদম হাইস্কুলে এক বিশেষ কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আলোচনা, পর্যালোচনা ও অভিমত প্রদানের মাধ্যমে আজ ১০ এপ্রিল, ২০১০ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার এই দীঘিনালা ঘোষণা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।
পার্টি সম্পর্কিত:
১। বিগত ২৯-৩১ মার্চ ২০১০ শ্রী সন্তু লারমা কর্তৃক অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সম্মেলনকে একতরফা, অগঠনতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক বিবেচনায় এই সম্মেলন ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করছে।
২। (১) জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের নিমিত্তে ৭ সদস্যক একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দৃঢ় ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে। শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা ও শ্রী রূপায়ণ দেওয়ানকে যুগ্ম আহ্বায়ক (Co-chairperson), শ্রী তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে সদস্য-সচিব ও প্রকৌশলী মৃণাল কাস্তি ত্রিপুরা, এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা, শ্রী উদয় কিরণ ত্রিপুরা ও মিজ কাকলি খীসাকে সদস্য করে ৭ (সাত) সদস্যক আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।
(২) সুবিধামতো সময়ে জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করার ক্ষমতা এই সম্মেলন এই আহ্বায়ক কমিটিকে দিচ্ছে।
(৩) কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পার্টির সকল কার্যাদি সম্পন্ন করার ক্ষমতা এই আহ্বায়ক কমিটিকে দেওয়ার ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।
(৪) শ্রী সন্তু লারমার গঠনতন্ত্রবিরোধী সকল কার্যকলাপের শ্বেতপত্র প্রকাশ করার ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কিত:
১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
২। এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরূপণ করে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।
৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী "পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১" সংশোধনপূর্বক দ্রুত ভূমি-বিরোধ নিস্পত্তির যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বাঘাইহাট-খাগড়াছড়ি বর্বরোচিত সহিংস ঘটনা সম্পর্কিত:
১। গত ফেব্রুয়ারী মাসে রাঙ্গামটি জেলার বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ি জেলা শহরে সংঘটিত বর্বরোচিত সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
২। এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে। এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে সেইসব মামলাসমূহ দ্রুত প্রত্যাহারের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি সম্পর্কিত:
১। বাংলাদেশের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
২। বাংলাদেশের সকল আদিবাসীর ভূমি অধিকার সুনিশ্চিত করাসহ যথাযথ উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার ঘোষণা এই সম্মেলন করছে।
৩। আদিবাসীদেরকে, আদিবাসী নামে পরিচিতি না দিয়ে 'উপজাতি' নামে পরিচিত করানোর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক আপত্তিকর ভাষায় যে গোপন সার্কুলার সম্প্রতি ইস্যু করা হয়েছে তার জন্য এই সম্মেলন গভীর উদ্বেগ জানাচ্ছে এবং সেই সার্কুলার প্রত্যাহার করার দাবী জানাচ্ছে।
৪। দেশের সকল রাজনৈতিক দল, সকল প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিকশক্তির প্রতি দেশের সকল আদিবাসীদের অধিকার সুনিশ্চিতকরণে অধিকতর ইতিবাচক ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে আদিবাসী বিষয়ক নিজ নিজ নীতিমালা প্রণয়ণ ও কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
আহ্বান:
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য বৃহত্তর জুম্ম জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান এ সম্মেলন জানাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে অধিকতর সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমূহের প্রতি আহ্বান এ সম্মেলন জানাচ্ছে।