Sunday, June 28, 2020

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ঐতিহাসিক ৫-দফা দাবীনামা

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৫-দফা দাবীনামাঃ 

১.
ক) পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রাদেশিক মর্যাদা প্রদান করা।
খ) নিজস্ব আইন পরিষদ সংবলিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা।
গ) প্রাদেশিক আইন পরিষদ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং প্রদেশ
তালিকাভুক্ত বিষয়ে এই প্রাদেশিক আইন পরিষদ প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের অধিকারী হবে।
ঘ)দেশরক্ষা,বৈদেশিক মুদ্রা ও ভারি শিল্প ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ
প্রশাসন,পুলিশ,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,কৃষি,বনজ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ,মৎস্য,অর্থ,পশুপালন,ব্যবসা-
বাণিজ্য,ক্ষুদ্র শিল্প,বেতার ও টেলিভিশন,রাস্তাঘাট,যোগাযোগ ও পরিবহন,ডাক,কর ও
খাজনা,জমি ক্রয়-বিক্রয় ও বন্দোবস্তি,আইন-শৃঙ্খলা,বিচার,খনিজ তেল ও     
গ্যাস,সংস্কৃতি,পর্যটন,স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন,সমবায়,সংবাদপত্র,পুস্তক ও প্রেস,জল ও বিদ্যুৎ
সরবরাহ,সীমান্তরক্ষা,সামাজিক প্রথা ও অভ্যাস,উন্নয়নমূলক কার্যক্রমসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের
অন্য সকল বিষয়ে প্রাদেশিক সরকারকে প্রত্যক্ষ প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ও ক্ষমতা
প্রদান করা।
ঙ) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও প্রদেশ যাতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে
পারে,সে জন্য কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতা স্বতন্ত্রভাবে তালিকাভুক্ত করা।
চ) পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে 'জুম্মল্যান্ড'(Jummland) নামে
পরিচিত করা।
ছ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিবর্তন(Amendent)
করা।

২.
ক) গণভোটের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মতামত যাচাই ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের
বিষয় নিয়ে কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যাতে না হয়, সেরকম শাসনতান্ত্রিক
বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন করা।
খ) বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে কেউ যেন পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন,ভূমি ক্রয়
বা বন্দোবস্তি নিতে না পারে সেরকম শাসনতান্ত্রিক বিধি প্রণয়ন করা।
গ) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসী নয় এরকম কোন ব্যক্তি যাতে বিনা অনুমতিতে পার্বত্য
চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য শাসনতান্ত্রিক বিধি প্রণয়ন করা।
ঘ) অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত বাংলাদেশের অপরাপর অংশের
নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপদগ্রস্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে যেন জরুরি আইন অথবা
সামরিক আইন জারি করা না হয়,সেরকম শাসনতান্ত্রিক বিধি প্রণয়ন করা।
ঙ) প্রাদেশিক সরকারের সকল সরকারি,আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ
 পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী নন, এমন কোন ব্যক্তিকে যেন নিয়োগ করা না হয় এবং
 গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তাকে প্রাদেশিক সরকারের সুপারিশ ব্যতীত অন্যত্র যেন
 বদলি করা না হয়, সেইরকম শাসনতান্ত্রিক বিধি প্রণয়ন করা।

৩.
 ক) ১. ১৭ আগস্ট,১৯৪৭ সালের পর থেকে যারা বেআইনিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ
করে পাহাড় বা সমতল ভূমি ক্রয়,বন্দোবস্তি বা 'বেদখল' করেছে অথবা বসতি স্থাপন
করেছে সে সকল 'বেআইনি বহিরাগতদের' পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
২. এ দাবীনামা উথথাপনের পর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির মধ্যে
চুক্তিপুত্র সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত যেসব 'বেআইনি অনুপ্রবেশকারী' পার্বত্য চট্টগ্রামে
জমি ক্রয়,বন্দোবস্তি বা বেদখল করে বসতি স্থাপন করবে তাদেরকেও সরিয়ে দিতে হবে.
খ) পাকিস্তান শাসনামলের শুরু থেকে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি
সমিতির মধ্যে চুক্তিপত্র সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেসব অধিবাসী
ভারত ও বার্মায় চলে যেতে 'বাধ্য হয়েছে' তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা।
গ) কাপ্তাই বাঁধের জলসীমা সর্বোচ্চ ষাট ফুট নির্ধারিত করা এবং এ বাঁধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত
উদ্বাস্তুদের সুষ্ঠু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
ঘ) ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কোন সদস্যের বিরুদ্ধে যদি কোন প্রকারের
মামলা,অভিযোগ,ওয়ারেন্ট ও হুলিয়া থাকে অথবা কারও অনুপস্থিতে কোন বিচার নিষ্পন্ন
হয়ে থাকে, তাহলে বিনাশর্তে সেসব মামলা,অভিযোগ, ওয়ারেন্ট,হুলিয়া প্রত্যাহার ও
বিচারের রায় বাতিল করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সকল সদস্যের যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা
অবলম্বন করা।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপে জড়িত করে বা মিথ্যা অজুহাতে জুম্ম
জনগণের মধ্যে যদি কারও বিরুদ্ধে কোন প্রকার মামলা,অভিযোগ,ওয়ারেন্ট ও হুলিয়া
থাকে অথবা কারো অনুপস্থিতিতে কোন বিচার অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে বিনাশর্তে সেসব
মামলা,অভিযোগ,ওয়ারেন্ট,হুলিয়া প্রত্যাহার ও বিচারের রায় বাতিল করা এবং কারো
বিরুদ্ধে কোন প্রকারের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা।

৪.
ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের উন্নতিকল্পে কৃষি,শিল্প,শিক্ষা,সমবায়,সংস্কৃতি,স্বাস্থ্য,ধর্ম,ভাষা,
ব্যবসা-বাণিজ্য,পশুপালন,রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ,মৎস্য,বন,জল ও বিদ্যুৎ সরবারাহ খাতে 
বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও সেজন্য কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ
বরাদ্দ করা।
খ) পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি নিজস্ব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা।
গ) বিশ্ববিদ্যালয়,মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুম্ম ছাত্র-ছাত্রীদের
 জন্য আসন সংরক্ষণ করা এবং বিদেশে গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষালাভের সুযোগ প্রদান করা।
ঘ) ১. বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে জুম্ম জনগণের জন্য নির্দির্ষ্ট কোটা
সংরক্ষণ করা।

৫.পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য-
ক) সাজাপ্রাপ্ত অথবা বিচারাধীন অথবা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর হাতে আটককৃত সকল জুম্ম
নর-নারীকে বিনাশর্তে মুক্তি প্রদান করা।
খ) পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ওপর সকল প্রকারের নির্যাতন,নিপীড়ন বন্ধ করা।
গ) পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে যুক্তগ্রাম ও আদর্শগ্রামের নামে গ্রুপিং করার কার্যক্রম
 বন্ধ করা এবং যুক্তগ্রাম ও আদর্শগ্রামসমূহ ভেঙে দেয়া।
ঘ) ১.বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল হতে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে 'বেআইনি' অনুপ্রবেশ, পাহাড়
ও সমতল ভূমি ক্রয়,বন্দোবস্তি ও বেদখল এবং বসতি স্থাপন বন্ধ রাখা।
 ২. লামা, রাজস্থলী,মাটিরাঙ্গা,রামগড়,মেরুং, পানছড়ি ও লংগদু থানা সমূহের বিভিন্ন অঞ্চলে
বসবাসরত বেআইনি বহিরাগতদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া।
ঙ) দীঘিনালা,রুমা ও আলিকদম সেনানিবাসসহ বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর সকল ক্যাম্প
পর্যায়ক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে তুলে নেওয়া।

[১৯৮৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে এই পাঁচ দফা সংবলিত দাবিনামা বাংলাদেশ সরকার সমীপে আনুষ্ঠানিভাবে পেশ করা হয় ।]


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রস্তাবিত ৯-দফাঃ

১৯৮৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ বৈঠকে সরকার পক্ষ তাঁদের ৯-দফা রুপরেখা জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধিদলের কাছে পেশ করেন। সেই ৯-দফা রুপরেখা ছিল নিম্নরুপঃ-

১) সংবিধানের ২৮ ধারার আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলাকে বিশেষ এলাকা হিসেবে
চিহ্নিতকরণ।
২) সংবিধানের ৯ ও ২৮ ধারার আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় প্রত্যক্ষ নির্বাচনের
মাধ্যমে সর্বাধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পৃথক পৃথক জেলা পরিষদ গঠন।
৩) বিষয় বিভক্তি ( Divison of Subjects) স্থিরকরণ।
৪) সংবিধানের ৬৫ ধারার আলোকে জেলা পরিষদসমূহকে মূল আইনের অধীন নির্দিষ্ট বিষয়ে
উপ-আইন,আদেশ,বিধি,প্রবিধান ইত্যাদি প্রণয়ন,জারি এবং কার্যকরী করার ক্ষমতা অর্পণ।
৫) জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোন আইন,জেলা পরিষদ কর্তৃক নিজস্ব এলাকার জন্য
আপত্তিকর বিবেচিত হলে সংসদে পুনর্বিবেচনার দাবি সরকারকে অবগতির জন্য
 আইনগত ক্ষমতা অর্পন।
৬) জেলা ও উপজাতীয় সার্কেলের এলাকা একত্রীকরণার্থে সীমানা পুননির্ধারণ।
৭) জেলা প্রধান এবং উপজাতীয় প্রধানের (Circle Chief) সংবলিত অবস্থান নির্ণয়ন।
৮) প্রতি সার্কেলে পুলিশ বাহিনী গঠন।
৯) পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েলের যথাযথ সংশোধন,বাস্তবায়ন অথবা বাতিলকরণ।
[বিদ্রঃ উপরোক্ত রুপরেখা নীতিগতভাবে গ্রহণ করা হলে যে আইনের অধীন স্থানীয় শাসন
প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই আইনকে সংরক্ষণ (Protection) করার জন্য সম্ভাব্য ব্যবস্থা করা যেতে পারে।]


জুম্ম জনগণের পক্ষ হতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট প্রদত্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংশোধিত পাঁচ দফা দাবীনামাঃ  

চাকমা,মারমা,ত্রিপুরা,মুরং,বোম,লুসাই,পাংখো,খুমী,খিয়াং ও চাক- ভিন্ন ভাষাভাষী এই দশটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির আবাসভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম।যুগ যুগ ধরিয়া এই দশটি ভিন্ন ভাষাভাষী জাতি নিজস্ব সমাজ,সংস্কৃতি,রীতি-নীতি,ধর্ম ও ভাষা লইয়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করিয়া আসিতেছে।বিশ্বের প্রতিটি জাতি বড় হউক আর ক্ষুদ্র হউক সব সময়ই নিজস্ব ধ্যান-ধারণার মাধ্যমে স্বীয় জাতীয় সংহতি ও জাতীয় পরিচিতি অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা চালাইয়া আসিতেছে।পার্বত্য চট্টগ্রামের দশটি ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম পাহাড়ি জনগণও ইহার ব্যতিক্রম নয়।
      ভারতের ব্রিটিশ সরকার এই মর্মকথা অনুধাবন করিতে সক্ষম হওয়ায় ১৯০০সালের ৬ই জানুয়ারি ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি প্রণয়ন করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখে।ইহার পরেও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে উক্ত শাসনবিধিকে পুনরায় স্বীকৃতি প্রদান করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক শাসিত অঞ্চলরুপে ঘোষণা করে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন ক্ষমতা পাকিস্তান সরকারের হস্তে অর্পন করিয়া চলিয়া যায়।পাকিস্তান সরকার সংশোধিত ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনকে অন্তর্বর্তীকালীন শাসনতন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসনের স্বীকৃতিও প্রদান করে। পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র ১৯৫৬ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি গৃহীত হয় এবং এই শাসনতন্ত্রেও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক শাসিত অঞ্চলরুপে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬২ সালের ১লা মার্চ পাকিস্তানের দ্বিতীয় শাসনতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। এই দ্বিতীয় শাসনতন্ত্রে ভারত শাসন ও ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান শাসনতন্ত্রে ব্যবহৃত 'পৃথক শাসিত অঞ্চল' শব্দের পরিবর্তে "উপজাতীয় অঞ্চল" শব্দ ব্যবহার করিয়া ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন পরিচালনার আইন ঘোষণা করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতীয় অঞ্চলের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বস্তুতঃ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এই শাসনবিধি উপনিবেশিক, সামন্ততান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ। এই শাসনবিধিতে জুম্ম জনগণের প্রতিনিধিত্বের কোন বিধি ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই। এই কারণে ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে তদানিন্তন সরকারের নিকট পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবী উথথাপন করা হয়।
         ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে এই স্বাধীনতা যেন সকলের নিকট অর্থপূর্ণ হইতে পারে তজ্জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণও দেশ ও জাতির পুনর্গঠনের মহান কর্মকান্ডে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করিয়া বাংলাদেশের উপযুক্ত নাগরিক হইয়া বাঁচিয়া থাকিতে চাহিয়াছিল। তদুদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখিয়া নিজস্ব আইন পরিষদ সম্বলিত স্বায়ত্তশাসনের আবেদন করা হইয়াছিল। কিন্তু তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকার জুম্ম জনগণের সকল প্রকারের আবেদন ও বাসনা সম্পূর্ণরুপে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের জাতীয় ও ভূমির অধিকার সংরক্ষণের একমাত্র রক্ষাকবচ পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসিত অঞ্চলের সত্তা চিরতরে লুপ্ত করিয়া দিয়া ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম শাসনতন্ত্র ঘোষণা করে। ফলতঃ জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও ভূমির স্বত্ব সংরক্ষণের যতটুকু আইনগত অধিকার ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিতে ছিল তাও ক্ষুণ্ণ হইয়া যায়।
          ব্রিটিশ শাসনামল হইতে আজ অবধি জুম্ম জনগণ সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত,লাঞ্চিত,নিপীড়িত ও নির্যাতিত হইয়া আসিতেছে। ফলশ্রুতিতে ভিন্ন ভাষাভাষী দশটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির জাতীয় অস্তিত্ব আজ চির বিলুপ্তির পথে। ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি,সামাজিক রীতি-নীতি,ভৌগলিক পরিবেশ,আচার-অনুষ্ঠান,দৈহিক ও মানসিক গঠন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা প্রভৃতির ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ ও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় জুম্ম জনগণও বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চলের জনগণের ন্যায় দেশমাতৃকার সেবা করিতে দৃঢ়-সংকল্প কিন্তু বিশেষ এক শ্রেণির লোকের ষড়যন্ত্রের ফলে ঐতিহাসিকভাবে আজ তাহারা সেই মহান দায়িত্ব হইতে বঞ্চিত হইয়া রহিয়াছে। অথচ এই দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সুদৃঢ় করিবার ক্ষেত্রে জুম্ম জনগণ নীরবে সকল বঞ্চনা ও নিপীড়ন সহ্য করিয়াও অপরিসীম ত্যাগ স্বীকারে দ্বিধাবোধ করে নাই।
           ব্রিটিশ প্রদত্ত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি জুম্ম জনগণের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করিতে পারে নাই। অনুরুপ 'পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ' দ্বারাও জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব,ভূমি স্বত্ব ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হইতে পারে নাই। কারণ এই পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ অগণতান্ত্রিক,সামন্ততান্ত্রিক,কম ক্ষমতাসম্পন্ন ও ত্রুটিপূর্ণ। বস্তুতঃ গণতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসন ব্যতিরেকে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ,ভূমিস্বত্ব ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভবপর নহে। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের জাতীত অস্তিত্ব অর্থাৎ দশ ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের সংহতি ,সংস্কৃতি,সামাজিক গঠন,অভ্যাস,প্রথা,ভাষা প্রভৃতি এবং ভূমিস্বত্ব অর্থাৎ পাহাড় ,বন ও ভূমির স্বত্ব সংরক্ষণের জন্য সর্বোপরি মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং সকল প্রকারের পশ্চাদপদতা অতি দ্রুতগতিতে অবসান করিবার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে জুম্ম জনগণের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক ১৯৮৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের নিকট পেশকৃত আইন পরিষদসহ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন সম্বলিত ৫(পাঁচ) দফা দাবি সংশোধিত আকারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট উপস্থাপন করা গেল-
১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান(Amendment) করিয়া-
ক) পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা প্রদান করা।
খ) আঞ্চলিক পরিষদ(Regional Council) সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন পার্বত্য চট্টগ্রামকে
প্রদান করা।
গ) এই আঞ্চলিক পরিষদ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের লইয়া গঠিত হইবে এবং ইহার
একটি কার্যনির্বাহী কাউন্সিল থাকিবে।
ঘ) আঞ্চলিক পরিষদে অর্পিত বিষয়াদির ওপর এই পরিষদ সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে                              বিধি,প্রবিধান,উপবিধি,উপআইন,আদেশ,নোটিশ প্রণয়ন,জারী ও কার্যকর করিবার
ক্ষমতার অধিকারী হইবে।
ঙ) পরিষদের তহবিল ও সম্ভাব্য আয়ের সাথে সংগতি রাখিয়া স্বাধীনভাবে বাৎসরিক বাজেট
 প্রণয়ন ও অনুমোদন করিবার ক্ষমতা এই পরিষদের হাতে থাকিবে।
চ) আঞ্চলিক পরিষদ নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দ্বায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী
হইবে-
১.পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা; ২.জেলা পরিষদ,পৌরসভা,
ইউনিয়ন পরিষদ,ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ;
 ৩.পুলিশ; ৪.ভূমি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; ৫.কৃষি,কৃষি ও উদ্যান উন্নয়ন; ৬.কলেজ,মাধ্যমিক
 ও প্রাথমিক শিক্ষা; ৭.বন,বনসম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; ৮. গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা; ৯.আইন ও বিচার;
 ১০.পশু পালন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ; ১১.ভূমি ক্রয়,বিক্রয় ও বন্দোবস্ত; ১২.ব্যবসা-বাণিজ্য; ১৩.
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প; ১৪.রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা; ১৫.পর্যটন; ১৬.মৎস্য,মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন
 ও রক্ষণাবেক্ষণ; ১৭.যোগাযোগ ও পরিবহন; ১৮.ভূমি রাজস্ব,আবগারী শুল্ক ও অন্যান্য কর
ধার্যকরণ; ১৯.পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ;২০.হাটবাজার ও মেলা; ২১.সমবায়; ২২.সমাজ কল্যাণ;
২৩.অর্থ; ২৪.সংস্কৃতি,তথ্য ও পরিসংখ্যান;২৫.যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া; ২৬.জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও
পরিবার পরিকল্পনা; ২৭.মহাজনী কারবার ও ব্যবসা; ২৮.সরাইখানা,ডাকবাংলা,বিশ্রামাগার,
খেলার মাঠ ইত্যাদি; ২৯.মদ চোলাই,উৎপাদন,ক্রয়-বিক্রয় ও সরবরাহ; ৩০.গোরস্থান ও শ্মশান;
 ৩১.দাতব্য প্রতিষ্ঠান,আশ্রম,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনাগার; ৩২.জল সম্পদ ও সেচ ব্যবস্থা;
৩৩.জুমচাষ ও জুম চাষীদের(জুমিয়া) পুনর্বাসন;৩৪.পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; ৩৫.কারাগার;
 ৩৬.পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

২.
ক) চাকমা,মারমা,ত্রিপুরা,মুরং,বোম,লুসাই,পাংখো,খুমী খিয়াং ও চাক- এই ভিন্ন ভাষাভাষী
দশটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা;
খ) পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি 'বিশেষ শাসনবিধি' অনুযায়ী শাসিত হইবে সংবিধানে এই রকম
শাসনতান্ত্রিক সংবিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা;
গ) বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হইতে আসিয়া যেন কেহ বসতি স্থাপন,জমি ক্রয় ও
বন্দোবস্ত করিতে না পারে সংবিধানে সেই রকম সংবিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা;
ঘ) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসী নন এই রকম কোন ব্যক্তি পরিষদের অনুমতি ব্যতিরেকে
যাহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করিতে না পারে সেই রকম আইনবিধি(Inner Line
Regulation)প্রণয়ন করা।তবে শর্ত থাকে যে কর্তব্যরত সরকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ইহা
প্রযোজ্য হইবেনা।
ঙ) ১. গণভোটের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মতামত যাচাইয়ের ব্যতিরেকে পার্বত্য
চট্টগ্রামের বিষয় লইয়া কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন(Amendment) যেন না করা হয়
সংবিধানে সেইরকম সংবিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা;
২. আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পরামর্শ ও
সম্মতি ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় লইয়া যাহাতে কোন আইন অথবা বিধি
প্রণীত না করা হয় সংবিধানে সেই রকম শাসনতান্ত্রিক সংবিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা;
চ) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের লইয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য স্বতন্ত্র পুলিশ বাহিনী
গঠন করা।তদুদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করা;
ছ) যুদ্ধ বা বহিঃআক্রমণ ব্যতীত আভ্যন্তরীণ গোলযোগের দ্বারা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে
বা উহার যে কোন অংশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন হইলেও
আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রান হইতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পরামর্শ ও
সম্মতি ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামে যেন জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা না হয় সংবিধানে
সেই রকম শাসনতান্ত্রিক সংবিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা;
জ) পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী,আধা-সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের
কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসী নন এমন কোন
ব্যক্তিকে যেন নিয়োগ করা না হয় সেই রকম আইন বিধি প্রণয়ন করা।তবে কোন পদে
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকিলে সরকার
হইতে প্রেষণে উক্ত পদে নিয়োগ করা।

২.
১. ক) রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- এই তিন জেলা বলবৎ রাখিয়া একত্রে পার্বত্য
চট্টগ্রামকে একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইউনিতে পরিণত করা।
 খ) পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামকে 'জুম্মল্যান্ড' (Jummaland)
 নামে পরিচিত করা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয় স্থাপন করা।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের জন্য একটি বিশেষ বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন
করা।
৪.  পার্বত্য চট্টগ্রামস্থ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ আসনসমূহ জুম্ম জনগণের জন্য সংরক্ষিত
রাখিবার বিধান করা।
৫. ক) কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প কেন্দ্র এলাকা ( Power Project Centre Area),বেতবুনিয়া
ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র এলাকা,রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা এলাকা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে অধিগ্রহণকৃত
জমি ব্যতীত অন্যান্য সকল শ্রেণীর জমি,পাহাড় ও কাপ্তাই হৃদ এলাকা এবং
সংরক্ষিত (Reserved) বনাঞ্চলসহ অন্যান্য সকল বনাঞ্চল পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও
আওতাধীন করা।
খ) কাপ্তাই জল-বিদ্যুৎ প্রকল্প কেন্দ্র এলাকা ( Power Project Centre Area),বেতবুনিয়া
ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র এলাকা,রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা এলাকা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে অধিগ্রহণকৃত
জমির সীমানা সুনির্দিষ্ট করা।
গ) পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি পাহাড় পরিষদের সম্মতি
ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর না করিবার প্রয়োজনীয় আইনগত
ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ঘ) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নন এমন ব্যক্তির দ্বারা বেদখলকৃত ও অন্য উপায়ে
বন্দোবস্তকৃত বা ক্রীত বা হস্তান্তরকৃত সমস্ত জমি ও পাহাড়ের প্রকৃত মালিকের
নিকট অথবা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা।
ঙ) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নন এমন ব্যক্তির নিকট বা কোন সংস্থাকে যে সমস্ত
জমি বা পাহাড় রাবার চাষ,বনায়ন অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে 'লীজ'(Lease) বা
বন্দোবস্ত দেওয়া হইয়াছে,সেই সমস্ত জমির লীজ ও বন্দোবস্ত বাতিল করা এবং
ঐ সমস্ত জমি ও পাহাড় পরিষদেরর নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন করা।
চ) সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত সকল
এলাকা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন করা।

৩.
১. ১৭ই আগস্ট,১৯৪৭ সাল হইতে যাহারা বেআইনিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করিয়া
পাহাড় কিংবা ভূমি ক্রয়,বন্দোবস্ত ও বেদখল করিয়া অথবা কোন প্রকারের জমি বা পাহাড়
ক্রয়,বন্দোবস্ত ও বেদখল ছাড়াই বিভিন্ন স্থানে ও গুচ্ছগ্রামে বসবাস করিতেছে সেই সকল
বহিরাগতদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে অন্যত্র সরাইয়া লওয়া।
২. ১৯৬০ সালের পর হইতে যে সকল জুম্ম নর-নারী ভারতে চলিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছে
তাহাদের সকলের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন ও সুষ্ঠু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. কাপ্তাই বাঁধের সর্বোচ্চ জলসীমা নির্ধারণ করা এবং কাপ্তাই বাঁধে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারসমূহের
সুষ্ঠু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৪. ক) সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প ব্যতীত সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সকল
ক্যাম্প ও সেনানিবাস পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে তুলিয়া লওয়া।
খ) বহিঃশত্রুর আক্রমণ,যুদ্ধাবস্থায় জরুরী অবস্থা ঘোষণা ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন
সেনাবাহিনীর সমাবেশ না করা ও সেনানিবাস স্থাপন না করা।

৪.
১. ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সকল সদস্যদের যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা
অবলম্বন করা।
খ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসং হতি সমিতির কোন সদস্যের বিরুদ্ধে যদি কোন প্রকারের
মামলা,অভিযোগ, ওয়ারেন্ট,হুলিয়া থাকে অথবা কাহারও অনুপস্থিতিতে যদি কোন
বিচার নিষ্পন্ন হইয়া থাকে তাহা হইলে বিনা শর্তে সেইসব মামলা,অভিযোগ,ওয়ারেন্ট ও
 হুলিয়া প্রত্যাহার ও উক্ত বিচারের রায় বাতিল করা এবং কাহারও বিরুদ্ধে কোন
প্রকারের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা।
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপে জড়িত করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী
বাসিন্দাদের মধ্যে যদি কাহারও বিরুদ্ধে কোন প্রকারের মামলা,অভিযোগ, ওয়ারেন্ট,
হুলিয়া থাকে অথবা কাহারও অনুপস্থিতিতে যদি কোন বিচার নিষ্পন্ন হইয়া থাকে তাহা
হইলে বিনা শর্তে সেইসব মামলা,অভিযোগ,ওয়ারেন্ট ও হুলিয়া প্রত্যাহার ও উক্ত বিচারের
রায় বাতিল করা এবং কাহারও বিরুদ্ধে কোন প্রকারের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা।
২. ক) বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে জুম্ম জনগণের জন্য নির্দির্ষ্ট কোটা
সংরক্ষণ করা।
খ) বিশ্ববিদ্যালয়,মেডিকেল কলেজ,ক্যাডেট কলেজ,কারিগরী ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
 জুম্ম ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা এবং বিদেশে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা
 লাভের সুযোগ প্রদান করা।
গ) সরকারী চাকুরীতে জুম্ম জনগণের জন্য বয়ঃসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা।
৩. ক) সরকারী অনুদানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা।
 খ) ভূমিহীন ও জুম চাষীদের (জুমিয়া) পুনর্বাসনসহ কৃষি,শিল্প,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,সংস্কৃতি,রাস্তা-ঘাট
 প্রভৃতি খাতে বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তজ্জন্য সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় অর্থ
 বরাদ্দ করা।
 ৪. পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা।
৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বহাল রাখা এবং উহা পরিষদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আনা।

৫. পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে অনুকূল পরিবেশ
গড়িয়া তোলা একান্ত অপরিহার্য।তৎপ্রেক্ষিতে-
১. সাজাপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন বা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর হেফাজতে আটককৃত সকল জুম্ম
নর-নারীকে বিনাশর্তে অনতিবিলম্বে মুক্তি প্রদান করা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনকে অনিতিবিলম্বে বেসামরিকীকরণ করা।
৩. জুম্ম জনগণকে গুচ্ছগ্রাম,বড়গ্রাম,শান্তিগ্রাম,যুক্তগ্রাম ও আদর্শগ্রামের নামে গ্রুপিং
করিবার কার্যক্রম বন্ধ করা এবং এই গ্রামসমূহ অনতিবিলম্বে ভাঙ্গিয়া দেওয়া।
৪. বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল হইতে আসিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ,বসতি স্থাপন,
পাহাড় ও ভূমি ক্রয়, বন্দোবস্ত,হস্তান্তর ও বেদখল বন্ধ করা।
৫.পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ও গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বহিরাগতদেরকে পর্যায়ক্রমে
পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে অনতিবিলম্বে অন্যত্র সরাইয়া লওয়া।
৬. সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BDR) ক্যাম্প ব্যতীত অন্যান্য সামরিক ও আধা-সামরিক
বাহিনীর সেনানিবাস ও ক্যাম্পসমূহ পর্যায়ক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে তুলিয়া লওয়া।
                                                                                                                                                                   
[বিঃদ্রঃ-৪ ডিসেম্বর,শুক্রবার,১৯৯২ পার্বত্য চট্টগ্রাম যোগাযোগ কমিটির মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক সংশোধিত আকারে পাঁচ দফা দাবীনামা পেশ করা হয়।]

Monday, June 15, 2020

এমএন লারমা ও তাঁর উত্তরসূরীদের বর্তমান অবস্থা - তাতিন্দ্র লাল চাকমা

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যখন ছাত্র ছিলেন তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন রাজনৈতিক দল ছিলনা।তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ ছিল পুরোপুরি গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ।

এই সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল সহজ সরল ও গতানুগতিক।পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতিতে ছিল অঢেল সম্পদ। এর মধ্যে জুম চাষ জুম চাষ নির্ভর লোকজন ছিল যাযাবরের মতোই।তাই অথিতি পরায়ণতা ও অস্থিতিশীলতা ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।

এছাড়া সমাজের নেতৃত্ব ছিল একনায়কতান্ত্রিক,পুরুষশাসিত ও উত্তরাধিকার প্রথায় প্রচলিত। এই কারণে এমএন লারমা বলতেন-পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ সামন্ততান্ত্রিক সমাজে আকন্ঠ নিমজ্জিত। সমাজে জাতীয় চেতনার কোন উন্মেষ ছিলনা।সর্বোপরি কাপ্তাই বাঁধের কারণে সমস্ত খাদ্য উৎপাদনের ভান্ডার জলে ডুবিয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। আর শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ছিল আমলাতান্ত্রিক,জেলা প্রশাসন নির্ভর প্রশাসন।এই অবস্থায় লক্ষাধিক পাহাড়ীকে ভারত ও বার্মায়(মায়ানমার) পালিয়ে যেতে হয়।

এই রকম পরিস্থিতির মধ্যে এমএন লারমা "কাপ্তাই বাঁধ পাহাড়ীদের মরণ ফাঁদ"-এই স্লোগান দিয়ে শুরু করেন রাজনীতি। তিনি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ দিয়ে বুঝিয়ে দেন - ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে অপাহাড়ীর সংখ্যা ছিল ২.৫ শতাংশ। ১৯৬১ সালে তা বেড়ে হয় ১১ শতাংশ, ১৯৭১ সালে বেড়ে ২২ শতাংশ আর ১৯৭৪ সালে ২৫ শতাংশ যার অর্থ হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু বানিয়ে তাঁদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

রাজনীতিতে তাঁর প্রথম বাধা গোষ্ঠীবাদ - যার উপর তিনি প্রচন্ড আঘাট হানেন। তাঁর বদলে আওয়াজ তুলেন জাতীয়তাবাদের। তখনই আবিষ্কার করেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দশ ভাষাভাষী এগারটি জাতির অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু এ জাতিগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও পশ্চাৎপদ। ভৌগলিক কারণে এই জাতিগুলো এতই কাছাকাছি ও পরস্পর সম্পর্কয্যক্ত যে একজাতির সহযোগিতা ছাড়া অন্য জাতির রাজনৈতিক আন্দোলন করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের অর্থনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম এক এবং অভিন্ন, আর রাজনৈতিক নিপীড়নও সমান। এই অভিন্নতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করেন জাতিগুলোর ঐক্যের স্লোগান-"জুম্ম জাতীয়তাবাদ"।

তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এটাও দেখিয়ে দেন যে বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক দল আছে এমনকি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলও আছে, সেই রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণের সমস্যার কথা মুখে স্বীকার করেন কিন্তু বাস্তবে এই জাতিগুলোর অধিকারের জন্য কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী গ্রহণ করেন না। তাই পাহাড়ীদেরকে আলাদা অস্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যে রাজনৈতিক দল জুম্মজনগণের স্বার্থ ও তাঁদের অধিকারের জন্য লড়াই করে যাবে। তা-ই জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটানো ও জুম্মজনগণের নিজস্ব অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে এমএন লারমার শ্রেষ্ঠ সৃষ্ঠি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও জুম্ম জাতীয়তাবাদ।

এমএন লারমা তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এবং যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামন্ত চিন্তাধারা সবচাইতে বেশী প্রভাবশালী ও সর্বত্রই পরিব্যাপ্ত কিন্তু তা সত্ত্বেও এই চিন্তাধারা আপোষপন্থী ও সংগ্রাম বিমূখ। তাই এই চিন্তাধারা জুম্ম সমাজের অগ্রগতিতে কখনোই নেতৃত্ব দিতে পারবেনা। এ কারণে তিনিই জুম্ম সমাজে প্রথম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেন। প্রতিটি গ্রামে গ্রাম পঞ্চায়েত গঠনের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে গড়ে তোলেন। জুম্ম সমাজে ইতিমধ্যে বুর্জোয়া অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠতে পারেনি। এমনকি এই সমাজে ব্যবসায়িক অর্থনীতিও গড়ে উঠতে পারেনি। তাই এই সমাজে বুর্জোয়া চিন্তাধারাও নেতৃত্ব দিতে সফল হবেনা। তাই তিনি ব্যাখ্যা করেন জুম্ম সমাজে একমাত্র প্রগতিশীল চিন্তাধারাই নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। যেহেতু প্রগতিশীল চিন্তাধারা সবচাইতে অগ্রসর এবং পৃথিবীর সর্বত্রই নির্যাতিত-নীপিড়িত মানুষদের সংগ্রামের জন্য ক্ষুরধার অস্ত্র, সেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগুলোর অস্তিত্ব সংরক্ষণের আন্দোলনেও এই চিন্তাধারাটাই হচ্ছে নেতৃত্বের জন্য বাস্তব ও উপযোগী। কিন্তু জুম্ম সমাজে এই চিন্তাধারার কোন সঙ্গী নেই। তাই এই চিন্তাধারার ধারকবাহক তথা নেতৃত্বের জন্য অবশ্যই আজীবন নিরলসভাবে সঙ্গী খুঁজে নিতে হবে। এমএন লারমা তাঁর এই কালজয়ী সিদ্ধান্তকে হাতে ধরে যেমন অনেক কর্মীকে শিখিয়ে গেছেন তেমনি বাস্তবে প্রয়োগ করে জুম্ম জনগণকে ইস্পাত কঠিন ঐক্যে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা যুগিয়েছেন। কিন্তু কালের চক্রে ১৯৮৩ সালের ১০ই নভেম্বরে তিনি শহীদ হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তাঁর উত্তরসূরীরা এই শিক্ষাকে কে কতখানি প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন।

এমএন লারমার মৃত্যুর পরপরই তাঁর প্রধান উত্তরাধিকারী শান্তিবাহিনীর প্রতিটি ইউনিট থেকে পলিটিক্যাল সেক্রেটারীর পদটি লুপ্ত করে দেন এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বে নিয়োজিত আঞ্চলিক কমিটি বিলুপ্ত করেন। তারপর থেকে শান্তিবাহিনীর মধ্যেকার জঙ্গী চেতনা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে । এর পরের ঘটনা আরো ভয়াবহ। এমএন লারমার উত্তরসূরীরা বিপ্লবী কর্মনীতি সঠিকভাবে প্রয়োগ না করে ভ্রান্ত কর্মনীতি প্রয়োগ করতে শুরু করেন। তখন সমগ্র শান্তিবাহিনীতে পুনর্গঠনের নামে যোগ্যতার ভিত্তিতে কমান্ডার, পরিচালক নিয়োগ না করে আনুগত্যের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। কিছু দিনের মধ্যে প্রমাণিত হতে থাকে এই আনুগত্য স্রেফ ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং স্বজন পোষণের আনুগত্য। ফলে দেখা গেছে যারা কখনও কোন যুদ্ধে যায়নি বা যুদ্ধ করার কথাও ভাবেনি তাদেরকেই শান্তিবাহিনীতে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। এতদিন যারা বেসামরিক বিভাগে কাজ করতো হঠাৎ করে তাদেরকে কোম্পানি কম্যান্ডার, সেক্টর কম্যান্ডার ও কম্যান্ড পোস্ট কম্যান্ডার এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে শত্রুর দ্বারা নয় বরঞ্চ নেতৃত্বের দ্বারাই শান্তিবাহিনীর জঙ্গিত্ব পঙ্গুত্ব বরণ করতে শুরু করে। ফলতঃ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে এমএন লারমার উত্তরাধিকারীরা নিজেদের বাহিনীর ভয়ে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়েন এবং পালাবার পথ খুঁজতে থাকেন।

প্রগতিশীল চিন্তাধারর ভিত্তিতে রচিত দলীয় সাংগঠনিক নীতি ছিল- শত্রুকে অধিকতর শত্রু না করে নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করা, নিরপেক্ষকে স্বপক্কে টেনে আনার চেষ্টা করা এবং পার্টির সক্রিয় সমর্থকদের পার্টির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক করা। কিন্তু এমএন লারমার প্রদর্শিত প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত এই নেতৃত্ব বিগত ২৯ বছরে যা করেছে তা হচ্ছে - এক সময়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতৃত্ব যা ছিল পার্টির দীর্ঘ শ্রমের ফল- সেই নেতৃত্বকে কাছে টানার বদলে দূরে সরিয়ে দিয়ে এমনকি নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা না করে সরাসরি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার ফলে আত্মরক্ষার তাগিদে এই নেতৃত্ব ইউপিডিএফ নামে আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে। শুধু তাই নয় এককালে চরম সংকটে গৃহযুদ্ধের সময় যারা অকুতোভয় যোদ্ধা তাদেরকেও পরবর্তীতে সংস্কারবাদী,বিভেদপন্থী,উপদলীয় চক্রান্তকারী ইত্যাদি নাম দিয়ে হত্যা ও গুম করার ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়। যার নীট ফলাফল হচ্ছে পার্টির বিভক্তি। সুতরাং বর্তমানে স্বভাবতই দেখা যাচ্ছে- এমএন লারমার প্রদর্শিত নীতি থেকে সরে যাওয়ার পরিণতি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাত।

কোন রাজনৈতিক দল কতটা প্রগতিশীল তা নির্ভর করে নিজেদের মধ্যকার সংঘটিত ভুলত্রুটি সম্পর্কে সেই পার্টির দৃষ্টিভঙ্গির উপর। কোন পার্টি যদি নিজেদের ভুলত্রুটি সংশোধনে আন্তরিক না হয় ,বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি প্রয়োগ না করে কিংবা তদন্ত করা না হয় তাহলে সেই পার্টি কোনদিন প্রগতিশীল হিসেবে দাবী করতে পারেনা। পার্টির ইতিহাসে কতিপয় ঘটনা- যেমন মুরংদের উপর হামলা, চাবাই মগের উপর হামলা, প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার উপর হামলা,ইউপি চেয়ারম্যান কুসুমপ্রিয় চাকমার উপর হামলা, প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রশেখর চাকমার উপর হামলা,প্রগতি চাকমার উপর হামলা, অংশুমান চাকমা ও তাঁর সহযোগীদের উপর হামলা এবং সর্বশেষ অনিল তঞ্চঙ্গ্যার অপহরণ; এই সব ঘটনা কার নির্দেশে বা কার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে সেই সব হামলার জন্য পার্টির ভাবমূর্তির কতটা ক্ষুন্ন হয়েছে বা উজ্জ্বল হয়েছে তা কোনদিন তদন্ত হয়েছে বা বিচার বিশ্লেষণ হয়েছে বলে জানা যায়নি।। এই ভুলত্রুটির সংশোধনে পার্টি নেতৃত্ব দায়িত্বশীল না হয়ে যদি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে সেই পার্টি তাঁর ভুলগুলো কিভাবে সংশোধন করবে এবং ভবিষ্যতে কিভাবে জাতীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। সে রকম দায়িত্বশীল মনোভাব যদি না থাকে তাহলে আর যাই হোক সেই পার্টি কোনদিন প্রগতিশীল হতে পারেনা এবং জাতিকে নেতৃত্ব  দেয়াও সেই পার্টির পক্ষে কখনই সম্ভব হবেনা।

জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে এমএন লারমা জাতীয় আন্দোলন বা জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আন্দোলনের এই স্তরে দেশপ্রেমিক ও সংগ্রামী সকল শ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারে যদিও নেতৃত্ব দেবে প্রগতিশীল শক্তি। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে বর্তমান নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে যে, চলমান ভ্রাতৃঘাটি সংঘাত স্রেফ ভ্রাতৃঘাটি নয়-এটা একটা শ্রেণী সংগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ জানে সত্তর দশকে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি পার্বত্য চট্টগ্রামে শ্রেণী সংগ্রাম শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে উৎখাত হয়েছিল। বর্তমান নেতৃত্বেরও একই পরিণতি হতে বাধ্য।

এমএন লারমা সবসময় বলতেন- একজন কর্মীর অবশ্যই তিনটা গুণ থাকতে হবে- ১) শিক্ষা গ্রহণের গুণ, ২) পরিবর্তন হওয়ার গুণ ও ৩) ক্ষমাশীল মনোভাব। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীরা পরিবর্তন হওয়ার জন্য অন্যদের পরামর্শ দেন, কিন্তু নিজেদের দীর্ঘদিনের বদভ্যাস কিংবা বদনাম পরিবর্তনের চেষ্টা করতে দেখা যায়নি। ক্ষমাগুণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমএন লারমা প্রায়ই গুরুত্ব দিয়ে বলতেন-যাদের হাতে ক্ষমতা থাকে তাঁদের অবশ্যই ক্ষমাশীল হতে হবে। বিশেষতঃ জীবনের উপর হাত না দেওয়ার জন্য বলতেন- "জীবন কেড়ে নেয়া যায়, কিন্তু জীবন দান করা যায়না"। সুতরাং যা দান করা যায়না তা নিয়ে মোটেঈ ক্ষমতার অপব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে আজো দেখা যায় এই সব ক্ষমতাশালী উত্তরাধিকারীদের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে খুন ও অপহরণ যেন নিত্য দিনের ঘটনা। এই সব বিষয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে- মুখে দাবী করেন, তারা এমএন লারমার উত্তরাধিকারী কিংবা মূল্ধারা অথচ তারাই বেশী রক্তের রাজনীতি করছেন। সে সব দলে মূখ্য দ্বন্ধ আর গৌণ দ্বন্দ্বের কোন ভেদাভেদ নেই। কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের মীমাংসার জন্য ঐক্য-সমালোচনা-ঐক্য আর কার্যকরী হতে পারেনা। তাই পার্টি জীবনে কেউ নিশ্চিত করে বলে পারবেনা কে কতদিন এই দলে টিকে থাকতে পারবে।

যারা আজ এই সহিংস রাজনীতিতে মত্ত তারা বা তাঁদের দ্বারা জুম্ম জাতির একটা বৃহত্তর ঐক্য অর্জিত হতে পারবে,এটা আর কেউ বিশ্বাস করেনা। কিন্তু জুম্ম জনগণ চায় একটা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য এবং ঐক্যের জন্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সংঘাত বন্ধ করা। জনগণের এই মতামতকে কেউই আমলে নিচ্ছেনা। অথচ এমএন লারমার শিক্ষা ছিল, জনগণের মতামত সংগ্রহ করা এবং তা সুসংহত করে আবার জনগণের মধ্যে নিয়ে যাবার মত গণলাইন অনুসরণ করা। তা না করে এই উত্তরাধিকারীরা নিজেদের জেদটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং একে অপরের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে প্রকৃত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকৃত বন্ধুদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজটি অবহেলা করে চলেছেন।

প্রকাশঃ প্রবাহণ, ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১২,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি,মিলনপুর,খাগড়াছড়ি।

Sunday, June 14, 2020

সুধাসিন্ধু খীসাঃএকটি নক্ষত্রের বিদায়


শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা
১৯৪৩ সালে বর্তমান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মহালছড়ি উপজেলার মুবাছড়ি ইউনিয়নের কুলারাম পাড়ায় (খুল্লেং পাড়া) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা।
ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন খুব জেদি।যা ভাবতেন তাই করতে তিনি কখনো পিছপা হতেননা।
যার কারণে তাঁর আরেক নাম ছিলো জিত্তোগুলো(চাকমা ভাষা) অর্থাৎ হার না মানা।
ষাটের দশকে সমাজবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে ভর্তি হন বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।বর্তমান সময়ে এসেও যেখানে মাত্র গুটিকয়েক জুম্ম ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করতে পারছেন,তৎকালীন সময়ে কতটা কঠিন ব্যাপার ছিল তা সহজে অনুমান করা যায়।একদিকে উনার পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত অন্যদিকে তিনি ছিলেন তুখোর মেধাবী।
স্বপ্ন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন।কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাম্পন্থীধারার বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।যার ধরুন জুম্মদের নিয়ে চিন্তাভাবনা তাকে প্রভাবিত করে।
উপরন্তু ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধের ফলে হাজার হাজার পাহাড়ী মানুষের ভিটামাটি হারানো ও তাঁদের দেশান্তরী তাকে আজকের এই পর্যায়ে উঠে আসতে প্রেরণা যুগিয়েছিল।
১৯৭১ সালে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে উঠল,সংবিধান রচনাকালে যখন এদেশের ভিন্ন জাতীস্বত্তার মানুষদের অস্বীকার করা হল,পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি কেড়ে নেয়া হল,
তখন এমএন লারমার নেতৃত্বে গঠিত হল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
আর যখনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সফলতার মুখ না দেখার আশা দেখা দিল তখনই জন্ম হল জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী।সেই জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠাকালীন একজন সদস্য হলেন সুধাসিন্ধু খীসা।
এমএন লারমা জুম্ম সমাজকে সামাজিক,অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একসময় শিক্ষিত জুম্ম সমাজের প্রতি বলেছিলেন গ্রামে চলো।সেই স্লোগানে পাহাড়ের শিক্ষিত জুম্ম সমাজ ছুটে গিয়েছিলেন জুম পাহাড়ে।
যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষকতার পেশায়,মানুষ গড়ার কারিগড় হিসেবে।সেই শিক্ষিত তরুণ সমাজকে নিয়েই একসময় গড়ে উঠেছিল জনসংহতি সমিতি বা শান্তিবাহিনীর বিপ্লব।জনসংহতি সমিতির বেশীরভাগ কর্মীই ছিলেন শিক্ষক,যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই আন্দোলনকে বলা হয়েছিল "টিচার্স রিভুলেশন"।
এবং একসময় টিচার্স রিভুলেশন নামেই শান্তিবাহিনীর আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।
এই টিচার্স রিভুলেশন নামে খ্যাত বিপ্লবের অন্যতম সারথী ছিলেন ছিলেন সুধাসিন্ধু খীসা।
তিনি ছিলেন জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ও জুম্ম সমাজের মহানায়ক এমএন লারমার একজন বিশস্ত কাছের মানুষ।
জনসংহতি সমিতির দলীয় প্রতীক
জনসংহতি সমিতির দলীয় পতাকা
১৯৮২ সালের(২৪-২৭) সেপ্টেম্বর জেএসএসের ২য় কংগ্রেসে ইতিহাসে প্রথম ভোটের মাধ্যমে জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় এবং সশস্ত্র পন্থায় ১ম ক্ষমতা দখলের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা চলে।
কংগ্রেসের আগেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে মতানৈক্য-আভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ লক্ষ্য করা যায়,যার কারণে কংগ্রেসের পর গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।
৪৯ জন প্রতিনিধির গোপন ব্যালেটে ভোট প্রধানে সুধাসিন্ধু খীসা ৪৮টি হ্যাঁ ভোট পান,একটিও না ভোট তিনি পাননি।
কংগ্রেসে প্রীতিকুমার বিরোধীতা না করলেও কংগ্রেসের পরপরই গোপনে নতুন একটি ৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন।ভবতোষ দেওয়ানকে সভাপতি,যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে সহসভাপতি ও প্রীতিকুমার চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি করা হয়।
২৯ জন কেন্দ্রীয় সদস্যের মধ্যে ১৫ জন কেন্দ্রের পক্ষে, ১০ জন বিদ্রোহী পক্ষে,২জন জেল বন্দী, একজন আলঙ্কারিক ও ১জন নিরপেক্ষ ছিলেন।
সভাপতি এমএন লারমা,ফিল্ড কমান্ডার সন্তু লারমা ছিলেন কেন্দ্রের পক্ষে,সাধারণ সম্পাদক ভবতোষ দেওয়ান ছিলেন বিদ্রোহী পক্ষে।
কংগ্রেস পূর্ববর্তী সময়ে কংগ্রেসস্থল পানছড়ির এহতমরা থুম এলাকায় পৌঁছার ৩-৪ দিন পূর্বে প্রীতিকুমার চাকমা সুধাসিন্ধু খীসাকে ভিন্নমতাবলম্বী ঘরনায় টানতে বাধ্য করতে চান।এতে সুধাসিন্ধু খীসা বলেন,"তুমি কি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছো? আমাকে তুমি 'থুম' করে মারলে তোমাকেও 'ফুং' করে মারার লোকের অভাব হবেনা।
গৃহযুদ্ধের সময় সুধাসিন্ধু খীসার এই বাক্যটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
৮৩'এর গৃহযুদ্ধে সুধাসিন্ধু খীসা ছিলেন এমএনলারমা অর্থাৎ কেন্দ্রের পক্ষে।
জেলবন্ধি অবস্থায় সন্তু লারমা সরকারের কাছে দেয়া ৪৩ পৃষ্ঠার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে সুপারিশনামাকে প্রীতিকুমার চাকমা আপোষনামা হিসেবে চিহ্নিত করেন।এবং তিনি এই আপোষনামায় পার্টির সমগ্র গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন,যার কারণে পার্টিতে সংকট ও পরবর্তীতে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।১৪ই জুন ১৯৮৩ সালে সন্তু লারমা তাঁর একঘেয়েমিতার কারণে যদি পানছড়ির গোলকপতিমাছড়ায় বিদ্রোহী ঘাটিঁতে প্রথম সশস্ত্র আক্রমণ না চালাতো তাহলে হয়তো সমাধানের পথ সৃষ্টি হতো।
১৪ই জুন ১৯৮৩ থেকে শুরু হয়ে গৃহযুদ্ধ ৩০ এপ্রিল ১৯৮৫ তে এসে শেষ হয়।যেখানে জুম্ম জাতির স্থপতি মহান নেতা এমএনলারমাসহ বহু প্রতিভাবান মানুষকে জুম্ম সমাজ হারিয়েছে।
গৃহযুদ্ধের পর আবারো জনসংহতি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করতে থাকে।জেলবন্দী অবস্থায় সন্তু লারমার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে দেয়া ৪৩ পৃষ্ঠার সুপারিশনামা অনুযায়ী স্বৈরাচারী এরশাদের
শাসন আমলে প্রথম জনসংহতির সাথে বাংলাদেশ সরকারের সমস্যা সমাধানকল্পে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সুধাসিন্ধু খীসা।বৈঠকের সকল চেয়ারগুলোতে লেখা ছিল জনাব অমুক জনাব সমুক।এই জনাব লেখা দেখে সুধাসিন্ধু খীসা মহোদয় চেয়ারগুলোতে বসতে অস্বীকৃতি জানান
এবং প্রতিবাদ জানান।তিনি মনে করেছিলেন এই জনাব লেখার মধ্য দিয়ে জুম্মদেরকে বাঙালীয়ানা আগ্রাসন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছিল।যার কারণে একপর্যায়ে উক্ত বৈঠকে জনাব এর পরিবর্তে শ্রী লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন শাসকেরা।
অথচ এখনো আমাদের কিছু কিছু জুম্ম নেতাদের জনাব ধারণ করতে দেখা যায়,যেখানে সুধাসিন্ধু খীসার এই প্রতিবাদ ম্লান হয়ে যায়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সকারের সাথে জনসংহতি সমিতির ২৬ বারের বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।যা গোটা বিশ্বে পার্বত্য শান্তি চুক্তি নামে সমধিক খ্যাত।
২৬ বারের এই প্রতিটি বৈঠকে জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধিদের সাথে উপস্থিত ছিলেন সুধাসিন্ধু খীসা।
পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পর সুধাসিন্ধু খীসা প্রথম স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন এবং থাকতে দেয়া হয় এলজিইডির ডরমেটরিতে।কিন্তু তিনি সদ্য গেরিলা জীবন থেকে ফিরে আসা একজন রাষ্ট্রীয় অথিতিকে এমন অবহেলা মেনে নেননি,করেছিলেন প্রতিবাদ।যার কারণে ঐদিন তাকে রেস্টহাউজে রাখতে বাধ্য হয়েছিল।
চুক্তির পূর্বে তৎকালীন ছাত্র পরিষদের কিছু নেতাকর্মী সন্তু লারমার সাথে চুক্তির বিষয়ে আলোচনার কথা বলা হলেও সন্তু লারমা তাদেরকে গুরুত্ব না দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে এগোয়।
যার কারণে চুক্তি স্বাক্ষরকালীন সময়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,পাহাড়ী গণ পরিষদ,হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ব্যানারে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে চুক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
সেসব নেতাকর্মীদের সন্তু লারমা কাছে টানার বদলে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে যার ফলে ইউপিডিএফ নামক দলের সৃষ্টি।
১৯৯৭ সালে চুক্তি সম্পাদনের পর ১৯৯৮ সালে ১২ নং আইন আনুসারে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়।এবং ১৯৯৯ সালের ২৭ মে পার্বত্য চুক্তি অনুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে আঞ্চলিক পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়।
উক্ত আঞ্চলিক পরিষদে আমৃত্যু পর্যন্ত একজন সদস্য হিসেবে ছিলেন সুধাসিন্ধু খীসা।
এক এগারোর সময়ে দেশে জরুরী অবস্থা চলাকালীন সময়ে জনসংহতি সমিতিতে আভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দেয়।
পরবর্তীতে উক্ত আভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে পার্টির ৮ম জাতীয় সম্মেলনের পর পরই বেশ কিছু কেন্দ্রীয় নেতাকে অপদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে দিয়েছিলেন সন্তু লারমা। এরপর সরিয়ে দেয়া উক্ত নেতাদের নিয়ে সন্তু লারমা বিভিন্ন আপত্তিকর বিশেষণে বিভূষিত করে অপ্প্রচার চালিয়েছিলেন।
ফলে জনসংহতি সমিতির তৃণমূল পর্যায়ে বিভক্তি চলে আসে এবং পার্টির খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি কেন্দ্রীক বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এরই প্রেক্ষাপটে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ বৈঠক ছাড়া একক সিদ্ধান্তে নবম জাতীয় সম্মেলনের কার্যাবলী চূড়ান্ত করে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত করেন এবং ২৯-৩১ মার্চ ২০১০ একতরফাভাবে,অগঠনতান্ত্রিকভাবে সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেন।
সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রুপায়ন দেওয়ান,সহসভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা,সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রশেখর চাকমা,সহ সাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে বাদ দেন।
যেখানে সন্তু লারমা তাঁর একগুঁয়েমি,সেচ্ছাচারী,স্বৈরাচারী,বল প্রয়োগের রাজনীতি,স্বজনপ্রীতি ও অধঃপতিত নেতৃত্বকে প্রকাশ করেছিলেন।
পার্টির এই চরম দুঃসময়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বকে প্রত্যাখান করে পার্টির সচেতন কর্মীবৃন্দ ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার বড়াদাম হাইস্কুল মাঠে এক বিশেষ কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে এবং দীঘিনালা ঘোষণা নামে একটি ঘোষণাপত্র দেয়া হয়।
যে ঘোষণা পত্রে সন্তু লারমার কর্তৃক অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনকে প্রত্যাখান করে ৭ সদস্যক নতুন একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
উক্ত ৭ সদস্যের আহবায়ক কমিটিতে যারা ছিলেন তারা হচ্ছেন শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা ও শ্রী রুপায়ন দেওয়ান যুগ্ম আহবায়ক,শ্রী তাতিন্দ্র লাল চাকমা সদস্য সচিব,প্রকৌশলী মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা,এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা,শ্রী উদয় কিরণা ত্রিপুরা ও শ্রীমতি কাকলি খীসা।
এর পরবর্তী জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুধাসিন্ধু খীসা জনসংহতি সমিতির সভাপতি পদ লাভ করেন।
তিনি বিভক্ত জনসংহতি সমিতিতে ২ পিরিয়ড সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন।
গত ১৫-১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০,১২ তম জাতীয় সম্মেলনে শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি নেন।
বিগত নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ নং রাঙামাটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছিলেন।
কথিত আছে যে তিনি শান্তিবাহিনীর দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামে পার্টির পক্ষ হতে একটি মাত্র শার্ট গ্রহণ করেছিলেন।যার কারণ হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।
একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামে তাঁর জন্মদাতা পিতা 'ন লাখ মুনি মহাজন' নামে প্রসিদ্ধ ছিল।
ছিল অঢেল সম্পত্তির মালিক। তিনি যদি চাইতেন ঢাকা-চট্টগ্রামের মত শহরে বড় বড় প্লাটবাড়িও করতে পারতেন।
না তা করেননি তিনি,কাটিয়েছেন কুড়েঘরের মত একটি সরকারি বাসভবনে।
পাহাড়ের অধিকার হারা দুঃখ পীড়িত মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের সমস্ত জীবন।
কিন্তু তিনি ছিলেন আজন্ম সংগ্রামী,ত্যাগী,নিষ্ঠাবান,নিঃস্বার্থ একজন নেতা।
আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি যে ভাতা পেতেন,এবং শান্তিবাহিনীর যে রেশন পেতেন তাঁর একটিও তিনি ভোগ করেননি।বিলিয়ে দিয়েছেন অভুক্ত-গরীব মানুষদের।
২৪ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামের দিনগুলোতে পার্টির শীর্ষ নেতাদের লোভ,দুর্নীতি ও অন্যায় গ্রাস করতে না পারার পিছনে সুধাসিন্ধুর খীসার প্রভাব ছিল ব্যাপক। তিনি ছিলেন সৎ থেকেও সৎ,যা সমগ্র পার্টির নেতা-কর্মীদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল।
১৯৫৭ সালে এমএন লারমার নেতৃত্বে গড়ে উঠে পাহাড়ী ছাত্র সমিতি।
১৯৬২ সালে এমএনলারমার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় জুম্ম ছাত্র সমাজের প্রথম ঐতিহাসিক ছাত্র সম্মেলন।
সম্মেলনের মধ্য দিয়েই জুম্ম ছাত্র সমাজের বিপ্লবী কার্যকলাপ আরো জোরদার হতে থাকে।
কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের আন্দোলন জোরদার হতে থাকে,১৯৬৩ সালে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে অভিযুক্ত করে এমএনলারমাকে পাক সরকার গ্রেফতার করে।
এমএন লারমা একদিকে পাকিস্তান সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠলেন অন্যদিকে ছাত্র তরুণ সমাজের উদীয়মান নেতাদের প্রগতিশীল চিন্তায় সংগঠিত করে সমাজের বাছাই করা শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার উপর গভীর মনযোগ দিতে থাকেন।
এভাবে এমএন লারমার নেতৃত্বে জুম্ম সমাজে ১৯৭০ সালে প্রকৃতপক্ষে নবজাগরণের অভ্যুদয় ঘটে।
পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে ১৯৭২ সালে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
যার সাথে জড়িয়ে আছে একজন মেহনতি মানুষের নেতা শ্রী সুধাসিন্ধু খীসার অবদান।
সুধাসিন্ধু খীসা অন্য দশ পাঁচজন নেতার মত উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন রাজনীতিবিদ নন।দীর্ঘ সময়ের লড়াই-সংগ্রাম করে,আত্মত্যাগের মাধ্যমে তীল তীল করে গড়ে উঠা একজন রাজনীতিবিদ।
পার্টি গঠন,শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি,৮৩'র গৃহযুদ্ধ,গৃহযুদ্ধের অবসান,পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানকল্পে রাষ্ট্রের সাথে ২৬ বারের বৈঠক অবশেষে চুক্তি,চুক্তি পরবর্তী ইউপিডিএফের সাথে সংঘাত দেখেছেন,জেএসএসে বিভাজন দেখেছেন,কতকিছুরই না স্বাক্ষী তিনি,কত ক্ষেত্রেই না নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন জাতির প্রয়োজনে।
১৯৮৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতি বাংলাদেশ সরকারের কাছে আইন পরিষদসহ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন সম্বলিত যে ৫ দফা দাবীনামা উত্তাপন করা হয়,সেই ৫ দফা দাবীনামার অন্যতম রুপকার ছিলেন এই সুধাসিন্ধু খীসা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে সুধাসিন্ধু খীসা ছিলেন একজন মহারথী,যাকে বাদ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস কখনো সম্পূর্ণ হবেনা।
Odong chakama এর ফেসবুক ওয়াল থেকে 

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে তাই বলে এই মহান মানুষটির অবদান ভুলে গিয়ে আমরা যদি অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিই তা কখনো একজন প্রকৃত সচেতন রাজনীতিবিদের কাজ হতে পারেনা।
পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে,
আগামীতেও উঠবে।পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক,আলোচনা,সমালোচনা হচ্ছে,হবে।বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল
আওয়ামীলীগ-বিএনপি,প্রতিপক্ষের কোন নেতা মারা গেলে তারা শোক জানায়।
অথচ আমাদের জুম্মদের মাঝে আমরা প্রতিপক্ষ মানেই চিরশত্রু ভাবী,প্রতিপক্ষ সংগঠনের কোন নেতা মারা গেলে শোক তো দূরের কথা উল্টো মুরগি-শূকর কেটে খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সুধাসিন্ধু খীসার মৃত্যুতে প্রতিপক্ষের অনেকে কটুক্তি করেছে বলে আমি এসব বলছিনা,আমি বলছি জাতি হিসেবে আমরা হিংস্র হয়ে যাচ্ছি,মানবতাবোধ আমরা হারাচ্ছি,নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে আমরা হয়ে পড়ছি শূণ্য।
আগামীতে শ্রীযুক্ত সন্তু লারমা, শ্রীযুক্ত প্রসীত খীসারা মারা গেলে যদি আপনারাও অশ্রাব্য কটুক্তি শুনতে পান তাহলে অবাক হওয়ারও কিছু থাকবেনা।
কারণ আমরা জাতি হিসেবেই নিকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছি,আমাদের কাছে ভালো কিছুই আর সহ্য হয়না।
সুধাসিন্ধু খীসা ছিলেন উপজাতীয় শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের একজন সদস্য।
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ষ্পেশাল এ্যাফেয়ার্স বিভাগ,
বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা-এর স্মারক নং-ষ্পেঃএ্যাঃবিঃ(প্রঃ-১)-১(ঞ)/৯৫(অংশ-১)/১৮৫, তাং- ৮/৪/১৯৯৭খি. মোতাবেক ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির হতে বাংলাদেশী উপজাতীয় শরণার্থীর দেশে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও তাদের পুনর্বাসন তথা সরকার ঘোষিত ২০(বিশ) দফা প্যাকেজ সুবিধা বাস্তবায়নে সহায়তা ও পর্যবেক্ষণকল্পে সরকার ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স গঠন করে।
"শান্তিবাহিনী গেরিলা জীবন" নামক বইতে লেখক গোলাম মোর্তাজা ১৫৯-১৬০ পৃষ্ঠায় সুধাসিন্ধু খীসার একটি সাক্ষৎকার তুলে ধরেন।তা এখানে হুবহু তুলে ধরলাম-
"উপজাতীয় শরনার্থী ও উপজাতীয় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের সদস্য সুধাসিন্ধু খীসার কথা হলো খাগড়াছড়ির পানখাইয়া পাড়ার জনসংহতি সমিতি অফিসে।তিনি বলেন,টাস্কফোর্সের মিটিংয়ে আলোচনা হয়।সেটা তখন লেখা হয়না।কার্যবিবরণী লেখা হয় পরে।আবার যেটা যে বিষয়ে আলোচনা হয় সেটা সেভাবে লেখা হয়না।টাস্কফোর্সের মিটিং হয়েছে নয়টি।কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।টাস্কফোর্স অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন করতে চায়।
যা চুক্তি বিরোধী।
টাস্কফোর্সের বৈঠক থেকে আপনারা ওয়াক আউট করলেন কেন?
'ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরনার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন করার জন্যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।কিন্তু সরকার টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন করতে চায়।এখন আমি তো জনসংহতি সমিতির সদস্য হিসেবে চুক্তিবিরোধী কাজ করতে পারিনা।মন্ত্রী কল্পরঞ্জন এবং সাংসদ দীপঙ্কর তালুকদার একটা প্রসঙ্গ উঠলেই বলেন,উপরের সঙ্গে আলোচনা না করে আমি কিছু করতে পারবনা।এখন আমার কথা হলো আপনার যদি কোন ক্ষমতাই না থাকে তাহলে আমরা আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করবো কেন?'
অ-উপজাতীয়দের সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আপনাদের আসলে কি কথা হয়েছে?আপনারা সব সময়ই বলেন চুক্তির বাইরেও চুক্তি আছে।
'তিনি বলেন, 'প্রধান্মন্ত্রী থেকে শুরু করে আবুল হাসানত আব্দুল্লাহ পর্যন্ত সবাই বলেছেন,আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখেন,আমরা আপনাদের বিষয়টি দেখবো।আমি ঢাকায় গিয়ে আবুল হাসানত আব্দুল্লাহর সঙ্গে দেখা করে তাকে বলেছি,আপনি আমার চোখের দিকে তাকান।আপনি বললেন পাহাড় থেকে আস্তে আস্তে অ-উপজাতীয়দের সরিয়ে নিয়ে আসবেন।সেখানে মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমাও উপস্থিত ছিলেন।স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ থেকে উপজাতি-অ-উপজাতি উভয়কেই পুনর্বাসন করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল।আমার কথার পর আবুল হাসানত আব্দুল্লাহ মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমাকে সেই চিঠি উইড্র করতে বলেন।'
অ-উপজাতি বাঙালীদের কিভাবে সরিয়ে নেয়ার কথা বলেছিলেন?
'আবুল হাসানত আবদুল্লাহ আমাকে বলেছিলেন, 'পর্যায়ক্রমে বাঙালিদের আর্থিক সাপোর্ট দেয়া বন্ধ করে দেয়া হবে।
রেশন বন্ধ করে দেয়া হবে।ল্যান্ড কমিশন হলে জমি হারিয়ে বাঙালিরা চলে আসতে বাধ্য হবে।কিন্তু এই দুই বছরে মাত্র পাঁচটি ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে।ভূমি বিরোধ আছে তিন হাজারের ওপরে।মীমাংসার গতি যদি দুই বছরে পাঁচটা হয় তাহলে কত বছর লাগবে?এর অর্থ কি আমরা বুঝিনা?'
কিন্তু বাস্তবে কি বাঙালীদের সরিয়ে নেয়া সম্ভব?
'কেন সম্ভব নয়?সরকার ইচ্ছে করলেই এদের দেশের অন্যত্র পুনর্বাসন করতে পারে।বাইরে থেকে ফান্ড আনতে পারে।চাইলে এ ব্যাপারে আমরাও সহযোগিতা করতে পারি।'
চুক্তি হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছেনা।তাহলে চুক্তি হয়ে লাভটা কি হলো?
'এ প্রশ্ন পাহাড়ীদের।পার্বত্য অঞ্চলের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা সবারই জানা।পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যা শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত।এই চুক্তির মানুষ এই ভেবে খুশি হয়েছিল যে,পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা হলো।সন্তু লারমা বলেছেন সরকারের একটি বিশেষ মহল চুক্তি বাস্তবায়ন করছেনা।অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমা ও সাংসদ দীপঙ্কর তালুকদার বলছেন, চুক্তির পর বাস্তবায়নে তারা সন্তুষ্ট।পুনর্বাসনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এই বক্তব্যের কোন মিল নেই।সন্তু লারমার কথারই সত্যতার প্রমাণ মেলে।
রাজনৈতিক টানাপোড়নের অসহায় শিকার সাধারণ পাহাড়িরা।
এই বিদ্রোহী জনপদের মানুষ আবার বিক্ষুব্দ হয়ে উঠছে।পথে পথে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ আর হতাশা।
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সুধাসিন্ধু খীসা
সুধাসিন্ধু খীসা ২০১৬ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর পরিবার,আত্মীয়স্বজন,বন্ধুবান্ধব ও পার্টির পক্ষ থেকে বিদেশে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার কথা বলা হলেও,তিনি বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে অপরাগ ছিলেন।বলেছিলেন আমি যদিওবা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায় লোকে বলবে অমুক বাবু জনগণের টাকা দিয়ে বিদেশে চিকিৎসা করাচ্ছে!
যার কারণে উনি মৃত্যু আগ পর্যন্ত দেশে থেকেই চিকিৎসা চালিয়ে গিয়েছিলেন।
এবং সর্বশেষ ৯ জুন ২০২০ মধ্যরাত ১২টা ৫ মিনিটে অর্থাৎ ১০জুন ২০২০ পাড়ি জমান না পেরার দেশে।
তাঁর মৃত্যুতে পার্টিতে নেমে আসে শোকের ছায়া।পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক,সামাজিক,সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ শোক প্রকাশ করেন।
প্রয়াত শ্রী সুধাসিন্ধু খীসার শবদেহ

প্রয়াত শ্রী সুধাসিন্ধু খীসার শবদেহ

প্রয়াত শ্রী সুধাসিন্ধু খীসার শবদেহ

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ও প্রগতিশীল ছাত্র জোটের প্রধান সমন্বয়ক আল কাদেরী জয় শ্রী সুধাসিন্ধু খীসাকে স্মরণ করে তাঁর ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন।পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল---
"বাঙ্গালীরা আমাদের শত্রু নয়,পাহাড়িরাও বাঙালিদের শত্রু নয়।আমাদের শত্রু একটাই -দেশের ও আন্তর্জাতিক শাসকগোষ্ঠী.. তাই আমাদের যুদ্ধটাও এক!"
কথাগুলো বলেছিলেন জুম্ম জনগণের মুক্তির অন্যতম বিপ্লবী নেতা সুধাসিন্ধু খীসা।
গতরাতে এই মহান বিপ্লবীর মহাপ্রয়াণ ঘটে।
২০১২ সালে খাগড়াছড়ির মহাজনপাড়ায় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি)'র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রোগ্রামে তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় হয়।সাথে ছিলেন আরেকজন প্রয়াত নেতা সূদীর্ঘ চাকমা।
সুধাসিন্ধু খীসাদা'র খাগড়াছড়ির বাসায় যখন আমরা পৌঁছায় তখন তিনি বারান্দায় বসে ছিলেন।সামনে ছিলো রবীন্দ্র রচনাবলীর পুরু একখন্ড। সেদিনই আলাপকালে বুঝতে পারি- এই ছোটখাটো মানুষটির মাঝে কি বিশাল ও প্রজ্ঞার শক্তি রয়েছে!
সেদিন প্রথম পরিচয়েই কথায় কথায় আফসোস করার সুরে বলতে থাকেন-"আমরা পারি নি,তবু চেষ্টা করছি। বামপন্থীরা দূর্বল বলে আজকে আমাদের পাহাড়িদের শক্তিও অনেক কমে গেছে। নিজেদের মাঝে বেড়েছে বিবাদ ও সংঘাত...।"
সেই আলাপকালে তাঁকে বললাম আমাকে আপনি না বলে তুমি করে বলবেন। তারপর মৃদু হেসে আমার পড়াশোনা কোথায়, কই থাকি বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
উত্তর শুনে বলেন-"তোমাদের মতো তরুণরা সমাজবদলের রাজনীতি করে-এটাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।"
এতো বড় একজন নেতা হয়েও কি সহজে মানুষের সাথে মিশে যেতে পারেন,সেটা এই মানুষটার সান্নিধ্যে এসে সেদিন বুঝেছিলাম।
দাদার সাথে ২য় দেখা হয় ২০১৪ কি ১৫ সালে। সেটাও পিসিপির আরেকটা সন্মেলনে। সেইবার আমারও খুব খারাপ সময় যাচ্ছিল।দলত্যাগীরা চলে যাওয়ায় সাংগঠনিক ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা চলছে সারাদেশে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও তাই এর প্রভাব পড়ে। দল ভাঙনের কথা শুনে সুধাসিন্ধুদা সেইবার খুব দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।বলেছিলেন-"আমরাও তো এরকম দলীয় সংকটের মাঝে আছি,তাই বুঝি এর কষ্ট।"
বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামানের প্রশংসা করেছিলেন,বলেছিলেন-রিয়েল রাজনীতিবিদ।সেইবার আরো অনেক আলাপে ভালো করে রাজনীতি করার উৎসাহ দিয়েছিলেন।
তাঁর সাথে সর্বশেষ দেখা ও কথা হয়েছিলো ২০১৭ সালে বাঘাইছড়িতে।শহরে প্রোগ্রামের অনুমতি না পেয়ে ও সংঘর্ষ এড়াতে খাগড়াছড়ি থেকে বেশ দূরেই রাঙামাটি সীমান্তে প্রোগ্রামটি হয়।সেইবার সাথে ছিলো Mehdi Hasan Nobel ও Sujon Biplob। এই প্রোগ্রামে দাদাকে খুব অসুস্থ মনে হচ্ছিল। নিজেও বলেছিলেন- 'শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, মনটাও ভালো নেই। ' বক্তৃতার মাঝেও যেন ছিলো সেই বেদনা ও কষ্টের সুর।বক্তৃতার মাঝখানেই হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। পরে একরকম অসুস্থ অবস্থায় অসমাপ্ত বক্তব্য রেখেই চলে গিয়েছিলেন... আর দেখা হয় নি।
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা)'র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য ছিলেন।তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা,মন্তব্য, আলোচনা-সমালোচনা থাকতে পারে।
কিন্তু তিনি ছিলেনএকজন সাহসী যোদ্ধা ও জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার একজন নিরলস সেনাপতি।তরুণ বয়সেই চোখে ছিলো সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন ও পাহাড়ি জনগণের মুক্তির আকুতি।ষাটের দশকে ছাত্রজীবনে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা ছিলেন।ছিলেন প্রচন্ড ক্ষুরধার স্মৃতিশক্তি ও আকর্ষণীয় বক্তা।এম.এন লারমা'র অন্যতম সহযোদ্ধা।বয়সে বৃদ্ধ হলেও চিন্তায় মননে ও সাহসিকতায় তিনি ছিলেন চিরসবুজ তরুণ!
তাঁর এই চলে যাওয়াটা- The end of journey but not the end of mission!
আজকে এই মহান বিপ্লবীর শেষযাত্রায় জানাই সশ্রদ্ধ ভালোবাসা ও তাঁর স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা!
পাহাড় এবং সমতলে- লড়াই হবে সমানতালে!
বিপ্লবী সুধাসিন্ধু খীসা! লাল সালাম! 
মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী,দুই মেয়ে ও এক ছেলে।১০জুন ২০২০ নিজ জন্মভূমি মহালছড়ির কুলারাম পাড়ায় সামাজিক রীতিনীতি মেনে তাঁর দাহকার্য সম্পাদন করা হয়।
জুম্ম জনগণ তাঁর অবদান কোনকালেই ভুলতে পারবেনা,তিনি বেঁচে থাকবেন জুম্মদের হৃদয়ে আজীবন।
ইতিহাসে লেখা থাকবে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে।
তাঁর জনপ্রিয় কিছু উক্তি হলো-
"দুনিয়াকে জেনে দুনিয়াকে বদলানো
আলো জ্বেলে অন্ধকারকে তাড়ানো"
"'লু মা লু হিরে
চ্গা মা চ্গা হিরে।''(মারমা ভাষা)
অর্থাৎ মানুষের ভিতরে মানুষ আছে,কথার ভিতরে কথা আছে।

শ্রী সুধাসিন্ধু খীসার কিছু স্থিরচিত্র
২রা ডিসেম্বর ২০১৭,খাগড়াছড়ি টাউন হল

২রা ডিসেম্বর ২০১৬

২রা ডিসেম্বর ২০১০,খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা মাঠ প্রাঙ্গন

২০শে মে ২০১৭,রুপালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ,বাঘাইছড়ি,রাঙামাটি

৯ আগস্ট ২০১২,মহাজন পাড়া,খাগড়াছড়ি

Monday, June 1, 2020

উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও জুম্ম জাতীয়তাবাদঃ

জাতীয়তাবাদ শব্দটি ইংরেজী ন্যাশনালিজিম শব্দের বাংলা পরিভাষা।ন্যাশনালিজম শব্দটি ১৮৪৪ সাল থেকে ব্যবহৃত হতে থাকে,যদিও জাতীয়তাবাদ মতবাদটি আরও আগে থেকে চলে আসছে।১৯শ শতাব্দীতে এই মতবাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।মতবাদটি এর অন্তর্নিহিত অর্থের কারণে ১৯১৪ সালের পর থেকে নেতিবাচক রূপ লাভ করে। গ্লেন্ডা স্লুগা বলেন,২০শ শতাব্দী হল জাতীয়তাবাদের মোহমুক্তি এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের উন্মেষের সময়।কথিত আছে যে,জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব ঘটেছে পাশ্চাত্যের মাটিতে।সেখান থেকে বিস্তার লাভ করেছে প্রাচ্যের দেশগুলোতে।পাশ্চাত্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও চেতনা জাগরিত করবার ক্ষেত্রে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।এই বিপ্লবের মূল স্লোগান ছিল,সাম্য,স্বাধীনতা ও সৌভ্রাতৃত্ব।পরবর্তীকালে ১৭৭৬ সালের আমেরিকার ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রাম জাতীয়তাবাদী সংগ্রামকে আরো সুসংহত ও শক্তিশালী করেছিল।

ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটেছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার হাত ধরেই।অনেকে একথা মনে করে যে সম্রাট অশোক,সমুদ্রগুপ্ত কিংবা সম্রাট আকবরের 'অখন্ড ভারত' নির্মাণের চিন্তাধারার মধ্যে জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ লুকায়িত ছিল।ভারতীয় গণতন্ত্রের 'পরমত সহিষ্ণুতা' দর্শনের সন্ধান পাওয়া যায় মোঘল সম্রাট আকবরের ধর্মীয় দর্শন নীতির মধ্যে।যদিও আকবরের সাম্রাজ্য জয়ের নীতির মধ্যে এক ভিন্ন জাতীয়তাবাদী দর্শনের খোঁজ পাওয়া যায়।পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষার সান্নিধ্যে এসে ভারতবর্ষের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশ ঘটেছিল।জাতীয়তাবাদ হল এমন এক ভাবগত অনুভূতি যা মানুষের মন-জগতে চিন্তা ও চেতনার স্তরে তৈরি হয়।যদিও এই অনুভূতি তৈরি হওয়ার পেছনে এক বা একাধিক বস্তুগত কারণ বিদ্যমান থাকে।যে সকল কারণগুলি একপ্রকার একতা তৈরিতে সহায়তা করে।ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল ধারার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল দুটি ভাবনার মধ্যে,
একদিকে নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করবার আকাঙ্খা অন্যদিক পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার চিন্তা।
ফলশ্রুতিতে কাশ্মীর হতে শুরু করে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সমগ্র ভারতবাসী একত্র হয়েছিল।যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ঐক্যের শক্তিকে মজবুত ও শক্তিশালী করেছিল।ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ আছড়ে পড়েছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে।ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের বিকাশের ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়,বিদ্যাসাগর,বিবেকানন্দ ও অ্যানি বেসান্ত এর মত সমাজ সংস্কারক চিন্তাবিদদের চিন্তাধারা।তৎকালীন ভারতবর্ষে জনগনের চিন্তা ও চেতনার স্তরকে জাগরিত করে জাতীয়তাবাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে এদেশের পত্র-পত্রিকাগুলো অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।এছাড়াও তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকারের একাধিক পদক্ষেপ,যেমন বঙ্গভঙ্গ,ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট ও ইলবার্ট বিল প্রভৃতি ভারতীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি করেছিল।যা ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্যের ভীতকে শক্তিশালী করেছিল।এই জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও চেতনা ভারতীয়দের উৎসাহিত করেছিল ব্রিট্রিশবিরোধী একের পর এক গণান্দোলনের তরঙ্গকে অব্যাহত রাখতে।

পরাধীন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করবার সংকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়েছিল,তা ছিল তৎকালীন ভারতবর্ষের মূলস্রোতের জাতীয়তাবাদ।এটি ছিল একপ্রকার অখন্ড জাতীয়তাবাদ।যেখানে সমস্ত পরিচিতির উপরে 'আমরা ভারতীয়' এই অনুভূতি দেখা দিয়েছিল।যা সমগ্র ভারতবাসীকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।অপরদিকে সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের আলোকপ্রাপ্ত দিনগুলোতে এই অখন্ড জাতীয়তাবাদী ভাবধারার মধ্যে ধর্মভিত্তিক এক ধরণের ভিন্ন ভাবধারার জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। যার মধ্যে আমরা হিন্দুধর্মভিত্তিক হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং ইসলাম ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ।যার ফলশ্রুতিতে একসময় এই দুই জাতীয়তাবাদ প্রখর হয়ে উঠলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের  প্রাক্কালে নতুন পৃথক দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান পৃথকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে।ব্রিটিশ সরকার তাঁদের শাসনের স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি করণের জন্যই উপমহাদেশে এ ধরণের বিভাজনের নীতি বা ভাগ কর শাসন কর নীতি প্রয়োগ করেছিল।ব্রিটিশদের ঐ নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে পরবর্তীতে আমরা দেশকে বিভক্ত করে ফেলি,যার সাম্প্রদায়িকতার রেশ আজও ভারতবর্ষের বিভক্ত বিভিন্ন দেশগুলোতে লক্ষ্য করা যায়।

ভারতবর্ষে স্বাধীনতার পর যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গিয়েছে তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যে ভাষা,জাতি,ধর্ম ও সংস্কৃতিগত স্বতন্ত্রটার ভিত্তিতে পৃথক আইডেন্টির দাবীতে একাধিক জাতীয়তাবাদী ধারণার অবয়ব ক্রমশ প্রকট হয়েছে।ভাষার ভিত্তিতে পৃথক রাজ্যের দাবীতে রাজ্য রাজনীতি তথা জাতীয় রাজনীতি বেশ কয়েক দশক উত্তাল হয়েছিল। ভারত সরকার বাধ্য হয়ে আন্দোলনকে স্তিমিত করার জন্য ১৯৫৩ সালে 'রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন' তৈরি করেছিল এবং ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন আইন পাশ হয়েছিল।এভাবে ভারতে ভাষাভিত্তিক,জাতি ভিত্তিক একের পর এক রাজ্য আত্মপ্রকাশ করেছিল।যার সর্বশেষ রাজ্য তেলেঙ্গানার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।এখনও পর্যন্ত যে সকল জাতিগোষ্ঠী কিংবা ভাষাগোষ্ঠীর দাবী পূরণ সম্ভব হয়নি তারা তাঁদের দাবী স্বপক্ষে আন্দোলন করে যাচ্ছে।যার উদাহরণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের গোর্খাদের গোর্খাল্যান্ডের দাবীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
স্তালিনের মতে একটি জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ধর্ম কোন মৌলিক বিষয় নয়। যার উদাহরণ হিসেবে আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠটা নিয়ে গড়ে উঠা পাকিস্তান থেকে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের কথা বলতে পারি।মার্কসবাদী দৃষ্টিতে জাতীয়তাবাদ মানব সমাজের ক্রমবিকাশের একটি পর্যায়ে গড়ে উঠে আবার মানব সমাজের ক্রমবিকাশের একটি পর্যায়ে এসে তা ভেঙে যায়।আমরা যদি লক্ষ্য করি ব্রিটিশ আগ্রাসন থেকে মুক্তির জন্য পুরো ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল আবার ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ভেঙে ধর্মভিত্তিক হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠে।আবার স্বাধীন ভারতবর্ষে বিভিন্ন ভাষা, জাতি,ধর্ম,সংস্কৃতিক গোষ্ঠীদের দ্বারা বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের সৃষ্টির ফলে অনেকগুলো রাজ্য গড়ে উঠে।আজও ভারতে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের চিত্র আমরা দেখতে পাই।গোর্খারা গোর্খাল্যান্ডের দাবী তুলছে, কাশ্মীরীরা কাশ্মিমের স্বাধীনতার দাবী তুলছে,মনিপুরীরা মনিপুরের স্বাধীনতার দাবী তুলছে।এছাড়াও ত্রিপুরা,মিজোরাম,নাগাল্যান্ড,আসামসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি হয়েছে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবীতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।হয়তো ভবিষ্যতে অনেক জাতীয়তাবাদ সফল হবে আর নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব হবে।
 
আর স্বাধীন পাকিস্তানে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ থেকে পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের ভাষাভিত্তিক জাতীয়বাদ গড়ে উঠে এবং পরবর্তীতে তা বাঙালী জাতীয়তাবাদে রূপ নেয়।এর পর পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাত থেকে নিজেদের ভাষা,সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও জাতীকে রক্ষার তাগিদে স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রাম করে এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়।পৃথিবীতে মানব সমাজের ক্রমবিকাশের একটা সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয় আবার সমাজের ক্রমবিকাশের একটা সময়ে এসে ভেঙে যায়।

উপরিউক্ত বিশ্লেষণে উপমহাদেশের বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের উদ্ভব আমরা লক্ষ্য করেছি আবার সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো ভেঙে যেতেও দেখেছি।বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভিন্ন ভাষাভাষীর  ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে উঠা "জুম্মজাতীয়তাবাদ"ও সমাজের ক্রমবিকাশের এক পর্যায়ে গড়ে উঠেছে।এবং ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী যদি এই জুম্ম জাতীয়তাবাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে আন্দোলন পরিচালনা করতে পারে তবে জুম্মজাতীয়তাবাদ যে উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল তা সফল হবে।মূলত জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠে সমাজ বিকাশের এক বিশেষ বাস্তবতায়।বিভিন্ন উন্নত জাতিগোষ্ঠীর আগ্রাসন,শোষণ,নীপিড়নের হাত থেকে রক্ষা ও নিজেদের জাতি,ধর্ম,সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ইত্যাদির রক্ষা এবং নিজেদের স্বাতন্ত্র্যটা রক্ষার জন্যই জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠে।জুম্ম জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠার পেছনেও এই কারণগুলোই দ্বায়ী।সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যখন সংবিধান রচনা করা হচ্ছিল তখন সংবিধানে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে,দেশের সমস্ত নাগরিকদের বাঙালী বানানো হয়েছিল।
যার বিরোধীতা করেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১ আসনের সংসদ এমএন লারমা এবং সংসদ ওয়াকআউট করেছিলেন।পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্রিটিশ আমল,পাকিস্তান আমল এবং তৎপূর্ববর্তী ঐতিহাসিক স্বীকৃতি ও এদেশের ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ অস্বীকৃতি জানায়।যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষা ও ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষদের সংস্কৃতি,ঐতিহ্য,ভাষা,আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা সর্বোপরি জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণের তাগিদেই এমএন লারমা জুম্ম জাতীয়তাবাদের ধারণা দেন।এবং জুম্ম জাতীয়তাবাদের ধারণা লালন করেই পাহাড়ের সবচাইতে প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি গড়ে উঠে।জুম্ম জাতীয়তাবাদের ধারণাটা এসেছে পাহাড়ের সমস্ত জাতিগোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক জীবন ধারা এবং অর্থনৈতিক ঐক্য জুম চাষের উপর ভিত্তি করে।তৎকালীন সময়েও এই জুম্ম শব্দটি নিয়ে মতপার্থক্য ছিল,যার কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী থেকে জনসংহতি সমিতিতে আসা বিভিন্ন জনকে একটি নাম বা শব্দ নির্বাচন কিংবা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছিল।যা হতে হবে সার্বজনীন সকল জাতির ক্ষেত্রে,
কিন্তু জুম্ম শব্দটির বিপরীতে সেদিন সার্বজনীন অন্যকোন শব্দ বা নাম কেউ দিতে পারেনি।যার কারণে এই জুম্ম শব্দটিকেই বেছে নেয়া হয়েছিল,সুতরাং এ সময়ে এসে আমাদের পূর্বজদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে অস্বীকার করে আমরা তাঁদের আত্মত্যাগকে কলঙ্খিত করতে পারিনা।

যেদিন জুম্ম জাতীয়তাবাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য পূরণ হবে সেদিন হয়তো পাহাড়ে জুম্ম জাতীয়তাবাদ ভেঙে গিয়ে আরো ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হবে।তাঁর কারণ পাহাড়ে অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এবং জুম্ম জাতীয়তাবাদ অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর মিলন ক্ষেত্র।সুতরাং আমাদের উচিত হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত জুম্ম জাতীয়তাবাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত পাহাড়ের সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলো জুম্ম জাতীয়তাবাদ যে আদর্শে গড়ে উঠেছে সে আদর্শের প্রতি বিশ্বাস রেখে জুম্ম জাতীয়তাবাদের উদ্দেশ্য পূরণে নিজেদের সপে দেয়া।

তথ্যসূত্রঃ
১।জাতীয়তাবাদ (উইকিপিডিয়া)
২।জাতি সমস্যায় মার্কসবাদ (সুপ্রকাশ রায়)
৩।বৈচিত্রময় ভারতভূমিতে বহুরুপী জাতীয়তাবাদঃ একটি পর্যালোচনা (আর্টিকেল, ত্রিদিব শঙ্কর ধাড়া)
৪।জাতি ও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে গোড়ার কথা (আর্টিকেল,ড.আবুল হোসেন)

Nishan Talukder
ফেসবুক পোস্ট
১লা জুন ২০২০ 

জাতি ও ভারতবর্ষের জাতি সমস্যা

কয়েক শতাব্দি আগেও পৃথিবীতে জাতির ধারণাটা ছিলনা।প্রাচীনকালে মানুষ সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করলেও জাতির ধারণাটা ছিলনা।রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিকাশের সাথে সাথেই জাতি ধারণার উদ্ভব ঘটে।সমাজ ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও বিকাশ হয় ।বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং গোত্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের মধ্য দিয়ে জাতিগত অর্থনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠে । এভাবে বহু ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং গোত্রের সংমিশ্রণে আধুনিক জাতির উদ্ভব ঘটে।এঙ্গেলসের ভাষায়-
"ক্রমবর্ধ্মান জনসংখ্যার চাপেই কোন জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতির মানুষ ভিতরে এবং বাইরে সংহত ও ঘনিষ্ট হইতে বাধ্য হয়।এইভাবে সর্বত্র পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও সংঘবদ্ধ হইয়া বসবাসের এবং পরস্পরের সহিত মিশিয়া যাইবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।ইহারই অনিবার্য পরিণতিস্বরুপ  ঐ জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজ নিজ বাসভূমি একত্র করিয়া একটি মাত্র জাতির বাসভূমি সৃষ্টি করে।"

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সংঘবদ্ধগোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রের গঠন করেছিল তখন সে সময়ে যে সব জাতিগোষ্ঠীরা নিজেরা দেশ গঠন করে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ভিন্ন কোন জাতির সাথে মিশে যেতে পারেনি  কিন্তু ভিন্ন জাতির দ্বারা গঠিত রাষ্ট্রে আলাদাভাবে থেকে গিয়েছিল তাদেরকেই উপজাতি বলা হয়েছিল।

জাতি বিষয়ে কিছু আলোচনাঃ 

জাতিঃ
আধুনিক জাতি বলতে কোন নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী একই ভাষাভাষী এবং এবং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ বিভিন্ন একবংশজাত গোষ্ঠী(clan),একবংশজাত উপজাতি(tribe) অথবা মূল মানব-শাখাজাত গোষ্ঠীর(ethnic group) ঐক্যবদ্ধ রূপ। 
স্তালিনের মতে,
"জাতি হইল,ইতিহাস বা সমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন যুগের মধ্য দিয়া ক্রমবিকাশ প্রাপ্ত,এক ভাষাভাষী,নিদির্ষ্ট স্থানে বসবাসকারী,একই আর্থনীতিক জীবন সম্পন্ন এবং সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়া প্রকাশিত একই মানসিক গঠনযুক্ত স্থায়ী জনসমাজ।"
এই সংজ্ঞাটি মতে জাতি গঠনের মূল কিছু বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেঃ
১। স্থায়ী জনসমাজ
২।এক ভাষাভাষী জনসমাজ
৩।এক বাসভূমি 
৪। এক অর্থনৈতিক জীবন ও অর্থনৈতিক ঐক্য
৫।জাতির মানসিক গঠন বা জাতীয় চরিত্র

উপরের বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর কিছু আলোচনাঃ
জাতি একটি নির্দিষ্ট জনসমাজ।পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই যে একটি মাত্র বংশজাতগোষ্ঠী বা এক বংশজাত গোষ্ঠী অথবা একটি মাত্র মূল মানব শাখা গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত।প্রতিটি জাতির মধ্যে রয়েছে বহু বংশধারা,বহু উপজাতি এবং বিভিন্ন মূল মানবশাখাজাত মানুষ।এই মিশ্রিত মানুষগুলো দীর্ঘকাল একত্রে বসবাস করে এবং একটি সাধারণ অর্থনৈতিক মধ্য থেকে ক্রমশ একটি স্থায়ী জনসমাজ গড়ে তুলেছিল।তাঁদের জীবন-ধারণ ও জীবন-সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়েই তারা এক জাতিতে পরিণত হয়েছে।আজকের আধুনিক বাঙালী জাতির কথা ধরা যাক।অস্ট্রালয়েড,মঙ্গোলয়েড এবং "আর্য" নামক মিশ্রিত মানবসংখ্যাকে নিয়েই বর্তমান বাঙালী জাতি গঠিত।পন্ডিতগণের মতে বাঙালী জাতির মধ্যে "আর্য" রক্তের পরিমাণ শতকরা মাত্র পাঁচ ভাগ।বাকি সমস্তই "অনার্য" রক্ত।কোন সুদূর অতীতে কোল-সাঁওতাল-মুন্ডা-ওরাওঁদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ অস্ট্রালয়েড মানবশাখা,কোচ প্রভৃতি মঙ্গোলয়েড মানবশাখা,"দ্রাবিড়" বলে কথিত মিশ্রিত মানবগোষ্ঠী বাংলাদেশে বন-জঙ্গল সাফ করে বস্তি স্থাপন করেছিল।পরে আর্য বলে কথিত মানুষেরা এসে বাংলাদেশে বসবাস করতে থাকে তাঁর পর কাল্ক্রমে এই জনসমষ্টি পরস্পরের সাথে মিশে গিয়ে এবং সমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে বাঙালী জাতিতে পরিণত হয়েছে।অবশ্য উপরোক্ত বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর সাঁওতাল,নাগা মিজো,রিয়াং,ত্রিপুরা প্রভৃতি কয়েকটি শাখা কোন বিশেষ ঐতিহাসিক কারণবশত সমতলভূমি হতে দূরে পাহাড়-পর্বত বা উচ্চ তরাই অঞ্চলে  বসতি স্থাপন করে কৃষি-জীবিকার মাধ্যমে নিজ নিজ পৃথক বংশগত বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে আসিতেছে।কেবলমাত্র কৃষি বিভিন্ন মানবশাখার ঐক্য সাধনে অক্ষম।ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাই উহার শোষণ কার্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মিশ্রণ ঘটাতে পারে এবং উহাদের একজাতিরুপে গড়ে তুলতে পারে।কিন্তু বাংলাদেশের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশের প্রধান স্রোত কেবল সমতল্ভূমির অঞ্চলের উপর প্রবাহিত হওয়ায় এই ব্যবস্থার চাপে বিভিন্ন মানব শাখার মিশ্রণ প্রধাণত সমতল ভূমিতেই ঘটেছে।এই মিশ্রণের ফলেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালী জাতির উদ্ভব হয়েছিল।
অভিবক্ত বাংলার সমতল ভূমি হতে উত্তর পূর্ব বাংলার পাহাড়-পর্বত ও উচ্চ তরাই অঞ্চলের বিভিন্ন মানবশাখাজাত মানুষ অর্থাৎ উপজাতিসমূহ সেই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কবল থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেছিল।সেই সকল জাতিগোষ্ঠীগুলো ভারত-বাংলাদেশের মত আধুনিক রাষ্ট্র উৎপত্তির পরও বর্তমানে নিজেদের স্বাতন্ত্র্যটা রক্ষার জন্য মিজোরাম,মনিপুর,নাগাল্যান্ড,ত্রিপুরা,আসামসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ও স্থায়ী জনসমষ্টিই জাতি নয়।সমগ্র ভারতবর্ষ,সমগ্র এশিয়া কিংবা সমস্ত ইউরোপই নির্দিষ্ট ও স্থায়ী জনসমষ্টির বাসস্থান;কিন্তু সমস্ত ভারতবাসী কিংবা,সমস্ত এশিয়াবাসী ,কিংবা সমস্ত ইউরোপবাসী এক জাতি নয়।
জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ভাষা এক মৌলিক উপাদান।জনসমষ্টির মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের যদি না চলে তাহলে ঐক্য গড়ে উঠা অসম্ভব,যার মাধ্যম হচ্ছে ভাষা।বাংলাদেশে বাঙালী জাতি ব্যতিত প্রায় ৪৫টির অধিক বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী রয়েছে,যাদের সাথে বাঙালী জাতির ভাষার ঐক্য নেই,তাঁদের  প্রত্যেকটি ভাষাভাষী জনসমষ্টিরই জাতীয় অস্তিত্ব সম্পূর্ণ পৃথক। কিন্তু তাঁর পরও এদেশের শাসকশ্রেণি সংবিধানে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে বাঙালী বলে অভিহিত করেছে।

কোন জনসমষ্টি এক ভাষাভাষী হলেও তারা ভাগ ভাগ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশে বাস করলে  এক জাতি বলে গণ্য হবেনা।যেমন ইংল্যান্ড,আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ান(আদিবাসীদের বাদে) অধিবাসীরা এক ভাষাভাষী হলেও এক জাতি নয়।
তেমনি বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালী ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা এক ভাষাভাষী এবং উৎপত্তির দিক হতে এক হলেও এখন ভিন্ন ভিন্ন দেশে বাস করায় এক জাতির অন্তর্ভুক্ত নয়। এক ভাষাভাষী মানুষ ভাগ হইয়া ভিন্ন ভিন্ন দেশে,ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে বাস করার ফলে ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে পরিণত হয়ে যায়।সুতরাং এক বাসভূমি জাতি গঠনের একটি মৌলিক উপাদান।

শুধুমাত্র এক ভাষা ও এক বাসভূমি হলেও কোন জনসমষ্টি জাতি বলে গণ্য হবেনা।প্রয়োজন একটি অর্থনৈতিক বন্ধনও।সাধারণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই জনসমষ্টির বিভিন্ন অংশকে একই জীবনের বন্ধনে আবদ্ধ করে এক জাতিতে পরিণত করে।

একই মানসিক গড়ন বা জাতীয় চরিত্র জাতি গঠনের একটি অপরিহার্য উপাদান।বিভিন্ন জাতির কেবল জীবন যাপনের অবস্থার মধ্যই নয়,তাদের মানসিক গঠনের মধ্যেও সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।এই মানসিক গড়ন বা জাতীয় চরিত্রই জাতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়ে থাকে।বিশেষ বিশেষ অবস্থায় জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে দিয়েই এই জাতীয় মানসিক গড়ন বা জাতীয় চরিত্র দীর্ঘকাল ধরে একত্রে বসবাসের ফলে জনসমষ্টির মধ্যে বিকাশ লাভ করে।

ভারতবর্ষে জাতি সমস্যাঃ
ইউরোপে সামন্ততন্ত্র ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ধনতন্ত্রের বিকাশ ধারা এবং জনসমষ্টির জাতিতে পরিণত হওয়ার ধারাটি এক হয়ে গিয়েছিল। আয়ারল্যান্ড বাদে বৃটিশ ,ফরাসি,জার্মান,ইতালিয়ান প্রভৃতি জাতি সামন্ততন্ত্রের ধ্বংস সাধন এবং ধনতন্ত্রের জয়জাত্রার যুগেই গঠিত হয়েছে।যে সকল ক্ষেত্রে জাতি গঠিত হবার পরপরই কেন্দ্রবদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করেছে সে সকল রাষ্ট্রগুলো একটিমাত্র জাতি নিয়ে গঠিত হয়েছে।যার কারণে সেসব রাষ্ট্রগুলোতে জাতীয় উৎপীড়ন,অর্থাৎ এক জাতির উপর আরেক জাতির উৎপীড়নের কোন প্রশ্ন ছিলনা।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যও রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।কিন্তু পূর্ব ইউরোপ ও প্রাচ্য জগতে,যেমন ভারতবর্ষে বহুজাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে।এই সকল রাষ্ট্রগুলোতে প্রভুত্ব করেছে ঐ রাষ্ট্রেরই কোন বিশেষ উন্নত জাতি।প্রাচ্য জগতের এই বহুজাতিক রাষ্ট্রগুলোই জাতীয় উৎপীড়নের প্রধান ক্ষেত্র।এই প্রকার এক জাতির উপর আরেক জাতির উৎপীড়ন হতেই জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ,জাতীয় আন্দোলন,জাতিগত সমস্যা প্রভৃতির সৃষ্টি হয়েছে।ভারতবর্ষে এই প্রকার সামন্ততান্ত্রিক ভিত্তির উপর কেন্দ্রবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে।যেমন হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে সম্রাট অশোক,মোগল যুগে সম্রাট আকবর হইতে আওরঙ্গজেবের শাসনকাল পর্যন্ত সময়ে।এই রাষ্ট্রগুলি কিছু সময় পর্যন্ত ঠিকে থাকে পরে গ্ণ অভ্যুথানের ফলে ভেঙে যায়।পরে বৃটিশ শাসনকালে আবার কেন্দ্রবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্টিত হয়।ভারত উপমহাদেশ বহু জাতি-উপজাতির বাসভূমি।
১৯২৩ সালে রুশীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসে জাতি সমস্যা সম্বন্ধে স্তালিন যে রিপোর্ট পেশ করেছিলেন তাতে ভারতবর্ষ সম্বন্ধীয় আলোচনায় অভিবক্ত ভারতের জাতি-উপজাতি সংখ্যা অন্তত ৮শত বলে উল্লেখ করেন।
তারপর ভারতবর্ষে দীর্ঘ সময়কাল সংগ্রামের ঝড় বয়র গিয়েছে এবং সেই সংগ্রামের আলোড়নে আরও বহু জাতি-উপজাতি নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে দেখা দিয়েছে।১৯৬১ সালের বর্তমান স্বাধীন ভারতে আদমশুমারীতে দেখা যায় এক হাজারের অধিক জাতি-উপজাতির আবির্ভাব ঘটেছে।বর্তমান বাংলাদেশেও মূল জনগোষ্ঠী বাঙালী জাতি বাদেও ৪৫টির অধিক বিভিন্ন জাতি লক্ষ্য করা যায়।বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জনজীবনের এই ভাঙাগড়ার ফলে এতগুলি জাতি-উপজাতির আবির্ভাব হয়েছে।বিশেষত পাহাড় অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন জাতি-উপজাতি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়েছে।বৃটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে নানা জাতির  আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলেছিল প্রায় দুইশত বছর।
সেগুলো বাদেও নাগা,মিজো,গারো,সাঁওতাল,ওঁরাও,মুন্ডা প্রভৃতি উপজাতীয়দের এবং কাশ্মীরিদের সংগ্রাম।
বর্তমানেও ভারতের ত্রিপুরা,মিজোরাম,নাগাল্যান্ড,মনিপুর,আসাম,বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।অথচ এই সকল জাতি-উপজাতিদের দীর্ঘকালের সংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার দুর্বার আকাঙ্খাকে ব্রিটিশদের মতই ভারত,বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী আজ পর্যন্ত অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে।১৯৪৬ সালে বৃটিশ 'ক্যাবিনেট মিশন' এর নিকট যোশী ডাঙ্গে অধিকারী-রণদিভে পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টি যে স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন তাতে মাত্র ১৮টি জাতির বাসভূমি অর্থাৎ জাতির নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।সেই ১৮টি জাতির বাসভূমি হইল তামিলনাদু,অন্ধ্রপ্রদেশ,কেরালা,কর্ণাটক,মহারাষ্ট্র,গুজরাট, রাজস্থান,সিন্ধু,বালুচিস্তান,পাখতুনিস্থান,কাশ্মীর,পশ্চিম পাঞ্জাব,মধ্য পাঞ্জাব,হিন্দুস্থান,বিহার,উড়িষ্যা,বাংলা ও আসাম।

অন্যসকল অঞ্চল বাদ দিলেও সাঁওতাল,মুন্ডা,ওঁরাও প্রভৃতি বহু জাতির বাসভূমি বিহার;খোন্ড প্রভৃতি জাতির বাসভূমি উড়িষ্যা;ত্রিপুরা,গুর্খা,সাঁওতাল,লেপচা প্রভৃতি বহু জাতির বাসভূমি বাংলাদেশ; এবং নাগা,মিজো প্রভৃতি বহু জাতির আসামকে এক ভাষাভাষী জাতির বাসভূমি বলে ঘোষণা করার কারণ কেবল অজ্ঞতা নয়,গভীর উদ্দেশ্যমূলক ছিল।
এটির একমাত্র উদ্দেশ্য শোষণ-পীড়ন হতে মুক্তিকামী জাতি-উপজাতিগুলোর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন।যার উদাহরণস্বরুপ বর্তমানের স্বাধীন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন জাতিস্ত্বার অবস্থা,ত্রিপুরা,মিজোরাম,মনিপুর,আসাম,নাগাল্যান্ড,কাশ্মীর সহ প্রভৃতি অঞ্চলের অবস্থা দেখলেই বোঝা সম্ভব।
১৯৪৭ সালে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের অজুহাতে ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি কোন সমর্থন যোগ্য ছিলনা,ধর্ম কোন জাতিত্বের নিয়ামক হতে পারেনা।বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশের সর্বত্র অর্ধ জাতীয় ও উপজাতীয় অধিবাসীদের বাস।
সাম্রাজ্যবাদ,সামন্ততন্ত্র,বৃহৎ বুর্জোয়াগোষ্ঠীর শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারাও যে দ্রুত জাতিরুপে বিকাশ লাভ করতে পারে ইতিহাস তাঁর স্বাক্ষ্য বহন করে।বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি ও সংঠনগুলোর রূপ বিশ্লেষণ করলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

উপমহাদেশে বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদ,সামন্ততন্ত্রের কড়াল থাবা জাতি-উপজাতিসমূহের বিকাশের পথে বাধার দেয়াল সৃষ্টি করে রেখেছে।বাধার দেয়াল সৃষ্টি করে কাউকে কখনো দমিয়ে যায়নি,প্রকৃতির নিয়মে প্রতিটি মানবশাখাগোষ্ঠী সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে নিজেদের বিকাশ ঘটিয়েছে।আগামীতেও বিকাশ ঘটবে।

Nishan Talukder
ফেসবুক পোস্ট 
৩০শে মে ২০২০