জুম পাহাড়ের কোন এক কোনায় লুকিয়ে অবস্থান। সেনাবাহিনীরা ফিরছে পাহাড়ী কোনো গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে, লুটপাট করে। মূহূর্তেই গোলাগুলি, চিৎপতাং সেনাবাহিনী। কয়েকজন সেনা আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হলো শান্তিবাহিনীর কাছে। সমর্পন করা সেনাদের নিয়ে যাওয়া হলো গোপন জায়গায়। বোঝানো হলো তাদের যে শান্তবাহিনীরা কোন বিছিন্ন কাজে যুক্ত নয়। অধিকারের জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছে। সবশেষে সম্মানের সাথে তাদের ফেরত পাঠানো হলো।
বন্ধুগন, ভাই, বোন সর্বোপরি পাঠক মহল ভাবছেন, কবেকার কোন ঘটনার কথা বলছি?
না পাঠক, আমি কোন রুপকথার কল্পকাহিনী বলছিনা। বলছি ১৯৭৭থেকে ১৯৯৭ এর শান্তবাহিনীর গেরিলা জীবনের কথা।
শুরুর কাহিনী আবার পড়ুন আর ভাবুন, কে হতে পারে? যার নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ এবং সর্বোপরি সেনা সদস্যদের সসম্মানে যেতে দেওয়া।
পাঠক গনের মধ্যে যারা পাহাড়ের রাজনীতির খবরাখবর রাখেন, তারা বুজে গিয়েছেন হয়তো।
হ্যা পাঠক, সে নেতৃত্ব দানকারী কমান্ডার আর কেউ নন, সে ব্যক্তিটি হলো তাতিন্দ্র লাল চাকমা।
যার মহাপ্রয়ান কয়েকদিন পূর্বেই ঘটেছে। পাহাড়ের রাজনীতিতে যিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
ছোটবেলায় দীঘিনালায় গিয়েছিলেন বাবার সাথে চাউল বিক্রি করতে। এমন সময় সেনা বাহিনীর আগমন। কারফিউ জারি, মারধর শুরু। লন্ডভন্ড করা হলো পাহাড়ীদের বিক্রী করতে নেওয়া জুমের ফসল। বাদ গেলোনা সেই ছোট তাতিন্দ্রের বিক্রী করতে চাউল গুলো। ছোট বয়সে বুঝলেন না, ঠিক কি কারনে সেনারা এমনটা করল?
যখন বুঝলেন, যোগ দিলেন পাহাড়ী ছাত্র সমিতিতে। তারপর মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার ডাকে সাড়া দিয়ে যোগ দেন গেরিলা জীবনে।
লাম্বা বাধির সংঘাতে যখন মহান নেতার মৃত্যু ঘটে, লাম্বা গ্রুপের সবাই হতাশ হন। ঠিক সেই সময়ে তিনি সবাইকে পথ দেখান, বলেন এ সংঘাতে বিজয় আমাদেরই হবে। বাধি গ্রুপ জন সমর্থন হারিয়েছে। জনগন আমাদের পক্ষে। অতএব বিজয় আমাদের।
অতপর বাধি গ্রুপকে পরাস্ত করতে গঠন করা হয় ডগ বাহিনী, যার নেতৃত্বের ভার নিজের কাধে নেন। সফলতার সাথে পরাস্ত করেন বাধি গ্রুপকে যার মূল হোতা ছিল গিরি, দেবেন, পলাশ, প্রীতি।
দীর্ঘ ২০ বছরের গেরিলা জীবনের সমাপ্তি ঘটে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। জুম্ম জনগনের কথা ভেবে থেকে যান রাজনীতিতে। লক্ষ্য এবার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা।
কিন্তু ততদিনে শাসকগোষ্ঠীর প্ররোচনায় পাহাড়ে এক অপশক্তির জন্ম হয়, নাম ইউপিডিএফ। যারা যুদ্ধফেরত শান্তিবাহিনীদের হত্যা করা শুরু করেছে। যারা চুক্তিকে মূলা শক্তি, কালো চুক্তি বলে অ্যাখ্যায়িত করছিল।
যুদ্ধফেরত শান্তিবাহিনী সদস্যরা সাহায্য চাইতে আসেন তাতিন্দ্র লাল চাকমার কাছে। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন। বলেন তোমরা প্রথমে উষাতন বাবুর কাছে যাও। ওনি কি বলেন তা শুন।
তারা উষাতন বাবুর কাছে যান, উষাতন তালুকদার, সন্তু লারমার সাথে যুক্তি করেন। সিদ্ধান্ত হয়, সংঘাতের মাধ্যমে ধ্বংস করা হবে চুক্তি বিরোধী অপশক্তিকে।।
সিদ্ধান্ত হয়, সংঘাত শুরু করার, কিন্তু ততদিনে প্রসীতরা বিএনপি জামাতের সাথে যোগাযোগ করে হাতে নিয়েছে ভারী অস্ত্র। সাহায্য নেওয়া শুরু করেছে সেনা বাহিনীর। আক্রমন শুরু করেছে খাগড়াছড়িতে।
সংঘাত করার অস্ত্র প্রয়োজন, অস্ত্রের জন্য প্রয়োজন অর্থের যার যোগান দেওয়া তৎকালীন জেএসএস এর পক্ষে ছিল অসম্ভব।
বাধ্য হয়ে যুদ্ধফেরত সদস্যরা চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া ৫০০০০৳ জমা দেন উষাতব তালুকদারের হাতে। লক্ষ্য অস্ত্র কিনতে হবে, শেষ করতে হবে চুক্তি বিরোধী শক্তিকে।
কিন্তু উষাতন তালুকদারের অবস্হাও ছিল কাহিল। টাকাগুলো দিয়ে অস্ত্র না কিনে ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করেন। যার ফলে হতাশ হয়ে পরেন যুদ্ধ ফেরত শান্তিবাহিনী সদস্যরা।
আবার ভরষার নাম হয়ে এলেন তাতিন্দ্র লাল চাকমা। বলে রাখা ভালো চুক্তির পর তাতিন্দ্র লাল চাকমা অবস্হান নেন খাগড়াছড়িতে। আর চুক্তিবিরোধী শক্তি ইউপিডিএফ এর প্রথম টার্গেট ছিল খাগড়াছড়ি। তাই বাধ্য হয়ে তাতিন্দ্র বাবু তাগিদ দেন অস্ত্র কেনাতে। তিনি এব্যাপারে সন্তু এবং উষাতন বাবুর মত গ্রাহ্য করেননি।।
অস্ত্র কিনেন, যুদ্ধ করেন। কোনঠাসা করেন ইউপিডিএফ কে।২০০৬ এর দিকে নিভু নিভু ইউপিডিএফ। যেকোন সময় আত্মসমর্পন করতে বাধ্য।
কিন্তু বোকা হয়ে বসেন সন্তু লারমা, শাসকগোষ্ঠীর পরিকল্পনা না বুজে সন্দহ করা শুরু করের তাতিন্দ্র লাল চাকমার উপর। যুক্তি দেখান তিনি দলের প্রধান, তার পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ করা যাবেনা।
তাতিন্দ্র বাবু মেনে নেন। কিছু করার পূর্বে সন্তু লারমার সিদ্ধান্তের জন্য চলে যেতেন রাঙ্গামাটি। কিন্তু রাঙ্গামাটি যাবার পথে নানিয়াচরে ছিল ইউপিডিএফের শক্ত অবস্হান। তাই বাধ্য হয়ে চলাচল করতেন খাগড়াছড়ি-হাটহাজারী- রাঙ্গামাটির পথ দিয়ে। কিন্তু যাওয়া মাত্র দেখা পেতেন না সন্তু লারমার, ৪-৫ দিন পর দেখা পেতেন। বলা যায়, এক প্রকার ইচ্ছে করে দেখা দিতেন না।
৪-৫ দিন পর দেখা করার পর যে বুদ্ধি দিতেন, সে পরিকল্পনা কাজে দিতনা। কারন ঐ কয়েক দিনেই ইউপিডিএফ এর অবস্হান ভিন্ন হয়ে দাড়াতো। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে সন্তু লারমা থেকে মত নেওয়াটা অগ্রাহ্য করেছিলেন।
এক- এগারো। ইউপিডিএফ এর অবস্হা কাহিল, অবস্হান ভারতীয় সীমান্তে।
এমন সময় মইনুদ্দীন- ফখর উদ্দীন সরকার পাহাড়ে পাশা খেলায় শকুনির চাল চালেন। যে চালে ফেসে যান সন্তু লারমা। মহাভারতে শকুনির চাল বুঝতে না পেরে যুধিষ্ঠির রাজ্য হারান, বস্ত্র হরন হয় দ্রোপধীর।
পাহাড়ে মইন উদ্দীন- ফকর উদ্দীনের চালানো পাশার চালে সন্তু লারমা নিজের গধি না হারালেও বলি দেন তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে।
মূলত সে সময় সেনাবাহিনীরা চেয়েছিল,, চুক্তিবিরোধী শক্তি ইউপিডিএফকে যেকোন মূল্যে বাচিয়ে রাখা। আর তাই ঘোষনা দেয়, পাহাড়ে সেনা অপারেশন চলবে। অবৈধ অস্ত্র যে দলের পাবে, সেই দলকে জবাবদিহি করতে হবে।
বলে রাখা ভালো, পাহাড়ে সেই সময় ইউপিডিএফ শেষ হবার পথে, পাহাড় জুরে ছিল জেএসএস এর গেরিলা সদস্য। আর সেজন্য যদি অপারেশন চলত জেএসএস বেকায়দায় পরার সম্ভাবনা ছিল বেশী।
আর এখানেই ভয় পেয়ে যান সন্তু লারমা,, কারন দলের প্রধান তিনি। আওয়ামীলীগ ওবিএনপির অপকর্মের জন্য দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে চোখের সামনে জেলে কারাবরন করতে দেখেন। তিনি ভাবেন যদি কোন কারনে জেএসএস এর উপর শাসক বাহিনী নজর দেয়, তাহলে তার জেল নিশ্চিত। তিনি সবকিছুর জন্য দোষ দিয়ে বসেন তাতিন্দ্র লাল চাকমার উপর এবং তার অনুসারীদের উপর।
পাঠকগনের জানা উচিত, সেই সময় তাতিন্দ্র লাল চাকমা ছিলেন সেনা বাহিনীর চক্ষুশূল। কারন ছিল, গেরিলা জীবনে অনেক বার তিনি সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেন। আর সেনা পরিকল্পনায় গড়ে উঠা ইউপিডিএফ কোনঠাসা হবার পিছনে নায়ক ছিলেন তাতিন্দ্র বাবু।
তাতিন্দ্র লালকে পাকড়াও করার সুযোগ খুছছিল সেনাবাহিনী,, সুযোগ দেন সন্তু লারমা। ব্যশ্
দুই দুই চার মিলে,,, ফলাফল একএগারোর সময় তাতিন্দ্র লাল চাকমার গ্রেফ্তার। গ্রেফতার করার সময় যার নামে কোন মামলা ছিলনা তিনি জেল থেকে মুক্তি পান ১৬টি মামলার আসামী হয়ে।
তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে গ্রেফতারের পর ওনার সহধর্মীনি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন সন্তু লারমা ও উষাতন বাবুর সাথে। ওনারা সাহা্য্য তো দূরে থাক, ফোনও উঠাননি।
তাতিন্দ্র বাবু গ্রেফতার, কর্মীবাহিনী হতাশ, সেনা পরিকল্পনা সফল। ফলাফল পুনরুজ্জ্বীবিত ইউপিডিএফ আর সন্তু লারমার কারাবাস থেকে কোনোরকমে রেহাই।
তাতিন্দ্র বাবুকে বলিদান দেওয়া বিষয়টা মানতে পারেননি পার্টির নেতৃবন্দরা,
ফলাফল সুধাসিন্ধু, রুপায়ন দেওয়ান, চন্দ্রশেখর, শক্তিমানদের বহিষ্কার এবং মৃত্যু ঘোষনা।
জুম্ম জনগনকে অধিকার পাইয়ে দেওয়ার তাগিদে এসব নেতারা থেমে যাননি। গঠন করেন নতুন পার্টি। জেএসএস(এমএনলারমা)।
অনেক চড়াই উতরাই পথ পেরিয়ে মুক্তি পান তাতিন্দ্র বাবু। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পথে মুখ্য ভুমিকা রাখেন রুপায়ন দেওয়ান এবং শক্তিমান চাকমা।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে এবারও থামেননি তিনি।থামেননি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আর হয়তো থামবেন না মৃত্যুর পরও। কারন মৃত্যুতে থামেনা জীবন। যে আদর্শ ওনি রেখে গেছেন সেটি ওনাকে বাচিয়ে রাখবে।
আজকে পাহাড়ে যেসকল ফেসবুক ব্লগার, ওনাকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছেন, সত্যদর্শী মুলুঙে নামক ছদ্মবেশী রাজনৈতিক বিশ্লেষনকারীরা ওনাকে একএগারোর মীরজাফর চরিত্রে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন,, তাদের উদ্দেশ্য করে বলছি,
কোন এক শান্ত বিকেলে এক কাপ চা নিয়ে বসবেন। পক্ষপাতহীন হয়ে একবার দুবার সাতবার ভাববেন। চিন্তা করবেন ওনার অবদান গুলো। তারপর ওনার ব্যাপারে মন্তব্য করবেন।
সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বে ওনার পাহাড়ের রাজনীতিতে অবদাবগুলো দেখে নিন।
#)ছোট বড় ৫০টির অধিক গেরিলা যুদ্ধে বিজয়।
#)৫০টির অধিক অস্ত্র কেড়ে নেওয়া।
#) বাধি গ্রুপ নিঃশেষ করার নায়ক।
#)চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফকে কোনঠাসা।
#)ভাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের চেষ্টা।
#)ইউপিডিএফ এর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি।
ধন্যবাদ সকলকে।
লেখক
উত্তম কুমার ত্রিপুরা
সদস্য,পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,কেন্দ্রীয় কমিটি।
মূল লিংকঃ https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=980274445769249&id=100013601084590
No comments:
Post a Comment