Thursday, May 21, 2020

জুম্মরা ভালো না থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে কি? - সুদীর্ঘ চাকমা

                           শহীদ সুদীর্ঘ চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ডজনের উপর গণহত্যা সংঘঠিত হয়েছে।অনেক সাম্প্রদায়িক হামলা,অপহরণ,হত্যা,গুম,ধর্ষণ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।হাজার হাজার পরিবার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারতে শরনার্থী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।
ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রামচুক্তি স্বাক্ষরের পরও পাহাড়ে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা কমেনি। অপারেশন উত্তরণ নামে সেনাবাহিনীর বিশেষ কর্তৃত্ব রয়েছে।
রয়েছে তিনশতাধিক সামরিক,আধাসামরি,আর্মড পুলিশ,ভিডিপি ক্যাম্প।যা বাংলাদেশের অন্য কোন অঞ্চলে নেই।
সেনাবাহিনী তাদের ভূমিকা নিয়ে সাফাই গেয়েছে।
বলেছে তারা উন্নয়ন ও শান্তির জন্য রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্বেকার ভূমিকার সাথে বর্তমান ভূমিকার আদৌ মিল নেই,ইত্যাদি।
যদিও তাদের বক্তব্যের সাথে  বাস্তবের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়না।

সম্প্রতি রাঙ্গামাটি শহরে জুম্মদের উপর হামলা করা হলো।বেসামরিক-সামরিক প্রশাসনের নাকের ডগায় অনেক জুম্ম ও জুম্ম গ্রামের উপর হামলা হলো।
এমন সময় এ হামলা হলো যখন জুম্মদের সুখে থাকার কথা।জুমের মানুষ নবান্নের প্রস্তুতি নিচ্ছে।জুমে সোনালি ধানের ঢেউ।নানা ফসলে ভরা জুম।
সামনে দুর্গাপূজা ও কঠিন চীবন দানসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজনেরও প্রস্তুতির সময় এটি।কিন্তু জুম্মরা সুখে নেই।মুখে হাসি নেই।
শাসকশ্রেণী তাদের সুখ নিয়ে তামাশার খেলায় মত্ত।
কাপ্তাইবাঁধ দিয়ে,বহিরাগত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে,পাহাড় জবরদখল করে,সেনাশাসন দিয়ে জুম্মদের সুখে কেড়ে নেয়া হয়েছে।
জুম্মদের চেহারায় এখন আতংকের ছাপ।তীব্র অনিশ্চয়তায় কাটে দিন।
প্রতিনিয়ত লোলুপ দৃষ্টি ধর্ষণ করছে পাহাড়ী নারীর শরীর।

জুম্মরা যে দা দিয়ে জুম চাষ করে তা বাঙালিদের তৈরি। সে দা দিয়ে বাঁশ কাটে তারা। সে বাঁশ দিয়ে চলে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজের কল কর্ণফুলি পেপার মিল।বাঁশ থেকে তৈরি করা কাগজে ছাপা হয় কত বই।
লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রী তাদের মাতৃভাষায় সুন্দর সুন্দর বর্ণ দিয়ে লিখে।
জুম্মদের মাতৃভাষায় লেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র সে ব্যবস্থা করেনি।আর সেই কাগজ দিয়ে জুম্মদের ভাগ্য নিয়ে কত আইন-কানুন ছাপেন শাসকেরা।
সাগরের কত প্রতিকুল পরিবেশে জাল ফেলে যে বাঙালি জেলে মাছ ধরে সেই মাছ দিয়ে তৈরি হয় নাপ্পি(সামুদ্রিক মাছের গুড়া দিয়ে তৈরি খাদ্য বিশেষ)।
যা না খেলে জুম্মদেরএকদিন চলেনা। সেই বাঙালি জেলে আর বাঙালি কামারের সাথে জুম্মদের কোন দ্বন্ধ নেই। নদী ভাঙা,অসহায় বাঙালিদের নানা প্রলোভন দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি দিয়ে পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে শাসকগোষ্ঠী।
তৎকালীন সরকার ১৯৭৮-৮০ সালে জেলা প্রশাসকদের এক গোপন সার্কুলার পাঠায়।
তাতে বলা হয়-

"আপনার জেলার ভূমিহীন/নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ জনসাধারণকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।নির্ধারিক এলাকায় পুনর্বাসন দেয়া হবে এবং প্রত্যেক পরিবারকে বিনামূল্যে নিন্ম বর্ণিতহারে জমি দেয়া হবে: সমতল ভূমি ২.৫ একর,সমতল ও ডাম্পিং জমি ৪ একর এবং পাহাড়ী জমি ৫ একর।
এই সিদ্ধান্ত হয়েছে আপনি ৫,০০০ পরিবার পাঠাবেন।" 

অথচ ১৯৬৪ সালে বন সার্ভে অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য জমি ২%,গাছ,ফল,সবজি আবাদজমি ২১%,বনের উপযোগী৫১%,রিজার্ভ ফরেস্ট ২৬% ছিল।

জুম্মরা ছড়ায় মাছ,চিংড়ি,কাঁকড়া ধরে।বনে বাঁশ কাটে।পশু শিকার করে কিছু আগামী দিনের জন্য রেখে দেয়।ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভাবে। নিঃশেষ করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে দখল নিতে যারা আসলো তারা সবকিছু শেষ করতে চায়।দখল নিতে চায়।
তারা ভালোবেসে মর জয় করতে চায়না।
জোর করে বশ করতে চায়।মানুষের চেয়ে সম্পদের প্রতি তাদের অগাধ ভালোবাসা।
একদল মানুষ বংশ পরম্পরায় প্রকৃতিকে,মানবিক মূল্যবোধকে রক্ষা ও লালন পালন করে এসেছে।
আর একদল ধ্বংস করতে এসেছে।ধ্বংসকারীদের পক্ষে সরকার,সেনাবাহি, পুলিশ,প্রশাসন আর তথাকথিত বড় বড় রাজনৈতিক দল।
এ যেন মানুষের সাথে অমানুষের লড়াই।কিন্তু আমাদের সরকার, আমাদের দেশের মিডিয়া প্রচার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালির লড়াই।
প্রশ্ন জাগে,চট্টগ্রামের বাঙালিদের জায়গার উপর যদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এসব বাঙালিদের বসতি দেয়া হতো তাহলে কি চট্টগ্রামের বাঙালিরা মেনে নিতে পারতেন?

ইসরাইল যখন ফিলিস্তিনের উপর,আমেরিকা যখন আফগানিস্তান,ইরাকের উপর আক্রমণ করে সেটা কি ইহুদি-মুসলিম,খ্রিস্টান-মুসলিম লড়াই?সেটাতো সত্যের সাথে মিথ্যার,ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের লড়াই।কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের লড়াইও পাহাড়ী-বাঙালির নয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আমেরিকার জর্জ হ্যারিসন কেন গেয়েছিল গান?স্টিফেন গিলসবার্গ মুক্তিযুদ্ধের জন্য কেন লিখেছিল কবিতা?কেন আর্জেন্টিনার চে গুয়েভারা কিউবায় ফিদেল কাস্ট্রোর সাথি হয়ে ধরেছিল অস্ত্র?
কেন ডাক্তার নর্মান বেথুনে চীনে গিয়ে লাল ফৌজিের দিয়েছিল চিকিৎ? 
তারা মানুষ হয়ে মানুষের পক্ষে লড়েছেন।মানবতার ঝান্ডা উর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন।
ঠিক তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন মানবাধিকার লংঘিত হয়,অন্যায় অত্যাচার চালানো হয় আমরা জুম্মদের পাশে পায় অনেক বাঙালিকে।বিশ্বের নানা প্রান্তের মানবতাবাদী মানুষদের।
উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে ফায়দা লুটলে শুধু কি পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য হুমকি?গোটা দেশের জন্য হুমকি নয়?

জুম্মদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে দমন পীড়নের মাধ্যমে ধ্বংস করার জন্য যে প্রচেষ্ঠা চালানো হচ্ছে তাতে কি শুধু জুম্মরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে?গোটা বাংলাদেশের মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেনা? বিগত সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহ দমনের নামে সামরিকখাতে ১৯৭৫ সালে ৪২মিলিয়ন ডলার,১৯৭৬ সালে ৮৬ মিলিয়ন ডলার,১৯৭৭ সালে ১৩৬ মিলিয়ন ডলার,১৯৭৮ সালে ১৪০ মিলিয়ন ডলার,১৯৮০ সালে ১৩৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ছিল(সুত্রঃ The Chittagong Hill Tracts Militarization,oppression and the hill tribes by Anti slavery Society)। 
সাথে রয়েছে প্রাণহানিসহ নানা ধরণের বৈষয়িক ক্ষয়ক্ষতি। বর্তমান সময়েও সামরিকখাতে বরাদ্দ বাড়বে বৈ কমবেনা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আগে সেনাবাহিনীর পেছনে দৈনিক সোয়া এককোটি টাকা ব্যয় করতে হতো।দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রভাব সামরিক কার্যক্রমেও পড়বে।
এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তিনশতাধিক সেনাক্যাম্প।
"অপারেশন উত্তরণ" নামে রয়েছে সামরিক শাসন।আওয়ামীলীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এএসএম কিবরিয়া সিলেটের হবিগঞ্জে তাঁর জীবনের শেষ বক্তব্যে বলেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা অভিযানের জন্য রাষ্ট্রকে কি পরিমাণ অর্থনৈতিক মাসুল গুনতে হয়েছিল।

বাংলাদেশে বেকারত্ব,শিক্ষা,বিদ্যুৎ,স্বাস্থ্যসেবাসহ কত সমস্যা রয়েছে।অধিকার কাউকে দিলে তা কমেনা বরং বাড়ে।জুম্মদের ন্যায় সঙ্গত অধিকার সেনাবাহিনী দিয়ে সমাধান করার বৃথা চেষ্টা না করে ঐ টাকা দিয়ে দেশের অনেক উন্নয়ন করা যেতো।দেশের মর্যাদা বাড়তো। পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্ব ব্যাংকের কত শর্ত মেনে ঋণ নিতে হচ্ছে।সামরিক ব্যয় কমালে আমাদের  টাকায় সত্যি সত্যি আমরা পদ্মাসেতু বানাতে পারতাম।
আমাদের দেশে পাহাড়ী-বাঙালি ভ্রাতৃত্ববোধের সেতুও সুদৃঢ়ভাবে রচনা হতো।
রাঙামাটিতে জুম্মদের উপর নগ্ন হামলা,রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে ও বাড়িতে অগ্নি সংযোগ ঘটনায় শুধু কি জুম্মরা আর বৌদ্ধরা কষ্ট পেয়েছে?বাঙালিরা কষ্ট পায়নি?কষ্ট না পেলে কেন দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠলো?পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্মরা ভালো না থাকলে আমাদের বাঙালি ভাইয়েরা ভালো থাকবেন কি করে!!বাংলাদেশ ভালো থাকবে কি করে!!! তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ভাষায় বলতে চাই-

                   "যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে-পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই!
                  শোনো মর্তের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন,নিজে হবে তত ক্লীব!                 

[সংগ্রহঃ প্রবাহণ,১০ নভেম্বর ১৯৮৩ স্মরণে স্মরণিকা ২০১২,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  ]                       

Monday, May 18, 2020

পিসিপি'র গৌরব্বোজ্জ্বল লড়াই-সংগ্রামের ৩১ বছর।

ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে ছাত্র-যুব সমাজ সোচ্চার হোন পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষি চৌদ্দটি জাতিসত্বার ছাত্র সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী লড়াকু ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ আগামী ২০শে মে ২০২০, ৩১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে। আজ থেকে ঠিক ৩১ বৎসর পূর্বে ১৯৮৯ সালের ২০শে মে লংগুদু গণহত্যার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গড়ে উঠে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।২১শে মে গণহত্যার প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথে একটি মৌন মিছিলের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে এ ছাত্র সংগঠনের। প্রতিষ্ঠার পর হতে জুম্ম ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জুম্ম জনগণের আত্ম্নিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা তথা জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমিরর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামেও গৌরব্বোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে আসছে এই প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর পর বিভেদপন্থীদের কর্তৃক আমরা হারিয়েছি সুদীর্ঘ,জীবন,গুনেন্দু,সুখেনসহ উদয়ীমান বহু তরুন ছাত্র নেতাকে। বিগত ২০১৮ সালের ০৩মার্চ, বিভেদপন্থি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক পিসিজেএসএস এম এন লারমা কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি,নানিয়াচর উপজেলা চেয়্যারমান এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে উপজেলা পরিষদের অফিসের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং তার সাথে থাকা রুপম চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় । ০৪মার্চ ২০১৮, তারিখে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে খাগড়াছড়ি থেকে যাওয়া চলন্ত গাড়ীতে হামলা চালানো হয়,এতে তপন জ্যোতি চাকমা,সুজন চাকমা,সেতু চাকমা ও গাড়ী ড্রাইভারসহ ৫ জন নিহত হন এবং আরও ৬ জন গুরুতর আহত হন। গত ৩১ বছরে অনেক বীর সাহসী সহযোদ্ধা আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হয়ে জেল-জুলুম,অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন,পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন,তাদের জীবন আত্মহুতি দিয়েছেন। সাথে সাথে সংগঠনের ৩১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জুম্ম ছাত্র-ছাত্রী,পার্বত্যবাসীসহ দেশবাসীকে জানাই লাল সালাম ও শুভেচ্ছা। জন্মলগ্ন থেকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি স্বাধীন ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে আসছে। বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। নিজ ভূমি বহিরাগত সেটেলার বেদখল করছে,ঘর-বাড়ি হারা উদ্বাস্তু জীবন-যাপন,ভাই বা পিতা সেটেলার ও নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে নির্যাতনে নিহত বা পঙ্গু,মা কিংবা বোন ধর্ষিত ও ধর্ষণের পর হত্যার শিকার।মাঠে-ঘাটে এমনকি অফিস-আদালতেও সাম্প্রদায়িকতা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে চলেছেন,এমন বাস্তবতায় একজন সচেতন ছাত্র চুপ করে শুধু লেখা-পড়া নিয়ে বসে থাকতে পারেনা।এমন বাস্তবতায় মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে শুধু শিক্ষা লাভ করবো,এটা একজন দেশপ্রেম সচেতন ছাত্রের জন্য আত্ম হত্যার সামিল। তাই এহেন পরিস্থিতি ও বাস্তবতানুযায়ী পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ শিক্ষা সংক্রান্ত দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক দাবিও করে আসছে। রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা,পরামর্শ ও সিদ্বান্ত প্রদানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিই এই ছাত্র সংগঠনের অবিভাবক সংগঠন। জাতীয় ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের তাগিদে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হলে শান্তিবাহিনীর উদ্ভব ও সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা হয়।পাহাড়ের সকল জুম্ম তরুণেরা অংশ নেয় জনসংহতি সমিতির এ সংগ্রামে। সেই ৭০-৮০ দশকের স্বপ্নবিলাসী তরুণদের মত এখনকার জুম্ম তরুনদেরও উচিত আন্দোলনে নিজেদের এগিয়ে আসা।পৃথিবীর ইতিহাসে যেখানেই সংগ্রাম-বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল সেখানেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল।পাহাড়ের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।সেসব প্রতিক্রিয়াশীল দালালদের হাতেই জুম্মজাতির স্বপ্নদ্রষ্টা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৮৩সালের ১০ই নভেম্বর ৮ সহযোদ্ধাসহ নির্মমভাবে খুন হন।সেই প্রতিক্রিয়াশীল প্রীতিগ্রুপকে কঠিন হস্তে দমনের মধ্যে দিয়ে পুনরায় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করা হয় ১৯৯৭সালের ২রা ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ৯৮'সালে প্রসিত-রবিশংকররা চুক্তির বিরোধীতা করে গড়ে তোলে ইউপিডিএফ নামক সশস্ত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর হতে অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা শান্তিবাহিনীদের উপর শুরু করে হত্যা-অপহরণ।পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগনকে নতুন একটি গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। ২০০৭-২০০৮ এর সময়ে সন্তু লারমার একঘেয়েমি,সেচ্ছাচারিতা,স্বজনপ্রীতিবাদ,অর্থলোভের কারণে জনসংহতি সমিতি আবার বিভক্ত হয়ে পড়ে। পাহাড়ের বুকে জুম্মজনগনের উপর নেমে আসে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত নামের কালো ছায়া।যা আজো চলমান রয়েছে। দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামের পর ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও,সে সময়ে বাংলাদেশ সরকার সাড়ে তিন বৎসর সময় পেয়েও পর্যাপ্ত সময় পায়নি এই অজুহাতে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের তো দুরের কথা বরং পদে পদে চুক্তি লঙ্ঘন করে পার্বত্য এলাকায় বহিরাগত পুনর্বাসন,ভূমি বেদখল ও নিজ ভূমি হতে জুম্মদের উচ্ছেদসহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে পাঁচ বছর সময় পার করে।তারপর ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নের কোন ভূমিকা পালন করেনি। পরবর্তী দীর্ঘ সাত বৎসর পর ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ত্বাধীন মহাজোট সরকার।তখন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ ছিল ক্ষমতায় গেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে তারা চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখায়নি,চুক্তির আংশিক বিষয় ছাড়া সবগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে,চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে-এই বলে অপপ্রচার চালিয়ে পাঁচ বছর সময় পার করে।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চুক্তি বাস্তবায়নের নামে পার্বত্য জেলা পরিষদ,পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে সিলেকশনের মাধ্যমে দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন,পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত সেটেলার কতৃক জুম্মদের ভূমি জবরদখল ও তাদের পুনর্বাসন,পাহাড়ী-বাঙ্গালী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছাড়া জুম্ম জনগণকে কিছুই দেয়নি। বিগত ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ২৩(ক)অনুচ্ছেদে"উপজাতি,ক্ষুদ্র জাতিসত্তা,নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়"সংযোজন এবং ৬(২)অনুচ্ছেদে "বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন"প্রতিস্থাপন করে সংবিধান পাশ করে।কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের প্রাণের দাবি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলে বসবাসরত আদিবাসী জাতিসমূহকে সংবিধানে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা।একদিকে শাসক গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলে বসবাসরত আদিবাসী জাতিসমূহকে সংবিধানে"উপজাতি,ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা,নৃ-গোষ্ঠি ও সম্প্রদায়"আখ্যা ও বাঙালি বানানো,অন্যদিকে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দিয়ে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব এবং সমতলের আদিবাসীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছেন।পার্বত্য চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করে তাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা ব্যবস্থা করা না হলে কাগজে কলমে যতই কল্যাণ-সাফল্য ও মঙ্গল-কামনা করা হোক না কেন তা নির্দয় প্রহসন ছাড়া আর কিছুই না। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবার মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে বিগত ২০১৬ সালের ০১ আগস্ট প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ভেটিং সাপেক্ষে "পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পিত্তি কমিশন(সংশোধন)আইন,২০১৬"-এর খসড়ার নীতিগতভাবে অনুমোদন ও ০৯ আগস্ট তা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।>এরপর একই বছরের ০৬অক্টোবর তা জাতীয় সংসদে পাশ হয়।পরবর্তীতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ২০১৬ সালের ০৮সেপ্টেম্বর ক্ষতিগ্রস্তদের ৪৫দিনের মধ্যে আবেদন চেয়ে জারি করা গণ বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে প্রায় ১৪,৮০০টি আবেদনপত্র জমা পড়ে।সর্বশেষ ১০জানুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত মোট ২২,৮৬৬টি আবেদন কমিশনে জমা পড়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এর আগে বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদে প্রায় ৪ হাজার ৪০৮টি আবেদনপত্র কমিশনে জমা পড়ে।সংশোধনীর পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের এ যাবৎ তিনটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কতৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া শুরু করাসহ পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহে কিছু দপ্তর হস্তান্তর করা ব্যতীত চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। বিগত ২০১৯ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২ বছর পূর্তি হয়ে গেল। এই ২২ বছরে পার্বত্য চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নের নামে জুম্ম স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন সরকারী পদক্ষেপগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এবং জুম্ম জনগণের জন্য কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। সকলকে মনে রাখতে হবে যে,পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এমনিতেই স্বাক্ষরিত হয়নি। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে স্বীকার করেই তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এই ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।ফলে দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিহার করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করার পথ সৃষ্টি হয়। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান,পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প থাকতে পারেনা। আমরা এমন এক সময়ে সংগঠনের ৩১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছি যখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু,জাতিগত সংখ্যালঘু,ভাষাগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের উপর সহিংসতা বেড়েই চলেছে।বাংলাদেশে সংখ্যালঘুসহ পার্বত্য এলাকার জুম্ম জনগণও হিংস্র ও মারাত্বক আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে জুম্ম জাতীয় ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষায় আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (এমএন লারমা'র) আদর্শে উজ্জীবিত প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের পতাকাতলে ছাত্র ও যুব সমাজ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। লেখকঃসুনয় চাকমা সভাপতি,পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,পানছড়ি থানা শাখা।

"২০শে মে'র চেতনা ছড়িয়ে পড়ুক পাহাড়ের প্রতিটি জুম্ম তরুণের প্রাণে"



প্রভাতে যেমন সূর্যের আলোকরশ্মি আলোকিত করে এই ধরণীর বুক,তেমনি ২০শে মে'র চেতনায় আলোকিত হোক পাহাড়ের প্রতিটি জুম্ম তরুণ।
পিসিপি একটি চেতনার নাম,একটি দ্রোহের নাম,একটি স্ফুলিঙ্গের নাম।
আগামী ২০শে মে ২০২০,পাহাড়ের একমাত্র লড়াকু ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
১৯৮৯সালের ৪ঠা মে লংগদুতে সেনা-সেটলারদের যৌথ আক্রমনে জুম্মদের উপর চালানো হয় নির্মম গণহত্যা।
সেই গণহত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে একই বছরের ২০শে মে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত জুম্ম শিক্ষার্থীরা ঢাকায় বুয়েটের রশিদ হলের ২০০২ নং রুমে গড়ে তোলে এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।২১শে মে গণহত্যার প্রতিবাদে একটি মৌন মিছিলের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এই ছাত্র পরিষদ।
সেই গণহত্যার প্রতিবাদের চেতনা ও জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনায় আজ পর্যন্ত রাজপথের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে এই ছাত্র পরিষদ।

প্রতিষ্ঠার পর হতেই লড়াই-সংগ্রামে অসংখ্য তরুণ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন জাতির মুক্তির সংগ্রামে।পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ৭০বছরের বৃদ্ধ ভরদ্বাজ মুনি, 
ছাত্র পরিষদের সাথে যুক্ত থেকে সমর বিকাশ চাকমা,সুকেশ চাকমা,মনোতোষ চাকমা,রুপন চাকমা,সুখেন চাকমা,গুনেন্টু চাকমা,জীবন চাকমাসহ অসংখ্য সহকর্মী জীবন দিয়েছেন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
তাদের এ আত্মবলিদান পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

জাতীয় ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের তাগিদে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হলে ১৯৭৩ সালের ০৭জানুয়ারি গঠিত হয় জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী।সেই থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা।যে আন্দোলনে পাহাড়ের জুম্ম তরুণেরা অংশগ্রহণ করেছিল নির্ধিদ্বায়।
মনিষীরা বলে গেছেন "যৌবন যার যুদ্ধে যাবার সময় তার"।
তাই আজও জুম্ম তরুণদের উচিত আমাদের এই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের সপে দেয়া।
পৃথিবীর ইতিহাসে যেখানেই সংগ্রাম-বিপ্লবের মাদল বেজেছিল সেখানেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী,সুবিধাবাদী শ্রেণীর উদ্ভব লক্ষ্য করা গিয়েছে।পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।সেসব প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীদের হাতেই জুম্মজাতির স্বপ্নদ্রষ্টা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৮৩সালের ১০ই নভেম্বর ৮ সহযোদ্ধাসহ শহীদ হন।সেই প্রতিক্রিয়াশীল বাদি গ্রুপকে হঠিয়ে পুনরায় সংগ্রাম করে ১৯৯৭সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।
দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ৯৮'সালে প্রসিত-রবিশংকররা চুক্তির বিরোধীতা করে গড়ে তোলে ইউপিডিএফ নামক সশস্ত্র সংগঠন।নিরীহ-নিরস্ত্র শান্তিবাহিনীদের উপর শুরু করে হত্যা-অপহরণ।পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এক-এগারোর সময়ে সন্তু লারমার একঘেয়েমি,সেচ্ছাচারিতা,স্বজনপ্রীতিবাদ,অর্থলোভের কারণে জনসংহতি সমিতি আবার বিভক্ত হয়ে পড়ে।
পাহাড়ের বুকে জুম্মজনগনের উপর নেমে আসে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত নামের কালো ছায়া।যা আজো বয়ে বেড়াচ্ছে জুম্মজাতি।

কোন এক মনিষী বলে গেছেন " বিপ্লব গোলাপ পাপড়ি ছিটানো কোন নরম বিছানা নয়"।
বিপ্লব-সংগ্রামের পথ মানেই কঠিন,রক্ত পিচ্ছিল রাজপথ,বারুদের গন্ধে মাতোয়ারা হওয়া বিদীর্ণ জনপদ।
এই বিপ্লবের পথে হেঁটে যাওয়া সহজ নয়।এই পথ সমুদ্রের ঢেউ থেকেও উত্তাল,ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির থেকেও বেশী জলন্ত অগ্নিকুন্ড,এই পথে হাটঁতে হলে সবকিছু ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে,প্রয়োজনে জীবনকেও উৎসর্গ করার মানসিকতা থাকতে হয়।
আর এই আন্দোলন এই সংগ্রামে অংশ নেয়ার উপযুক্ত সময় যৌবনকাল।
তরুণেরাই পৃথিবীর ইতিহাস বদলেছে,তরুণেরাই যুগে যুগে বিজয়ের গাঁথা শুনিয়েছে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেমন তরুণ ক্ষুদিরাম,বিনয়,বাদল,দিনেশ,ভগবৎ সিং রা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন,
৫২সালের ভাষা আন্দোলনে পাক সরকারের ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষার জন্য যেমন বুকের তাজা রক্ত ঢেলে জীবন দিয়েছেন,১১দফা,৬ দফা সহ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত এদেশের ছাত্র তরুণরা যেভাবে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন,
তেমনিভাবে পাহাড়ের প্রতিটি তরুণকে সেভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।কঠিন ইস্পাত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জুম্ম জনগণের চুক্তি বাস্তবায়ন,আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে।

পাহাড়ে এখন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীরা তৎপর।পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামীকরণ করার লক্ষ্যে ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় হতে শাসকশ্রেণীর নীলনকশা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে,সেইসাথে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিও এ কাজে পিছিয়ে নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্মকে বিভিন্নসময় বিভিন্নভাবে প্রতিপালনে বাধাগ্রস্থ করার অভিযোগ রয়েছে সন্তু লারমার সংগঠনের বিরুদ্ধে।
সন্তু লারমার সংগঠন কর্তৃক বৌদ্ধভিক্ষু হত্যার মত জগন্যতম ইতিহাস আমরা জানি।গত ১৫মে রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়িতে ডঃ এফ দীপঙ্কর ভান্তের পরিচালিত ধূপশীল আন্তর্জাতিক বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের মত জগন্য ঘটনা সন্তু লারমার দল সংঘটিত করেছে।
সুতরাং তরুণ সমাজকে বেছে নিতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোন দল জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে।এবং কোন দলের মাধ্যমে আমাদের ভোরের রাঙা সকাল দেখতে পাবো।
জুম্মস্বার্থ পরিপন্থী,চুক্তিবিরোধীরা জুম্মজনগনের ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তা নিয়ে হতাশ হবার কারণ নেই।যুগে যুগে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে এসব প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীরা অধিকারকামী মানুষদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছিল।
অধিকারকামী মানুষেরা যেভাবে সেসব প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীদের প্রতিহত করেছিল আগামীতেও জুম্ম তরুণ সমাজকে সাথে নিয়ে সেসব প্রতিক্রিয়াশীল-জুম্মস্বার্থবিরোধীদের আমরা প্রতিহত করবো।
৮৩'র প্রেতাত্মাদের জুম্মসমাজ যেভাবে প্রত্যাখান করেছে,যেভাবে তাদেরকে বিলুপ্ত করা হয়েছে,
আজ এসময়ে এসেও সেসব ৮৩'র বাদীদলের উত্তরসূরীদের আমাদের প্রত্যাখান করতে হবে।ভেঙে দিতে হবে তাদের নীলনকশা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আজ ২২টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু এদেশের শাসকশ্রেণী চুক্তি দুয়েকটি ধারা ব্যতিত চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোই বাস্তবায়ন করেনি।ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি,মিশ্র পুলিশবাহিনী গঠন,স্থানীয় বাসিন্দা নিরুপন,স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে জেলা পরিষদ নির্বাচন,জেলা পরিষদের সদস্যদের নিয়ে আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন,জেলা পরিষদ-আঞ্চলিক পরিষদের কাচে হস্তান্তর,সেটলার বাঙালিদের সম্মানজনকভাবে সমতলে পুনর্বাসন,অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার ইত্যাদি।
শাসকশ্রেণী ২২টি বছরে এসব কিছুই বাস্তবায়ন না করে উল্টো চুক্তিবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে।জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর হতে যে সরকার আসে সে সরকারই জেলা পরিষদ দখলে নিয়ে জনগনের ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
আর আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের গদিতে চুক্তির পর হতে বসে থাকা সন্তু লারমা জনগনের বাজেট অর্থগুলো সংগঠনের নেতাকর্মী ও নিজে ভোগ করছেন।
যার ফলে জুম্মজনগন চুক্তির সুফল ভোগ করতে পারছেননা।
যা রাষ্ট্রযন্ত্রের নগ্নরুপ আমরা ২২টি বছর ধরে প্রত্যক্ষ করে আসছি।সরকার যে চুক্তি বাস্তবায়ন করবে সে আশা আজ সুদুর পরাহত।
আজ পর্যটনের নামে,সেনাক্যাম্প,বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের নামে হাজার হাজার একর জুম্মদের ভূমি দখল করা হচ্ছে,উচ্ছেদ করা হচ্ছে পরিবার।
যা আঞ্চলিক পরিষদের অনুমোদন ব্যতীত।
চুক্তি লঙ্গন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগনকে জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করণের ষড়যন্ত্র হিসেবেই আজ শাসকশ্রেণী এসব করে যাচ্ছে।শাসকশ্রেণীর এসব ষড়যন্ত্র আমাদের সজাগ হয়ে মোকাবেলা করতে হবে।

পুরো দেশে একনীতি পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেকনীতি। চুক্তি স্বাক্ষরের পর হতে পাহাড়ী মানুষ ভেবেছিল পাহাড় থেকে সেনাশাসন উঠিয়ে নেয়া হবে কিন্তু না চুক্তি স্বাক্ষরের পরও অপারেশন উত্তরনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিত সেনাশাসন অব্যাহত রেখেছে এদেশের শাসকশ্রেণী।যা পাহাড়ী জনগনের সাথে বেঈমানি করা হয়েছে।১৯৭২সালে সংবিধান রচনাকালে বাংলাদেশের সকল জনগনকে বাঙালি বলায় এমএনলারমা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বেড়িয়ে আসেন,
তখন থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনের সূচনা ঘটে।
পুনরায় আবার ২০১১সালের ৩০জানুয়ারী পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সমতলের সকল আদিবাসী জনগনসহ পাহাড়ী মানুষদের  অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বাঙালি বানানো হয়েছে।
আজো সেনাবাহিনী দ্বারা নীরিহ জুম্মরা হামলার শিকার হয়,ভূমি বেদখলের শিকার হয়,উচ্ছেদের শিকার হয়।
এর বিরুদ্ধে জুম্ম তরুণ সমাজকে লড়াই করতে হবে।

পাহাড়ের বুক ছিড়ে আজো শোনা যায় তুমাচিং,সবিতা,বালাতি,ইতি,পূর্ণাদের আর্তচিৎকার।সেটলার বাঙালিরা জুম্ম নারীদের উপর প্রতিনিয়ত ধর্ষণ,ধর্ষণের পর হত্যা ইত্যাদিভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে জুম্ম তরুণীদের রুখে দাঁড়াতে হবে।শুধু তরুণদের দিকে চেয়ে থাকলে হবেনা আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে,
কল্পনা চাকমার ডাকে তোমাদের সাড়া দিতে হবে।
যে জলপাই রঙের সন্ত্রাসীরা আপনাদের বোন কল্পনাকে রাতের আঁধারে চুরি করেছিল সেই অন্ধকারের গহীন থেকে আজো কল্পনার চিৎকার শোনা যায়।এসো বোনেরা আমাকে মুক্ত করো,শৃঙ্খল ভাঙো।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রীতিলতারা যেমন ছেলেদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিল সেই শাসকদের বিরুদ্ধে তোমাদেরও এই মুক্তির মিছিলে ভায়েদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

তৎকালীন জুম্ম ছাত্র সমাজের চেতনা ছিল লংগদু গণহত্যাসহ বিভিন্ন গণহত্যার প্রতিবাদী চেতনা,ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে চেতনা,জুম্ম ছাত্র সমাজকে সুশিক্ষিত করার চেতনা,জাতীয় ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার চেতনা,মা-বোনেদের ইজ্জত রক্ষার চেতনা,
জুম্ম সমাজকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার চেতনা।
জুম্ম ছাত্রসমাজ যে চেতনাকে বুকে ধারণ করে এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ গঠন করেছিল,সেই চেতনাকে আমরা ধ্বংস হতে দিতে পারিনা।
এমএনলারমা যে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল সে স্বপ্নকে আমরা বিনষ্ট হতে দিতে পারিনা।
এমএনলারমা যেভাবে শহরের শিক্ষিত তরুণদের নিয়ে গ্রামে চলো স্লোগানে ফিরে এসেছিলেন,
তেমনি শহরের প্রতিটি জুম্ম তরুণের শিক্ষিত হয়ে ফিরে যেতে হবে গ্রামে গ্রামে।
এই জুম্মসমাজকে জাগিয়ে তুলতে হবে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে।
আজ যেমন পার্বত্য চুক্তির আদৌলতে এবং ছাত্র সমাজের প্রবল আন্দোলনের মুখে পাহাড়ের ৩টি ও সমতলে ২টি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়েছে।
তেমনি ধাপে ধাপে আমাদের অন্যান্য যেসব জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় এখনো প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়নি সেসব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর দাবী জোড়ালো করতে হবে।
যেসব জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা নেই সেসব জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা উদ্ভাবনের কাজ সরকারের কাছে জোর দাবী জানাতে হবে।
মাতৃভাষা পড়ানোর পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের দাবী জড়ালো করতে হবে।সর্বোপরী জুম্ম সমাজকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রত্যয়ে তরুণ ছাত্র সমাজ ও ছাত্র পরিষদকে কাজ করতে হবে।
আর সেকাজে আপনাদের পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পাশে থাকতে হবে।
পাহাড়ের আলোর দিশা এই তরুন ছাত্রসমাজ,আর ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।

চুক্তি বাস্তবায়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম,জাতীয় ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের যে আন্দোলন সে আন্দোলনে জুম্ম তরুণ সমাজকে ঝাপিয়ে পড়তে হবে।
অন্যথায় জুম্মজাতি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।এই ভূমি এই পাহাড়কেই আকড়ে ধরে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

পিসিপি'র গৌরবোজ্জ্বল লড়াই-সংগ্রামের ৩১বছর,
৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল হোক-স্বার্থক হোক।

লেখকঃ পেদেলা চাঙমা(ছদ্মনাম)

Monday, May 11, 2020

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস

  1. ১৮৬০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামকে চট্টগ্রাম জেলা থেকে আলাদা করে তিনটি সার্কেলে ভাগ করা হয় যথা : চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল এবং বোমাং সার্কেল।
  2. ১৮৬৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা নির্দিষ্ট করা হয়।
    ১৯০০ সালের বৃটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ও অনুমোদিত হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল এ্যাক্ট বা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধি যা পাহাড়ি আদিবাসীদের কাছে প্রিয় বলে বর্তমানে মনে করা হয়। এর কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো :
    • পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি এক্সক্লুডেড বা ননরেগুলেটেড এরিয়া বা অ-শাসিত বা অনিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ এলাকা “যেখানে জেলা প্রশাষকের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ আসতে পারবে না।
    • আদিবাসীরা পচিঁশ বিঘা পর্যন্ত জমি ব্যবহার করতে পারবে তবে মালিকানা হতে পারবে না।
    • বিচারালয়ে কোনো উকিল থাকতে পারবে না।
    • রাজা হেডম্যান এবং কার্বারি থাকবে।
    • দরকার হলে বিনাপারিশ্রমিকে আদিবাসীরা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ করে দিতে বাধ্য থাকবে।
    • রাজা হেডম্যান এবং কারবারীরাও আদিবাসীদের বিনাপারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে।
    “এই বিধি গুলো ছিল তখনকার পাহাড়ি আদিবাসীদের শাসন ও দাসত্ব করা বিধি। এই আইনটি ব্রিটিশদের দ্বারা রচিত পাহাড়ি আদিবাসীদের শাসন শোষনের আইন নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। তখনকার দিনে তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল না বিধায় তা হয়েছিল বলে ক্ষোভ বা আক্রোশের কমতি ছিল না।
  3. ১৯১৬ সালে কামিনীমোহন দেওয়ান প্রতিষ্ঠা করেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম সমিতি “
  4. ১৯২০ সালের এক্সক্লুসিভ এরিয়া বা একান্ত এলাকা ঘোষনা।
  5. ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর কামিনীমোহন দেওয়ান ও স্নেহকুমার চাকমার নেতৃত্বে একটি দল (জনসমিতির প্রতিনিধি) এবং ভূবনমোহন রায়ের নেতৃত্বে ও আরেকটি দল (পার্বত্য রাজাদের প্রতিনিধি ) দিল্লিতে গিয়ে কংগ্রেস নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন ; ভারতের অন্তভূক্ত হওয়ার জন্যও আবেদন করেন। অবশেষে, র্যাডক্লিক কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তভূক্ত করেন।
  6. ১৯৫৪ সালে এসে “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি ” গঠিত হয়।
    ৮. ১৯৬২ সালে এসে পাকিস্তান কর্তৃক “উপজাতীয় এলাকা ” ঘোষনা।
  7. আবার ১৯৬৪ সালের উপজাতীয় এলাকার মর্যাদা লোপ করে পুনরায় ১৯০০ সালের বিধি গ্রহন করে।
  8. ১৯৬৬ সালের মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ঢাকা ও ট
    চট্টগ্রামে “উপজাতীয় ছাত্র সমিতি ” গঠন করেন।
  9. ১৯৬৯ সালের উপজাতীয় ছাত্র সমিতির প্রধান কার্যালয় রাঙামাটিতে স্থানান্তরিত হয়ে একটি “মার্ক্সবাদী-মাওবাদী ” সংগঠনে পরিবর্তন আনা হয়।
  10. ১৯৭০ সালের পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ হয়। এতে অনেক পাহাড়ি আদিবাসী স্বেচ্ছায় বাংলার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তারমধ্য (মৃত) উক্যচিং মারমা বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত হন।
  11. ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি মাসে স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে “চারুবিকাশ চাকমা ” নেতৃত্বে একদল আদিবাসী প্রতিনিধি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে দেখা করে হতাশ হন। আবার ১৫ ফেব্রুয়ারি : রাজা মং প্রু সাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে সাক্ষাৎের চেষ্টায় ব্যর্থ হন এবং তাদের দাবিগুলো রেখে যান। এরপর ২৩ মার্চ সংবিধান রচনা করার জন্য গণপরিষদ আদেশ জারি করা হয়। ১০ এপ্রিলে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে।
  12. ১৯৭২ সালে ২৪ এপ্রিল : মনবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিম্নে দাবিগুলো আরো বিস্তৃতভাবে পেশ করেন বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান প্রণেতাদের কাছে।
    ▪ পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
    ▪ পার্বত্য আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ন্যায় অনুরুপ সংবিধি শাসনতন্ত্রে থাকবে।
    ▪ পার্বত্য আদিবাসী রাজাদের সংরক্ষণ করা হবে।
    ▪ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয় এরুপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। ²
    কিন্তু দূঃখের বিষয় তার দাবিগুলো মেনে নেইনি। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বলেছিল বাঙালি হয়ে যেতে এবং তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ³ এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের বাঙালি জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে ৭২ এর সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
  13. তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে “জন সংহতি সমিতি ” (জেএসএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। জনসংহতি সমিতির মূল দাবি –
    ▪ ভূমি অধিকার।
    ▪ সেটেলার বাঙালি (অভিবাসনকৃত ) প্রত্যাহার
    ▪ সেনাবাহিনী প্রত্যাহার।
    ▪ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, এবং
    ▪ বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষনা প্রদান।
  14. ১৯৭৩ সালে ৭ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির ইটছড়ির জঙ্গলে শান্তিবাহিনী (জেএসএস এর স্বশস্ত্র সংগঠন আত্বপ্রকাশ করে।
  15. ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সরকারের স্বশস্ত্র বাহিনী ও শান্তিবাহিনী মধ্যকার তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। এর মধ্যে ১৯৭৯সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লে: জেনার”েল জিয়াউর রহমান ” সুপরিকল্পিত ভাবে বিপুল পরিমাণ বাঙালি (সেটেলার) মুসলমানদের এ অঞ্চলে অভিবাসন করেন।⁴
    ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতি মধ্যকার বহুবার শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্ত কোন সুরহা হয়নি।
    পরিশেষে, প্রায় দুই যুগ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে ঐতিহাসিক “পার্বত্য চুক্তি ” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে সরকার পক্ষ থেকে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রধান আবুল হাসনাত আআব্দুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে সভাপতি জ্যোতিরিন্দ বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা ) স্বাক্ষর করেন। এসময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন। এসময় পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি আদিবাসীরা এ চুক্তি কে অধিকার আদায়ের চুক্তি বলে অভিহিত করেন।
    এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় তৎকালীন বিরোধী দল (বিএনপি এর অঙ্গ সংগঠন) চুক্তির বিরোধিতা করে দেশের এক বিরাজমান পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং দেশকে অচল অবস্থা তৈরি করেছিল। এ সময় তারা এ চুক্তিকে “কালো চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা আসে এবং সরকার গঠন করে। এ সময়ে চুক্তির তেমন কোন বাস্তবায়ন হয়নি।
    অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে ১৯৯৮ সালে ২৬ ডিসেম্বর ” ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট “(ইউপিডিএফ) নামে আরেকটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এ সংগঠন মূলত : তখনকার “পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং পাহাড়ি গণপরিষদ মিলিত একটি রুপই মাত্র। 


লিংকঃ

Sunday, May 3, 2020

লংগদুর পথে পথে

      ছবিঃ পিসিপি'র মৌন মিছিল ২১শে মে ১৯৮৯ইং

     
লংগদু গণহত্যার ৩১বছর আজঃ

 ৪ঠা মে ১৯৮৯,লংগদু গণহত্যাঃ
১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে সংগঠিত হয় লংগদু গণহত্যা। এদিন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলায় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় সেটলার বাঙালিরা পাহাড়ী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে পরিকল্পিতভাবে হামলা করে এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, বৌদ্ধ মন্দির ও বুদ্ধ মুর্তি ধ্বংস করে দেয়।সেটলারদের এ হামলায় বহু পাহাড়ী নিহত ও আহত হয়।

এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ জানিয়ে ৮৯' সালের ৯ মে চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, প্রাক্তন সংসদ সদস্য চাইথোয়াই রোয়াজা, প্রাক্তন সংসদ সদস্যা সুদীপ্তা দেওয়ান, প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা সুবিমল দেওয়ান, তৎকালীন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান এবং রাঙামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মায়াধন চাকমাসহ ২২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে তারা এ হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “উপজেলা সদরে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্বেও পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য, লংগদু ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান  ও ৩নং লংগদু মৌজার হেডম্যান অনিল বিহারী চাকমা তার বাসভবনে হামলার শিকার হন। ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচেগেলেও তার স্ত্রী ও প্রতিবেশীদের অনেকে(যারা হেডম্যানের বাসভবনে আশ্রয় নিয়েছিল) এই নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন। হত্যাকারীরা দা, বল্লম ইত্যাদি সহ আগ্নেয়াস্ত্রের দ্বারা, গুলি করে এইসব নিরীহ নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে হত্যা করেও ক্ষান্ত হয়নি। মৃতদেহগুলি বাড়িতে ফেলে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে।অনিল বিহারী চাকমা তার স্ত্রীর মৃতদেহ বাড়ি থেকে বের করে বাড়ীর পাশ্ববর্তী জঙ্গলে সারারাত পাহারা দিয়ে রাখেন। ভোরের দিকে থানায় খবর দিতে এসে পরে উদ্ধার করতে গেলে পরবর্তীতে মৃতদেহের কোন হদিস পাননি। পরিস্থিতির এমন ভয়াবহতায় মৃতদেহগুলি ধর্মীয় বিধিতে পর্যন্ত সৎকার করা সম্ভব হয়নি।”

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে বিকাল ৪-৫ টা নাগাদ লংগদু উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ সরকার তার অফিসের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাবার আড়াই ঘন্টা পর লংগদুতে পাহাড়ি গ্রামবাসীদের উপর প্রতিশোধ মূলক হামলা শুরু হয়। এই প্রতিশোধমূলক হামলায় কম করে ৩৬ জন পাহাড়ী নারী-পুরুষ ও শিশু মারা যায়। তবে এর প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে রিপোর্টে বলা হয়। আর আব্দুর রশিদ সরকারের মৃত্যুর জন্য শান্তিবাহিনীকে দায়ী করা হলেও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর কোন কারণ খুঁজে পায়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ্যামনেস্টির ওই রিপোর্টে বলা হয়," কমপক্ষে ৬টি গ্রা্মে আক্রমণ করা হয়, পাহাড়ীদের শত শত ঘরবাড়ি, অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির এবং খ্রিস্টানদের দু’টি গীর্জা জ্বালিয়ে দেয়া হয়। যারা বেঁচে যায় তারা আশ্রয়ের জন্য পাহাড়ে ও জঙ্গলে পালিয়ে যায় এবং তাদের একটা বিরাট অংশ সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়।”
আজ লংগদু গণহত্যা দিবস
ছবিঃলংগদু গণহত্যার লাশের ছবি 

  যে সময় এ গণহত্যা সংঘটিত হয় তখন ছিল স্বৈরাচারী এরশাদের সামরিক শাসনামল। 
ফলে এ বর্বর হত্যাযজ্ঞের সংবাদ সে সময়কার বাংলাদেশের কোন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। 
তবে পরবর্তীতে যখন ঘটনাটি প্রচার পায় তখন থেকেই প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়।

বর্বরতম এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে জন্ম লাভ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। লোমহর্ষক এ গণহত্যার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর জন্য ঢাকার রাজপথে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ১৯৮৯ সালের ২১শে মে মৌন মিছিল সহকারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। 
পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ এ বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদানসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। 
 হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৩০শে মে’ ৮৯ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঢাকায় মৌন বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

 আজ ৪ঠা মে ২০২০,হত্যাকান্ডের ৩১ বছর অতিক্রান্ত হলেও কোন সরকারই এ হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের উপর ডজনের অধিক গণহত্যা চালানো হয়েছিল।এ হত্যাকান্ডের মত কোন গণহত্যার বিচার আদিবাসী জনগণ পায়নি।তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবতা বিরোধী এসব হত্যাযজ্ঞের কি কোনদিন বিচার হবে না?


২রা জুন ২০১৭,লংগদু হামলাঃ

ছবিঃপ্রাণের ভয়ে  ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন আদিবাসীরা


  ১লা জুন বৃহস্পতিবার দুপুরে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ৭নং ইউনিয়ন শাখার যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম নয়ন (৩৫)-এর লাশ উদ্ধার করা হয়৷
 লাশটি উদ্ধার করা হয় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চার মাইল এলাকা থেকে৷ স্থানীয় পুলিশ জানায়, দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যার পর লাশ ফেলে রেখে যায়৷তিনি একজন ভাড়াটে মোটর সাইকেল চালক ছিলেন বলে জানা যায়।
এরপর থেকেই লংগদু উপজেলা সদরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়৷২জুন শুক্রবার সকাল ৮ টার দিকে লাশ লংগদুতে নিয়ে আসা হলে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে৷৷হত্যাকান্ডের দায় ছাপিয়ে দেয়া হয় পাহাড়ীদের উপর।হামলা চালানো হয় পাহাড়ী জনপদে।
এ হামলায় লংগদু সদরের তিনটিলা এলাকায় জুম্মদের দুই শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট; মানিকজুরছড়ায় কমপক্ষে ৪০টির অধিক ঘরবাড়ি, এবং বাত্যা পাড়ায় প্রায় ৪০টি ঘরাবাড়িসহ জুম্মদের প্রায় ৩০০টির অধিক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
 আনুমানিক সকাল ৯টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ছত্রছায়ায় লংগদু উপজেলায় বাত্যা পাড়া থেকে সেটেলার বাঙালিদের এক জঙ্গী সাম্প্রদায়িক মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি আনুমানিক ১০টার দিকে লংগদু সদরের তিনটিলা এলাকায় পৌঁছলে সেটেলার বাঙালিরা কোন উস্কানী ছাড়াই জনসংহতি সমিতির অফিসসহ জুম্মদের ঘরবাড়ি ও দোকানগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ঘরবাড়ি লুটপাটসহ জুম্মদের উপর হামলা করতে শুরু করে। এতে তিনটিলা এলাকায় জুম্মদের ২০০-এর অধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয় বলে জানা যায়। এরপর সেনা ও পুলিশ প্রহরায় সেটেলার বাঙালিরা পার্শ্ববর্তী মানিকজুরছড়ায় হামলা করতে যায়। এতে জুম্মদের বসতিতে অগ্নিসংযোগ করলে কমপক্ষে ৪০টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ছাই হয়ে যায়।
বেলা ১২টার দিকে স্থানীয় প্রশাসন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে সেনাবাহিনীর প্রহরায় সেটেলার বাঙালিরা দক্ষিণ মানিকজুরছড়া, বাত্যা পাড়া ইত্যাদি জুম্ম গ্রামে অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। বাত্যা পাড়ায় আরো ৩০টি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে বলে জানা যায়।
লাশ নিয়ে সেটেলারদের জঙ্গী মিছিল বের করার খবর ১জুন বৃহস্পতিবার রাতে জানাজানি হলে স্থানীয় জুম্ম জনপ্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দ লংগদু সেনা জোন ও লংগদু থানা কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কার কথা জানা্নো হয়েছিল। ২রা জুন সকালে সেনা জোনের পক্ষ থেকে টুআইসি মেজর রফিক জুম্মদেরকে এই মর্মে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ‘মিছিল করা সেটেলারদের গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলটি করবে। কোন অঘটন ঘটতে দেয়া হবে না।’ তাই নিরাপত্তা নিয়ে জুম্মদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে জুম্ম জনপ্রতিনিধি ও জুম্মদেরকে তিনি আশ্বস্থ করেন। কিন্তু অত্যন্ত দু:খজনক যে, লংগদু সেনা জোনের জোন কম্যান্ডার লে: কর্ণেল আবদুল আলিম চৌধুরী পিএসসি, টুআইসি মেজর রফিক ও লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে সেনা-পুলিশের সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে সেটলার বাঙালিরা জুম্মদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করে এবং লুটপাটসহ সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা চালায়।
উক্ত জঙ্গী মিছিল ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পাটি, জামায়াতে ইসলাম প্রভৃতি জাতীয় রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে এবং সাম্প্রদায়িক উগ্র সংগঠন সমঅধিকার আন্দোলন ও অন্যান্য সেটেলার বাঙালিদের সংগঠনের লোকজন অংশগ্রহণ করে বলে জানা যায়।
সেনা জোন ও থানার পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করা সত্ত্বেও এবং তাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে জুম্মদের ঘরবাড়িতে সেটেলার বাঙালিদের অবাধে এই অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হামলার ঘটনা থেকে এটা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, সেনা-পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতৃত্বের যোগসাজশে জুম্মদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও সাম্প্রদায়িক হামলার পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে সেটেলার বাঙালিরা লাশ নিয়ে মিছিল করার আয়োজন করেছিল। যদিও উক্ত ঘটনায় পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি সরকারের পক্ষ থেকে তুলে দেয়া হয়েছিল।
উক্ত হামলার ঘটনায় গুণবালা চাকমা নামের এক মহিলা নিহত হন বলে যায়।
১৯৮৯ এর গণহত্যার পর লংগদুতে এটিই ছিল আদিবাসীদের উপর সবচেয়ে বড় হামলা।


উৎসব নেই লংগদুর ২১৩ ঘরপোড়া পরিবারে ...
   ছবিঃঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এক জুম্ম নারীর আর্তনাদ


 এদেশের আদিবাসীরা স্বাধীনতার পর হতে নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার পাবার জন্য আন্দোলন,দাবী করে গেলেও বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার না দিয়ে তাদেরকে জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে।বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলকে পার্বত্য চটতগ্রামকে নিয়ে এদেশের শাসকশ্রেণী বেশী উঠেপড়ে লেগেছে ।
একসময়কার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলকে জিয়াউর রহমানের আমলে ৮০'র দশকে সমতল থেকে প্রায় ৫ লক্ষ সেটলার বাঙালীকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এখানকার ভূমিপুত্রদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করে।যার কারণে পাহাড়ে আজ আদিবাসী-বাঙালী অনুপাত  ৪৮%-৫২%।পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামীকরণ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার অনবরত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
যার প্রমাণ হিসেবে বলা যায় ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনাকালে সাংসদ আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবকৃত "বাংলাদেশের সকল নাগরিকগণ বাঙালী পরিচিত হইবে" প্রস্তাবটি শুধুমাত্র সংখ্যা গরিষ্ঠতার কারণে গ্রহণ করা হয়েছিল এদেশের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীদের অস্বীকার করে।

২০১১ সালের ৩০শে জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবারও বাংলাদেশের ভিন্ন জাতিসত্বার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র এক জাতির(বাঙালী) রাষ্ট্র হিসেবে সংবিধান ঘোষণা করে।
এই যে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আদিবাসীদের উপর যে হামলা,লুটপাত,হত্যাকান্ড,ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ সবগুলোই সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কিছু ঘটনা।সংবিধানই যখন আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে তখন তাঁদের উপর এসব ঘটনা ঘটা মানেই এদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের দোষ বলে আদিবাসীরা মনে করবে।

২জুন ২০১৭,লংগদু হামলায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতার  কিছু ছবি।

একজন শক্তিমান চাকমা ও পাহাড়

অস্ত্রধারীদের গুলিতে নানিয়ারচর ...
এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা

পাহাড়ের একমাত্র লড়াকু ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।৮০'র দশক,পার্বত্য চট্টগ্রাম তখন বারুদের গন্ধে ভরা।বন পাহাড়ে যতদূর  শোনা যায় শুধু রাইফেল-মর্টারশেলের আওয়াজ।পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগন তখন তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের শাসক শ্রেণী তথা বাংলাদেশ সরকারের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। ১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় ঘটে গিয়েছিল এক বিরাট হত্যাযজ্ঞের ঘটনা।পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া গণহত্যাগুলোর একটি।সেনাবাহিনীর প্রত্যেক্ষ সহযোগীতায় সেটলার বাঙালীরা আদিবাসীদের ছয়টি গ্রামে চালিয়েছিল হত্যাকান্ড।শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে লুটপাট করেছিল আদিবাসী জনপদ।গুলি করে পাখির মত হত্যা করা হয়েছিল আদিবাসী আবাল বৃদ্ধ-বণিতাকে।
"অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল" এর তৎকালীন রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৬জন নারী পুরুষকে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় আদিবাসীদের দাবী অনুযায়ী এর সংখ্যা দ্বিগুনেরও বেশী।  আহত হয়েছিলেন আনুমানিক ৫০০ এর অধিক।হত্যার পর এসব লাশগুলোও হস্তান্তর করা হয়নি পরিবারের কাছে।এ হত্যাকান্ডে দুটি গির্জাসহ অসংখ্যা বৌদ্ধমন্দির ভাংচুর ও পুড়িয়ে দেয়া হয়।পার্বত্য চট্টগ্রামে তখন সামরিক শাসন চলছিল ফলে এ হত্যাকান্ডের জন্য কোন প্রতিবাদ মিছিল-সমাবেশ করা সম্ভব হয়নি।দেশে তখন স্বৈরাচারী এরশাদের শাসন চলছিল।পুরোদেশে তখন ছাত্রদের মিছিল,মিটিং,সভা-সমাবেশ চলছিল স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে।

সেসময়ে লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদ করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত জুম্ম ছাত্ররা একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জুম্ম শিক্ষার্থীদের খবর দেয়া হয়।ছাত্রদের প্রথম বৈঠক হয় ২০শে মে ১৯৮৯ এর বিকেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) রশিদ হলের ২০০২ নং রুমে।মিটিংয়ে বুয়েট,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় ও মোহাম্মদপুর হোস্টেলের ছাত্ররা উপস্থিত ছিলেন।ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর ছাত্ররা মিটিংয়ে পৌঁছেনি।সেদি্নের সেই মিটিংয়েই গঠিত হয় পাহাড়ের লড়াকু ছাত্র সংগঠন  আজকের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।সিদ্ধান্ত হয় পরদিন ২১শে মে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে শোক মিছিল হবে। ২১শে মে এর প্রতিবাদ মিছিল কোন স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে নয়,কোন ব্জ্রকন্ঠেও নয়।সে মিছিল ছিল শান্তিপূর্ণ শোক মিছিল;মৌন মিছিল,কিন্তু চেতনায় ছিল বিদ্রোহ-বুকে ছিল প্রতিবাদের আগুন।
সেদিনের সেই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শক্তিমান চাকমা।শক্তিমান চাকমা ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা।হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বাংলাদেশ ছাত্র,যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি। সেদিন তিনি মাতৃভূমির ডাকে সারা দিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিলেন এবং লাভ করেছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতির পদ।এরপর শুরু হয় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে শক্তিমান চাকমারও পথচলা।আজকের এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার,আত্মবিসর্জনের।
জনসংহতি সমিতি তখন বাংলাদেশ সকারের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত,পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে জনসংহতি সমিতির সম্পর্ক গড়ে উঠে। ছাত্র পরিষদ গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকে আর জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র আন্দোলন।ছাত্র পরিষদ হয়ে উঠে জনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন।
পরে শক্তিমান চাকমা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে হয়ে উঠেন একজন এ্যাডভোকেট।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সাথে বিভিন্ন সময় জনসংহতি সমিতির ২৬ বারের বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।যা বিশ্বব্যাপী শান্তি চুক্তি নামে সমধিক পরিচিত।চুক্তিতে শান্তি চুক্তির উল্লেখ না থাকলেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি হয়েছিল বিধায় শান্তি শব্দটি অধিক জনপ্রিয়টা পেয়েছিল।চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনেও শক্তিমান চাকমার যে প্রচুর অবদান ছিল তা অস্বীকার করার জো নেই।বলতে হয় তার কারণেই তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।কারণ সাবেক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তৎকালীন বহু আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতার সাথে তার সখ্যটা ছিল।কিন্তু চুক্তিকে শান্তি চুক্তি আখ্যা দেয়া হলেও আজ ২২টি বৎসর অতিক্রম হলেও জুম্ম জনগন শান্তির দেখা পায়নি। চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন না করেই সরকার বলছে চুক্তি ৭২টি ধারার ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে।

চুক্তির সময় তৎকালীন কিছু ছাত্র নেতা চুক্তির বিরোধীতা করেছিল।যার কারণে চুক্তির পর চুক্তির বিপক্ষরা ১৯৯৮ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ইউপিডিএফ নামে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করেছিল।যার প্রধান ছিলেন সাবেক পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা।
পাহাড়ের রাজনীতি দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে চুক্তির পক্ষ আর বিপক্ষ।চুক্তির পক্ষ হচ্ছে জনসংহতি সমিতি আর বিপক্ষ হচ্ছে ইউপিডিএফ।শক্তিমান চাকমাসহ অসংখ্যা ছাত্র নেতা থেকে যায় চুক্তির পক্ষ জনসংহতি সমিতির সাথে।পাহাড়ে শুরু হয় সংঘাত।চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন থমকে যায়।
একে অপরকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠে দুটি দল।
যে সময় ইউপিডিএফ দুর্বল হয়ে পড়ে,সে সময় জনংহতি সমিতিতে ফাটল দেখা দেয়।জনসংহতি সমিতিতে আত্মকোন্দল শুরু হলে ২০১০সালের ১০ এপ্রিল তা প্রকাশ্য বিভক্ত হয়ে পড়ে।অভিযোগ করা হয় সন্তু লারমা তার একঘেয়েমি ও সেচ্ছাচারিতার কারণে কিছু জনসংহতি সমিতির প্রবীণ নেতাকে নবম জাতীয় কংগ্রেস ও পার্টি থেকে বাদ দেয়ার ফলে পার্টি বিভক্ত হয়।যেসব প্রবীণ নেতাকে বাদ দেয়া হয়েছিল তারা হলেন তৎকালীন সহ-সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা,সহ-সভাপতি রুপায়ন দেওয়ান,সাধারণ সম্পাদক চন্দ্র শেখর চাকমা,সহ সাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমাসহ বহু নেতা।ফলে তাঁদের সমর্থন দেয়া কর্মীদের দিয়ে গড়ে উঠে পাহাড়ের আরেকটি সংগঠন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)।এমএনলারমার আদর্শে গড়া সংগঠন জনসংহতি সমিতি।তাই সংগঠনের নামের সাথে এমএনলারমা নামটি জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবী করা হয়।শক্তিমান চাকমা যোগদেন নতুন গঠিত হওয়া জনসংহতি সমিতিতে।পরে দায়িত্ব পান সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে।
পাহাড়ে জন্ম হয় আরেকটি নতুন সংগঠনের।জুম্ম জনগন পা বাড়ায় আরেকটি সংঘাতে।
সংঘাত রূপ নেয় জেএসএস(সন্তু লারমা) বনাম ইউপিডিএফ,জেএসএস(এমএনলারমা)।

শক্তিমান চাকমা ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে এমএনলারমা দলের পক্ষ হতে নির্বাচন করে রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়াচর উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।এরপর তার উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন করেছেন বলে লোকেমুখে শোনা যায়।

 এককালীন ইউপিডিএফ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা(বর্মা) ও শ্যামল কান্তি চাকমা(তরু) তাঁদের সংগঠনের কাছ থেকে যখন বিভিন্ন হয়রানি,তোষামেদ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে গুপ্ত হত্যার কথা জানতে পারলে তারা এমএনলারমা দলে আশ্রয় নেয়।কিন্তু ইউপিডিএফ থেকে বর্মা-তরুদের তাঁদের হাতে তুলে দিতে এমএনলারমা দলকে চিঠি দেয়া হয়েছিল।কিন্তু আমরা যদি ইতিহাস দেখি তাহলে আমরা দেখতে পাই রাজনৈতিক আশ্রিত কাউকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়নি।
এমএনলারমা দলও তাই করেছিল বলে আমরা জানতে পারি।যখন ইউপিডিএফ থেকে অতিরিক্ত চাপ আসতে থাকে তখন বর্মা-তরুদের তাঁদের পথ তাদেরকে খুজতে বলা হলে তাঁরা নতুন একটি সংগঠন ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) গঠন করে।মানবিক কারণে তাদেরকে এমএনলারমা দল নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয়।
এমএনলারমা দল গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে সাংগঠনিক সুযোগ দেয়ার কারণসহ বিভিন্ন কারণে শক্তিমান চাকমাকে হত্যার খবর আমরা জানি। 
( ইউপিডিএফ-এমএনলারমা দলের সংঘাত সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে আমার পূর্বের লেখাটা পড়তে পারেন।
Link:https://draft.blogger.com/blogger.g?blogID=3863652744512578728#editor/target=post;postID=8586920090343160249;onPublishedMenu=allposts;onClosedMenu=allposts;postNum=1;src=postname)

২০১৮ সালের ৩রা মে বেলা এগারটার দিকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে শক্তিমান চাকমাকে।জানা যায় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ আর জেএসএস সন্তু গ্রুপের সমন্বিত পরিকল্পনাতেই তাকে হত্যা করা হয়।ঝড়ে যায় পাহাড়ের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
পরদিন ৪ঠা মে তার শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাওয়ার সময়  রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের ১৭মাইল এলাকায়  ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় শহীদ হন ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা(বর্মা) সহ ৫জন।

আজ ৩রা মে ২০২০,পাহাড়ের উজ্জ্বল একটি নক্ষত্র হারানোর দুবছর পূর্ণ হলো।স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে।তার রেখে যাওয়া অবদান জুম্মজাতি ভুলতে পারবেনা।আমাদের জুম্ম সমাজ থেকে আমরা শত শত তরুণ প্রতিভাকে হারিয়েছি,হারাচ্ছি।যার মাশুল হিসেবে বর্তমান প্রজন্ম রাজনীতি বিমূখ হচ্ছে,অদূর ভবিষ্যতে জুম্মদের এই অবস্থা চলতে থাকলে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে যাবে।আমরা অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনের যে পথে নেমেছিলাম সে পথ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আগামী প্রজন্ম যদি রাজনীতি বিমূখ হয়,জুম্মজাতি যদি নিজেদের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখতে না পারে এর সম্পূর্ণ দায় গিয়ে বর্তাবে বর্তমানে বিদ্যমান আঞ্চলিক সংগঠন গুলোর উপর।

লেখকঃপেদেলা চাঙমা(ছদ্মনাম)

































আমার পাহাড়

১)
পাহাড়ের রাজনীতিকে বুঝতে হলে,বর্তমান পরিস্থিতির উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের পূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো,
অতীত ইতিহাসগুলো অবশ্যই জানা প্রয়োজন।
তারপর বর্তমান জুম্মদের এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য কি করণীয় আমাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।
৮৩'তে জুম্মদের প্রথম গৃহযুদ্ধ হয়েছিল,যেখানে জুম্ম জাতীয়তাবাদের জনক এম এন লারমাসহ বহু ত্যাগী নেতাকর্মীকে হারিয়েছি।
সেই গৃহযুদ্ধ থেকে উত্তরণ ঘটে পুণরায় রাষ্ট্রের সাথে সশস্ত্র সংগ্রাম করে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতি সরকারকে চুক্তি সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
এই চুক্তিকে ঘিরেই জুম্মদের মধ্য শুরু হয় ২য় পর্যায়ের গৃহযুদ্ধ।
চুক্তির পূর্ববর্তী পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও পাহাড়ী গণপরিষদের কিছু নেতাকর্মী জেএসএস নেতা সন্তু লারমার সাথে চুক্তি বিষয়ে কিছু আলোচনা করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু সন্তু লারমা তাদেরকে "নাক চিবিলে দুধ নিগিলে" বলে তাদের সাথে আলোচনা করেননি।অর্থাৎ সন্তু লারমা তাদেরকে রাজনৈতিক অপরিপক্ক ও বয়সে একটু কম বলে গুরুত্ব দেননি।
হয়তো সন্তু লারমা নিজের অহংকার ও দম্ভ দেখিয়েছিল।
ফলে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা এই মতানৈক্যের সুযোগ কাজে লাগাতে চুক্তি স্বাক্ষর কালীন সময়ে চুক্তির বিরোধিতা করে ওসব ছাত্রনেতা সহ কিছু লোককে দিয়ে মিছিল করায়।
চুক্তির পর দেশের বৃহত্তর বিরোধী দল বিএনপির সাথে ওসব চুক্তির বিরোধিতা কারীরা চুক্তি বাতিলের দাবী জানিয়ে হরতাল-লংমার্চের মত কর্মসূচী দিয়েছিল।
সেনা-গোয়েন্দাদের সহযোগীতায় চুক্তির বিরোধীতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬শে ডিসেম্বর মিথ্যা ভূয়া পূর্ণসায়ত্বশাসনের নাম দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ।
অথচ গোটা দুনিয়াজুড়ে পূর্ণসায়ত্তশাসন নামে কোন স্বায়ত্তশাসনই আমরা দেখিনা।
তাহলে আমাদের ধরে নিতে হবে ইউপিডিএফই পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা!
পুরোবিশ্বই জানে স্বায়ত্তশাসন ৩প্রকার সেখানে ইউপিডিএফ পুরো বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে!
প্রতিষ্ঠার পর হতে ইউপিডিএফ চুক্তি বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্থ করার জন্য অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সেনা-গোয়েন্দাদের সহযোগীতায় একের পর এক হত্যা করে।
সেনা-গোয়েন্দা অস্ত্র গোলাবারুদ সরবরাহ করতো,দেশীয় অস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতো।একটা সময় জনসংহতি সমিতি আত্মরক্ষার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুললে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহের তাগিদে ইউপিডিএফ চুরি,ডাকাতি অপহরণের মত বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে।২০০৩ সালে তিন বিদেশী নাগরিককে অপহরণ করে বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ আদায়ের কথা আমরা সকলেই জানি।
ইউপিডিএফের তান্ডবে পুরো খাগড়াছড়ি জেলার মধ্য দীঘিনালা ও খাগড়াছড়ি সদরের কিছু এলাকা ব্যতীত জেএসএসের প্রায় শূণ্য হয়ে গিয়েছিল।
২)
পরবর্তীতে জনসংহতি সমিতির প্রবল আক্রমণে ইউপিডিএফ কিছুটা থমকে গিয়েছিল। ওয়ান ইলেভেনের সময় যখন দেশে তত্বাবধায়ক সরকারের শাসন চলছিল তখন জনসংহতি সমিতিতে বিভিন্নরকমের মতানৈকের খবর পাওয়া যায়।যার শুরু ২০০৫ সালের দিকে।
ইউপিডিএফ যখন নিভু নিভু হয়ে গিয়েছিল জনসংহতি সমিতির কাছে আত্মসমর্পণের কথা পাকাপোক্ত হয়েছিল,
ঠিক সেসময় জনসংহতি সমিতির উপর কোপ বসিয়েছিল এদেশের গোয়েন্দা সংস্থা সহ সেনাবাহিনী।
সন্তু লারমা সেচ্ছাসারিতা,একগুয়েমির কারণে অনেক নেতাকর্মীকে সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছিল।
তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রশেখর চাকমার সাথে সন্তু লারমার কাজে কর্মে দূরত্ব বেড়ে যায়।
জনসংহতি সমিতিতে সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে যায়। ফলে সাধারণ কর্মীদের মধ্য নেতাবাদ সৃষ্টি হয়,সে অমুক নেতার মানুষ ও অমুক নেতার মানুষ ইত্যাদি।
জনসংহতি সমিতিতে প্রথম সংঘাত শুরু হয় দীঘিনালাতে,এরপর পুরো সংগঠনে ছড়িয়ে পড়ে।
নবম জাতীয় সম্মেলনে সন্তু লারমা সিনিয়র সহ-সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা,সহ-সভাপতি রুপায়ন দেওয়ান,সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রশেখর চাকমা,সহসাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমাসহ কয়েকজনকে জাতীয় সম্মেলন ও কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ দিলে সংঘাত চরম আকার ধারণ করে করে।জনসংহতি সমিতি খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি ভিত্তিক বিভক্ত হয়ে পড়ে।
উল্লেখিত নেতাদের বাদ দিয়ে সন্তু লারমা সম্মেলন সম্পন্ন করলে খাগড়াছড়ি অঞ্চলের নেতারা ২০১০সালের ১০এপ্রিল দীঘিনালা বড়াদাম স্কুলে মাঠে কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে আরেকটি জনসংহতি সমিতির আত্মপ্রকাশ ঘটায়।
শুধুমাত্র আহবায়ক কমিটি গঠণ করে সন্তু লারমার ঐক্যের ডাক অপেক্ষা করে।কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি।যে সংগঠণকে বর্তমানে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) বলে আমরা জানি।
জুম্মজনগণের শুরু তৃতীয় ধাপের গৃহযুদ্ধ।
৩)
জনসংহতি সমিতি বিভক্ত হয়ে পড়লে ইউপিডিএফ আত্মসমর্পণ থেকে রক্ষা পায় এবং খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীক জনসংহতি সমিতির সাথে এক হয়ে কাজ করতে থাকে।
জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) ও ইউপিডিএফকে ঠেকাতে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি সেনা-গোয়েন্দাদের সাথে আঁতাত করে।
সেসময় খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় সেনা-গোয়েন্দাদের সহযোগীতায় ইউপিডিএফ ও এমএনলারমার বহু কর্মীকে হত্যা করেছিল।
এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ইউপিডিএফ ও এমএনলারমা দলের সংঘাতের খবর প্রথম পাওয়া যায় প্রার্থী দেয়া নেয়া নিয়ে।
এরপর ইউপিডিএফ কর্তৃক এমএনলারমা দলকে অর্থ উত্তোলনে বাঁধা দেয়া,চুক্তি নিয়ে প্রচারণায় বাঁধা,সংগঠণ করতে গেলে বাঁধা দেয়া ইত্যাদি ইস্যুকে ঘিরে তাদের দুদলের মধ্যে আস্তে আস্তে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
মূলত ইউপিডিএফ থেকে বলা হয় যে সন্তু লারমা থেকে বিভক্ত হওয়ার পর ইউপিডিএফ এমএনলারমা দলকে কোন আক্রমণ না করে খাগড়াছড়িতে নির্বিঘ্নে চলাফেরার সুযোগ দিয়েছিল,সুতরাং তাদের কথা মতই চলতে হবে।
যা একটা সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কখনো মেনে চলা সম্ভব নয়।
এভাবে আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ,মারামারি চলতে থাকে।
২০১৫সালের দিকে এসে সকল সংগঠন থেকে মারামারি-হানাহানি না করার একটা সিদ্ধান্ত এসেছিল।জুম্ম জনগণ ভেবেছিল হয়তো আমাদের ভাগ্য ফিরবে।এ শান্তি অবস্থা ২০১৭সালের গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ সৃষ্টি না হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছিল ধরা হলেও আদৌতে তা কখনো ছিলনা।
মারামারি-খুনোখুনি বন্ধ রাখার কথা থাকলেও বাঘাইছড়িতে ইউপিডিএফেরা এমএনরারমা দলের নয়ন জ্যোতি চাকমা ও যুদ্ধ চন্দ্র চাকমাকে হত্যা করেছিল,নানিয়াচরে মকবুল চাকমাকে হত্যা করেছিল,খাগড়াছড়ির বেতছড়িতে স্যামুয়েল চাকমাকে হত্যা করেছিল।
যা সেসময়ের মারামারি -খুনোখুনি না করার শর্তগুলো ইউপিডিএফ ভঙ্গ করেছিল।
তারপরও এমএনলারমা দল থেকে কোনরুপ প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি।
৪)
এরপর সালে উপজেলা নির্বাচনের সময় পানছড়িতে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে সর্বোত্তম চাকমাকে সমর্থন করলেও তৎকালীন পানছড়ির ইউপিডিএফ নেতা জলেয়া চাকমা(তরু)[বর্তমান ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক প্রধান] বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রিংকু চাকমাকে সমর্থন করতেন।
জলেয়া চাকমা সর্বোত্তম চাকমার ঘোর বিরোধিতার কারণে জলেয়া চাকমাকে নির্বাচনী মাঠ থেকে দূরে রাখার জন্য খাগড়াছড়িতে গৃহবন্ধি করে রাখা হয়।এদিকে উক্ত ঘটনার জন্য প্রয়াত গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা(বর্মা) খুবি মর্মাহত হন।
বিভিন্ন সময় আনন্দ প্রকাশ চাকমারা বর্মাদের কাছে বিভিন্ন তথ্য লুকাতেন,অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ লুকাতেন।
এবং তাদের বাকস্বাধীনতা বলতে কিচ্ছু থাকতোনা।
ফলে একসময় তারা(তরু ও বর্মাসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী) সন্তু লারমার দলে চলে যাবার পরিকল্পনা করেন। এ খবর জানতে পেরে এমএনলারমা দল তাদের সাথে যোগাযোগ করে।
তাদের সাথে যোগাযোগ এই জন্য করে যে তাদের মতন নেতা যদি সন্তু লারমা দলে চলে যায় ইউপিডিএফ এবং এমএনলারমা দলের উপর কঠিন আঘাত আসবে।
ইউপিডিএফ বর্মা এবং তরুর সন্তু লারমা দলে চলে যাওয়ার খবর শুনে তাদেরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল।
ফলশ্রুতিতে বর্মা-তরুরা তাদেরকে হত্যার পরিকল্পনা জানার পর দ্রুত এমএনলারমা দলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
এরপর ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে এমএনলারমা দলকে বার বার খবর পাঠানো হয়েছিল বর্মা-তরুকে তাদের হাতে তুলে দিতে,
কিন্তু রাজনৈতিক আশ্রিত কাউকে কেউ কারো হাতে তুলে দেয়া কতটুকু উচিত পাঠকগণ উত্তর খুজে নিবেন।ইতিহাসের কোথাও এমন দৃষ্টান্ত পাবেন বলে আমি জানিনা।
ফলশ্রুতিতে বার বার ইউপিডিএফ থেকে এমএনলারমা দলের উপর কঠোর হুশিয়ারি দেওয়া হলে বর্মা-তরুদের নিজেদের পথ নিজেদের খোঁজার কথা বলা হয়।
এরপর বর্মা-তরুরা নিজেদের আত্মরক্ষার তাগিদে এমএনলারমা দলের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থেকে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গঠণ করে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরম্ভ করে।
ফলে দুই ইউপিডিএফের সংঘাত শুরু হয়।
কিন্তু প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে এমএমলারমা দল তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিচরণের সুযোগ দেয়ায় নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাসহ বহু এমএনলারমা দলের কর্মীকে হত্যা করলে শুরু হয় ইউপিডিএফ বনাম ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক,এমএনলারমা।
৫)নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে হত্যার পরিকল্পনা জেএসএস সন্তু লারমা ও প্রসীত বিকাশের ইউপিডিএফ একসাথে করেছিল।
এমএনলারমাকে দলকে একযোগে আক্রমণ করার জন্য লংগদু-মারিশ্যার মধ্যবর্তী কাট্টোলী বিল এলাকায় সন্তু লারমা-ইউপিডিএফেরা বৈঠক করেছিল।
প্রথম অবস্থায় সন্তু লারমার দল চুপিচুপি ইউপিডিএফকে সহযোগিতা দিয়ে এসেছিল,
যাহাতে তাদের নাম জনসম্মুখে না আসে।
কিন্তু সন্তু লারমার দল বাঘাইছড়িতে উপজেলা নির্বাচনের সময় এমএনলারমা দলের কর্মী অপহরণ এবং এর পরবর্তী বসু,এ্যানো ও শতসিদ্ধিকে হত্যা করে প্রকাশ্য এমএনলারমা দলের সাথে সংঘাতে জড়ায়।
এখন বর্তমানের সংঘাতে লিপ্ত দলগুলোর সমীকরণ এরকমঃ
ইউপিডিএফ(প্রসীত),জেএসএস(সন্তু লারমা)=জেএসএস(এমএনলারমা),ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক)
এখন আপনি বর্তমান সময়ে জুম্মদের এই দুর্যোগ পরিস্থিতির জন্য কাকে দায়ী করবেন?
এসব দায়ী করাকরি করলে সমাধান আসবেনা কোনদিন!মূলত সমাধানের পথকে খুঁজে বের করাই হতে হবে আমাদের একমাত্র লক্ষ্যে।
আমরা দেখতে পাই পৃথিবীর ইতিহাসে যেখানেই আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে সেখানেই ভিন্ন মত পার্থক্যের কারণে সংগঠণ বিভাজিত হয়েছে।
ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সুভাষ চন্দ্র বসু আর মহাত্মা-জহুরলালদের মতাপার্থক্য দেখতে পাই। কিন্তু তারা কখনও একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই অসংখ্য নামে বেনামে সংগঠণ যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে।
ঠিক আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অসংখ্য দল গড়ে উঠেছে বলে দুঃখ পাবার কারণ নেই।
মতবিরোধ থাকতে পারে সেটা স্বাভাবিক,
কিন্তু মূল সমস্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছি।
আমরা মূখ্যশত্রু-গৌণশত্রুর তফাৎটা বুঝতে চেষ্টা করছিনা।
সেজন্য বিপ্লবে-আন্দোলনে প্রথমেই আমাদের যে কাজটি করতে হবে,কে শত্রু আর কে মিত্র।
লেখকঃপেদেলা চাঙমা(ছদ্মনাম)

Friday, May 1, 2020

৮৬’র গণহত্যা (খাগড়াছড়ি)




ছবিঃইন্টারনেট থেকে নেয়া 






৮৬’র গণহত্যা (খাগড়াছড়ি): 
পানছড়ি হত্যাকান্ড: ১৯৮৬ সালের ১লা মে সংঘটিত হয় পানছড়ি হত্যাকান্ড। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতে, ১লা মে এবং তার পরের দিনগুলোতে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেটলার বাঙালিদের নিয়ে খাগড়াছড়ির পানছড়ির পাহাড়ী গ্রামগুলোতে প্রবেশ করে এবং ব্রাশ ফায়ারসহ দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পাহাড়ীদের ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ,ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ চালায়।এই গ্রামগুলো হল-গোলকপুতিমা ছড়া,কালানাল,সূতকর্মা পাড়া,শান্তিপুর,মির্জাবিল,হেদারা ছড়া (খেদারাছড়া মুখ পাড়া নামেও পরিচিত),পূজগাং,লোগাং,হাতিমুক্তি পাড়া,সাডেশ্বর পাড়া,নাবিদাপাড়া,লতিবাদ ছড়া(লতিবান) এবং দেওয়ান পাড়া।
এ হত্যাকান্ডে ছয়টির অধিক গ্রামের ১৬ জনের অধিক লোককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার আদিবাসী লোক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
মহাজন পাড়ায় হামলা: একই দিন ১লা মে খাগড়াছড়ি সদরের মহাজন পাড়ায়ও পাহাড়ীদের উপর আক্রমণ চালানো হয়। এতে একজন নিহত ও ১৫ জনের অধিক আহত হয়। অগ্নিসংযোগ ও লুটপাত করা হয় আনুমানিক ৩০টির অধিক পাহাড়ী ঘর বাড়িতে।
মাটিরাঙ্গা-দীঘিনালা হত্যাকান্ড: মাটিরাংগা উপজেলার তাইন্দং-তবলছড়ি এলাকা এবং দীঘিনালার বোয়ালখালী,নারিকেল বাগান,পাবলাখালীসহ আরো অনেক পাহাড়ী অধ্যুষিত গ্রামে সেনাবহিনীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও সহযোগীতায় সেটলার বাঙালীরা পাহাড়ীদের উপর হামলা ও লোমহর্ষক গণহত্যা চালিয়েছিল! পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল পাহাড়ীদের শত শত ঘরবাড়ি।১লা মে হতে কয়েকদিন ধরে চলা এসব হামলা ও হত্যাকান্ডে কয়েশত শত পাহাড়ী নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়,যার সঠিক হিসাব এখনো জানা যায়নি।সেনা-সেটলারদের পরিকল্পিত এ হামলায় হাজার হাজার পাহাড়ী আদিবাসী নিজ জায়গা-জমি,বসতভিটা ছেড়ে ভারতের ত্রিপুরায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
১লা মে এর হত্যাকান্ডে ১২ হাজারের অধিক পরিবারের লক্ষাধিক পাহাড়ী আদিবাসী মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশবর্তী দেশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।যেখানে ১২বছরের অধিক শরনার্থী জীবন অতিবাহিত করে এবং ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পরে ওসব উদ্ভাস্ত পাহাড়ী মানুষদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ঘটনাটি ৮৬’র গণহত্যা নামে পরিচিত।এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত করা হয় ডজনের অধিক হত্যাকান্ড। কিন্তু এসব হত্যাকান্ডের বিচার আজো মিলেনি।