Thursday, March 11, 2021

কর্মফল- শ্রী সুদীর্ঘ চাকমা

মানুষ তার নিজস্ব নাম নিয়েই বেড়ে উঠে। নামের অর্থ যাই হোক না কেন মানুষের কৃত কর্মের উপরই ব্যক্তির পরিচিতি ঘটে। যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার নাম উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। আর যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করে তার নামের শব্দগত অর্থ যাই হোক না কেন সে নাম হয় ধিকৃত। রাজাকার অর্থ “আল্লাহর সেবক” কিন্তু ’৭১ সালে রাজাকারদের অনৈতিক, আদর্শহীন কার্যকলাপের কারণে মানুষ রাজাকার অর্থ বোঝে খুনি, অত্যাচারী, ধর্ষক ইত্যাদি হিসেবে। মীর জাফর সেই যে পলাশীর যুদ্ধে বেঈমানী করেছিল নবাব সিরাজদ্দৌল্লার সাথে আজো মীর জাফর অর্থ সুন্দর হলেও ব্যক্তির অপকর্মের কারণে নেতিবাচক অর্থে এ নাম ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ বেঈমানী করলে মানুষ বলে মীরজাফরী। ফলে কোন বাবা-মা তাদের নবজাতকের নাম মীর জাফর অথবা রাজাকার রাখেনা। 

বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে কল্পরঞ্জন চাকমা, দীপঙ্কর তালুকদার পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের কাছে বিতর্কিত ও গণধিকৃত হিসেবে বিবেচিত ছিলেন, এখনও আছেন। তাদের কর্মকান্ডের কারণে তাদের এ অবস্থা। আমার পরিচিত দু’জন ছাত্রকে দেখেছি একজনের নাম দীপংকর আর একজনের নাম কল্পরঞ্জন। ঐ নাম নিয়ে বেচারারা অস্বস্তিতে ভুগতো। বন্ধু-বান্ধবরাও রসিকতা করতো, খোঁচা মারতো। অথচ তারা কি জানতো, যে নাম তাদের অভিভাবকবৃন্দ রেখেছেন তা এতই বিতর্কিত ও ঘৃণিত হবে। যে নাম শুনে স্ব-জাতি ছি! ছি! করবে। ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তীতে আওয়ামীলীগের স্থানীয় তিন সাংসদ পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনতো ঘটাতেই পারেননি তদুপরি জুম্ম স্বার্থ তথা স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বার্থ পরিপন্থী কাজে লিপ্ত ছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের অনেক আশ্বাস দিলেও নিজের আখের গোছানো ছাড়া তারা কিছুই করেননি। তাদের সরকার চুক্তি করলে তারা চুক্তি বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাঁধা সৃষ্টি করেছেন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের তাদের ব্যাপারে এত অসন্তোষ। তাদের এরকম কর্মকান্ডের কারণে তাদের নাম আজ এতই বিতর্কিত। যথেষ্ট সন্দেহ হয় বর্তমানে কোন নবজাতকের নাম দীপঙ্কর-কল্পরঞ্জন নামে কেউ রাখে বলে। মানুষ এমন ব্যক্তির নাম অনুস্মরণ করে যে দেশের-জাতির ও সমাজের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে নিঃস্বার্থ হয়ে কাজ করে গেছেন। সমাজের অগ্রগতিতে, সকল প্রকার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে যথার্থ ভূমিকা রেখেছেন। 

লেলিন, স্টালিন, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, মাওসেতুং, প্রীতিলতা ইত্যাদি নাম সমূহ কোন নির্দিষ্ট ভাষা, সংস্কৃতি-ভূমন্ডলে আবদ্ধ না থেকে সারা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। এ নামে ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন জাতি নবজাতকের নাম রেখেছে। কারণ তাঁরা ছিলেন ভালো কাজের দৃষ্টান্ত স্বরুপ। 

বিগত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় তিন আসনের মধ্যে দু আসনে বিএনপি ও শরীক দল প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা জানেন কোন পরিস্থিতিতে, কোন ঐশ্বরিক কারণে তাদের এত অনুকূল অবস্থা তৈরী হয়েছিল। যুক্তিসঙ্গত কারণে বিজয়ী সাংসদের প্রতি পার্বত্যবাসীর আশা-আকাঙ্খা থাকাটা স্বাভাবিক। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীগণ চাল, ডাল, কম্বলের চাইতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ সর্বোপরি মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার চাই। টাকা আর ডলার দিয়ে বাড়ির ছাউনী নির্মাণ করলেও মানুষের শান্তি আসবেনা, যদি পার্বত্য সমস্যার ব্যাপারে সঠিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়। “৯১-৯৬” পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলের পরিস্থিতি পাহাড়ীরা এখনও ভুলে যেতে পারেনি। ভুলে যেতে পারেনি লোগাং, নান্যাচর গণহত্যা, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানে সংঘটিত সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। পার্বত্য বাসীর আস্থা, বিশ্বাস অর্জন করতে না পারলে মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যান অর্থ-বিত্তের মালিক হলেও ইতিহাসের খল নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। প্রয়াত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মন্ত্রী হননি, লাল সবুজের পতাকাবাহী গাড়ীতে চড়েননি। চাল, গম, টেন্ডার, প্রজেক্ট জনগণকে বিলিয়ে দিতে পারেননি; তারপরও কোন এক যাদুমন্ত্রে তিনি আজো জুম্ম জনগণের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে আছেন। সেই যাদুমন্ত্র হচ্ছে- তিনি দুঃখী মানুষের অধিকার অঞ্চিত মেহনতী মানুষের মনের কথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, নিপীড়িত, নির্যাতিত, স্বাধিকার, অধিকার হারা জুম্ম জনগণের কথা ভুলে যাননি। মহান সংসদে, সংসদের বাইরে মানুষের অধিকারের কথা সকল শোষণ বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছিলেন। সংসদ সদস্য হয়েও তাঁর মৌলিক কোন পরিবর্তন হয়নি। জনগণের বন্ধু হিসেবেই ছিলেন সবসময়। সংসদ সদস্য হওয়ার আগে এমন পরেও তেমন। 

বর্তমান সময়ে আমাদের এমপিগণ নির্বাচন আসলেই দুঃখী মানুষকে চেনেন, জানেন, প্রতিশ্রুতি দেন সকল সমস্যার সমাধান করেন। নির্বাচিত হলে দুঃখী মানুষের ব্যাথা বেদনার কান্না তাদের কানে পৌঁছেনা। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা হতে বর্তমানে এমপি মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি হিসেবে যারা মনোনিত হয়েছেন তাঁদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে কারো কারো নাম আবারও ঘৃণ্য বিবেচিত হবে। 

বাংলাদেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিশ্রুতি না রাখার সংস্কৃতি খুবই প্রতীয়মান। প্রার্থী, দল নির্বাচনে যে সব প্রতিশ্রুতি দেন তা কাউকে পৃথক করার জো নেই। জুম্ম জনগণ কখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি, পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনে শুনে আসছে। জুম্ম জনগণ শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়না জুম্ম জনগণ বাস্তবিক অর্থে কথার বাস্তবায়ন চাই। আর তা যদি না হয় তাহলে জনগণের প্রবল চাপের জোয়ারে মন্ত্রী এমপিদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে বাধ্য। [প্রকাশ সূত্রঃ কেওক্রডং(পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের মুখপত্র), বুলেটিন নং-১, ১ম বর্ষ, ১০ নভেম্বর ২০০২] [সুদীর্ঘ চাকমার হত্যার ৮ বছর আজ, ২০১৩ সালের ১২ই মার্চ লংগদুতে সাংগঠনিক সফরের সময় ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে তিন সহযোদ্ধাসহ নির্মমভাবে শহীদ হন। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার এই প্রবন্ধটি অনলাইনে প্রকাশ করা হল]

No comments: