Sunday, October 27, 2024

চুক্তি বিরোধীতা কার স্বার্থে?

জীবন চাকমা

১৯৯৫ সালের শেষ দিকে শেষ বারের মতো প্রসিত আর ববি বাবু এলো পার্টির সভাপতির সাথে সাক্ষাত করতে। পার্টি ও বাইরে আন্দোলনরত কতিপয় ছাত্র ও যুব নেতার মধ্যেকার বিরাজমান সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য। এর পরে সঞ্চয়ের নেতৃত্বে আট নয় জনের একটা গ্রুপ এসেছিল। আজকের কথিত শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ এর শীর্ষস্থানীয় নেতাই ছিল তখন। এদের সাথেই মূলত মতবিরোধ এক সময় তিক্ততায় পরিণত হয়। পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যতই মতভিন্নতা থাক আমাদের লক্ষ্য তো এক, সুতরাং যদি আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যেকার দূরত্ব বেড়েই যায় তাহলেও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে হোক। অর্থাৎ ঝগড়া বিবাদটাও নিজেদের জানাজানির মাধ্যমে একটা সমঝোতার ভেতর হয়ে যাক। তার মানে আন্দোলন যে যার লাইনে করবে কিন্তু নিজেদের মধ্যে সংঘাত হবে না। এভাবে আন্দোলনকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো। সঞ্চয়রাও সেদিন মন খুলে, প্রাণ খুলে কিছু বলেনি। বরং বলেছিল তা কি করে হয়। পার্টিই আমাদের আন্দোলনের অভিভাবক। তার নির্দেশ, পরামর্শ অনুযায়ীই কাজ করবো। পার্টি অবশ্য কোনকালেই তাদের নির্দেশ দেয়নি। কারণ নির্দেশ দেয়ার তারা কে? তারা তো পার্টির কোন শপথ নেয়া সদস্য বা কর্মী নয়। পার্টির খেয়ে জুম্ম জনগণের স্বার্থে আন্দোলন করে যাচ্ছে। অর্থাৎ পাটির শুভেচ্ছা নিয়ে নিজেদের মত করে ছাত্র যুবকদের নিয়ে আন্দোলনের স্বার্থে কর্মকান্ড চালাচ্ছে। তারা পার্টির নির্দেশ শোনার কে? কিন্তু পার্টি কি চেয়েছে? পার্টি চেয়েছে এই অগ্রগামী ছাত্র-যুবকরাই আগামী দিনের আন্দোলনের ভবিষ্যত। তাদের গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্বই পালন করতে চেয়েছে পার্টি। এদিক থেকে পার্টির কোন কার্পণ্য ছিল না। আন্তরিকতায়, আপ্যায়নে ছিল না কোন খুঁত। বরং বলা যায় সামর্থ্যেরও বেশি মনোনিবেশ করেছে পার্টি। সংশ্লিষ্ট পার্টি সদস্যরা নিজেরা কম খেয়ে, কষ্ট স্বীকার করেও দু'হাত বাড়িয়েছিল আন্দোলনরত ছাত্রদের সুখে-দুঃখে।

অথচ সেই সময় পার্টির তরফ থেকে যা বলা হচ্ছিল তখন তারা সেভাবে কাজ করছিল না। ফলে চলমান শান্তি আলোচনা ও সম্ভাব্য আন্দোলনের কর্মসূচিতে ঘটে যাচ্ছিল নানা বিপত্তি। বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল তাদের কিছু কর্মকাণ্ড। দালাল শুদ্ধি অভিযানের পাশাপাশি তাদের অতি লড়াকু কর্মসূচীর কারণে সমাজের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যদিও ছাত্র যুবকদের মধ্যে আন্দোলনে জঙ্গিপনার মাত্রা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অহরহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে। সড়ক অবরোধ কর্মসূচীতে বাস ভাঙচুর, পুলিশের সাথে বিনা উস্কানিতে কান্তা যুদ্ধ, লাঠি নিয়ে ধস্তাধস্তি নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অসংখ্য ছাত্র-কর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয়ে যায় আর অনেকেই পুলিশী হেফাজতে চলে যায়। যার পেছনে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে দিতে হয় পার্টিকে। আজ জামিনের জন্য কাল কেইস চালাবার জন্য ইত্যাদি। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের মধ্যেও সংঘাত চলতে থাকে। এই সংঘাত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ রূপ নিয়ে। এরই পাশাপাশি তারা গ্রামে মুরুব্বিয়ানা শুরু করে। সমাজের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে থাকে। তারা বিভিন্ন গ্রামে বিচার কার্য পরিচালনা করতে থাকে। এক পর্যায়ে তো রীতিমত গণ-আদালত বসালো প্রসিত খীসা নিজে। প্রিয় কুমার চাকমা নামে একজনকে কান ধরে উঠালো বসালো তারা খাগড়াছড়ির খবংপড়িয়া গ্রামে। ঘটনা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। খাগড়াছড়ি পেড়াছড়ায় এক পার্টি সদস্যকে মারধর করে বসলো। তার অপরাধ সে পরস্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছে। পার্টির সদস্য অপরাধ করে থাকলে তা সত্য-মিথ্যা বিচার করে শাস্তির ব্যবস্থা পার্টিই করে থাকে। অথচ অবাক হলেও সত্য, তারা গ্রামের বিচার-আচার থেকে শুরু করে অবশেষে খোদ পার্টির গায়ে হাত দেয় আজকের ইউপিডিএফ-এর স্বনামধন্য কর্মীরা। পার্টি বরাবরই ঠান্ডা মাথায় গভীর ধৈর্য্য নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে এবং বারবার আহ্বান জানাতে থাকে যাতে নেতারা আলোচনার জন্য দেখা করতে আসে। অবশেষে জানা গেল, এই চুক্তি বিরোধীরা পার্টির কিছু জুনিয়র কর্মীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত এবং ইতিমধ্যেই পার্টির বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছে। একদিকে সমঝোতার ভাব, পার্টির নৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই সুবিধা লুফে নিয়েছে অন্যদিকে পার্টির বিরুদ্ধে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়ার ধান্ধায় প্রসিত বাবুরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কি সেই ছাব্বিশটি কর্মসূচি যা ওদের মনপুত হয়নি সেদিন

অবশেষে তাদের সাথে পার্টির মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে তারা বলেছিল যে, "আচ্ছা ঠিক আছে এখন আমাদের বলুন কি কি করতে হবে।" পার্টির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয় তাদের কি করণীয়। যেমন-

১। জঙ্গিপনা পরিহার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন চালানো।

২। ছাত্র পরিষদের বিক্ষুব্ধ অংশের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করে তাদের মতামতকেও গুরুত্ব দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার নিষ্পত্তি করা।

৩। ছাত্র-যুবকদের মধ্যে ঐক্য-সংহতি জোরদার করা এবং আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নিয়ে আসা।

৪। প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্র-যুবকদের মধ্যে মূল আন্দোলনে অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিতে উৎসাহিত করা।

৫। সমাজে বিচার-আচারে হস্তক্ষেপ না করা এবং নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন না করা।

৬। বিচার-আচারের ক্ষেত্রে পার্টির যুব সমিতি বা পঞ্চায়েতকে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে যাওয়া।

৭। হিল উইমেন্স ফেডারেশনকে আরো শক্তিশালী করা।

৮। দেশের বাম ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবগত করানো।

৯। নিয়মিতভাবে মিটিং, মিছিল, সমাবেশ করে জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা।

১০। যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ উপায়ে অবরোধ কর্মসূচী পালন করা।

১১। বাংলাদেশের লেখক, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রক্ষা করা।

১২। সংগঠনের পত্রিকাকে নিয়মিত করা, বিভিন্ন ঘটনায় সাংবাদিক সম্মেলন করা, বিবৃতি দেয়া।

১৩। জাতীয়, আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি অব্যাহত রাখা এবং জুম্ম জনগণের অধিকারের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা।

১৪। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সম্মেলন, সেমিনারে যোগদান করা এবং জুম্ম জনগণের অধিকারের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা।

১৫। মাঝে মধ্যে ঢাকায়, চট্টগ্রামে এবং বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে আলোচনা চক্র, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আযোজন করা।

১৬। বিভিন্ন দূতাবাসের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা, পরিস্থিতি অবগত করা, মানবাধিকার লংঘনের রির্পোট বা প্রতিবেদন সরবরাহ করা।

১৭। পশ্চাদপদ জুম্ম জনগোষ্ঠীর ছাত্রদের প্রতি সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা দান এবং তাদেরকে আন্দোলনে অধিকতর সম্পৃক্ত করা।

১৮। নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে শক্তিশালী করা।

১৯। শহরের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত জুম্মদের আন্দোলনে উৎসাহিত করা।

২০। সমাজের সুবিধাবাদী দালালদের সম্পর্কে সতর্ক থাকা।

২১। নিজেদের রাজনৈতিক মান বাড়ানোর জন্য পড়াশোনা চালানো এবং এই লক্ষ্যে বই-পত্র কেনার জন্য পার্টির আর্থিক সহযোগিতা নেয়া।

২২। রোমান্টিকতা ও এডভেঞ্চারিজম পরিহার করে সুষ্ঠু ও শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তোলায় মনোযোগ দেয়া।

২৩। বাইরের বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করে পার্টিকে সহায়তা করা।

২৪। পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে সাংগঠনিক সফরের মাধ্যমে জনসভা করে জনগণকে পার্টি তথা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নিয়ে আসা।

২৫। পার্টির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা, পার্টির ভুলত্রুটি এবং নিজেদের মতামত খোলাখুলি পার্টি নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা।

২৬। জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে পার্টিতে যোগ দিতে অন্যদ্রের উৎসাহিত করা এবং নিজেরাও যোগ দেয়া।

উপরোক্ত শর্তগুলো পড়ে শোনানো হয় সেদিন। বলা শেষ হয়ে যখন আলোচনার জন্য আবার এক নম্বর পয়েন্ট থেকে পড়া শুরু হয় তখনই সঞ্চয় বলে ওঠে "তাহলে তো আমাদের করার কিছুই থাকলো না।" কেন? কিছুই করার থাকল না মানে? তখন সঞ্চয়রা যুক্তি দেখায় যে, "ছাত্ররা এখন অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে লড়াকু। ওদের এভাবে আন্দোলনে রাখা যাবে না। মিছিলে আসতে বললে তাদের এখন আমাদের বলতে হয় তৈরি হয়ে আসতে। অর্থাৎ হাতে কান্তা, লাঠি, কিরিচ বা অস্ত্র যাতে থাকে মিছিলে। ছাত্র যুবকদের এখন শান্ত রাখা বা মারমুখো অবস্থা থেকে ফেরানো সম্ভব নয়। তাদের জঙ্গিপনা দমন করা মানেই তাদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে দেয়া। তাদেরকে নেতৃত্ব দিতে হলে জঙ্গিত্ব অনিবার্য।" স্বাভাবিক কারণেই তাদের সাথে আলোচনা আর এগোয়নি। ওরা বললো, জেএসএস-এর পরামর্শ শোনা আর তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পার্টিরও আশা ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা রইল না। কথা তবুও রয়ে গেছে।

সেদিন ওরা বলেছিল সামর্থ যা আছে তা দিয়ে জুম্ম জাতির ভালো কিছু করার চেষ্টা করবে আর ভালো কিছু করতে না পারলে রাজনীতি থেকে সরে যাবে। অর্থাৎ একটা সাদামাটা জীবন বেছে নেয়া আর কি। আমরাও তাই ভেবেছিলাম ভুল করে। প্রসিত বাবুরা ভালো কিছু করার চেষ্টা করবে অন্তত। আর তা যদি নাই পারে তাহলে নিশ্চয়ই ক্ষতি করবে না। অথচ ভাবতে অবাক লাগে কি হতে কি হয়ে গেলো। বিগত তিনটি বছরে ওরা আমাদের মোট ৩২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। অপহরণ করেছে অহরহ। জেএসএস যাতে মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে তার জন্য তারা করেনি এমন কোন কাজ নেই। দীর্ঘকাল কঠোর আত্মত্যাগের মাধ্যমে, সীমাহীন কষ্টের মধ্যে যারা আন্দোলন করে এসেছে তাদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে চুক্তি বিরোধিরা। অপরাধ? চুক্তি করে জেএসএস জুম্ম জনগণের সাথে বেঈমানী করেছে। তাই নিজের ছেলে, নিজের ভাইয়ের হাতে জীবন বলি দিচ্ছে এককালের সাহসী লড়াকু জনসংহতি সমিতির সদস্যরা।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস। চুক্তি বিরোধিরা জেএসএসকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে তাদের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন কায়েম করতে চায়- তা কতোটুকু সম্ভব- ভবিষ্যতে দেখা যাবে।

খুব দুঃখের হলেও একথা সত্য যে, যারা জেএসএস-এর থেকে কোন না কোন ভাবে, কোন না কোন সময় শুভেচ্ছা পেয়েছে তাদের মধ্যেই পার্টি বিরোধী প্রবণতা বেশী পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর যারা পার্টির সাথে তেমন সংশ্রব রাখেনি বা পার্টির কোন সুবিধাও ভোগ করেনি, তারা সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। আর যারা পার্টির বিভিন্ন স্তরের কর্মী দ্বারা কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা স্বাভাবিকভাবেই পার্টি বিরোধী। যদিও কিছু কিছু ব্যতিক্রম আছে। তবে পেটি বুর্জোয়া নামের যে শ্রেণীটি আন্দোলনের জন্য একটু আধটু ক্ষতিগ্রস্ত বা আন্দোলনের জন্য বড় বেশী লাভবানও হয়েছে তারা বরাবরই আন্দোলন পরিপন্থী ভূমিকায় লিপ্ত। এরাই অতি ভয়ংকর। এরাই নেতৃত্বকে নির্দ্বিধায় হত্যা করতে পারে। নিজের পায়ে কুড়াল মারতেও এদের তেমন যায় আসে না। কেবল ক্ষোতের বশবর্তী হয়ে এই তথাকথিত জাতি দরদী গোষ্ঠী গুরুতর ক্ষতি করতে কোন দ্বিধা করে না। দীর্ঘকাল আন্দোলনের কারণে জুম্ম জাতি সামগ্রিকভাবে চরম ক্ষয়ক্ষতির শিকার। এর মধ্যে যারা সুবিধাবাদী শ্রেণী তারা বরাবরই জেএসএস বিরোধী। অথচ আন্দোলনের সুফল যদি কেউ ভোগ করে থাকে তাহলে এই শ্রেণীটাই বেশি ভোগ করেছে এবং এদের মধ্যে যারা পার্টির সাহায্য-সহযোগিতা সরাসরি পেয়েছেন তারাই পার্টির বিরুদ্ধে বেশী কুৎসা রটনার চেষ্টা করছেন। এদের মধ্যে ছাত্র, যুবক, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে চাকুরীজীবী, পেশাজীবী এমনকি পার্টির নতুন পুরাতন অনেক কর্মীও রয়েছেন। ব্যাপারটি সুখকর না হলেও কিন্তু মোটেই অবাস্তব কিছু নয়। কেবল কুৎসা রটনা বা তুলোধুনোর মধ্যে থাকলেও বোধ হয় উদ্বেগের কিছু ছিল না। তা এখন খুনোখুনির মধ্যে পরিব্যাপ্ত। অর্থাৎ জেএসএস সমর্থক, কর্মী, নেতা যেকোন মুহূর্তে হয়ে যাচ্ছেন খুন। লাঞ্ছনার তো সীমা-পরিসীমা নেই।

জীবন প্রদীপ খীসাকে অপহরণ এবং অপদস্থ করার ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। পার্টির নেতৃস্থানীয় কর্মীদের মধ্যে জীবন প্রদীপ। হলেন অন্যতম সাহসী, নির্ভীক, নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক। একজন আদর্শবান কর্মীর জীবন কাহিনী লিখতে হলে তাঁর মতো মানুষদের নিয়েই লেখা যায়। নীতিবান, কঠোর সংগ্রামী, আত্মত্যাগী প্রতীম বাবু (পার্টির নাম)কে অপহরণ করল পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনপন্থীরা। অপরাধ জেএসএস কর্মী। অপরাধ সুদীর্ঘকাল জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের আন্দোলনে আত্মনিবেদিত জীবন কাটিয়েছেন জীবন প্রদীপ। চুক্তির পর যাঁর মাথা গুজার ঠাঁইটুকুও নেই। এককাঠা জমি নেই তাঁর। আত্মীয়পরিজন থাকলেও পাননি তেমন সাহায্য সহযোগিতা। চলমান ঘুণেধরা মূল্যবোধের বিচারে তিনি হলেন অন্যতম। বোকা। অর্থাৎ এ যুগে নিঃস্বার্থ হওয়া যে কত বড় বোকামী, তিনিই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বড়ই অদ্ভুত। তার চেয়েও অদ্ভুত হচ্ছে এ অবস্থার জন্য তার কোন অনুশোচনা নেই, নেই কোন অভিযোগ। কারো প্রতি নেই কোন অভিমানও।

এটা অবশ্য কম-বেশী সকল আন্দোলনেরই বাস্তবতা। ব্যক্তিগত কিছু আশা করে আন্দোলনে যাওয়া যায় না। বরং খরে নিতে হবে আন্দোলনে ভালো করুন আর খারাপ করুন ধিক্কার, কুৎসা, সমালোচনা এমনকি যে কোন সময় প্রাণনাশও হতে পারে। তবুও আমরা আহত হই। অনেক ত্যাগ স্বীকার করে যখন কিছু লোক কেবল বিরোধিতা নয় রীতিমত চরম আঘাত করতে ব্যতিব্যস্ত। কথিত শান্তি চুক্তির ফলে আমরা কেউ বেশী কিছু আশা করিনি। তারপরও অনেকেই ভেবেছে যা আদায় করা যাচ্ছে তা নিয়ে মোটামুটি জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনের গতিকে একটা ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যাবে। বাকীটার জন্য সাধ্যমত আন্দোলন করতে হবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। আর কেউ যদি সশস্ত্র আন্দোলন আবার শুরু করতে চায় তা করুক। জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম অধিকতর শক্তিশালী হোক আমরা সবাই মনে-প্রাণে চাই। আঞ্চলিক পরিষদ থেকে আরো বেশী কিছু পেতে আমাদের কারো আপত্তি নেই। তাই সাদামাটা একটা জীবন কাটানোর ইচ্ছাই ছিল জেএসএস কর্মীদের অনেকের। কিন্তু না, তা যে হবার নয়। চুক্তির পর প্রথম আঘাত আসে নিজের জাত ভাইয়ের থেকে। না আমী, না সেটেলার- কেউ না। অথচ এরাও কি মনে-প্রাণে চেয়েছে শান্তি চুক্তি? না। তবুও চরম আঘাত করে বসে ইদানিংকালের কথিত নেতা প্রসিত খীসার সংগঠিত ইউপিডিএফ-এর চেলা-চামুন্ডারা। নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে ৩৪ জন জেএসএস কর্মী ও সমর্থক এই পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনপন্থীদের হাতে, নিগৃহীত হয়েছেন অনেকেই।

কিছু কিছু লোক আছেন যারা আদতে না পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনপন্থী, না প্রসিত পন্থী। কিন্তু জেএসএস বিরোধী নানা কারণে। তবে সাধারণভাবে জেএসএসকে বিরোধিতা করাই যেহেতু এদের কর্ম, তাই তারাও আজকাল প্রসিতপন্থী। অর্থাৎ চুক্তিবিরোধী। তবে চুক্তি বিরোধী, ইউপিডিএফ যাই বলি না কেন মূলতঃ এরা জেএসএস বিরোধী শিবির। এদের ধারণা হচ্ছে, জেএসএসই সকল অপকর্মের মূলে। জেএসএস-এর জন্য আজ জুম্ম জাতির দুর্দশা, অপুরণীয় ক্ষয়ক্ষতি, শান্তি চুক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। জেএসএসকে খতম করতে পারলেই এদের শান্তি। পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন অর্জন করতে পারবে, পার্টিকে ধ্বংস করতে পারলে। যদিও আপাতত দুটোই অবাস্তব। জেএসএসকে ধ্বংস করাও সম্ভব নয় আর জেএসএসকে ধ্বংস করেও পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন অর্জন করা অবাস্তব। একথা সত্য যে, নেহায়েত জেএসএস বিরোধীতাকে পুঁজি করে যে আন্দোলন, তার ফলাফল সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। সচেতন জনসাধারণকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে প্রসিত চক্রের আত্মঘাতী তৎপরতায় আমাদের সামগ্রিক ক্ষতি অনিবার্য।

[লেখা: স্মারকগ্রন্থ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ১যুগ পূর্তি, ২০০১]