Thursday, March 11, 2021

কর্মফল- শ্রী সুদীর্ঘ চাকমা

মানুষ তার নিজস্ব নাম নিয়েই বেড়ে উঠে। নামের অর্থ যাই হোক না কেন মানুষের কৃত কর্মের উপরই ব্যক্তির পরিচিতি ঘটে। যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার নাম উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। আর যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করে তার নামের শব্দগত অর্থ যাই হোক না কেন সে নাম হয় ধিকৃত। রাজাকার অর্থ “আল্লাহর সেবক” কিন্তু ’৭১ সালে রাজাকারদের অনৈতিক, আদর্শহীন কার্যকলাপের কারণে মানুষ রাজাকার অর্থ বোঝে খুনি, অত্যাচারী, ধর্ষক ইত্যাদি হিসেবে। মীর জাফর সেই যে পলাশীর যুদ্ধে বেঈমানী করেছিল নবাব সিরাজদ্দৌল্লার সাথে আজো মীর জাফর অর্থ সুন্দর হলেও ব্যক্তির অপকর্মের কারণে নেতিবাচক অর্থে এ নাম ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ বেঈমানী করলে মানুষ বলে মীরজাফরী। ফলে কোন বাবা-মা তাদের নবজাতকের নাম মীর জাফর অথবা রাজাকার রাখেনা। 

বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে কল্পরঞ্জন চাকমা, দীপঙ্কর তালুকদার পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের কাছে বিতর্কিত ও গণধিকৃত হিসেবে বিবেচিত ছিলেন, এখনও আছেন। তাদের কর্মকান্ডের কারণে তাদের এ অবস্থা। আমার পরিচিত দু’জন ছাত্রকে দেখেছি একজনের নাম দীপংকর আর একজনের নাম কল্পরঞ্জন। ঐ নাম নিয়ে বেচারারা অস্বস্তিতে ভুগতো। বন্ধু-বান্ধবরাও রসিকতা করতো, খোঁচা মারতো। অথচ তারা কি জানতো, যে নাম তাদের অভিভাবকবৃন্দ রেখেছেন তা এতই বিতর্কিত ও ঘৃণিত হবে। যে নাম শুনে স্ব-জাতি ছি! ছি! করবে। ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তীতে আওয়ামীলীগের স্থানীয় তিন সাংসদ পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনতো ঘটাতেই পারেননি তদুপরি জুম্ম স্বার্থ তথা স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বার্থ পরিপন্থী কাজে লিপ্ত ছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের অনেক আশ্বাস দিলেও নিজের আখের গোছানো ছাড়া তারা কিছুই করেননি। তাদের সরকার চুক্তি করলে তারা চুক্তি বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাঁধা সৃষ্টি করেছেন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের তাদের ব্যাপারে এত অসন্তোষ। তাদের এরকম কর্মকান্ডের কারণে তাদের নাম আজ এতই বিতর্কিত। যথেষ্ট সন্দেহ হয় বর্তমানে কোন নবজাতকের নাম দীপঙ্কর-কল্পরঞ্জন নামে কেউ রাখে বলে। মানুষ এমন ব্যক্তির নাম অনুস্মরণ করে যে দেশের-জাতির ও সমাজের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে নিঃস্বার্থ হয়ে কাজ করে গেছেন। সমাজের অগ্রগতিতে, সকল প্রকার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে যথার্থ ভূমিকা রেখেছেন। 

লেলিন, স্টালিন, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, মাওসেতুং, প্রীতিলতা ইত্যাদি নাম সমূহ কোন নির্দিষ্ট ভাষা, সংস্কৃতি-ভূমন্ডলে আবদ্ধ না থেকে সারা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। এ নামে ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন জাতি নবজাতকের নাম রেখেছে। কারণ তাঁরা ছিলেন ভালো কাজের দৃষ্টান্ত স্বরুপ। 

বিগত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় তিন আসনের মধ্যে দু আসনে বিএনপি ও শরীক দল প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা জানেন কোন পরিস্থিতিতে, কোন ঐশ্বরিক কারণে তাদের এত অনুকূল অবস্থা তৈরী হয়েছিল। যুক্তিসঙ্গত কারণে বিজয়ী সাংসদের প্রতি পার্বত্যবাসীর আশা-আকাঙ্খা থাকাটা স্বাভাবিক। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীগণ চাল, ডাল, কম্বলের চাইতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ সর্বোপরি মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার চাই। টাকা আর ডলার দিয়ে বাড়ির ছাউনী নির্মাণ করলেও মানুষের শান্তি আসবেনা, যদি পার্বত্য সমস্যার ব্যাপারে সঠিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়। “৯১-৯৬” পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলের পরিস্থিতি পাহাড়ীরা এখনও ভুলে যেতে পারেনি। ভুলে যেতে পারেনি লোগাং, নান্যাচর গণহত্যা, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানে সংঘটিত সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। পার্বত্য বাসীর আস্থা, বিশ্বাস অর্জন করতে না পারলে মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যান অর্থ-বিত্তের মালিক হলেও ইতিহাসের খল নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। প্রয়াত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মন্ত্রী হননি, লাল সবুজের পতাকাবাহী গাড়ীতে চড়েননি। চাল, গম, টেন্ডার, প্রজেক্ট জনগণকে বিলিয়ে দিতে পারেননি; তারপরও কোন এক যাদুমন্ত্রে তিনি আজো জুম্ম জনগণের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে আছেন। সেই যাদুমন্ত্র হচ্ছে- তিনি দুঃখী মানুষের অধিকার অঞ্চিত মেহনতী মানুষের মনের কথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, নিপীড়িত, নির্যাতিত, স্বাধিকার, অধিকার হারা জুম্ম জনগণের কথা ভুলে যাননি। মহান সংসদে, সংসদের বাইরে মানুষের অধিকারের কথা সকল শোষণ বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছিলেন। সংসদ সদস্য হয়েও তাঁর মৌলিক কোন পরিবর্তন হয়নি। জনগণের বন্ধু হিসেবেই ছিলেন সবসময়। সংসদ সদস্য হওয়ার আগে এমন পরেও তেমন। 

বর্তমান সময়ে আমাদের এমপিগণ নির্বাচন আসলেই দুঃখী মানুষকে চেনেন, জানেন, প্রতিশ্রুতি দেন সকল সমস্যার সমাধান করেন। নির্বাচিত হলে দুঃখী মানুষের ব্যাথা বেদনার কান্না তাদের কানে পৌঁছেনা। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা হতে বর্তমানে এমপি মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি হিসেবে যারা মনোনিত হয়েছেন তাঁদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে কারো কারো নাম আবারও ঘৃণ্য বিবেচিত হবে। 

বাংলাদেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিশ্রুতি না রাখার সংস্কৃতি খুবই প্রতীয়মান। প্রার্থী, দল নির্বাচনে যে সব প্রতিশ্রুতি দেন তা কাউকে পৃথক করার জো নেই। জুম্ম জনগণ কখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি, পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনে শুনে আসছে। জুম্ম জনগণ শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়না জুম্ম জনগণ বাস্তবিক অর্থে কথার বাস্তবায়ন চাই। আর তা যদি না হয় তাহলে জনগণের প্রবল চাপের জোয়ারে মন্ত্রী এমপিদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে বাধ্য। [প্রকাশ সূত্রঃ কেওক্রডং(পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের মুখপত্র), বুলেটিন নং-১, ১ম বর্ষ, ১০ নভেম্বর ২০০২] [সুদীর্ঘ চাকমার হত্যার ৮ বছর আজ, ২০১৩ সালের ১২ই মার্চ লংগদুতে সাংগঠনিক সফরের সময় ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে তিন সহযোদ্ধাসহ নির্মমভাবে শহীদ হন। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার এই প্রবন্ধটি অনলাইনে প্রকাশ করা হল]

প্রসঙ্গঃ পর্যটন- শ্রী সুদীর্ঘ চাকমা

নৈস্বর্গিক পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রকৃতির নিপুণতায় নয়নাভিরাম নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, সবুজ বনাঞ্চল সাথে বিভিন্ন ভাষাভাষি স্বতন্ত্র সংস্কৃতির আদিবাসী জনগণ। প্রকৃতির মতই সহজ সরল তাদের জীবন। ভরা ফসলের জুম ক্ষেত ভরিয়ে দেয় পাহাড়ী নর-নারীর হৃদয়। এক জুমে চাষ হয় অনেক প্রজাতির ফসল, যেন একটা বাজার। 

ইংরেজরা এই জায়গার নাম দিয়েছিল কার্পাস মহল। কার্পাসের মাধ্যমে কর দিতে হতো ইংরেজকে। ইংরেজরা যায় যায় কালে রেড ক্লীপের দেশ বিভাগের অপারেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয় পাকিস্তানে। যদিও বহু জাতির সন্নিবেশ ঘটেছিল ভারতের সার্বভৌমত্বে। পাহাড়িরা মেনে নিতে পারেনি এই দেশ বিভক্তি। মেনে নিতে না পারার অপরাধে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ১৯৬০ সালে ৫৪ হাজার একর ধান্যজমি পানির নিচে তলিয়ে দিয়ে, হাজার হাজার পাহাড়ী মানুষকে উদ্বাস্তু বানিয়ে নির্মাণ করে কাপ্তাই বাঁধ। অসহায় পাহাড়ী মানুষের চোখের অশ্রুতে ভরে উঠে কাপ্তাই হৃদ। 

কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুৎ উদ্বাস্তু হওয়া জুম্মদের বাড়ি পৌঁছেনা। কাপ্তাই এর বিদ্যুৎ আলোকিত করে শহরকে, শহরবাসীকে। উদ্বাস্তু পাহাড়ীরা থাকে অন্ধকারে। ফলে তাদের হাসি-কান্না দেখেনা কেউ। শজ সরল জুম্মদের এতবড় শাস্তি দিয়েও শাসকের মন ভরেনা। শাসকের পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয়না পাহাড়ী মানুষের জীবনধারা। নতুন শাসকেরাও ধ্বংস করে দিতে চাই পাহাড়ীদের। মাটি তাদের প্রয়োজন, পাহাড়ীদের নয়। স্বপ্নে বিভোর মানুষ স্বপ্নহীন হয়ে যায়। 

গড়ে উঠে প্রতিরোধ সংগ্রাম। কত মানুষের রক্ত, জীবন ঝরে পড়ে অকালে। নতুন করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে পাহাড়ীরা। জুম্ম নারীর আর্তচিৎকারে, মুক্তির আকাঙ্খায় সরল মানুষ প্রতিবাদী হয়ে অস্ত্র ধরে। শান্তির প্রত্যাশায় সুখী সমৃদ্ধশালী একটি দেশ গঠনের লক্ষে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির সুবাতাস পরিবাহিতের জন্য সাহসী মানুষেরা অস্ত্র পরিত্যাগ করে চুক্তির মাধ্যমে চলে আসে স্বাভাবিক জীবনে। 

প্রকৃতি এবং কৃত্রিমতায় মিশ্রণে এক সৌন্দর্যের শহর রাঙ্গামাটি। অন্য দিকে খাগড়াছড়ি, বান্দরবানও প্রকৃতির সৌন্দর্যে অপরুপে অপরুপা। সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বিভিন্ন ভাষাভাষী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী। যারা প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বংশ পরম্পরায় বেঁচে আছে। 

ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে চোখে পড়ার মতো দেশী-বিদেশী পর্যটক দেখা যায়। সরকার বিদেশীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা প্রদান করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশী-বিদেশী অনেক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় এক স্থানে পরিণত হয়। পর্যটনকে একটি শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই শিল্পের সাথে বিভিন্ন মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। চুক্তি পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য উন্নত রাস্তাঘাট, হোটেল, রেস্ট হাউজ ও তাদের মনোরঞ্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজনের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামকে কৃষি নির্ভর অর্থনীতির অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করলেও অত্রাঞ্চলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু পর্যটন শিল্পকেই গুরুত্বারোপ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছিল যে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হাজার হাজার পরিবার দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে এবং এখনও পর্যন্ত অনেকেই নিজ ভিটে মাটিতে ফিরে যেতে পারেনি। ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী ও রাজনৈতিক কারণে উদ্বাস্তুদের যথাযথ পুনর্বাসনের জন্য আগে পরিকল্পনা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার এবং তা অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু সরকার তা না করে রাস্তাঘাট নির্মাণসহ পর্যটন শিল্পের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধের আয়োজন করে। শুধুমাত্র পথ-ঘাট তৈরি, বড় বড় বিল্ডিং নির্মাণ করাকেই সরকার উন্নয়ন বলে চালিয়ে দিতে চায়। প্রকৃত অর্থে জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনগ্রসর রেখে প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারেনা। 

পার্বত্য চুক্তির পর যখন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের কর্মসূচী সম্প্রসারিত করে তখন অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, এ অঞ্চলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি আরো বিরুপ। বিভিন্ন সুবিধার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধার কারণে পার্বত্যবাসী আজ নিঃস্ব। ঠিক তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাকেও অনেকেই সাধুবাদ দিয়ে থাকেন, আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করেন। এটাও পার্বত্যবাসীর জন্য এক অভিশাপ তা সন্দেহাতীত ভাবেই বলা যায়। বাস্তবে আমরা দেখতে পাই বিশ্বের যে সকল দেশে পর্যটন শিল্পের সম্প্রচার ঘটেছে সেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবন চরম অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছে। সে অঞ্চলের জনগণের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়েছে। নারীরা চরম নিপীড়ন ও অপমানের শিকার হয়েছেন। পর্যটন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হল Hospitality Girls বা মনোরঞ্জক মহিলা। পর্যটন শিল্পের অন্যতম দেশ থাইল্যান্ডে নারীত্বের যে অপমান সত্যিই সে দেশের মানুষকে মাথা নত করে দেয়। থাইল্যান্ডের রোজী ট্রাভেল কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপনে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য লেখা হয়েছে- “বিদেশীদের কাছে থাইল্যান্ড এক আকর্ষণীয় দেশ। বিশেষ করে এ কথাটা খাটে মহিলা সংক্রান্ত বিষয়ে। কিন্তু অনেক সময় বিদেশীরা এসে সমস্যা পড়েন, বুঝতে পারেন না কোথায় গেলা এ অনাস্বাধিত আনন্দের খোঁজ পাওয়া যাবে। আমাদের রোজী কোম্পানি তাঁদের এই সমস্যার সমাধান মেটাচ্ছে। ইতিহাসে এই প্রথম এই সুযোগ পাচ্ছেন। আমাদের এই বইতে যে তালিকা দেয়া আছে সেটা দেখুন এবং থাইল্যান্ডে অনাস্বাধিত আনন্দ ভোগের জন্য টিকিট বুক করুন”। বিশ বছর বয়সি থাই মহিলা নৈ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- আমি যে ব্যাটারি কোম্পানিতে কাজ করি, তা থেকে যা পাই তা দিয়ে চলেনা। খাওয়া, বাসের টিকিট ও অবশ্য প্রয়োজনীয় খরচ এতে একেবারেই মেটেনা। আমি খুব হিসাব করেই খরচ করি তাই আমাকে রাতেও কাজ (!) করতে হয়, আমাকে বাবা-মা’র জন্য কিছু অর্থ তো পাঠাতেই হবে। ফিলিপাইনে সরকারি হিসাব মতে এক লক্ষ এই মনোরঞ্জক মহিলা রয়েছে। বেসরকারি হিসাবে তা আরও বেশি। নাইট ক্লাবে বিদেশীরা তাদের জন্য মনোরঞ্জক মহিলা নির্বাচিত করেন। গড়ে ভাড়া ৬০ ডলার, নিষ্পেষিতা মহিলাটি পান মাত্র ৬ ডলার। ৫৪ ডলার যায় দালাল ও সরকারেরপেটে। দক্ষিণ কোরিয়ার পতিতাদের নাম “কিয়েসায়েঙ”। তারা তাদের দেহ নিংড়ে প্রতিবছর সরকারকে ২৭ কোটি ডলার মুনাফা অর্জন করে দেয়। সেখানে আছে “কিয়েসায়েঙ রেস্টুরেন্ট”। পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের গোয়ায় ১৯৭৬ সালে মার্কিন বহুজাতিক সংস্থা ফাইভ স্টার হোটেল গড়ে তোলে। ১৯৮৭ সালের ৩০ মেগোয়া পূর্ণ রাজ্য হলে জুলাই মাসের নতুন সরকার ঘোষণা দিল যে, ট্যুরিজম হল গোয়ার মূল শিল্প। সরকার আইন করলো যে, হোটেলের জন্য জমি চাইলে অবশ্যই বিক্রি করতে হবে। জমির মালিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছা মূল্যহীন। স্থানীয় জনসাধারণ উৎখাত হতে বাধ্য হল নব্য ও বিকৃত শকুনের থাবার কারণে। তেমনিভাবে মিশরে পর্যটন শিল্পের কারণে করুণ অবস্থা। মেক্সিকোতে পর্যটনের জন্য প্রমোদ হোটেল নির্মাণার্থে মাইলের পর মেইল বন কেটে উজার করা হয়েছে। (তথ্যসমূহ- সর্বগ্রাসী অক্টোপাস, অন্যচোখে পরিষদ) 

US News and world report- এ বলা হয়েছে আমেরিকাতে যে পরিমাণ গম উৎপন্ন হচ্ছে তা দিয়ে সারা বিশ্বে প্রতিদিন প্রতিটি মানুষকে সাতটি করে মোটা সাইজের রুটি খাওয়ানো যায়। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষ যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করে তা দিয়ে প্রতিটি মানুষকে ২০৩৪ ক্যালরী খাবার সরবরাহ করা যায়। কিন্তু মানুষ পাচ্ছে মাত্র ১৫০০ ক্যালরী। বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রয়েছে২ কোটি ২৪ লক্ষ একর। উক্ত জমিতে চাষ করে ১৩কোটি মানুষের অন্ন যোগানো কোন ব্যাপারই নয়। সমাজে গুটিকয়েক মানুষ সর্বত্রই কৃত্রিম সংকট তোইরি করে রেখেছে। একদিকে মানুষের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে গরীব মানুষের নৈতিক চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য দেশী-বিদেশী শোষকেরা সূক্ষভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। পর্যটনও সেরকম একটি পরিকল্পনা। মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদি নাগরিক সুবিধাদি নেই অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল পর্যটন কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। গরীব মানুষের কুঁড়ে ঘরের আঙিনায় তারা “পাঁচতারা” হোটেল বানাবে আর গরীব মানুষের বেঁচে থাকার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দিয়ে বাধ্য করবে তাদের পাঁচতারা হোটেলে পয়সাওয়ালাদের আনন্দ উল্লাসের সামগ্রী হতে। তীব্র পেটের ক্ষুধায়, আর্থিক সংকটে যখন কোন তরুণী, গৃহিণী তার ভাইকে বাবাকে, পরিবারের সদস্যদের অভাবের জ্বালায় ছটফট করতে দেখবে তা সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হবে ঐ সাজানো বিলাসবহুল অট্টালিকায়। মানুষের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়েই তার এসব অনৈতিক কাজ করতে চায়। সিলেটের মৌল্ভী বাজারে মাধবকুন্ডে ৪০টির মত খাসিয়া গ্রামে ১৫ হাজার খাসিয়া অধ্যুষিত এলাকায় সরকার “ইকোপার্ক” তৈরির মাধ্যমে আদিবাসীদের চিড়িয়াখানার জন্তু বানাতে চায়। ঢাকায় আদিবাসী পল্লী গড়ার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে শাসকের চরিত্র ফুটে উঠে। তারা ঐ আদিবাসী পল্লীতে বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর লোক এনে রাখবে আর তাদের দেখতে আসবে দেশী-বিদেশী কত পর্যটক। মানুষকে দিয়ে মুনাফার স্বার্থে তারা ব্যবসা করে আর মানুষের চরিত্রকে নষ্ট করে দেয়- যাতে মানুষ প্রতিবাধীন নির্জীব প্রাণীতে পরিণত হয়। 

সাম্রাজ্যবাদীদের থাবায় আজ সারা বিশ্ব আক্রান্ত। সাথে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন দেশের লুটেরা গোষ্ঠী। অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে তারা ব্যবসা করে। মুনাফা কামায় করে। বিশ্বে যে স্কল দেশে অন্যায়, নিপীড়ন সংঘটিত হচ্ছে সেখানেই রয়েছে দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের কালো থাবা। দেশে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি, মানুষকে চারিত্রিক অধঃপতনে নামিয়ে দিয়ে তারা শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে চাই। বহুজাতিক কোম্পানি সংস্থা ব্যাংক নিরীহ জনগণকে এক হাতে কিছু দিয়ে অন্য হাতে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রেও দেখা যায় স্থানীয় মানুষের চরিত্রকে ধ্বংস করে, সমাজকে কলুষিত করে বিনা বাঁধায় তারা মুনাফা আদায় করতে চাই। সবসময়ই ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ রাখা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় অধিবাসীদের। কখনো পাহাড়ী-বাঙ্গালী বিভেদ, কখনো ভাইয়ে-ভাইয়ে বিভেদ, কখনো জাতিতে জাতিতে বিভেদের জাল বোনা হয়েছে। ঠিক তেমনি বর্তমানেও পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন মায়ার জাল বোনা হচ্ছে। এই মায়ার জাল থেকে সকলকে সচেতনভাবেই অতীতের মত প্রতিরোধ করতে হবে। তা করতে না পারলে শাসকের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বে এ অঞ্চলের জনসাধারণ। 

 [প্রকাশ সূত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মুখপত্র জুম্ম সংবাদ বুলেটিন, বুলেটিং নং-২৮// ১০ বর্ষ//এপ্রিল ২০০২// বিশ্ব নারী দিবস সংখ্যা]

[সুদীর্ঘ চাকমার হত্যার ৮ বছর আজ, ২০১৩ সালের ১২ই মার্চ লংগদুতে সাংগঠনিক সফরের সময় ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে তিন সহযোদ্ধাসহ নির্মমভাবে শহীদ হন। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার এই প্রবন্ধটি অনলাইনে প্রকাশ করা হল]