Monday, June 1, 2020

জাতি ও ভারতবর্ষের জাতি সমস্যা

কয়েক শতাব্দি আগেও পৃথিবীতে জাতির ধারণাটা ছিলনা।প্রাচীনকালে মানুষ সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করলেও জাতির ধারণাটা ছিলনা।রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিকাশের সাথে সাথেই জাতি ধারণার উদ্ভব ঘটে।সমাজ ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও বিকাশ হয় ।বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং গোত্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের মধ্য দিয়ে জাতিগত অর্থনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠে । এভাবে বহু ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং গোত্রের সংমিশ্রণে আধুনিক জাতির উদ্ভব ঘটে।এঙ্গেলসের ভাষায়-
"ক্রমবর্ধ্মান জনসংখ্যার চাপেই কোন জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতির মানুষ ভিতরে এবং বাইরে সংহত ও ঘনিষ্ট হইতে বাধ্য হয়।এইভাবে সর্বত্র পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও সংঘবদ্ধ হইয়া বসবাসের এবং পরস্পরের সহিত মিশিয়া যাইবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।ইহারই অনিবার্য পরিণতিস্বরুপ  ঐ জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজ নিজ বাসভূমি একত্র করিয়া একটি মাত্র জাতির বাসভূমি সৃষ্টি করে।"

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সংঘবদ্ধগোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রের গঠন করেছিল তখন সে সময়ে যে সব জাতিগোষ্ঠীরা নিজেরা দেশ গঠন করে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ভিন্ন কোন জাতির সাথে মিশে যেতে পারেনি  কিন্তু ভিন্ন জাতির দ্বারা গঠিত রাষ্ট্রে আলাদাভাবে থেকে গিয়েছিল তাদেরকেই উপজাতি বলা হয়েছিল।

জাতি বিষয়ে কিছু আলোচনাঃ 

জাতিঃ
আধুনিক জাতি বলতে কোন নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী একই ভাষাভাষী এবং এবং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ বিভিন্ন একবংশজাত গোষ্ঠী(clan),একবংশজাত উপজাতি(tribe) অথবা মূল মানব-শাখাজাত গোষ্ঠীর(ethnic group) ঐক্যবদ্ধ রূপ। 
স্তালিনের মতে,
"জাতি হইল,ইতিহাস বা সমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন যুগের মধ্য দিয়া ক্রমবিকাশ প্রাপ্ত,এক ভাষাভাষী,নিদির্ষ্ট স্থানে বসবাসকারী,একই আর্থনীতিক জীবন সম্পন্ন এবং সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়া প্রকাশিত একই মানসিক গঠনযুক্ত স্থায়ী জনসমাজ।"
এই সংজ্ঞাটি মতে জাতি গঠনের মূল কিছু বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেঃ
১। স্থায়ী জনসমাজ
২।এক ভাষাভাষী জনসমাজ
৩।এক বাসভূমি 
৪। এক অর্থনৈতিক জীবন ও অর্থনৈতিক ঐক্য
৫।জাতির মানসিক গঠন বা জাতীয় চরিত্র

উপরের বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর কিছু আলোচনাঃ
জাতি একটি নির্দিষ্ট জনসমাজ।পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই যে একটি মাত্র বংশজাতগোষ্ঠী বা এক বংশজাত গোষ্ঠী অথবা একটি মাত্র মূল মানব শাখা গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত।প্রতিটি জাতির মধ্যে রয়েছে বহু বংশধারা,বহু উপজাতি এবং বিভিন্ন মূল মানবশাখাজাত মানুষ।এই মিশ্রিত মানুষগুলো দীর্ঘকাল একত্রে বসবাস করে এবং একটি সাধারণ অর্থনৈতিক মধ্য থেকে ক্রমশ একটি স্থায়ী জনসমাজ গড়ে তুলেছিল।তাঁদের জীবন-ধারণ ও জীবন-সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়েই তারা এক জাতিতে পরিণত হয়েছে।আজকের আধুনিক বাঙালী জাতির কথা ধরা যাক।অস্ট্রালয়েড,মঙ্গোলয়েড এবং "আর্য" নামক মিশ্রিত মানবসংখ্যাকে নিয়েই বর্তমান বাঙালী জাতি গঠিত।পন্ডিতগণের মতে বাঙালী জাতির মধ্যে "আর্য" রক্তের পরিমাণ শতকরা মাত্র পাঁচ ভাগ।বাকি সমস্তই "অনার্য" রক্ত।কোন সুদূর অতীতে কোল-সাঁওতাল-মুন্ডা-ওরাওঁদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ অস্ট্রালয়েড মানবশাখা,কোচ প্রভৃতি মঙ্গোলয়েড মানবশাখা,"দ্রাবিড়" বলে কথিত মিশ্রিত মানবগোষ্ঠী বাংলাদেশে বন-জঙ্গল সাফ করে বস্তি স্থাপন করেছিল।পরে আর্য বলে কথিত মানুষেরা এসে বাংলাদেশে বসবাস করতে থাকে তাঁর পর কাল্ক্রমে এই জনসমষ্টি পরস্পরের সাথে মিশে গিয়ে এবং সমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে বাঙালী জাতিতে পরিণত হয়েছে।অবশ্য উপরোক্ত বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর সাঁওতাল,নাগা মিজো,রিয়াং,ত্রিপুরা প্রভৃতি কয়েকটি শাখা কোন বিশেষ ঐতিহাসিক কারণবশত সমতলভূমি হতে দূরে পাহাড়-পর্বত বা উচ্চ তরাই অঞ্চলে  বসতি স্থাপন করে কৃষি-জীবিকার মাধ্যমে নিজ নিজ পৃথক বংশগত বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে আসিতেছে।কেবলমাত্র কৃষি বিভিন্ন মানবশাখার ঐক্য সাধনে অক্ষম।ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাই উহার শোষণ কার্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মিশ্রণ ঘটাতে পারে এবং উহাদের একজাতিরুপে গড়ে তুলতে পারে।কিন্তু বাংলাদেশের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশের প্রধান স্রোত কেবল সমতল্ভূমির অঞ্চলের উপর প্রবাহিত হওয়ায় এই ব্যবস্থার চাপে বিভিন্ন মানব শাখার মিশ্রণ প্রধাণত সমতল ভূমিতেই ঘটেছে।এই মিশ্রণের ফলেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালী জাতির উদ্ভব হয়েছিল।
অভিবক্ত বাংলার সমতল ভূমি হতে উত্তর পূর্ব বাংলার পাহাড়-পর্বত ও উচ্চ তরাই অঞ্চলের বিভিন্ন মানবশাখাজাত মানুষ অর্থাৎ উপজাতিসমূহ সেই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কবল থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেছিল।সেই সকল জাতিগোষ্ঠীগুলো ভারত-বাংলাদেশের মত আধুনিক রাষ্ট্র উৎপত্তির পরও বর্তমানে নিজেদের স্বাতন্ত্র্যটা রক্ষার জন্য মিজোরাম,মনিপুর,নাগাল্যান্ড,ত্রিপুরা,আসামসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ও স্থায়ী জনসমষ্টিই জাতি নয়।সমগ্র ভারতবর্ষ,সমগ্র এশিয়া কিংবা সমস্ত ইউরোপই নির্দিষ্ট ও স্থায়ী জনসমষ্টির বাসস্থান;কিন্তু সমস্ত ভারতবাসী কিংবা,সমস্ত এশিয়াবাসী ,কিংবা সমস্ত ইউরোপবাসী এক জাতি নয়।
জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ভাষা এক মৌলিক উপাদান।জনসমষ্টির মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের যদি না চলে তাহলে ঐক্য গড়ে উঠা অসম্ভব,যার মাধ্যম হচ্ছে ভাষা।বাংলাদেশে বাঙালী জাতি ব্যতিত প্রায় ৪৫টির অধিক বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী রয়েছে,যাদের সাথে বাঙালী জাতির ভাষার ঐক্য নেই,তাঁদের  প্রত্যেকটি ভাষাভাষী জনসমষ্টিরই জাতীয় অস্তিত্ব সম্পূর্ণ পৃথক। কিন্তু তাঁর পরও এদেশের শাসকশ্রেণি সংবিধানে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে বাঙালী বলে অভিহিত করেছে।

কোন জনসমষ্টি এক ভাষাভাষী হলেও তারা ভাগ ভাগ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশে বাস করলে  এক জাতি বলে গণ্য হবেনা।যেমন ইংল্যান্ড,আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ান(আদিবাসীদের বাদে) অধিবাসীরা এক ভাষাভাষী হলেও এক জাতি নয়।
তেমনি বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালী ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা এক ভাষাভাষী এবং উৎপত্তির দিক হতে এক হলেও এখন ভিন্ন ভিন্ন দেশে বাস করায় এক জাতির অন্তর্ভুক্ত নয়। এক ভাষাভাষী মানুষ ভাগ হইয়া ভিন্ন ভিন্ন দেশে,ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে বাস করার ফলে ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে পরিণত হয়ে যায়।সুতরাং এক বাসভূমি জাতি গঠনের একটি মৌলিক উপাদান।

শুধুমাত্র এক ভাষা ও এক বাসভূমি হলেও কোন জনসমষ্টি জাতি বলে গণ্য হবেনা।প্রয়োজন একটি অর্থনৈতিক বন্ধনও।সাধারণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই জনসমষ্টির বিভিন্ন অংশকে একই জীবনের বন্ধনে আবদ্ধ করে এক জাতিতে পরিণত করে।

একই মানসিক গড়ন বা জাতীয় চরিত্র জাতি গঠনের একটি অপরিহার্য উপাদান।বিভিন্ন জাতির কেবল জীবন যাপনের অবস্থার মধ্যই নয়,তাদের মানসিক গঠনের মধ্যেও সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।এই মানসিক গড়ন বা জাতীয় চরিত্রই জাতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়ে থাকে।বিশেষ বিশেষ অবস্থায় জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে দিয়েই এই জাতীয় মানসিক গড়ন বা জাতীয় চরিত্র দীর্ঘকাল ধরে একত্রে বসবাসের ফলে জনসমষ্টির মধ্যে বিকাশ লাভ করে।

ভারতবর্ষে জাতি সমস্যাঃ
ইউরোপে সামন্ততন্ত্র ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ধনতন্ত্রের বিকাশ ধারা এবং জনসমষ্টির জাতিতে পরিণত হওয়ার ধারাটি এক হয়ে গিয়েছিল। আয়ারল্যান্ড বাদে বৃটিশ ,ফরাসি,জার্মান,ইতালিয়ান প্রভৃতি জাতি সামন্ততন্ত্রের ধ্বংস সাধন এবং ধনতন্ত্রের জয়জাত্রার যুগেই গঠিত হয়েছে।যে সকল ক্ষেত্রে জাতি গঠিত হবার পরপরই কেন্দ্রবদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করেছে সে সকল রাষ্ট্রগুলো একটিমাত্র জাতি নিয়ে গঠিত হয়েছে।যার কারণে সেসব রাষ্ট্রগুলোতে জাতীয় উৎপীড়ন,অর্থাৎ এক জাতির উপর আরেক জাতির উৎপীড়নের কোন প্রশ্ন ছিলনা।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যও রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।কিন্তু পূর্ব ইউরোপ ও প্রাচ্য জগতে,যেমন ভারতবর্ষে বহুজাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে।এই সকল রাষ্ট্রগুলোতে প্রভুত্ব করেছে ঐ রাষ্ট্রেরই কোন বিশেষ উন্নত জাতি।প্রাচ্য জগতের এই বহুজাতিক রাষ্ট্রগুলোই জাতীয় উৎপীড়নের প্রধান ক্ষেত্র।এই প্রকার এক জাতির উপর আরেক জাতির উৎপীড়ন হতেই জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ,জাতীয় আন্দোলন,জাতিগত সমস্যা প্রভৃতির সৃষ্টি হয়েছে।ভারতবর্ষে এই প্রকার সামন্ততান্ত্রিক ভিত্তির উপর কেন্দ্রবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে।যেমন হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে সম্রাট অশোক,মোগল যুগে সম্রাট আকবর হইতে আওরঙ্গজেবের শাসনকাল পর্যন্ত সময়ে।এই রাষ্ট্রগুলি কিছু সময় পর্যন্ত ঠিকে থাকে পরে গ্ণ অভ্যুথানের ফলে ভেঙে যায়।পরে বৃটিশ শাসনকালে আবার কেন্দ্রবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্টিত হয়।ভারত উপমহাদেশ বহু জাতি-উপজাতির বাসভূমি।
১৯২৩ সালে রুশীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসে জাতি সমস্যা সম্বন্ধে স্তালিন যে রিপোর্ট পেশ করেছিলেন তাতে ভারতবর্ষ সম্বন্ধীয় আলোচনায় অভিবক্ত ভারতের জাতি-উপজাতি সংখ্যা অন্তত ৮শত বলে উল্লেখ করেন।
তারপর ভারতবর্ষে দীর্ঘ সময়কাল সংগ্রামের ঝড় বয়র গিয়েছে এবং সেই সংগ্রামের আলোড়নে আরও বহু জাতি-উপজাতি নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে দেখা দিয়েছে।১৯৬১ সালের বর্তমান স্বাধীন ভারতে আদমশুমারীতে দেখা যায় এক হাজারের অধিক জাতি-উপজাতির আবির্ভাব ঘটেছে।বর্তমান বাংলাদেশেও মূল জনগোষ্ঠী বাঙালী জাতি বাদেও ৪৫টির অধিক বিভিন্ন জাতি লক্ষ্য করা যায়।বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জনজীবনের এই ভাঙাগড়ার ফলে এতগুলি জাতি-উপজাতির আবির্ভাব হয়েছে।বিশেষত পাহাড় অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন জাতি-উপজাতি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়েছে।বৃটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে নানা জাতির  আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলেছিল প্রায় দুইশত বছর।
সেগুলো বাদেও নাগা,মিজো,গারো,সাঁওতাল,ওঁরাও,মুন্ডা প্রভৃতি উপজাতীয়দের এবং কাশ্মীরিদের সংগ্রাম।
বর্তমানেও ভারতের ত্রিপুরা,মিজোরাম,নাগাল্যান্ড,মনিপুর,আসাম,বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।অথচ এই সকল জাতি-উপজাতিদের দীর্ঘকালের সংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার দুর্বার আকাঙ্খাকে ব্রিটিশদের মতই ভারত,বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী আজ পর্যন্ত অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে।১৯৪৬ সালে বৃটিশ 'ক্যাবিনেট মিশন' এর নিকট যোশী ডাঙ্গে অধিকারী-রণদিভে পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টি যে স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন তাতে মাত্র ১৮টি জাতির বাসভূমি অর্থাৎ জাতির নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।সেই ১৮টি জাতির বাসভূমি হইল তামিলনাদু,অন্ধ্রপ্রদেশ,কেরালা,কর্ণাটক,মহারাষ্ট্র,গুজরাট, রাজস্থান,সিন্ধু,বালুচিস্তান,পাখতুনিস্থান,কাশ্মীর,পশ্চিম পাঞ্জাব,মধ্য পাঞ্জাব,হিন্দুস্থান,বিহার,উড়িষ্যা,বাংলা ও আসাম।

অন্যসকল অঞ্চল বাদ দিলেও সাঁওতাল,মুন্ডা,ওঁরাও প্রভৃতি বহু জাতির বাসভূমি বিহার;খোন্ড প্রভৃতি জাতির বাসভূমি উড়িষ্যা;ত্রিপুরা,গুর্খা,সাঁওতাল,লেপচা প্রভৃতি বহু জাতির বাসভূমি বাংলাদেশ; এবং নাগা,মিজো প্রভৃতি বহু জাতির আসামকে এক ভাষাভাষী জাতির বাসভূমি বলে ঘোষণা করার কারণ কেবল অজ্ঞতা নয়,গভীর উদ্দেশ্যমূলক ছিল।
এটির একমাত্র উদ্দেশ্য শোষণ-পীড়ন হতে মুক্তিকামী জাতি-উপজাতিগুলোর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন।যার উদাহরণস্বরুপ বর্তমানের স্বাধীন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন জাতিস্ত্বার অবস্থা,ত্রিপুরা,মিজোরাম,মনিপুর,আসাম,নাগাল্যান্ড,কাশ্মীর সহ প্রভৃতি অঞ্চলের অবস্থা দেখলেই বোঝা সম্ভব।
১৯৪৭ সালে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের অজুহাতে ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি কোন সমর্থন যোগ্য ছিলনা,ধর্ম কোন জাতিত্বের নিয়ামক হতে পারেনা।বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশের সর্বত্র অর্ধ জাতীয় ও উপজাতীয় অধিবাসীদের বাস।
সাম্রাজ্যবাদ,সামন্ততন্ত্র,বৃহৎ বুর্জোয়াগোষ্ঠীর শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারাও যে দ্রুত জাতিরুপে বিকাশ লাভ করতে পারে ইতিহাস তাঁর স্বাক্ষ্য বহন করে।বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি ও সংঠনগুলোর রূপ বিশ্লেষণ করলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

উপমহাদেশে বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদ,সামন্ততন্ত্রের কড়াল থাবা জাতি-উপজাতিসমূহের বিকাশের পথে বাধার দেয়াল সৃষ্টি করে রেখেছে।বাধার দেয়াল সৃষ্টি করে কাউকে কখনো দমিয়ে যায়নি,প্রকৃতির নিয়মে প্রতিটি মানবশাখাগোষ্ঠী সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে নিজেদের বিকাশ ঘটিয়েছে।আগামীতেও বিকাশ ঘটবে।

Nishan Talukder
ফেসবুক পোস্ট 
৩০শে মে ২০২০ 

No comments: