Monday, September 14, 2020

টিসার্চ রিভ্যুলেশনের রুপকার এমএনলারমার ৮১তম জন্মবার্ষিকী আজ





টিসার্চ রিভ্যুলেশন নামে খ্যাত শান্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধের রুপকার,জুম্ম জাতীয়তাবাদের জনক,জুম্ম জাতির মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা,মেহনতী মানুষের মুক্তির নায়ক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম গণপরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮১ তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩৯ সালের ০২ সেপ্টেম্বর হিটলারের জার্মানি পোলান্ড আক্রমণের মধ্যে দিয়ে শুরু ২য় বিশ্বযুদ্ধ। গোটা বিশ্ব যখন যুদ্ধের দামাদলে উন্মাদ তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে জন্ম নেয় এক মহানায়ক এমএন লারমা।১৯৩৯ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর চিত্ত কিশোর চাকমা ও সুভাষিনী দেওয়ানের ঘর আলোকিত করে আবির্ভূত হন এই মহানায়ক। বর্তমান রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়াচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের মাওরুম (মহাপ্রুম) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এমএন লারমা।চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৩য়।বড় ভাই শুভেন্দু প্রভাষ লারমা(বুলু),বড় বোন জ্যোতিপ্রভা লারমা এবং ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু)।তার সহধর্মিনীর নাম পঙ্কজিনী চাকমা এবং ছেলে জয়েস লারমা, মেয়ে পারমিতা লারমা। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় মহাপ্রুম জুনিয়র হাইস্কুলে। ১৯৫৮ সালে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে বিএ ও ১৯৬৮ সালে বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন।১৯৬৯ সালে এলএলবি ডিগ্রীও অর্জন করেন।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।১৯৫৬ সালে পাহাড়ী ছাত্র সমিতিতে যোগ দেন,এরপর পাহাড়ী ছাত্র সমাজকে আন্দোলনে সংগঠিত করতে শুরু করেন।১৯৬০ সালে পাহাড়ী ছাত্র সমাজের নেতা হন। ১৯৫৮ সালে যোগ দেন পূর্ব বাংলার ছাত্র ইউনিয়নে।১৯৬০ সালের দিকে পাহাড়ী মানুষের মরন ফাঁদ কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তুলেন। কাপ্তাই বাঁধের ভয়াবহতার কথা লিফলেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে সচেতন ও প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন।কাপ্তাই বাধেঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তাব সরকারের নিকট আটক হন।১৯৬৫ সালের ৮ই মার্চ শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান।১৯৭০ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষি ১৪টি জাতিগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কাছে একটি প্রতিনিধি দল পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসন সম্বলিত ৪দফা দাবীনামা পেশ করে।মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলাদেশের খসড়া সংবিধানে এদেশের মূল জাতিগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্বকে অস্বীকার ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। লারমার দাবী তখন শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।১৯৭২ সালে বাংলাদেশের গণপরিষদে যে সংবিধান পাস হয়, তাতে বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ছিল না।

সংবিধানের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়:
‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’

এর প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেছিলেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এম এন লারমা। এর আগে খসড়া সংবিধানের ওপর গণপরিষদে যে বিতর্ক হয়, তাতে অংশ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সংবিধান হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা, যা অনগ্রসর জাতিকে, পিছিয়ে পড়া ও নির্যাতিত জাতিকে অগ্রসর জাতির সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে আসার পথ নির্দেশ করবে। কিন্তু বস্তুতপক্ষে এই পেশকৃত সংবিধানে সেই রাস্তার সন্ধান পাচ্ছি না।’
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান প্রণয়ন করার প্রাক্কালে লারমা উগ্র আধিপত্যবাদী বাঙালী জাতীয়তবাদের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পৃথক শাসন ব্যবস্থাসহ জুম্ম জণগণের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দাবি করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের  জোরে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রীয় শক্তি লারমার ন্যায্য দাবিকে প্রত্যাখান করে। জুম্ম জনগণের পাশাপাশি দেশের  কৃষক, তাঁতি, জেলে, মাঝি-মাল্লা, কলকারখানার শ্রমিক-সহ সকল মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য লারমা গণপরিষদে সোচ্চার দাবি রেখেছিলেন। সংবিধানে সকল ধর্ম ও নারীর সমমর্যাদা রক্ষার জন্য লারমা বারংবার আইন প্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সংবিধান প্রণয়নের  সময় লারমা ছিলেন নিসঙ্গ অভিযাত্রী। কিন্তু তাঁর  কণ্ঠে ছিলো অমিত তেজ। গণপরিষদে বার-বার তাঁর মাইক বন্ধ করা হলেও ফ্লোর পেলেই তিনি জুম্ম জনগণের কথা, নারী অধিকার  এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা বলতেন। লারমা সাম্যবাদী দর্শনের সৈনিক ছিলেন ছাত্র জীবন থেকেই। মার্কসীয় সমাজ বিজ্ঞানকে আত্মস্থ করে শ্রমজীবি মানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাংখা থেকে তিনি সংবিধান প্রণয়নের সময় শ্রমিক, মেহনতি জনতা ও নিপীড়িত জাতিসমূহের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছিলেন

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সংসদ প্রতিনিধি হিসেবে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দেন ইংল্যান্ডে। তিনি ১৯৭৫ সালে বাকশালেও যোগদান করেছিলেন। 

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি ও কর্মীদের নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।১৯৭৩ সালের ০৭ জানুয়ারি গড়ে তুলেন সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সংগঠিত হলে তিনি পরের দিনই আত্মগোপনে চলে যান । একই সাথে তিনি গড়ে তুলেছিলেন মহিলা সমিতি, জুমিয়া সমিতি, যুব সমিতি ও গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী। মার্ক্সীয় আদর্শ তিনি ধারণ করেছিলেন তার আন্দোলনের জন্য। পরে জিয়াউর রহমান সমতল থেকে নদী ভাঙা অঞ্চলের  বাঙালীদের পাহাড়ী অঞ্চলে অভিবাসিত করলে তাদের সংগ্রাম তীব্র হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে তাদের লড়াই তীব্রতর হয়ে ওঠে।

একসময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জুম্ম শিক্ষিত সমাজকে গ্রামে চলো স্লোগানে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এবং জুম্ম শিক্ষিত সমাজ পাহাড়ে ফিরে এসে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষকতার পেশায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছিলেন।জুম্ম সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পাহাড় থেকে পাহাড়ে ছুটে বেরিয়েছেন। জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় অধিকাংশ কর্মীই ছিলেন শিক্ষক,যার কারণে এই আন্দোলনের নাম টিসার্চ রিভ্যুলেশন নামেও সমধিক পরিচিত।এদেশের সেনাবাহিনীরাও নাম দিয়েছিলেন টিসার্চ রিভ্যুলেশন।মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিজেও  ১৯৬৬ সালে দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ও প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি,যে সংগঠন এমএন লারমার নিজ হাতে গড়া।ঘুমন্ত জুম্মসমাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন অধিকার আদায়ের জন্যে।আন্দোলন-সংগ্রাম শিখিয়েছেন পাহাড়ী জুম্ম সমাজে।মেহনতী মানুষের কথা বলেছেন সবসময়।তাইতো আজো পাহাড়ে পাহাড়ে এমএন লারমার জয়গাথা উচ্চারিত হয়।কাপ্তাই বাধেঁর কারণে যেদিন উদ্ভাস্ত হয়ে চলে যাচ্ছিলেন নিয়েছিলেন এক মুঠো মাটি,কি প্রতিজ্ঞা ছিলো আমরা জানিনা,তবে এটুকু আমরা বলতে পারি যে জন্মভূমিকে মুক্তিই ছিল তার লক্ষ্য। 
 
১৯৭৭ সালে এবং ১৯৮২ সালেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জনসংহতি সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দলেও সৃষ্টি হয় অন্তর্দন্ধ এবং দলটি ২টি ধারা এমএন লারমার নেতৃত্বে লাম্বা গ্রুপ ও প্রীতি কুমার চাকমার নেতৃত্বে বাদি গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়।দলীয় ঐক্যকে সংহত করার লক্ষ্যে লারমা ভিন্ন মতাবলম্বীদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সে-দিকে পথ বাড়াননি। ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ গভীর রাতে তারা লারমার  গোপন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। লারমাকে রক্ষার জন্য লারমার সহযোদ্ধারা আমরণ লড়াই চালিয়ে যান। জুম্ম জনগণের মহান নেতাকে রক্ষার সকল প্রতিরোধ অতিক্রম করে ঘাতকরা লারমার কাছে পৌঁছে যায়। ঘাতকের নির্মম বুলেট নিপীড়িত জনতার মুক্তি সংগ্রামের অগ্রসেনানী লারমার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। ১০ নভেম্বর, ১৯৮৩ চক্রদের বুলেটে নিভে যায় লারমার জীবন প্রদীপ। সাথে শহীদ হন লারমার ৮ সহযোদ্ধা। ঘাতকের বুলেট লারমার জীবন কেড়ে নিয়েছে সত্য। তবে লারমার আত্মত্যাগ, তাঁর জীবন দর্শন প্রতিনিয়ত নিপীড়িত মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। নির্লোভ ও নির্মোহ জীবন যাপনে লারমা চিরকাল অনুকরণীয়। মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত কোনো প্রকার ভোগবাদ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন সব সময় আপোষহীন। সাচ্চা, ত্যাগী বিপ্লবী এ-নেতার জীবন তাই মরণেই থেমে থাকে না। ঘাতকেরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু লারমা চির দীপ্যমান 

Thursday, September 10, 2020

তাতিন্দ্র লাল চাকমার রাজনৈতিক জীবন - মেঘদূত ত্রিপুরা উত্তম


জুম পাহাড়ের কোন এক কোনায় লুকিয়ে অবস্থান।  সেনাবাহিনীরা ফিরছে পাহাড়ী কোনো গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে, লুটপাট করে। মূহূর্তেই গোলাগুলি, চিৎপতাং সেনাবাহিনী। কয়েকজন সেনা আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হলো শান্তিবাহিনীর কাছে। সমর্পন করা সেনাদের নিয়ে যাওয়া হলো গোপন জায়গায়। বোঝানো হলো তাদের যে শান্তবাহিনীরা কোন বিছিন্ন কাজে যুক্ত নয়। অধিকারের জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছে। সবশেষে সম্মানের সাথে তাদের ফেরত পাঠানো হলো।

বন্ধুগন, ভাই, বোন সর্বোপরি পাঠক মহল ভাবছেন, কবেকার কোন ঘটনার কথা বলছি?
না পাঠক, আমি কোন রুপকথার কল্পকাহিনী বলছিনা। বলছি ১৯৭৭থেকে ১৯৯৭ এর শান্তবাহিনীর গেরিলা জীবনের কথা।
শুরুর কাহিনী আবার পড়ুন আর ভাবুন, কে হতে পারে? যার নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ এবং সর্বোপরি সেনা সদস্যদের সসম্মানে যেতে দেওয়া।
 পাঠক গনের মধ্যে যারা পাহাড়ের রাজনীতির খবরাখবর রাখেন, তারা বুজে গিয়েছেন হয়তো। 

হ্যা পাঠক, সে নেতৃত্ব দানকারী কমান্ডার আর কেউ নন, সে ব্যক্তিটি হলো তাতিন্দ্র লাল চাকমা।

যার মহাপ্রয়ান কয়েকদিন পূর্বেই ঘটেছে। পাহাড়ের রাজনীতিতে যিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ছোটবেলায় দীঘিনালায় গিয়েছিলেন বাবার সাথে চাউল বিক্রি করতে। এমন সময় সেনা বাহিনীর আগমন। কারফিউ জারি, মারধর শুরু। লন্ডভন্ড করা হলো পাহাড়ীদের বিক্রী করতে নেওয়া জুমের ফসল। বাদ গেলোনা সেই ছোট তাতিন্দ্রের বিক্রী করতে চাউল গুলো। ছোট বয়সে বুঝলেন না, ঠিক কি কারনে সেনারা এমনটা করল?
যখন বুঝলেন, যোগ দিলেন পাহাড়ী ছাত্র সমিতিতে। তারপর মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার ডাকে সাড়া দিয়ে যোগ দেন গেরিলা জীবনে।

লাম্বা বাধির সংঘাতে যখন মহান নেতার মৃত্যু ঘটে, লাম্বা গ্রুপের সবাই হতাশ হন। ঠিক সেই সময়ে তিনি সবাইকে পথ দেখান, বলেন এ সংঘাতে বিজয় আমাদেরই হবে। বাধি গ্রুপ জন সমর্থন হারিয়েছে। জনগন আমাদের পক্ষে। অতএব বিজয় আমাদের।

অতপর বাধি গ্রুপকে পরাস্ত করতে গঠন করা হয় ডগ বাহিনী, যার নেতৃত্বের ভার নিজের কাধে নেন। সফলতার সাথে পরাস্ত করেন বাধি গ্রুপকে যার মূল হোতা ছিল গিরি, দেবেন, পলাশ, প্রীতি।

দীর্ঘ ২০ বছরের গেরিলা জীবনের সমাপ্তি ঘটে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। জুম্ম জনগনের কথা ভেবে থেকে যান রাজনীতিতে। লক্ষ্য এবার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা।
কিন্তু ততদিনে শাসকগোষ্ঠীর প্ররোচনায় পাহাড়ে এক অপশক্তির জন্ম হয়, নাম ইউপিডিএফ। যারা যুদ্ধফেরত শান্তিবাহিনীদের হত্যা করা শুরু করেছে। যারা চুক্তিকে মূলা শক্তি, কালো চুক্তি বলে অ্যাখ্যায়িত করছিল।
যুদ্ধফেরত শান্তিবাহিনী সদস্যরা সাহায্য চাইতে আসেন তাতিন্দ্র লাল চাকমার কাছে। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন। বলেন তোমরা প্রথমে উষাতন বাবুর কাছে যাও। ওনি কি বলেন তা শুন।

তারা উষাতন বাবুর কাছে যান, উষাতন তালুকদার,  সন্তু লারমার সাথে যুক্তি করেন। সিদ্ধান্ত হয়,  সংঘাতের মাধ্যমে ধ্বংস করা হবে চুক্তি বিরোধী অপশক্তিকে।।
সিদ্ধান্ত হয়, সংঘাত শুরু করার, কিন্তু ততদিনে প্রসীতরা বিএনপি জামাতের সাথে যোগাযোগ করে হাতে নিয়েছে ভারী অস্ত্র। সাহায্য নেওয়া শুরু করেছে সেনা বাহিনীর। আক্রমন শুরু করেছে খাগড়াছড়িতে।

সংঘাত করার অস্ত্র প্রয়োজন, অস্ত্রের জন্য প্রয়োজন অর্থের যার যোগান দেওয়া তৎকালীন জেএসএস এর পক্ষে ছিল অসম্ভব।
 বাধ্য হয়ে যুদ্ধফেরত সদস্যরা চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া ৫০০০০৳ জমা দেন উষাতব তালুকদারের হাতে। লক্ষ্য অস্ত্র কিনতে হবে, শেষ করতে হবে চুক্তি বিরোধী শক্তিকে।

কিন্তু উষাতন তালুকদারের অবস্হাও ছিল কাহিল। টাকাগুলো দিয়ে অস্ত্র না কিনে ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করেন। যার ফলে হতাশ হয়ে পরেন যুদ্ধ ফেরত শান্তিবাহিনী সদস্যরা।

আবার ভরষার নাম হয়ে এলেন তাতিন্দ্র লাল চাকমা। বলে রাখা ভালো চুক্তির পর তাতিন্দ্র লাল চাকমা অবস্হান নেন খাগড়াছড়িতে। আর চুক্তিবিরোধী  শক্তি ইউপিডিএফ এর প্রথম টার্গেট ছিল খাগড়াছড়ি। তাই বাধ্য হয়ে তাতিন্দ্র বাবু তাগিদ দেন অস্ত্র কেনাতে। তিনি এব্যাপারে সন্তু এবং উষাতন বাবুর মত গ্রাহ্য করেননি।।

অস্ত্র কিনেন, যুদ্ধ করেন। কোনঠাসা করেন ইউপিডিএফ কে।২০০৬ এর দিকে নিভু নিভু ইউপিডিএফ। যেকোন সময় আত্মসমর্পন করতে বাধ্য।

কিন্তু বোকা হয়ে বসেন সন্তু লারমা, শাসকগোষ্ঠীর পরিকল্পনা না বুজে সন্দহ করা শুরু করের তাতিন্দ্র লাল চাকমার উপর। যুক্তি দেখান তিনি দলের প্রধান, তার পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ করা যাবেনা।

তাতিন্দ্র বাবু মেনে নেন। কিছু করার পূর্বে সন্তু লারমার সিদ্ধান্তের জন্য চলে যেতেন রাঙ্গামাটি। কিন্তু রাঙ্গামাটি যাবার পথে নানিয়াচরে ছিল ইউপিডিএফের শক্ত অবস্হান। তাই বাধ্য হয়ে চলাচল করতেন খাগড়াছড়ি-হাটহাজারী- রাঙ্গামাটির পথ দিয়ে। কিন্তু যাওয়া মাত্র দেখা পেতেন না সন্তু লারমার, ৪-৫ দিন পর দেখা পেতেন। বলা যায়, এক প্রকার ইচ্ছে করে দেখা দিতেন না।
৪-৫ দিন পর দেখা করার পর যে বুদ্ধি দিতেন, সে পরিকল্পনা কাজে দিতনা। কারন ঐ কয়েক দিনেই ইউপিডিএফ এর অবস্হান ভিন্ন হয়ে দাড়াতো। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে সন্তু লারমা থেকে মত নেওয়াটা অগ্রাহ্য করেছিলেন।

এক- এগারো। ইউপিডিএফ এর অবস্হা কাহিল, অবস্হান ভারতীয় সীমান্তে।

এমন সময় মইনুদ্দীন- ফখর উদ্দীন সরকার পাহাড়ে পাশা খেলায় শকুনির চাল চালেন। যে চালে ফেসে যান সন্তু লারমা। মহাভারতে শকুনির চাল বুঝতে না পেরে যুধিষ্ঠির রাজ্য হারান, বস্ত্র হরন হয় দ্রোপধীর।
পাহাড়ে মইন উদ্দীন- ফকর উদ্দীনের চালানো পাশার চালে সন্তু লারমা নিজের গধি না হারালেও বলি দেন তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে।
মূলত সে সময় সেনাবাহিনীরা চেয়েছিল,, চুক্তিবিরোধী শক্তি ইউপিডিএফকে যেকোন মূল্যে বাচিয়ে রাখা। আর তাই ঘোষনা দেয়, পাহাড়ে সেনা অপারেশন চলবে। অবৈধ অস্ত্র যে দলের পাবে, সেই দলকে জবাবদিহি করতে হবে।

বলে রাখা ভালো,  পাহাড়ে সেই সময় ইউপিডিএফ শেষ হবার পথে, পাহাড় জুরে ছিল জেএসএস এর গেরিলা সদস্য। আর সেজন্য যদি অপারেশন চলত জেএসএস বেকায়দায় পরার সম্ভাবনা ছিল বেশী।
আর এখানেই ভয় পেয়ে যান সন্তু লারমা,, কারন দলের প্রধান তিনি। আওয়ামীলীগ ওবিএনপির অপকর্মের জন্য দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে চোখের সামনে জেলে কারাবরন করতে দেখেন। তিনি ভাবেন যদি কোন কারনে জেএসএস এর উপর শাসক বাহিনী নজর দেয়, তাহলে তার জেল নিশ্চিত। তিনি সবকিছুর জন্য দোষ দিয়ে বসেন তাতিন্দ্র লাল চাকমার উপর এবং তার অনুসারীদের উপর।

পাঠকগনের জানা উচিত, সেই সময় তাতিন্দ্র লাল চাকমা ছিলেন সেনা বাহিনীর চক্ষুশূল। কারন ছিল, গেরিলা জীবনে অনেক বার তিনি সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেন। আর সেনা পরিকল্পনায় গড়ে উঠা ইউপিডিএফ কোনঠাসা হবার পিছনে নায়ক ছিলেন তাতিন্দ্র বাবু। 

তাতিন্দ্র লালকে পাকড়াও করার সুযোগ খুছছিল সেনাবাহিনী,, সুযোগ দেন সন্তু লারমা। ব্যশ্
দুই দুই চার মিলে,,,  ফলাফল একএগারোর সময় তাতিন্দ্র লাল চাকমার গ্রেফ্তার। গ্রেফতার করার সময় যার নামে কোন মামলা ছিলনা তিনি জেল থেকে মুক্তি পান ১৬টি মামলার আসামী হয়ে।

তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে গ্রেফতারের পর ওনার সহধর্মীনি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন সন্তু লারমা ও উষাতন বাবুর সাথে। ওনারা সাহা্য্য তো দূরে থাক,  ফোনও উঠাননি।
তাতিন্দ্র বাবু গ্রেফতার, কর্মীবাহিনী হতাশ, সেনা পরিকল্পনা সফল। ফলাফল পুনরুজ্জ্বীবিত ইউপিডিএফ আর সন্তু লারমার কারাবাস থেকে কোনোরকমে রেহাই।
তাতিন্দ্র বাবুকে বলিদান দেওয়া বিষয়টা মানতে পারেননি পার্টির নেতৃবন্দরা,
ফলাফল সুধাসিন্ধু, রুপায়ন দেওয়ান, চন্দ্রশেখর, শক্তিমানদের বহিষ্কার এবং মৃত্যু ঘোষনা।

জুম্ম জনগনকে অধিকার পাইয়ে দেওয়ার তাগিদে এসব নেতারা থেমে যাননি। গঠন করেন নতুন পার্টি। জেএসএস(এমএনলারমা)।
অনেক চড়াই উতরাই পথ পেরিয়ে মুক্তি পান তাতিন্দ্র বাবু। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পথে মুখ্য ভুমিকা রাখেন রুপায়ন দেওয়ান এবং শক্তিমান চাকমা।

জেল থেকে মুক্তি পেয়ে এবারও থামেননি তিনি।থামেননি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আর হয়তো থামবেন না মৃত্যুর পরও। কারন মৃত্যুতে থামেনা জীবন। যে আদর্শ ওনি রেখে গেছেন সেটি ওনাকে বাচিয়ে রাখবে।  

আজকে পাহাড়ে যেসকল ফেসবুক ব্লগার, ওনাকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছেন, সত্যদর্শী মুলুঙে নামক ছদ্মবেশী রাজনৈতিক বিশ্লেষনকারীরা ওনাকে একএগারোর মীরজাফর চরিত্রে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন,, তাদের উদ্দেশ্য করে বলছি,
কোন এক শান্ত বিকেলে এক কাপ চা নিয়ে বসবেন। পক্ষপাতহীন হয়ে একবার দুবার সাতবার ভাববেন। চিন্তা করবেন ওনার অবদান গুলো। তারপর ওনার ব্যাপারে মন্তব্য করবেন।

সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বে ওনার পাহাড়ের রাজনীতিতে অবদাবগুলো দেখে নিন।
#)ছোট বড় ৫০টির অধিক গেরিলা যুদ্ধে বিজয়।
#)৫০টির অধিক অস্ত্র কেড়ে নেওয়া।
#) বাধি গ্রুপ নিঃশেষ করার নায়ক।
#)চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফকে কোনঠাসা।
#)ভাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের চেষ্টা।
#)ইউপিডিএফ এর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি।

ধন্যবাদ সকলকে।

লেখক
উত্তম কুমার ত্রিপুরা
সদস্য,পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,কেন্দ্রীয় কমিটি।

মূল লিংকঃ https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=980274445769249&id=100013601084590

ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃত্বের সংকট -শ্রী তাতিন্দ্র লাল চাকমা


দেশের রাজনৈতিক অবস্থা যখন চরম নৈরাজ্যময় হয়ে উঠে,সীমাহীন সন্ত্রাস যখন সমাজকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় এবং বেপরোয়া দুর্নীতি যদি প্রশাসন যন্ত্রকে বিকল করে দেয় সর্বোপরি লাগামহীন বেকার সমস্যা যদি বাড়তেই থাকে তখন ছাত্র সমাজকে এসবের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাজনীতি না করে আর উপায় থাকেনা। শাসকগোষ্ঠী যতই সোচ্চার কন্ঠে ঘোষণা করুক যে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা উচিত কিন্তু আজকের ছাত্র সমাজ যদি ভাবে আগামী দিনে বড় বড় ডিগ্রী লাভ করেও তার কি চাকুরীর সংস্থান হবে? চাকুরীর জন্য প্রতিযোগীতা করতে গিয়ে যদি দেখে যে তার মেধার চাইতে বাম হাতের ব্যাপারটায় সবচাইতে বড়ো এবং নিয়ামক তাহলে শিক্ষাজীবন শেষে সে ছাত্র কোন পথ বেছে নেবে? তাই একজন ছাত্রকে সমাজের এই অনিয়ম অনাচার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কি করা যায় সে কথা ভাবতে হয়। সমাজের এই ভয়াবহ চিত্র দেখে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ভবিষ্যতের জন্য রাজনীতির কথা ভাবতে হয়। তাই প্রচলিত সমাজে ছাত্রদের বিরাট একটা অংশের ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে না পড়ে উপায় থাকেনা।

সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে একজন ছাত্র স্বভাবতই দোদুল্যমান চরিত্রের হয়। কারণ তারা সমাজের দুই ধরণের চিত্র প্রায়ই দেখতে পায়। তার একটা হচ্ছে - সমাজে গরীবদের দুঃখ যন্ত্রণা,নির্যাতন-নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনা যা প্রতিদিন প্রতিটি পদক্ষেপে দেখতে পায়। এসবের মধ্যে একজন ছাত্র স্বভাবতই গরীবদের দুঃখ দেখে বেদনাবোধ করে থাকে। তাদের যন্ত্রণা ও বঞ্চনা দেখে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। তাই গরীবদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পক্ষে সংগ্রামের কাতারে ছাত্র জনতার কন্ঠই বেশী শোনা যায়। আর যে শিক্ষা তারা প্রতিনিয়ত পায় এবং সমাজে বিত্তবানদের যে আরাম আয়েশ ও ভোগ বিলাসের চিত্র দেখে আর সেই সংস্কৃতির সাথেই তারা পরিচিত হয় সেই সংস্কৃতির টানেও তারা গা ভাসাতে থাকে। তাই তাদের দ্বৈত চরিত্র। যাকে রাজনীতিতে পেটি বুর্জোয়া নামে অভিহিত করা হয়। এই শ্রেণীর ব্যাপক একটা অংশ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই শ্রেণীর লোকজন সমাজের অবস্থাভেদে নানা ধারায় ভাগ হয়ে যায়। তাদের একটা ধারা যারা সমাজ জীবনে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে হাবুডুবু খায় সে অংশটা চরম হতাশায় নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। মদ জুয়ার আড্ডায় যোগ দেয় এবং ধীরে ধীরে আত্মঘাতি কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। আর একটা অংশ সমাজের বিত্তবানদের কাছে আশ্রয় নেয় এবং ভাগ্যের অন্বেষণে প্রভূর মদদে কাজকর্ম চালাতে থাকে। উদ্দেশ্য - জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোন সুযোগ পাওয়া যায় কিনা? এই ধারাটি সাধারণতঃ বিত্তবান শ্রেণীর রাজনৈতিক বলয়ে আশ্রিত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় প্রভুর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের উপর। কিন্তু সেই আনুগত্যেরও প্রতিযোগিতা চলে।ঐ প্রতিযোগিতায় তাল সামলাতে একজন ছাত্রকে অনেক ক্ষেত্রে তার বিচার বিবেক বুদ্ধিকে বিসর্জন দিতে হয়। আর নিজস্ব প্রতিভার বিসর্জন দেওয়ার অর্থ ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পরগাছাবৃত্তি গ্রহণ করা। ছাত্র সমাজের এই ধারাটি সমাজে উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হতে পারেনা। ফলে সমাজে তাদের শক্ত কোন নেতৃত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হয়না। তাদের পরিণত আশ্রয়দাতা প্রভুর ভাগ্যের উপরই নির্ভরশীল হয়। বিদ্যমান সমাজে এই ধারাটি নেতৃত্ব গঠনে কোন অবদান রাখতে পারেনা।

ছাত্র নেতৃত্বের আরো একটা বড় দুর্বলতা হচ্ছে ঘন ঘন নেতৃত্বের পরিবর্তন দেখা যায় একজন ছাত্র নেতা কয়েক বছরের মধ্যে ভিন্ন পরিবেশে চলে যায়। বিশেষতঃ ছাত্র জীবন শেষে তাকে কর্মসংস্থানের কথা ভাবতে হয়। সে সময় কোন ছাত্রনেতা যদি চাকুরীতে যোগ দেয় কিংবা কোন ব্যবসার সাথে জড়িত হয় তাহলে তার জীবনেও তার দর্শনের পরিবর্তন হতে বাধ্য। চাকুরী করার মাধ্যমে দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য ভূমিকা রাখবে বলে যে ছাত্রনেতা ভাবে তাকে পয়লা নম্বরের মূর্খই আখ্যা দেয়া উচিত। যে ছাত্র জীবনে সবচাইতে স্বার্থ নিরপেক্ষ সেই ছাত্র জীবনের বৈশিষ্ট্যের ইতি ঘটে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পর। কারণ পরিবার হচ্ছে সংগ্রামী জীবনের সবচাইতে বড় বাঁধা। অথচ পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পর সমাজের জ্ঞান, উৎপাদন সংগ্রামের জ্ঞান ও শ্রেণী সংগ্রামের জ্ঞান অর্জনের দীর্ঘ সাধনার প্রয়োজন। কিন্তু পারিবারিক সমস্যা মাথায় নিয়ে সমাজের এই বাস্তব জ্ঞান অর্জন একজন স্বাধীনচেতা মানুষের পক্ষে আর সম্ভব হয়না। কারণ ত্যাগই হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল চাবিকাঠি। ছাত্র অবস্থায় যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে সমাজের জন্য কাজ করা যায় পারিবারিক জীবনে জড়িয়ে পড়ার পর ততোটা আর সম্ভব হয়না। সম্ভব হয়না শিক্ষা গ্রহণে একনিষ্ঠ ও উদার হওয়া। এই সব বাঁধা যে ছাত্র নেতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়না সে ছাত্র নেতার ভূত-ভবিষ্যৎ গতানুগতিক হতে বাধ্য।

ছাত্র নেতৃত্ব যেহেতু মৌলিক নয় সেই হেতু জাতীয় পর্যায়ের কোন না কোন মূল রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। এই কারণে ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও তার বিকাশ সাধন করার বিষয়টিও ঐ রাজনৈতিক দলের উপরই নির্ভরশীল হতে হয়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক দল যদি প্রগতিশীল চিন্তাধারা সম্পন্ন না হয় এবং রক্ষণশীল ও পশ্চাৎপদ চিন্তাধারায় সজ্জিত হয় তাহলে সেই দলের ছাত্র নেতৃত্ব অন্ধ কানাগলিতে হাতরাতে থাকবে। রাজনীতি যেহেতু জনগণের সাথে ঐ দলের সম্পর্কের ব্যাপার তাই নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনাটি হওয়া উচিত জনগণের সাথে ঐ ছাত্র নেতার সম্পর্ক কি রকম তারই উপর। আর তা না করে যদি শুধু গলাবাজি করতে পারা কিছু বাক সর্বস্ত ছাত্রদের দিয়ে কিংবা শুধু নেতাদের তোয়াজ করতে জানে এই ধরনের ছাত্র যাদের গুনাবলীতে অনুগত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বিশেষণ যোগ করে তাদের নেতা বানিয়ে ছাত্র নেতৃত্ব গড়ে তোলা যায় তাহলে সে নেতৃত্ব কোনদিন সংগ্রামী কিংবা প্রগতিশীল হতে পারবেনা। বিশ্বস্ততা শুধু নেতার নেতৃত্বের কাছে নয় বরঞ্চ জনগণের কাছে বিশ্বস্ত থাকতে পারাটাই হচ্ছে তার প্রধান মাপকাঠি। কারণ অতীতে অনেক ছাত্র নেতাকে দেখা গেছে ক্ষমতায় যাবার পর সেই জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খেতে আর দ্বিধা করেনা। তাই জনগণের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেই ছাত্রের কতটা আগ্রহ সে বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েই তার নেতৃত্বের গুনাগুণ খোঁজা উচিত। সেটা হচ্ছে একটা ব্যাপার। আর অন্য একটা ব্যাপারও আছে তা হচ্ছে শ্রেণী হিসেবে ছাত্ররা হচ্ছে সবচাইতে দোদুল্যমান। এই দোদুল্যমান শ্রেণী থেকে সঠিকতাকে বেছে নিতে হলে অবশ্যই তার সংগ্রামের দৃঢ়তাকে প্রমাণ করতে হবে। পরিস্থিতি একটুখানি জটিল হলে,বিশেষতঃ যখন জেল জুলুম ও বুলেটের হুমকি আসবে তখনও দৃঢ়তার সাথে সামনে এগুতে পারার মত সাহস ও দৃঢ়তা না থাকলে সেই নেতৃত্ব দেশের ও সমাজের জন্য গঠনমূলক কোন ভূমিকা রাখতে পারবেনা।

নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় ব্যাপার হচ্ছে আন্দোলনের বাস্তবতাকে অনুধাবন করা। কারণ স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সমস্যাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন চীনদেশের আন্দোলন  আর ভিয়েতনামের আন্দোলন এক নয়। অনুরুপ ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশ আর বাংলাদেশের পরিবেশ এক নয়। এমনকি বাংলাদেশের অপরাপর অংশের সমস্যা আর পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা এক নয়। কারণ বাঙ্গালী জাতি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত। তাদের ধ্বংস হবার সম্ভাবনা নেই।কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতিসত্বাগুলোর ধ্বংস হয়ে যাবার সম্বাবনা সবচাইতে বেশী। তাই একই পরিবেশে ছাত্ররা বিদ্যার্জন করলেও জুম্ম ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয় এবং নিজেদের আবাসভূমি থেকে বিতারিত হবার আশাংকার সম্মুখীন হতে হয়। এই বাস্তবতা থেকে জুম্ম ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আলাদা রাজনৈতিক দল করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অতীতে দেখা গেছে অনেক জুম্ম ছাত্র বড় বড় জাতীয় রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। কিন্তু ২০০০ সালের শেষ অবধি কেউ সফল হতে পারিনি। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এসে জুম্ম ছাত্র জনতার একটা রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কঠিন বাধা হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক উচ্চবিলাস। এই উচ্চবিলাস থেকে ছাত্র জনতার নূতন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। তারা কিন্তু জুম্ম জনগণের সাথে যথেষ্ট পরিমাণে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিল। জুম্ম জনগণও  এই ছাত্র নেতাদের মধ্যে একটা সম্ভাবনা আশা করেছিল কিন্তু দেখা গেল প্রসিত সঞ্চয়ের নেতৃত্বে রাজনৈতিক উচ্চবিলাস থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তারা ভেবেছিল তারাই জুম্ম জনগণের মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় নেতা এবং তারা ইচ্ছা করলে প্রয়াত এম এন লারমার মত নির্বাচনে জিতে গিয়ে এমপি হতে পারবে এমনকি ভাগ্যচক্রে মন্ত্রীও হয়ে যেতে পারে কিন্তু। কিন্তু না; বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। সেই এম এন লারমার সময়ের ৭৪ সাল আর ২০০১ সালের সময় ভিন্ন, পরিবেশ পরিস্থিতি ভিন্ন। বিগত তিরিশ বছরের পার্বত্য চট্টগ্রামে যে অনুপ্রবেশকারীদের বিপুল উপস্থিতি এবং সরকারী আধা সরকারী, সামরিক বেসামরিক আমলার উপস্থিতি ৭৪ সালের পরিস্থিতির চাইতে বহুগুন ভিন্নতর হয়ে গেছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে প্রসীত সঞ্চয় গং বিগত ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এমনই যে পাহাড়ী বাঙ্গালী ভোটারের হার প্রায় সমান। তদুপরি যাবতীয় তুরুপের তাস শাসক গোষ্ঠীর হাতে। এমতাবস্থায় এম এন লারমার মত জাতীয় নেতা হওয়া ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দূরের কথা তারা এখন একজন ইউ.পি চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হতে পারে না। এই প্রসিত সঞ্চয় চক্রের ব্যক্তিত্ব জাহির করতে এবং উচ্চবিলাস চরিতার্থ করতে জুম্ম ছাত্র সমাজে এমনই বিভ্রান্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে তাতে ছাত্র নেতৃত্বকে উজ্জীবিত ও সাবলীল করার পরিবর্তে চরম হতাশার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। ফলে এখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পক্ষে বিপক্ষের বিষবাষ্পে জুম্ম ছাত্র সমাজ আজ হতভম্ব।  অথচ রাজনৈতিক মনীষীরা বলেছেন দেশের তরুণরাই হচ্ছে সকাল বেলার আট নটার সূর্য্যের মতই তেজোদ্দীপ্ত।  এই ছাত্র  তরুণরাই পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রসীত সঞ্চয়রা যদি ছাত্রনেতাই হয়ে থাকে তাহলে তাদের পরিচালিত ছাত্র সংগঠন এত কোণঠাসা,এত দৈন্যদশায় জর্জরিত কেন? এটা কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শগত বিচ্যুতি নয়? সবকিছু পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনের পরিস্থিতি আছে এবং তাই জুম্ম ছাত্র রাজনীতি আছে। আর সেই রাজনীতির নেতৃত্বও আছে কিন্তু সেই নেতৃত্ব নির্ভুল নয়।  তাই এই নেতৃত্বের করণীয় হচ্ছে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করা এবং ভবিষ্যতের ভুল এড়িয়ে চলা; আর পাথেয় হচ্ছে প্রগতিশীল চিন্তাধারায় সুসজ্জিত হওয়া।

কেওক্রডং ★বুলেটিন নং -৩ ★২য় বর্ষ★৩০ জুন, ২০০৩ ইং।