Thursday, May 21, 2020

জুম্মরা ভালো না থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে কি? - সুদীর্ঘ চাকমা

                           শহীদ সুদীর্ঘ চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ডজনের উপর গণহত্যা সংঘঠিত হয়েছে।অনেক সাম্প্রদায়িক হামলা,অপহরণ,হত্যা,গুম,ধর্ষণ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।হাজার হাজার পরিবার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারতে শরনার্থী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।
ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রামচুক্তি স্বাক্ষরের পরও পাহাড়ে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা কমেনি। অপারেশন উত্তরণ নামে সেনাবাহিনীর বিশেষ কর্তৃত্ব রয়েছে।
রয়েছে তিনশতাধিক সামরিক,আধাসামরি,আর্মড পুলিশ,ভিডিপি ক্যাম্প।যা বাংলাদেশের অন্য কোন অঞ্চলে নেই।
সেনাবাহিনী তাদের ভূমিকা নিয়ে সাফাই গেয়েছে।
বলেছে তারা উন্নয়ন ও শান্তির জন্য রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্বেকার ভূমিকার সাথে বর্তমান ভূমিকার আদৌ মিল নেই,ইত্যাদি।
যদিও তাদের বক্তব্যের সাথে  বাস্তবের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়না।

সম্প্রতি রাঙ্গামাটি শহরে জুম্মদের উপর হামলা করা হলো।বেসামরিক-সামরিক প্রশাসনের নাকের ডগায় অনেক জুম্ম ও জুম্ম গ্রামের উপর হামলা হলো।
এমন সময় এ হামলা হলো যখন জুম্মদের সুখে থাকার কথা।জুমের মানুষ নবান্নের প্রস্তুতি নিচ্ছে।জুমে সোনালি ধানের ঢেউ।নানা ফসলে ভরা জুম।
সামনে দুর্গাপূজা ও কঠিন চীবন দানসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজনেরও প্রস্তুতির সময় এটি।কিন্তু জুম্মরা সুখে নেই।মুখে হাসি নেই।
শাসকশ্রেণী তাদের সুখ নিয়ে তামাশার খেলায় মত্ত।
কাপ্তাইবাঁধ দিয়ে,বহিরাগত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে,পাহাড় জবরদখল করে,সেনাশাসন দিয়ে জুম্মদের সুখে কেড়ে নেয়া হয়েছে।
জুম্মদের চেহারায় এখন আতংকের ছাপ।তীব্র অনিশ্চয়তায় কাটে দিন।
প্রতিনিয়ত লোলুপ দৃষ্টি ধর্ষণ করছে পাহাড়ী নারীর শরীর।

জুম্মরা যে দা দিয়ে জুম চাষ করে তা বাঙালিদের তৈরি। সে দা দিয়ে বাঁশ কাটে তারা। সে বাঁশ দিয়ে চলে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজের কল কর্ণফুলি পেপার মিল।বাঁশ থেকে তৈরি করা কাগজে ছাপা হয় কত বই।
লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রী তাদের মাতৃভাষায় সুন্দর সুন্দর বর্ণ দিয়ে লিখে।
জুম্মদের মাতৃভাষায় লেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র সে ব্যবস্থা করেনি।আর সেই কাগজ দিয়ে জুম্মদের ভাগ্য নিয়ে কত আইন-কানুন ছাপেন শাসকেরা।
সাগরের কত প্রতিকুল পরিবেশে জাল ফেলে যে বাঙালি জেলে মাছ ধরে সেই মাছ দিয়ে তৈরি হয় নাপ্পি(সামুদ্রিক মাছের গুড়া দিয়ে তৈরি খাদ্য বিশেষ)।
যা না খেলে জুম্মদেরএকদিন চলেনা। সেই বাঙালি জেলে আর বাঙালি কামারের সাথে জুম্মদের কোন দ্বন্ধ নেই। নদী ভাঙা,অসহায় বাঙালিদের নানা প্রলোভন দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি দিয়ে পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে শাসকগোষ্ঠী।
তৎকালীন সরকার ১৯৭৮-৮০ সালে জেলা প্রশাসকদের এক গোপন সার্কুলার পাঠায়।
তাতে বলা হয়-

"আপনার জেলার ভূমিহীন/নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ জনসাধারণকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।নির্ধারিক এলাকায় পুনর্বাসন দেয়া হবে এবং প্রত্যেক পরিবারকে বিনামূল্যে নিন্ম বর্ণিতহারে জমি দেয়া হবে: সমতল ভূমি ২.৫ একর,সমতল ও ডাম্পিং জমি ৪ একর এবং পাহাড়ী জমি ৫ একর।
এই সিদ্ধান্ত হয়েছে আপনি ৫,০০০ পরিবার পাঠাবেন।" 

অথচ ১৯৬৪ সালে বন সার্ভে অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য জমি ২%,গাছ,ফল,সবজি আবাদজমি ২১%,বনের উপযোগী৫১%,রিজার্ভ ফরেস্ট ২৬% ছিল।

জুম্মরা ছড়ায় মাছ,চিংড়ি,কাঁকড়া ধরে।বনে বাঁশ কাটে।পশু শিকার করে কিছু আগামী দিনের জন্য রেখে দেয়।ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভাবে। নিঃশেষ করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে দখল নিতে যারা আসলো তারা সবকিছু শেষ করতে চায়।দখল নিতে চায়।
তারা ভালোবেসে মর জয় করতে চায়না।
জোর করে বশ করতে চায়।মানুষের চেয়ে সম্পদের প্রতি তাদের অগাধ ভালোবাসা।
একদল মানুষ বংশ পরম্পরায় প্রকৃতিকে,মানবিক মূল্যবোধকে রক্ষা ও লালন পালন করে এসেছে।
আর একদল ধ্বংস করতে এসেছে।ধ্বংসকারীদের পক্ষে সরকার,সেনাবাহি, পুলিশ,প্রশাসন আর তথাকথিত বড় বড় রাজনৈতিক দল।
এ যেন মানুষের সাথে অমানুষের লড়াই।কিন্তু আমাদের সরকার, আমাদের দেশের মিডিয়া প্রচার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালির লড়াই।
প্রশ্ন জাগে,চট্টগ্রামের বাঙালিদের জায়গার উপর যদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এসব বাঙালিদের বসতি দেয়া হতো তাহলে কি চট্টগ্রামের বাঙালিরা মেনে নিতে পারতেন?

ইসরাইল যখন ফিলিস্তিনের উপর,আমেরিকা যখন আফগানিস্তান,ইরাকের উপর আক্রমণ করে সেটা কি ইহুদি-মুসলিম,খ্রিস্টান-মুসলিম লড়াই?সেটাতো সত্যের সাথে মিথ্যার,ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের লড়াই।কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের লড়াইও পাহাড়ী-বাঙালির নয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আমেরিকার জর্জ হ্যারিসন কেন গেয়েছিল গান?স্টিফেন গিলসবার্গ মুক্তিযুদ্ধের জন্য কেন লিখেছিল কবিতা?কেন আর্জেন্টিনার চে গুয়েভারা কিউবায় ফিদেল কাস্ট্রোর সাথি হয়ে ধরেছিল অস্ত্র?
কেন ডাক্তার নর্মান বেথুনে চীনে গিয়ে লাল ফৌজিের দিয়েছিল চিকিৎ? 
তারা মানুষ হয়ে মানুষের পক্ষে লড়েছেন।মানবতার ঝান্ডা উর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন।
ঠিক তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন মানবাধিকার লংঘিত হয়,অন্যায় অত্যাচার চালানো হয় আমরা জুম্মদের পাশে পায় অনেক বাঙালিকে।বিশ্বের নানা প্রান্তের মানবতাবাদী মানুষদের।
উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে ফায়দা লুটলে শুধু কি পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য হুমকি?গোটা দেশের জন্য হুমকি নয়?

জুম্মদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে দমন পীড়নের মাধ্যমে ধ্বংস করার জন্য যে প্রচেষ্ঠা চালানো হচ্ছে তাতে কি শুধু জুম্মরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে?গোটা বাংলাদেশের মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেনা? বিগত সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহ দমনের নামে সামরিকখাতে ১৯৭৫ সালে ৪২মিলিয়ন ডলার,১৯৭৬ সালে ৮৬ মিলিয়ন ডলার,১৯৭৭ সালে ১৩৬ মিলিয়ন ডলার,১৯৭৮ সালে ১৪০ মিলিয়ন ডলার,১৯৮০ সালে ১৩৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ছিল(সুত্রঃ The Chittagong Hill Tracts Militarization,oppression and the hill tribes by Anti slavery Society)। 
সাথে রয়েছে প্রাণহানিসহ নানা ধরণের বৈষয়িক ক্ষয়ক্ষতি। বর্তমান সময়েও সামরিকখাতে বরাদ্দ বাড়বে বৈ কমবেনা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আগে সেনাবাহিনীর পেছনে দৈনিক সোয়া এককোটি টাকা ব্যয় করতে হতো।দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রভাব সামরিক কার্যক্রমেও পড়বে।
এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তিনশতাধিক সেনাক্যাম্প।
"অপারেশন উত্তরণ" নামে রয়েছে সামরিক শাসন।আওয়ামীলীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এএসএম কিবরিয়া সিলেটের হবিগঞ্জে তাঁর জীবনের শেষ বক্তব্যে বলেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা অভিযানের জন্য রাষ্ট্রকে কি পরিমাণ অর্থনৈতিক মাসুল গুনতে হয়েছিল।

বাংলাদেশে বেকারত্ব,শিক্ষা,বিদ্যুৎ,স্বাস্থ্যসেবাসহ কত সমস্যা রয়েছে।অধিকার কাউকে দিলে তা কমেনা বরং বাড়ে।জুম্মদের ন্যায় সঙ্গত অধিকার সেনাবাহিনী দিয়ে সমাধান করার বৃথা চেষ্টা না করে ঐ টাকা দিয়ে দেশের অনেক উন্নয়ন করা যেতো।দেশের মর্যাদা বাড়তো। পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্ব ব্যাংকের কত শর্ত মেনে ঋণ নিতে হচ্ছে।সামরিক ব্যয় কমালে আমাদের  টাকায় সত্যি সত্যি আমরা পদ্মাসেতু বানাতে পারতাম।
আমাদের দেশে পাহাড়ী-বাঙালি ভ্রাতৃত্ববোধের সেতুও সুদৃঢ়ভাবে রচনা হতো।
রাঙামাটিতে জুম্মদের উপর নগ্ন হামলা,রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে ও বাড়িতে অগ্নি সংযোগ ঘটনায় শুধু কি জুম্মরা আর বৌদ্ধরা কষ্ট পেয়েছে?বাঙালিরা কষ্ট পায়নি?কষ্ট না পেলে কেন দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠলো?পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্মরা ভালো না থাকলে আমাদের বাঙালি ভাইয়েরা ভালো থাকবেন কি করে!!বাংলাদেশ ভালো থাকবে কি করে!!! তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ভাষায় বলতে চাই-

                   "যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে-পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই!
                  শোনো মর্তের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন,নিজে হবে তত ক্লীব!                 

[সংগ্রহঃ প্রবাহণ,১০ নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১২,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  ]                       

No comments: