Saturday, February 8, 2020

বিপ্লবী কল্পনা দত্ত

বিপ্লবী কল্পনা দত্ত



                                                                      



১৯২৯ সালের মে মাস। তখন মাষ্টারদা সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের উদ্যোগে সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম জেলা রাজনৈতিক সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র- ছাত্রী সম্মেলন ও নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
মাষ্টারদা সূর্যসেন ও তাঁর সহযোগীদের পরিচালনায় চট্টগ্রাম জেলা রাজনৈতিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। এই সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

যুব সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিপ্লবী নেতা অধ্যাপক জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ। এ সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের যুব শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।

নারী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন লতিকা সেন। এ সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের নারীরা স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধাদের পাশে থাকা ও সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ছাত্র-ছাত্রী সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ছাত্র সংগঠন 'অল বেঙ্গল ষ্টুডেন্টস এসোসিয়েশন' (বিপ্লবী অনুশীলন দল দ্বারা প্রভাবিত) ও 'বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল ষ্টুডেন্টস এসোসিয়েশন' (বিপ্লবী যুগান্তর দল দ্বারা প্রভাবিত) ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তাঁরা প্রয়োজনে জীবনবাজী রেখে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য লড়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এই সম্মেলনগুলোতে ওই সময় চট্টগ্রামের স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় কল্পনা দত্ত অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবিকার দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে নারী সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবিকার দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে কল্পনা দত্তের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। স্কুলজীবনের প্রারম্ভ থেকে তিনি 'ক্ষুদিরাম', 'কানাইলালের জীবনী', 'পথের দাবি' প্রভৃতি স্বদেশি বই পড়তে শুরু করেন। এই বইগুলি তাঁর অন্তরে স্বদেশপ্রেমের প্রেরণা যুগিয়েছিল।

ভারত উপমহাদেশের অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা থেকেই অনেক নারী পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। 'অনুশীলন', 'যুগান্তর' প্রভৃতি সশস্ত্র বিপ্লবী দলের সঙ্গে ঘরে ঘরে মা, বোন, মাসিমা, কাকিমা, দিদি, বৌদিরা যুক্ত ছিলেন। তাঁরা গোপনে গোপনে বিপ্লবী দলের কাজ করতেন। অনেক পরিবারের মা-বোনরা বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন। আবার অনেকে টাকা-কড়ি, সোনা-গহনা দিয়ে বিপ্লবী দলকে সহযোগিতা করতেন। অগ্নিযুগের প্রথম পর্বে স্বর্ণ কুমারী দেবী, সরলা দেবী, আশালতা সেন, সরোজিনী নাইডু, ননী বালা, দুকড়ি বালা, পরবর্তীকালে ইন্দুমতি দেবী, (অনন্ত সিংহের দিদি) লীলা রায়, পটিয়া ধলঘাটের সাবিত্রী দেবী প্রমুখ দেশপ্রেমিক নারী বিপ্লবী দলে যুক্ত ছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় কল্পনা দত্তের আবির্ভাব। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে কল্পনা দত্ত একটি অবিস্মরণীয় নাম।

বীর কন্যা কল্পনা দত্ত ১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার খরণদ্বীপ ইউনিয়নের শান্ত, সবুজ, পাহাড়ঘেরা শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী হলেও বাবা বিনোদ বিহারী দত্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সাব রেজিষ্টার হওয়ায় তাঁর শৈশব কাটে চট্টগ্রাম শহরে। মা সুভনা দত্ত ছিলেন গৃহিণী। শহরের প্রাণ কেন্দ্র আন্দরকিল্লায় তাঁদের বিশাল বাড়ি ছিল। শহরের নামকরা ডাক্তার রায় বাহাদুর দুর্গাদাস দত্ত ছিলেন তাঁর দাদু ।

কল্পনা দত্তের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে তাঁকে ডা. খাস্তগীর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন তাঁর বাবা। বীরকন্যা প্রীতিলতাও এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। কল্পনা দত্ত প্রীতিলতার এক ক্লাস নীচে পড়তেন। ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় ওই সময়ের অন্যতম নারী শিক্ষালয় ছিল। এই নামকরা স্কুলে প্রতিটি শ্রেণীতে কল্পনা দত্ত প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ছিলেন।

ডা. খাস্তগীর স্কুলের শিক্ষিকা উষাদি ছাত্রীদের সাথে গল্প করতেন। তাঁদেরকে দেশ-বিদেশের গল্প শুনাতেন। কল্পনা দত্ত এই উষাদির সংস্পর্শে এসেই বিভিন্ন স্বদেশি বই পড়তে শুরু করেন। উষাদি ছিলেন স্বদেশীদের গোপন বিপ্লবী সহযোগী। তিনি মূলত কল্পনা দত্তের চেতনায় দেশপ্রেম ও বিপ্লবী রাজনীতির বীজমন্ত্র বুনে দেন।

১৯২৯ সালে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রমের ডা. খাস্তগীর স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দেন। পরীক্ষা শেষ হলে তিনি উত্তাল চট্টগ্রামের নানা ঘটনার দিকে মন দেন। এসময় বিপ্লবী ধারার কয়েকটি বই পড়েন। পাড়া- প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিপ্লবী রাজনীতি, স্বদেশী ডাকাতীর কিংবদন্তী ঘটনা শোনেন। কিছুদিন পর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। কল্পনা দত্ত অঙ্কে ও সংস্কৃতে লেটারসহ চতুর্থ স্থান পেয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মেট্রিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করার জন্য সরকার তাঁকে মাসে ১৫ টাকা বৃত্তি প্রদান করে। পূর্ব থেকেই তাঁর পরিবার তাঁকে কলকাতায় পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কল্পনা দত্তও রাজী ছিলেন। ওই বছরই তিনি আই.এস.সি.-তে কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন।

বেথুন কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিন পর প্রীতিলতার সাথে পরিচয় ঘটে। যাঁকে কল্পনা দত্ত ডা. খাস্তগীর স্কুলের শিক্ষিকা উষাদির আলোচনার আড্ডায় প্রায়ই দেখতেন। বেথুন কলেজে পড়ার সময় সেই স্কুল জীবনের সুপ্ত দেশপ্রেমের বীজ কল্পনা দত্তের চেতনায় অঙ্কুরিত হয়। প্রীতিলতা আন্তরিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যবহারের মাধ্যমে মেয়েদেরকে খুব আপন করে নিতে পারতেন। প্রীতিলতা ওই একই কলেজে ইংরেজী সাহিত্যে বি.এ. পড়েন। থাকেন ছাত্রীনিবাসে। এখানে মাষ্টারদার নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। গড়ে তোলেন এক বিপ্লবী চক্র। এই বিপ্লবীচক্রে অনেক মেয়ে সদস্য যোগ দেন। এই বিপ্লবীচক্রে কল্পনা দত্ত যুক্ত হলেন। এই চক্রের মূল কাজই ছিল বিপ্লবীকর্মী তৈরীর পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ করা। অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতেন।

একই সময় কল্পনা দত্ত কল্যাণী দাসের 'ছাত্রীসংঘ'-এ যুক্ত ছিলেন। এসময় বেথুন কলেজে হরতাল পালন এবং অন্যান্য আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশের মুক্তি সংগ্রাম, মাতৃভূমির স্বাধীনতা, নারীদের মর্যাদা রক্ষার জন্য বীর সন্তানদের আত্মত্যাগ ভাবিয়ে তোলে কল্পনা দত্তকে। তিনি প্রীতিলতার সাথে যুক্ত থেকে বিপ্লবী ধারার কাজ করতে করতে নিজেই বিপ্লবী কর্মী হয়ে যান। আর বিপ্লবী মনে মাস্টার দা সূর্যসেনের প্রতিষ্ঠিত তরুণ ও ছাত্রদের বিপ্লবী যুগান্তর দলে যোগ দেওয়ার আকাঙ্খায় উদ্বেল হয়ে ওঠেন। মেয়েদের বিপ্লবে অংশগ্রহণের অনুমতি চাওয়ার জন্য দেখা করতে চান সর্বাধিনায়ক সূর্যসেনের সাথে।

ওই একই সময় তিনি বিপ্লবী নেতা পুর্ণেন্দু দস্তিদারের সংস্পর্শে আসেন, যিনি ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের একান্ত অনুগামী। পুর্ণেন্দু দস্তিদার ও প্রীতিলতার প্রভাবেই কল্পনা দত্ত বিপ্লবী দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের উদ্যোগে চট্টগ্রাম জেলা রাজনৈতিক সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবিকার দায়িত্বের মধ্যে দিয়ে কল্পনা দত্তের বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।

সম্মেলনের পর প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত কলকাতায় চলে যান। ওই সময় কলকাতায় বিপ্লবীদের এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হত বোমার খোল। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সে বোমার খোল সংগ্রহ করেন প্রীতিলতা। ওই বছরের শেষের দিকে পূজার ছুটিতে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, সরোজিনি পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনী রবিত চট্টগ্রাম আসেন। মাষ্টারদার নির্দেশে তাঁরা বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাষ্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৮ এপ্রিল যুববিদ্রোহ বা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনাকে 'ভারতের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে সাহসিকতাপূর্ণ কাজ' হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। যা ছিল দেড়শত বছরের ইতিহাসে ইংরেজদের জন্য খুবই অপমানজনক ঘটনা। এটা ছিল ইংরেজ বাহিনীর প্রথম পরাজয়। ১৮ থেকে ২১ এপ্রিল এই চারদিন চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন কার্যত অচল ছিল। পরাধীন জাতির ইতিহাসে বিপ্লবীদের এ বিজয় ছিল গৌরবগাঁথা।

জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার অস্ত্রাগার লুন্ঠনের দায়ে অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ ও লোকনাথ বলসহ আরও অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। মাষ্টারদা সূর্যসেন চলে যান আত্মগোপনে। মে মাসের প্রথম দিকে বিপ্লবে অংশ নিতে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন। অনেক কষ্টে তাঁরা মাস্টারদার সাথে দেখা করতে সক্ষম হন। তাঁরা উভয়েই মাস্টারদার কাছে সশস্ত্র বিপ্লবে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন। মাস্টারদা তাঁদেরকে বিপ্লবী দলের শপথ বাক্য পাঠ করান। তখন থেকে তাঁরা বিপ্লবী দলের অধিনায়ক সূর্যসেনের নির্দেশ মতো কাজ করে যান। এসময় প্রীতিলতা চট্টগ্রাম নন্দনকানন বালিকা মধ্য ইংরেজি স্কুলে (বর্তমানে অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) শিক্ষয়িত্রীর হিসেবে চাকুরী নেন। আর কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম কলেজে বি.এস.সি.তে ভর্তি হন। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে গোপনে গোপনে চলতে থাকে বিপ্লবী দলের কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল, জালালাবাদ সম্মুখ সমর, কালারপোল, ফেনী, ঢাকা, কুমিল্লা, চন্দননগর ও ধলঘাটের বীরোচিত সংগ্রামের অধ্যায়গুলো মুক্তিকামী বিদ্রোহীদের নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

ধলঘাটের সংঘর্ষে ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন নিহত হওয়ার পর সারা চট্টগ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। গ্রামে-গঞ্জে-শহরে মিলিটারী ও পুলিশের নির্যাতন শুরু হয় । তখন কল্পনা দত্ত পুরুষের পোশাক পরিধান করে তাঁদের আন্দরকিল্লার বাসা থেকে গোপন বিপ্লবী কেন্দ্র কাট্টলী যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু পথে আটকা পড়েন। পাহাড়তলী স্টেশনের পাশে ভেলুয়ার দীঘির কোনায় কিছু গুণ্ডা প্রকৃতির ছেলের সহায়তায় পুলিশের হাতে বিপ্লবী কল্পনা দত্ত ধরা পড়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক কারাজীবন শুরু হয়। ১৯৩১ সালের মে মাসে ছাড়া পাওয়ার পর কলকাতা থেকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য কৌশলে নিয়ে আসার দায়িত্ব পান । ডিনামাইট ফিউজ দিয়ে চট্টগ্রাম আদালত ভবন ও কারাগার উড়িয়ে দিয়ে বিচারাধীন বিপ্লবীদের মুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর ।

১৯৩১ সালের এপ্রিল মাসে এক বিশেষ আদালতে (ট্রাইব্যুনালে) আরম্ভ হয় রাজদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত ৩২ জন বন্দির বিচার (চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল)। মাস্টারদা বন্দিদের মুক্ত করার জন্য এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি মাইন ব্যবহার করে জেলের প্রাচীর উড়িয়ে দিয়ে বন্দিদের মুক্ত করা এবং একই সাথে আদালত ভবন ধ্বংস করার উদ্যোগ নেন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কল্পনা দত্ত। হামলার দিন ধার্য করা হয় ৩ জুন, ১৯৩১ সাল। সব প্রস্তুতিও গোপনে সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে সর্বশেষ মাইনটি বসানোর সময় পুলিশের নজরে পড়ে যাওয়ায় গোটা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।

এ ঘটনায় পুলিশ কল্পনা দত্তকে সন্দেহভাজন রূপে তাঁর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁকে শুধু চট্টগ্রাম কলেজে গিয়ে বি.এস.সি. পড়বার অনুমতি দেওয়া হয়। পুলিশের এই কড়া নজরদারির মধ্যেও কল্পনা দত্ত প্রায়ই গভীর রাতে সূর্য সেন, নির্মল সেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করতে তাঁদের গোপন আস্তানায় যেতেন এবং সেখানে বিপ্লবী কাজের প্রশিক্ষণ নিতেন। এখানে তিনি এবং তাঁর সতীর্থ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নিয়মিত রিভলভার চালানোও শিখতেন। একদিন দুজনকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেবার সিদ্ধান্ত নেন মাস্টারদা। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে যৌথ নেতৃত্ব দেবার কথা ছিল তাঁদের দুজনের। কিন্তু তার পূর্বেই পুরুষের ছদ্মবেশে সহকর্মী নির্মল সেনের সঙ্গে মাস্টারদার কাছে দেখা করতে যাবার সময় পুলিশ কল্পনা দত্তকে গ্রেফতার করে । দুই মাস জেলে থাকার পর প্রমাণাভাবে তিনি জামিনে মুক্ত হন। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ১০৯ ধারায় অর্থাৎ 'ভবঘুরে' বলে মামলা দায়ের করেছিল। পুলিশের সন্দেহ দৃষ্টি এড়াতে তাঁকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন মাস্টারদা। এরপর কল্পনা দত্ত মাস্টারদার নির্দেশে আত্মগোপন করেন এবং তাঁরই সঙ্গে গৈরালাতে ক্ষীরোদপ্রভাব বিশ্বাসের বাড়িতে আশ্রয় নেন। গোপন অবস্থাতেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

১৯৩২ সালে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের জন্য দুইবার ব্যর্থ বিপ্লবী শৈলশ্বর চক্রবর্তীর আত্মহত্যার পর মাস্টারদা বিপ্লবী প্রীতিলতাকে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের ভার অর্পণ করেন। এই কারণে সূর্যসেন কাট্টলীর গোপন ক্যাম্পে আসেন। প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত দেখা করতে দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে আলাপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। প্রীতিলতা নিরাপদে গোপন কেন্দ্রে পৌঁছে গেলেও পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত ১৯৩২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ধরা পড়েন। মাস্টারদা সূর্যসেন খবর পেয়ে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতাকে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করার অনুমতি দেন । জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর চট্টগ্রাম কলেজের পশ্চিমে দেব পাহাড়ে আবার আত্মগোপন করেন কল্পনা দত্ত। তিনি তখন বি.এস.সি.-র ছাত্রী। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী সমুদ্রতীরবর্তী গৈরালা গ্রামে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু তিন মাস পর ১৯ মে গৈরালা গ্রামে এক সশস্ত্র সংঘর্ষের পর কল্পনা দত্ত এবং তাঁর সতীর্থ কয়েকজন বিপ্লবী ধরা পড়েন।

ওই বছর ১৪ আগস্ট একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসি দেয় এবং অন্যদেরকে আন্দামান সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল মামলার ('চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সেকেন্ড সাপ্লিমেন্টারি কেস') দ্বিতীয় বিচার পর্বে কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। জেলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি পড়াশোনা করতেন। প্রায় ৬ বছর কারাভোগের পর এই বিপ্লবী নেত্রী ১৯৩৯ সালে কারামুক্ত হন। ইতিমধ্যে তাঁর মামলা চালাতে গিয়ে বাবা সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েন। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের উত্তরে যে বড় দোতলা বাড়ি (রায় বাহাদুর ডা. দুর্গাদাস দত্তের বাড়ি) ছিল তাও হারাতে হয়েছে তাঁকে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে গিয়ে দেখেন প্রাক্তন বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টি যে পথে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে, সেই পথই ঠিক মনে হওয়ায় কল্পনা দত্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামে থেকে তিনি কাজ করেছেন। সেই সময় পিপলস ওয়ার পত্রিকায় তাঁর বহু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে । ১৯৪০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশ তাঁকে স্বগৃহে অন্তরীণ রাখে। এরপর তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন।

১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। ওই বছর মুম্বাইতে এক সম্মেলনে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানেই পি.সি. যোশীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৪৪ সালে যোশীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পিসি যোশী তদানীন্তন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ছিলেন। এরপর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে যান এবং দলের মহিলা ও কৃষক সংগঠনকে গড়ে তোলেন। সেই পশ্চাৎপদ যুগের হয়েও কল্পনা দত্ত অনুভব করেছিলেন, নারীরা সমাজেরই অর্ধ-অঙ্গ। নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই কাটবে অমানিশা, আসবে মুক্তি। ১৯৪৬ সালে আইনসভার নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে প্রার্থী হিসেবে ছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। আর কংগ্রেস থেকে দাঁড়িয়েছিলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনের স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তা।

দেশ ভাগ হওয়ার পরও অনেকদিন তিনি চট্টগ্রামেই থেকে যান। ১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে চাকরি নেন এবং পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি নানাবিধ কাজের সাথে যুক্ত হন। তিনি এসময় বেশ কয়েকটি ভাষা শিখেছিলেন। এর মধ্যে রুশ ভাষাও শেখেন। ভাষাবিদ হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। রুশ ভাষায় শিক্ষকতা করেন এবং নতুন দিল্লির রুশ ভাষা কেন্দ্রের চেয়ারপার্সন নিযুক্ত হয়েছিলেন। কল্পনা দত্তের লেখা বইয়ের নাম 'চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান'।

ভারতের নারী আন্দোলনে তিনি ভূমিকা রাখেন। কল্পনা দত্ত নারী সমিতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের মৈত্রী সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। তিনি 'অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ'-এর সাধারণ সম্পাদিকাও ছিলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কল্পনা দত্ত নানাভাবে সহযোগিতা করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ ও খাবার সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে অন্যান্য বিপ্লবী কমরেডদের সাথে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে আসেন। সেখানে 'মিউনিসিপ্যাল স্কুল' প্রাঙ্গণে বিপ্লবী দলকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই বীরকন্যা মৃত্যুবরণ করেন।

বৌদ্ধ দর্শন (The Buddist Philosophy)

 গৌতম বুদ্ধ


                                                                     






বৌদ্ধ দর্শন (The Buddist Philosophy) 

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে সিদ্ধার্থ বা গৌতম বুদ্ধ একজন বিশিষ্ট শিক্ষাগুরু ও ধর্ম সংস্কারক রুপে পরিচিত।তিনি বাস্তববাদীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই জীবন ও জগৎকে বিশ্লেষণ করেছিলেন।
ব্যাধি,শোক,জরা,মৃত্যু প্রভৃতির দ্বারা মানুষকে নিত্য নিপীড়িত হতে দেখে সিদ্ধার্থের মনে এসবের কারণ অন্বেষণের ইচ্ছা জাগে।এক শান্ত,সৌম্যদর্শন নির্ভিক সন্নাসীর দর্শন পেয়ে দুঃখের হাত থেকে পরিত্রাণ লাভ করার জন্য তিনি ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে সংসার পরিত্যাগ করেন।সমাধিমগ্ন অবস্থায় সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর মধ্যে 'বৌধি' বা 'প্রজ্ঞা'-র উন্মেষ হয়।সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধ বা সম্যক জ্ঞানী।সত্যের সন্ধান লাভ করেও তিনি তৃপ্ত হতে পারলেন না।কেবলমাত্র নিজের মুক্তির জন্য নয়,বিশ্বের সমস্ত লোককে দুঃখকষ্ট থেকে চিরমুক্ত করার জন্য তিনি তাঁর ধর্মবাণী প্রচার করেন।গৌতম বুদ্ধের এই প্রচারিত এই বাণীই বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের ভিত্তি।
ত্রিপিটক-বিনয়পিটক,সুত্তপিটক ও অভিধম্মপিটক 
বুদ্ধদেবের তিরোধনের পরে তাঁর উপদেশাবলি সংরক্ষণের জন্য তাঁর শিষ্যরা সেগুলিকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন।এই সংরক্ষিত উপদেশাবলিকে পিটক বলা হয়।পালি ভাষায় লিখিত এই পিটকের সংখ্যা তিন হওয়ায় এগুলিকে একত্রে 'ত্রিপিটক' বলা হয়।এগুলি হলো (১) বিনয়পিটক, (২) সুত্তপিটক, এবং (৩) অভিধম্মপিটক ।বিনয়পিটকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের আচরণ সম্পর্কে নিয়মসমূহ আলোচনা করা হয়েছে।সুত্তপিটকে বৌদ্ধ ধর্মের উদ্দেশ্য,সাধনা ও ফল এবং অভিধম্মপিটকে বুদ্ধদেবের উপদেশের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে।
নবলব্ধ প্রজ্ঞার আলোকে দুঃখ ও দুঃখনিরোধের উপায় সম্পর্কে বুদ্ধদেবের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তাঁকে চারটি সত্যের সন্ধান দিয়েছিলো।এই চারটি সত্য 'চত্বারি আর্য সত্যানি' বা 'চারটি আর্য সত্য' নামে পরিচিত।এগুলি হলো- (১) দুঃখ আছে, (২) দুঃখের কারণ আছে, (৩)দুঃখের নিরোধ আছে এবং (৪) দুঃখ নিরোধের পথ আছে।
প্রথম আর্য সত্যঃ দুঃখ আছে- 
এ সংসার দুঃখময়।দুঃখ হলো সর্বব্যাপক।জন্ম দুঃখ,জরা দুঃখ,রোগ দুঃখ,মরণ দুঃখ।উদ্বেগ,আকাঙ্ক্ষা,শোক,ক্লেশ,প্রিয়-বিয়োগ,অপ্রিয়সংযোগ বা যা কিছু আসক্তিপ্রসুত সবই দুঃখময়।এই সংসারে জীব ব্যাধি,জরা ও মৃত্যুর অধীন।সংসারের সমস্ত বস্তুই ক্ষণস্থায়ী।সংসার কেবল দুঃখময়- কোথাও সুখ বা আনন্দ কিছুই নেই।সুখ থাকলেও প্রতিটি সুখের মধ্যেই দুঃখের বীজ প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে।এই বিশ্বের সমস্তই অনিত্য এবং সেকারণেই দুঃখময়।
দ্বিতীয় আর্য সত্যঃ দুঃখের কারণ আছে-
সংসারে যেমন দুঃখ আছে,তেমনই দুঃখের কারণও রয়েছে।বুদ্ধের "প্রতীত্যসমুৎপাদ" বা কার্যকারণের সম্পর্কের ভিত্তির উপর দ্বিতীয় আর্য সত্যটি প্রতিষ্ঠিত । প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব অনুসারে এ জগতে কোনো ঘটনাই কারণ ব্যতীত ঘটতে পারেনা।অর্থাৎ দুঃখও অকারণে ঘটতে পারেনা।দুঃখেরও কারণ আছে।জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম,জাতির কারণ ভব বা পুনর্জন্ম গ্রহণের আকুলতা।ভবের কারণ উপাদান বা জাগতিক বিষয়ের প্রতি আসক্তি। উপাদানের কারণ হলো ভোগস্পৃহা বা তৃষ্ণা।তৃষ্ণার কারণ বেদনা।বেদনার কারণ স্পর্শ।স্পর্শের কারণ ষড়ায়তন বা ছয় ইন্দ্রিয় এবং ষড়ায়তনের কারণ নামরুপ বা দেহ-মন সংগঠন।নামরুপের কারণ চেতনা বা বিজ্ঞান।বিজ্ঞানের কারণ সংস্কার বা অতীত জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ।সংস্কারের কারণ হলো অবিদ্যা অর্থাৎ চারটি আর্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব।অবিদ্যার জন্যই মানুষ মিথ্যাকে সত্য ও অনিত্যকে নিত্য জ্ঞান করে।
তৃতীয় আর্য সত্যঃ দুঃখের নিরোধ আছে-
এই সত্যটি প্রথম সত্য থেকে প্রসূত একটি যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্ত বিশেষ।দুঃখের উদ্ভবের কারণগুলিকে ধ্বংসের মাধ্যমেই দুঃখের নিরোধ সম্ভব।কামনার সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন ও ইচ্ছার জাগরণ রোধের মাধ্যমেই দুঃখের অবসান ঘটানো সম্ভব।দুঃখ থেকে চিরমুক্তিই নির্বাণ।নির্বাণ নিস্ক্রিয় অবস্থা নয়।নির্বাণ লাভের পর অনাসক্তভাবে কর্ম করলে বন্ধনের সম্ভাবনা থাকেনা।
চতুর্থ আর্য সত্যঃ দুঃখ নিরোধের মার্গ বা পথ আছে-  
দুঃখ থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য বৌদ্ধ দর্শনে 'আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে'র কথা বলা হয়েছে।এই পথের আটটি পথ বা মার্গ হলো- (১) সম্যক দৃষ্টি (right views), হলো চারটি আর্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। (২) সম্যক সংকল্প (right determination), বলতে বোঝায় পার্থিব বিষয়বস্তুর প্রতি অনীহা,হিংসা,দ্বেষ,রাগ পরিত্যাগের ইচ্ছা ও কামনা-বাসনা জয়ের সংকল্প। (৩)  সম্যক বাক্যের  ( right speech), অর্থ হলো সত্য কথা বলা ও সংযত এবং শিষ্ট আলোচনা করা। (৪) সম্যক কর্ম বা সম্যক আচরণ(right conduct) হলো প্রাণী হত্যা,চৌর্য এবং ইন্দ্রিয় সেবা থেকে বিরত হওয়া । (৫) সম্যক জীবিকা(right livelihood) অর্থ হলো সদুপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা। (৬) সম্যক ব্যয়াম(right effort) বলতে বোঝায় কুচিন্তার বিনাশ ও সৎচিন্তার সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া ।(৭) সম্যক স্মৃতি(right mindfulness) হলো দেহ ও মনের অনিত্যতা সর্বদা স্মরণে রাখা এবং (৮) সম্যক সমাধি(right concentration) হলো অষ্টাঙ্গের শেষ মার্গ।যে ব্যক্তি পূর্বোক্ত সাতটি কর্মবিধি অনুসরণ করে সকল প্রকার অসদচিন্তা ও ভাবনা থেকে মনকে মুক্ত করে নিজের আচরণকে সংযত করে ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করতে পেরেছে,তিনিই সমাধির মাধ্যমে নির্বাণলাভে সক্ষম হন।
বুদ্ধদেব তত্ত্ববিদ্যার জটিল সমস্যার আলোচনায় বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ না করলেও তাঁর দার্শনিক তত্ত্ব (১) প্রতীতসমুৎপাদ নীতি,(২) কর্মবাদ,(৩) অনিত্যবাদ ও (৪) নৈরাত্মবাদ- এই তত্ত্বগুলির উপর প্রতিষ্ঠিত।
(১)প্রতীত্যসমুৎপাদঃ নীতির অর্থ হলো যা কিছু আছে তা কারণ-পরম্পরা থেকে উদ্ভূত এবং যা ঘটে তা কোন পূর্ববর্তী কারণের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ,জগতের কোনো পরিণতি কারণ (final cause) নেই।এই নীতি অনুসারে এমন কোন শাশ্বত সত্তা নেই যা কারণ-নির্ভর না হয়ে অনন্তকাল ধরে বিরাজ করতে পারে।
(২) কর্মবাদঃ হলো প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্বের এক বিশেষ রুপ।এই সূত্র অনুসারে প্রতিটি মানুষকেই তার কৃতকর্মের ফল অবশ্যই ভোগ করতে হবে।যে যেমন কর্ম করবে তাকে তেমনই ফল ভোগ করতে হবে।কর্মের এই সূত্রটি অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম থেকে বহু প্রাচীন।কর্ম দুই প্রকারের,সকাম ও নিষ্কাম।নিষ্কাম কর্মের কোন কর্মফল ভোগ নেই ।
(৩) অনিত্যবাদঃ (ক্ষণিকত্ববাদ) অর্থ হলো সব কিছুই অনিত্য।কোন কিছুই চিরস্থায়ী বা শাশ্বত নয়।এই অনিত্যবাদ প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি  থেকে উদ্ভূত।পরবর্তী বৌদ্ধ দার্শনিকেরা (অর্থাৎ সৌত্রান্তিক ও বৈভাষিকেরা ) বুদ্ধদেবের অনিত্যবাদকেই ক্ষণিকত্ববাদে রুপান্তরিত করেন।এই মত অনুসারে প্রতিটি বস্তুই একটি মাত্র ক্ষণের জন্য স্থায়ী হয়।
(৪) নৈরাত্মবাদঃবুদ্ধদেব কোন শাশ্বত বা চিরন্তন আত্মার স্বীকার করেননা।সমস্ত কিছু অনিত্য হওয়ায় চিরন্তন আত্মার কোন অস্তিত্ব নেই। আত্মা হলো মানসিক প্রক্রিয়ার অবিরাম ধারা বা প্রবাহ।বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে জন্মান্তরের অর্থ হলো বর্তমান জীবন থেকে পরবর্তী জীবনের উদ্ভব।জীব হলো মানসিক প্রক্রিয়ার প্রবাহ এবং এই মানসিক প্রক্রিয়াই এক জন্ম থেকে অন্য জন্মে প্রবাহিত হয়।

বৌদ্ধধর্মে   ঈশ্বরের কোন স্থান নেই।পরিণতির কারণ রুপে (final cause) কোনো জগৎ কর্তার অস্তিত্ব নেই।কারণ পরিণতি কারণ বলে কিছুই নেই।কর্মবাদ ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় প্রতিপন্ন করেছে।বৌদ্ধদের মতে কর্ম থেকে বড় কিছুই হতে পারেনা।
বুদ্ধদেব জীবিত থাকাকালীন তাঁর শিষ্যরা দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা থেকে বিরত থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পরে বৌদ্ধদর্শন চারটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে।সেই চারটি সম্প্রদায় হলো-
(১) মাধ্যমিক বা শূন্যবাদ দর্শনঃ এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হলেন নাগার্জুন ।এই মতবাদ অনুসারে বাহ্যবস্তু বা মানসিক প্রক্রিয়া সবই শূন্য।চেতনা বা অচেতন কোনো কিছুরই বাস্তব সত্ত্বা নেই।এই মতবাদ তাই শূন্যবাদ(Nihilism)  নামে পরিচিত।
(২)যোগাচার দর্শনঃ এই সম্প্রদায়ের সমর্থক হলেন অসঙ্গ বসুবন্ধু মৈত্রেয়নাথ,দিঙনাগ প্রভৃতি দার্শনিকেরা।এই মত অনুসারে জড় বস্তুর সত্ত্বা নেই,কিন্তু চেতনার সত্ত্বা আছে।চেতনাই একমাত্র সত্য যার অস্তিত্ব কখনোই অস্বীকার করা যায়না।অচেতন বিশ্বব্রক্ষ্মান্ড অসত্য।এই কারণেই এই সম্প্রদায়কে বিজ্ঞানবাদ বলা হয়।
(৩) সৌত্রান্তিক দর্শনঃ তক্ষশিলার কুমারলব্ধকেই এই দার্শনিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়।সৌত্রান্তিকরা সর্বাস্তিবাদী।এই সম্প্রদায় জড়বস্তু ও মন উভয়েরই পৃথক সত্ত্বা স্বীকার করেন।বস্তুর প্রত্যক্ষ বা সাক্ষাৎ জ্ঞান সম্ভব নয়।বস্তু আমাদের মনেযে ধারণার সৃষ্টি করে আমরা কেবলমাত্র সেই ধারণাগুলি সম্পর্কেই জ্ঞান অর্জন করে থাকি'এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই অনুমানের মাধ্যমে আমরা বস্তুর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত হই।অর্থাৎ,বহির্জগতের বস্তুগুলির জ্ঞান প্রত্যক্ষ নয়,অনুমানের উপর ভিত্তি করেই অর্জন করা সম্ভব।বস্তুর অস্তিত্ব অনুমানলব্দ হলেও বস্তুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায়না।এই মতবাদ বাহ্যানুমেয়বাদ নামেও পরিচিত।
(৪)বৈভাষিক দর্শনঃ বৌদ্ধগ্রন্থ অভিধম্মের উপর বিভাষা নামে একটি ভাষ্য রচিত হয়েছিলো।এই বিভাষা অনুসরণ করে বৈভাষিকরা এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তাঁরা জড়জগৎ ও মনোজগৎ উভয়েরই স্বতন্ত্র সত্বা স্বীকার করেন।তাঁদের মতে বস্তুর অস্তিত্ব অনুমানের সাহায্যে জানা যায়না।আমরা বস্তুকে সাক্ষাৎভাবে প্রত্যক্ষ করে থাকি।অর্থাৎ,বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ কেবলমাত্র সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষণের মাধ্যমেই সম্ভবপর।চেতনা-বহির্ভূত বস্তুর নিজস্ব সত্ত্বা আছে এবং সোজাসুজি তাকে প্রত্যক্ষ করা যায়।বৈভাষিকদের তাই বাহ্যপ্রত্যক্ষবাদী বলা হয়ে থাকে।
হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়
বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রাচীনপন্থী ও নবীনপন্থী - এই দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়।প্রাচীনপন্থীরা বুদ্ধদেবের নীতি ও আদর্শকে সামান্যতম পরিবর্তিত করতে রাজী নন।এদের হীনযান সম্প্রদায় বলা হয়। নবীনপন্থীরা ছিলেন বুদ্ধদেবের নীতি ও আদর্শের পরিবর্তনের পক্ষপাতী।এদের মহাযান সম্প্রদায় বলা হয় ।হীনযান বৌদ্ধরা বুদ্ধের ধর্মোপদেশ,নীতি ও আদর্শকে যথাযত অনুসরণের পক্ষপাতী।তাঁদের মতে নির্বাণের উদ্দেশ্য হলো আত্মমুক্তি যা প্রতিটি বস্তুর লক্ষ্য।এই নির্বাণের জন্য অপরের মুখাপেক্ষী হওয়া উচিত নয়। অপরদিকে মহাযান সম্প্রদায়ের মতে আত্মমুক্তির আদর্শটি স্বার্থদুষ্ট।নির্বাণের প্রকৃত লক্ষ্য আত্মমুক্তি নয়,পরম জ্ঞান লাভ করা।এই লব্ধ পরম জ্ঞান ও ভালোবাসার সাহায্য বিশ্বের দুঃখ-দুর্দশাক্লিষ্ট মানুষের দুঃখ দূর করে তাদের মোক্ষলাভে সহায়তা করাই হলো নির্বাণের উদ্দেশ্য।
বৌদ্ধ নীতিতত্ত্ব(The Bauddha Ethics)
বুদ্ধদেব দার্শনিক বা তত্ত্বজ্ঞ ছিলেন না।তিনি ছিলেন নীতিতত্ত্বের প্রচারক।তিনি দুঃখ ও দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কে চারটি সত্যের সন্ধান দিয়েছেন।এই চারটি সত্য 'চত্বারি আর্য সত্যানি' বা চারটি আর্য সত্য নামে পরিচিত।এই চারটি সত্য হলঃ (১) দুঃখ বা এ জীবন দুঃখময়, (২) দুঃখের উদ্ভবের কারণ আছে, (৩) দুঃখনিরোধ বা দুঃখের নিবৃত্তি আছে এবং (৪) দুঃখনিরোধ্মার্গ বা দুঃখনিরোধের যথাযথ উপায় আছে।দুঃখনিরোধের পথ অনুসরণ করে দুঃখ থেকে চিরমুক্তি লাভ সম্ভব হয়।এই পথই বৌদ্ধ দর্শনে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ( Eight fold Noble Path) নামে পরিচিত।এই অষ্টাঙ্গিক মার্গই মধ্যপথ,যেহেতু এই পথ অসংযত ভোগবিলাস ও শারীরিক কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যবর্তী পন্থা।বস্তুত এই অষ্টাঙ্গিক মার্গের মধ্যেই বৌদ্ধ নীতিতত্ত্ব নিহিত রয়েছে।এই আটটি মার্গ হলোঃ (১) সম্যক দৃষ্টি (right views),(২) সম্যক সংকল্প (right determination), (৩)সম্যক বাক্য  ( right speech),(৪) সম্যক কর্ম বা সম্যক আচরণ(right conduct) , (৫) সম্যক জীবিকা(right livelihood,(৬) সম্যক ব্যয়াম(right effort,(৭) সম্যক স্মৃতি(right mindfulness),(৮) সম্যক সমাধি(right concentration) ।
বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষা ও নীতিতত্ত্ব কতকগুলি দার্শনিক তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত।তত্ত্বগুলি হলো (১)প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি,(২) কর্মবাদ,(৩) অনিত্যবাদ,(৪) নৈরাত্মবাদ।(১)প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি অনুসারে এমন কোন শাশ্বত সত্তা নেই যা কারণ-নির্ভর না হয়ে অনন্তকাল ধরে বিরাজ করে।জগতের কোনো পরিণতি কারণ (final cause) নেই।(২)কর্মবাদ অনুসারে প্রতিটি মানুষকেই তার কৃতকর্মের ফল অবশ্যই ভোগ করতে হবে।যে যেমন কর্ম করবে তাকে তেমনই ফল ভোগ করতে হবে।(৩)অনিত্যবাদ অনুযায়ী সব কিছুই অনিত্য।কোন কিছুই চিরস্থায়ী বা শাশ্বত নয়। (৪)নৈরাত্মবাদ নীতি অনুযায়ী যেহেতু সমস্ত কিছু অনিত্য ও ক্ষণিক সেহেতু চিরন্তন আত্মার কোন অস্তিত্ব নেই। আত্মা হলো মানসিক প্রক্রিয়ার অবিরাম ধারা বা প্রবাহ।
বৌদ্ধদর্শন সমস্ত কামনা-বাসনাকে দমনের পক্ষপাতী বলে এই দর্শনকে কঠোর সাধনার দর্শন রুপে অবহিত করা হয়।কামনাই মানুষকে এই সংসারে জন্মগ্রহণ করতে বাধ্য করে।তৃষ্ণার বিলোপসাধন কেবলমাত্র কামনার ধবংসের মাধ্যমেই ঘটতে পারে। আর শুধুমাত্র বলিষ্ঠ ইচ্ছাশক্তির দ্বারাই কামনা দমন সম্ভবপর।কামনার দমন যদি কঠোর সাধনা হয়,তবে বৌদ্ধ দর্শনের নীতি হলো কঠোর সাধনা।
বৌদ্ধ জ্ঞানতত্ত্ব(The Bauddha Epistemology)
বৌদ্ধ দর্শনে প্রত্যক্ষ() ও অনুমান () উভয়কেই যথার্থ জ্ঞানের উৎস্রুপে স্বীকার করা হয়েছে।প্রত্যক্ষ্যের মাধ্যমে বস্তু সম্পর্কে তাৎক্ষণিক জ্ঞান অর্জিত হয়।প্রত্যক্ষ হলো বস্তুর স্বলক্ষণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক জ্ঞান।এই জ্ঞান জ্ঞাতাকে বস্তুটির প্রকৃত প্রাপ্তিতে সাহায্য করে।
কোনো বস্তুর জ্ঞান থেকে অপর কোনো বস্তুর জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি হলো অনুমান।অনুমান যথার্থ হয় তখনই যখন অনুমানের মাধ্যমে প্রকৃত বস্তুটির প্রকৃত প্রাপ্তি সম্ভব হয়।কোনো একটি বিষয়কে প্রত্যক্ষ করে সেই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে অপর একটি অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রক্রিয়াকে অনুমান বলে ।'অনু' শব্দের অর্থ পশ্চাৎ,আর 'মান' শব্দের অর্থ জ্ঞান।সুতরাং অনুমান হলো সেই জ্ঞান যা অন্য জ্ঞানকে অনুসরণ করে।যখন দুটি বস্তুর মধ্যে অপরিবর্তনীয় সহাবস্থানের সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি বস্তুর উপস্থিতি থেকে অপর বস্তুটির জ্ঞান অর্জন করা যায় তখন তাকে অনুমান বলা যায়।যেমন ধোঁয়া থাকলেই আগুন থাকে এই সম্পর্কের ভিত্তিকে ধোঁয়ার উপস্থিতি থেকে আগুনের উপস্থিতি অনুমান করা যায়।