বিভিন্ন ভাষা-ভাষী জুম্ম জাতির আবাস ভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস শাসন শোষণ ও নির্যাতনের ইতিহাস। বৃটিশ শাসনামলে ও পাকিস্তানী শাসনামলে এই দেশে ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্মদের কোন ভাবেই ছিলোনা শাসন ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের অধিকার, ছিলোনা সত্যিকার অর্থে কোন গণতান্ত্রিক অধিকার। যখনই জুম্ম জাতির উপর কোন না কোন ভাবে নেমে আসতো প্রচুর শোষণ ও নির্যাতন, তখনই তারা নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তো। গণতান্ত্রিক অধিকারের অনুপস্থিতির কারণে ঘরবাড়ী ছেড়ে পালানোই ছিল তাদের একমাত্র পথ।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ সমাপ্তের পর লক্ষাধিক জুম্ম হারালো তাদের জমি ও বাস্তুভিটা। কোন প্রতিবাদ ছাড়াই হারালো দেশ, পাড়ি জমালো ভারত ও বার্মায়। তাদের আর নিজের দেশে, ঘরে ফেরা হলো না। ৫০ দশকের শেষ ও ৬০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে জুম্মদের শিক্ষিত যুবশক্তির একটি ক্ষুদ্র অংশ বুঝতে পারলো, পৃথিবী নামক গ্রহে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত সূচাগ্র জায়গাও আর তাদের জন্য অবশিষ্ট নেই। অপর দিকে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিকে ফাঁকি দিয়ে পার্বত্য জনতার অজ্ঞাতগোচরে উক্ত শাসন বিধিতে চলেছে দফায় দফায় কাটা ছেঁড়া।
শাসকগোষ্ঠীর আশীর্বাদে পার্বত্য চট্টগ্রামে হু হু করে বেড়ে চলেছে অ-উপজাতীয় অনুপ্রবেশ। পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময় এবং তার আগে ও পরে তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে এবং বাংলাদেশের সূচনালগ্নে বাম, মধ্য ও দক্ষিণ- প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তিত্ব ও নেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিলো। কোন রাজনৈতিক নেতাই তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। অনেকে সমস্যার কথা ধৈর্য্য সহকারে শুনতে পর্যন্ত রাজী ছিলেন না, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি, বরং অত্যাচার নিপীড়ন বেড়েছে বহু গুণে এবং অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত শাসনতন্ত্রের ছত্রছায়ায়। চিন্তায়, চেতনায় গুণে, গরিমায়, ত্যাগ, তিতিক্ষায় সবচেয়ে অগ্রগামী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও জ্যোতিরিন্দ্র বোধি প্রিয় লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে গড়ে উঠলো অধিকার আদায়ের আন্দোলন। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ যখন হলো একেবারে রূদ্ধ, তখন সে আন্দোলন সশস্ত্র আন্দোলনে রূপান্তরিত হলো, শাসক গোষ্ঠী হয়ে উঠল ব্যতিব্যস্ত, হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য, চালাতে শুরু করলো অত্যাচার ও নিপীড়নের স্টিম রোলার। শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘ দিনের নগ্নরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়লো, শুরু হলো শক্তি প্রয়োগ করে জুম্মদের উচ্ছেদ কার্যক্রম, সেই সাথে সরকারের উদ্যোগে হাজার হাজার অ উপজাতীয় পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা শুরু হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের কথা বিশ্বের মানবতাবাদী, গণতন্ত্রমনা ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব বুঝতে পারলো। বুঝতে পারলো শাসকগোষ্ঠীর আসল রূপ। অনেক পরে আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও ন্যায় পরায়ণ ব্যক্তিত্ব কিছুটা বুঝতে পারলো প্রতিটি বস্তুর থাকে দুটি দিক এবং তা পরস্পর বিরোধী ভালোর সাথে মন্দের, হাসির সাথে কান্নার, পতনের সাথে উত্থানের, জন্মের সাথে মৃত্যুর, প্রগতির সাথে প্রতিক্রিয়ার, জয়ের সাথে পরাজয়ের ইত্যাদি। স্বাভাবিক ভাবেই আন্দোলনেরও দুটি দিক রয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর চুক্তি করে কিছু অধিকার আদায় হয়েছে।
অপরদিকে অধিকাংশ আদিবাসী জুম্ম হয়েছেন বাস্তুচ্যুত। তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে হয়েছে চুরমার। ৬০ হাজারেরও অধিক মানুষ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পাড়ি জমালো ভারতে। দুর্বিষহ শরণার্থী জীবন কাটালো প্রায় এক যুগ ধরে। আর যারা স্বদেশের মধ্যে রয়েছে অথচ বাস্তুচ্যুত হয়নি এমন সংখ্যা শতকরা ১০ জনেরও কম হবে নিঃসন্দেহে। সাধারণভাবে অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা বাস্তবে সত্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের বাস্তুহারা জীবন শুরু হয় মূলত ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পর থেকে। সেসময় লাখেরও অধিক জুম্ম উদ্বাস্তু হয়, তাদের যথাযথ পুনর্বাসন করা হয়নি। তারা স্থিতিশীল অবস্থায় আসতে না আসতে শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম। মুক্তি সংগ্রামের সময় শত শত পরিবার উদ্বাস্তু হয়, বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলের অধিকাংশ জুম্ম বাস্তুচ্যুত হয়। কোন সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের পুনর্বাসন দেয়নি। বিগত দুই যুগ ধরে বিরাজ করছিলো অস্থিতিশীল, অশান্ত পরিস্থিতি। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের অর্থনেতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে হয় চূর্ণ-বিচূর্ণ।
সাধারণত মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি জীবন তার অর্থনৈতিক জীবনধারাকে অনুসরণ করে থাকে। মানুষের অর্থনৈতিক জীবনধারায় স্থিতিশীলতা বিরাজ না করলে স্বাভাবিকভাবেই তার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি জীবনধারাও স্থিতিশীল হয় না। তাই আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি মূল্যবোধে খুবই অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। এ সমস্ত বিষয় স্মরণে রেখে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন করাকে গুরুত্ব দিয়ে চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করার নিমিত্তে বাংলাদেশ সরকার ৮ এপ্রিল ১৯৯৭ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত কার্যাবলী সম্পাদনের লক্ষ্যে তথা সরকার ও শরণার্থী নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নের নিমিত্তে গঠিত টাস্কফোর্স ২০ জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুনর্গঠিত হয়। এই পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের বৈঠক আজকের দিন পর্যন্ত এক বছরের অধিক সময়ে সর্বমোট ৭টি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ৭টি বৈঠকের মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ঘন্টাখানেকের মতো। সেখানেও শুধু সাধারণ কতগুলি নিয়ম কানুন আছে, নিয়মকানুনগুলো হলো এক বৈঠকের কার্যবিবরণী তার পরবর্তী বৈঠকে পড়ে শোনানোর পরে সেটা সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। শরণার্থী কল্যাণ সমিতির নেতা উপেন্দ্রলাল চাকমার সাথে আমাদের টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান দীপঙ্কর বাবুর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পরে বৈঠক সমাপ্ত হয়।
প্রথম বৈঠক শুরু হয় ২১ মার্চ, দ্বিতীয় বৈঠক শুরু হয় ৬ জুন- প্রথম বৈঠকের অনেক দিন পরে। দ্বিতীয় বৈঠকে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনার পরে হলো অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে খুব অল্প সময়ের জন্য আলোচনা। যদিও উনারা-টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব উন্মুক্ত আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন, সে সময় আমি জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি হিসাবে একটা প্রস্তাব পেশ করি, লিখিত ভাবে। আমার লিখিত প্রস্তাবটা হলো এমন, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু কাহাকে বলে এটা প্রথমে সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত এবং সেটার জন্য কি কি ক্রাইটেরিয়া থাকা উচিত এবং সেটা কারা নির্ধারণ করবে এবং তাদেরকে কি করে, কি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হবে, ইত্যাদি।
আমার লিখিত প্রস্তাবটা হলো এই, (এক) অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা- পার্বত্য চট্টগ্রামের (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিজনিত কারণে যে সকল উপজাতি নিজ গ্রাম, মৌজা, অঞ্চল ত্যাগ করে স্বদেশের মধ্যে অন্যত্র চলে গেছেন বা চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে বিবেচিত হবেন। আর সেটা হচ্ছে স্বীয় গ্রাম হতে অন্য কোন গ্রামে বা গ্রাম স্থাপন করে বসতি স্থাপন করেছেন। স্বীয় মৌজা হতে অন্য কোন মৌজায় চলে গেছেন। যাদের সরকার কর্তৃক গুচ্ছ গ্রামে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বীয় গ্রাম হতে অন্যত্র যাওয়ার পর যারা স্বগ্রামে বা স্বগ্রামের নিকটস্থ স্থানে ফিরে এসেছেন, কিন্তু নিজেদের সঠিক স্থানে ফিরে যেতে পারেননি, অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় ভুগছেন। (দুই) অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা প্রণয়ন পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যানের নিকট তালিকা পেশ করা। যে কোন কারণে হেডম্যান বা চেয়ারম্যান অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর তালিকা তৈরি করতে অনিচ্ছুক বা অপরাগ হন, সেক্ষেত্রে জনসংহতি সমিতি কর্তৃক তালিকা প্রস্তুত করা এবং টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রদান করা। (তিন) পুনর্বাসন সাহায্য সম্পর্কে আমাদের প্রস্তাব ছিলো, বাস্তুভিটা ও জমিজমা প্রদান করা। এককালীন অর্থ সাহায্যে ১০ হাজার টাকা প্রদান করা। এক বছরের রেশনসহ তেল, ডাল, লবণ প্রদান করা। জমির মালিকদের হালের গুরু ক্রয় করার জন্য ১৫ হাজার টাকা প্রদান করা এবং ভূমিহীনদের গাভী ক্রয় করা বাবদ ৪ হাজার টাকা প্রদান করা। ভূমিহীনদের ভূমি প্রদান করা। পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা। চাকুরীতে পুনর্বহাল করা ও জ্যেষ্ঠতা প্রদান করা। হেডম্যান পুনর্বহাল করা। ঋণ ও খাজনা মওকুফ করা। মামলা প্রত্যাহার করা। এ প্রসঙ্গে এই সমস্ত জিনিসগুলি কেমন যেন লাগবে। আমি নিজেও মনে করি, আমি যদি ঐখানকার অধিবাসী না হয়ে এখানকার অধিবাসী হতাম তাহলে বোধহয় প্রশ্নগুলো শুনতে খারাপ লাগতো।
আজকে বস্তুভিটা সহ জমিজমা ফেরত দেয়ার প্রশ্নটি এখানে আসল কেনো? কারণ, এই পরিস্থিতিতে একদল নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে গেলো ভারতে। অপর দল শুধু নিজ গ্রাম ছেড়ে স্বদেশের মধ্যেই বনে-জঙ্গলে জীবন যাপন করছে, সেই জায়গা জমিগুলো এখন সরকার বাইরে থেকে যাদের নিয়ে এসে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেছে, ঐ জায়গাই ওদেরকে দেওয়া হয়েছে। এখন এদেরকে ফিরে আসতে হলে, পুনর্বাসন দিতে হলে তাদের জায়গা জমিগুলো প্রথমে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন। এইভাবে অনেক হেডম্যান প্রাণের দায়ে চলে গেছে, হেডম্যানের জায়গায় আর একজন নতুন এখান থেকে পুনর্বাসন করা হেডম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। আর অনেকে চাকরীর চেয়ে জীবন বেশী বড় মনে করে চলে গেছে। ঠিক এইভাবে আমরা দ্বিতীয় বৈঠকে বললাম, এই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো- শুধু উপজাতীয়দের নয়, অ-উপজাতীয়দেরও পুনর্বাসন করা প্রয়োজন। তখন আমি বলেছি, চুক্তি মোতাবেক এখানে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসনের প্রশ্নই উঠতে পারে না। কারণ এখানে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, চুক্তির যে স্পিরিটটা ছিলো, আজকে দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে একদল গেলো ভারতে, অপরদল নিজ জায়গা ছেড়ে বনে-জঙ্গলে যে যেখানে পারলো সেখানে।
কাজেই তাদের মাথায় রেখে জনসংহতি সমিতি এবং সরকারে মধ্যে চুক্তি হয়। এখানে যদি আবার অ-উপজাতীয় পুনর্বাসনের বিষয়টা আনা হয়, তাহলে পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটা আরো জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ঠিক এ অবস্থাটা বর্তমানে বিরাজ করছে। কারণ যখনই আলোচনা হচ্ছে যে এখানে অ-উপজাতীয় পুনর্বাসন করা হবে, সেখানে অ-উপজাতীয় ঢুকে পড়ছে প্রতিনিয়ত এবং এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ভিতর যারা নিজেদের জায়গায় ফিরে এসেছেন, তারাও এখন ফিরে যাচ্ছে ওখানে। এই যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে সরকার, এই অবস্থার দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টির জন্য বলেছে যে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন করতে হবে সেখানে। এটা আমরা জনসংহতি সমিতি মনে করি চুক্তির পরিপন্থী। যদি সেখানে চুক্তির বাস্তবায়ন করা না হয়, ওখানে যদি আবার অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন করা হয় তবে তার ফলে অ-উপজাতীয় অনুপ্রবেশকেই আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে, সেটা কারো কোন হিসাব নিকাশের মধ্যে নেই।
এভাবেই আজ অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় পুনর্বাসন সমস্যাটা এখানেই স্থগিত হয়ে আছে।
সরকারের পক্ষে থেকে বারে বারে ওনারা এটাকে পুনর্বাসনের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এমন ভাবে তারা এটা করছে, এইযে ডেফিনেশন হলো, ডেফিনেশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় পুনর্বাসন ফরম একটা নির্ধারণ হলো এবং সেটা টাস্কফোর্সের অনুমোদন হলো, অ-উপজাতীয়দের জন্যে কোন ফরম অনুমোদন হয়নি, আর টাস্কফোর্সেও আলোচিত হয়নি। এখানে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একটা ফরম ব্যবহার করে টাস্কফোর্সের ক্ষমতাকে উনারা অপব্যবহার করেছেন অথচ টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে, তারা বসে আলোচনা করে। প্রত্যেক জিনিসকে আলোচনার মধ্যে এনে সেটা করা হবে কিন্তু তা না করে ওনারা শুধু সরকারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা করেছে। এখানে ৭টা বৈঠক করে আজও তেমন কোন ফল আশা করা যাচ্ছে না। এই ডেলিগেশনের আরেকটা দিক এখানে উল্লেখ্য যে, এই ডেলিগেশনটা যখন আমরা করেছি তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে ১৯৯২ সালের ১০ আগষ্ট বিরতির শুরুর দিন পর্যন্ত আমাদের জনসংহতি সমিতির ডেফিনেশনের সঙ্গে এই ডেফিনেশন যোগ করে এটা করা হলো।
এই ডেফিনেশনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং থানা পর্যায়ে দুটো কমিটি করা হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হলো আহ্বায়ক, জনসংহতি সমিতির একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের মেম্বার আর থানা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট থানার টিএনও নিরাপত্তা বাহিনীর একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তা, থানা সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তা জন সংহতি সমিতির একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমিতির প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার হেডম্যান সমিতির প্রতিনিধি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, যখনই কমিটিগুলি গঠন করা হলো, কমিটির দায়িত্ব ছিলো এই ডেফিনেশন অনুসারে তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু চিহ্নিত করবে এবং নির্ধারণ করবে, সেটা এই ফরমগুলো পূরণ করে তা টাস্কফোর্সের এখানে উপস্থাপন করা। কিন্তু তারা এটা না করে হেডম্যানদেরকে এবং চেয়ারম্যানদেরকে নানাভাবে প্রভাবিত করে অ-উপজাতীয় ফরমেও সই করার জন্য বাধ্য করেছে। নানাভাবে তারা ভয় প্রদর্শন করেছে যে অ-উপজাতীয়দের ফরমে যদি সই করা না হয়, তখন হেডম্যানের হেডম্যানশীপ চলে যাবে, চেয়ারম্যানদের বন্দি করে বিভিন্ন ভয় ভীতি দেখানো হয়েছে তারপরও নানা ধরনের ফন্দিফিকির এখনো চালানো হচ্ছে। পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের আজ অবধি মোট ৭টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, দ্বিতীয় বৈঠক হতে সপ্তম বৈঠক পর্যন্ত নানা কৌশল অবলম্বন করে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সরকার পুনর্বাসনের বিষয়টা অব্যাহত রেখেছে।
তৃতীয় বৈঠকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাত্ত্ব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক ভাবে টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত লংঘন করে সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ভুল ফরমের মাধ্যমে অ-উপজাতীয়দের তালিকাভুক্ত করার কাজ চলছে এবং সরকার কর্তৃক তা টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা পার্বত্য চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য হিসেবে জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি এ বিষয়ে গোড়া থেকেই বিরোধিতা করে আসছে।
উল্লেখ্য যে, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে অ-উপজাতীয়দের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও হেডম্যানদের উপর নানা কায়দা কৌশলে প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা চলেছে। অধিকাংশ হেডম্যান অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক নানা ভয় প্রদর্শন, আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের প্রভাব মুক্ত হতে পারেনি। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিশেষত টিএনও-র দ্বারস্থ হতে হয়। ফলত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশ চেয়ারম্যান যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অশান্ত পরিস্থিতিতে অনেক মৌজার জনগণ নিজ মৌজা ত্যাগ করে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছেন। এই সমস্ত মৌজায় সমতল ভূমি থেকে আসা অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসন দেয়া হয়।
এই সব অ-উপজাতীয়দের কিছু সংখ্যক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং কিছু এলাকায় উপজাতীয়দের উদ্দেশ্যমূলকভাবে হেডম্যানও নিয়োগ দেয়া হয়। এই সব হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাদের এলাকায় কোন উদ্বাস্তু নেই বলে উপজাতীয় ফরমে স্বাক্ষর প্রদানে বিরত থাকে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা অনুসারে অ-উপজাতীয় ফরমে চেয়ারম্যান ও হেডম্যানগণ স্বাক্ষর প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। তাই সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাগণ নানাভাবে উপজাতীয় চেয়ারম্যান ও হেডম্যানদের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি থানা কমিটির আহ্বায়ক কর্তৃক নানা ওসিলায় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ফরম থেকে উপজাতীয়দের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুসারে অ-উপজাতীয়দের অনুপ্রবেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তির পরিপন্থী অপর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতীয়দের পুনর্বাসতি করা হচ্ছে এই মর্মে প্রচারিত হওয়ায় পরোক্ষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতীয়দের অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে চুক্তি সম্পাদনের পরেও অনেক অ-উপজাতীয় পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকে পড়ছে এবং প্রতিনিয়ত অনুপ্রবেশ হচ্ছে।
সরকার কর্তৃক অবৈধভাবে পুনর্বাসিত শত শত অ-উপজাতীয় বিগত অশান্ত পরিস্থিতির সময়ে স্ব স্ব স্থানে বা জেলায় নিজ উদ্যোগে ফিরে গিয়েছে, কিন্তু বর্তমানে অ-উপজাতীয়দের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের বিষয়টা ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রচারিত হওয়ায় সেই সব অ-উপজাতীয়রা পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেরত আসছে। এক দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে অত্যন্ত ধীর গতি হওয়া অন্যদিকে টাস্কাফোর্সের কার্যকলাপ চুক্তি পরিপন্থী বিধায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সাবিক পরিস্থিতি বর্তমান পর্যায়ে খুবই জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি শৃংখলা ও উন্নয়নের স্বার্থে চুক্তি মোতাবেক ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তুদের টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা একান্ত অপরিহার্য ও বাঞ্ছনীয় মনে করি।
সিনিয়র সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
সদস্য, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স ।
বই- পার্বত্য চট্টগ্রামঃ সংকট ও সম্ভাবনা (সম্পাদনা- মেসবাহ কামাল, শারমিন মৃধা)
[প্রবন্ধটি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও তার সমাধানের সম্ভাব্য দিকসমূহ নিয়ে ১৯৯৯ সালের ২২ ও ২৩ মে দু'দিন ব্যাপী ওয়ার্কশপের ফল]

No comments:
Post a Comment