Sunday, May 3, 2020

একজন শক্তিমান চাকমা ও পাহাড়

অস্ত্রধারীদের গুলিতে নানিয়ারচর ...
এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা

পাহাড়ের একমাত্র লড়াকু ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।৮০'র দশক,পার্বত্য চট্টগ্রাম তখন বারুদের গন্ধে ভরা।বন পাহাড়ে যতদূর  শোনা যায় শুধু রাইফেল-মর্টারশেলের আওয়াজ।পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগন তখন তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের শাসক শ্রেণী তথা বাংলাদেশ সরকারের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। ১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় ঘটে গিয়েছিল এক বিরাট হত্যাযজ্ঞের ঘটনা।পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া গণহত্যাগুলোর একটি।সেনাবাহিনীর প্রত্যেক্ষ সহযোগীতায় সেটলার বাঙালীরা আদিবাসীদের ছয়টি গ্রামে চালিয়েছিল হত্যাকান্ড।শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে লুটপাট করেছিল আদিবাসী জনপদ।গুলি করে পাখির মত হত্যা করা হয়েছিল আদিবাসী আবাল বৃদ্ধ-বণিতাকে।
"অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল" এর তৎকালীন রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৬জন নারী পুরুষকে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় আদিবাসীদের দাবী অনুযায়ী এর সংখ্যা দ্বিগুনেরও বেশী।  আহত হয়েছিলেন আনুমানিক ৫০০ এর অধিক।হত্যার পর এসব লাশগুলোও হস্তান্তর করা হয়নি পরিবারের কাছে।এ হত্যাকান্ডে দুটি গির্জাসহ অসংখ্যা বৌদ্ধমন্দির ভাংচুর ও পুড়িয়ে দেয়া হয়।পার্বত্য চট্টগ্রামে তখন সামরিক শাসন চলছিল ফলে এ হত্যাকান্ডের জন্য কোন প্রতিবাদ মিছিল-সমাবেশ করা সম্ভব হয়নি।দেশে তখন স্বৈরাচারী এরশাদের শাসন চলছিল।পুরোদেশে তখন ছাত্রদের মিছিল,মিটিং,সভা-সমাবেশ চলছিল স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে।

সেসময়ে লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদ করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত জুম্ম ছাত্ররা একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জুম্ম শিক্ষার্থীদের খবর দেয়া হয়।ছাত্রদের প্রথম বৈঠক হয় ২০শে মে ১৯৮৯ এর বিকেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) রশিদ হলের ২০০২ নং রুমে।মিটিংয়ে বুয়েট,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় ও মোহাম্মদপুর হোস্টেলের ছাত্ররা উপস্থিত ছিলেন।ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর ছাত্ররা মিটিংয়ে পৌঁছেনি।সেদি্নের সেই মিটিংয়েই গঠিত হয় পাহাড়ের লড়াকু ছাত্র সংগঠন  আজকের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।সিদ্ধান্ত হয় পরদিন ২১শে মে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে শোক মিছিল হবে। ২১শে মে এর প্রতিবাদ মিছিল কোন স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে নয়,কোন ব্জ্রকন্ঠেও নয়।সে মিছিল ছিল শান্তিপূর্ণ শোক মিছিল;মৌন মিছিল,কিন্তু চেতনায় ছিল বিদ্রোহ-বুকে ছিল প্রতিবাদের আগুন।
সেদিনের সেই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শক্তিমান চাকমা।শক্তিমান চাকমা ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা।হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বাংলাদেশ ছাত্র,যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি। সেদিন তিনি মাতৃভূমির ডাকে সারা দিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিলেন এবং লাভ করেছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতির পদ।এরপর শুরু হয় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে শক্তিমান চাকমারও পথচলা।আজকের এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার,আত্মবিসর্জনের।
জনসংহতি সমিতি তখন বাংলাদেশ সকারের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত,পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে জনসংহতি সমিতির সম্পর্ক গড়ে উঠে। ছাত্র পরিষদ গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকে আর জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র আন্দোলন।ছাত্র পরিষদ হয়ে উঠে জনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন।
পরে শক্তিমান চাকমা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে হয়ে উঠেন একজন এ্যাডভোকেট।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সাথে বিভিন্ন সময় জনসংহতি সমিতির ২৬ বারের বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।যা বিশ্বব্যাপী শান্তি চুক্তি নামে সমধিক পরিচিত।চুক্তিতে শান্তি চুক্তির উল্লেখ না থাকলেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি হয়েছিল বিধায় শান্তি শব্দটি অধিক জনপ্রিয়টা পেয়েছিল।চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনেও শক্তিমান চাকমার যে প্রচুর অবদান ছিল তা অস্বীকার করার জো নেই।বলতে হয় তার কারণেই তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।কারণ সাবেক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তৎকালীন বহু আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতার সাথে তার সখ্যটা ছিল।কিন্তু চুক্তিকে শান্তি চুক্তি আখ্যা দেয়া হলেও আজ ২২টি বৎসর অতিক্রম হলেও জুম্ম জনগন শান্তির দেখা পায়নি। চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন না করেই সরকার বলছে চুক্তি ৭২টি ধারার ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে।

চুক্তির সময় তৎকালীন কিছু ছাত্র নেতা চুক্তির বিরোধীতা করেছিল।যার কারণে চুক্তির পর চুক্তির বিপক্ষরা ১৯৯৮ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ইউপিডিএফ নামে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করেছিল।যার প্রধান ছিলেন সাবেক পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা।
পাহাড়ের রাজনীতি দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে চুক্তির পক্ষ আর বিপক্ষ।চুক্তির পক্ষ হচ্ছে জনসংহতি সমিতি আর বিপক্ষ হচ্ছে ইউপিডিএফ।শক্তিমান চাকমাসহ অসংখ্যা ছাত্র নেতা থেকে যায় চুক্তির পক্ষ জনসংহতি সমিতির সাথে।পাহাড়ে শুরু হয় সংঘাত।চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন থমকে যায়।
একে অপরকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠে দুটি দল।
যে সময় ইউপিডিএফ দুর্বল হয়ে পড়ে,সে সময় জনংহতি সমিতিতে ফাটল দেখা দেয়।জনসংহতি সমিতিতে আত্মকোন্দল শুরু হলে ২০১০সালের ১০ এপ্রিল তা প্রকাশ্য বিভক্ত হয়ে পড়ে।অভিযোগ করা হয় সন্তু লারমা তার একঘেয়েমি ও সেচ্ছাচারিতার কারণে কিছু জনসংহতি সমিতির প্রবীণ নেতাকে নবম জাতীয় কংগ্রেস ও পার্টি থেকে বাদ দেয়ার ফলে পার্টি বিভক্ত হয়।যেসব প্রবীণ নেতাকে বাদ দেয়া হয়েছিল তারা হলেন তৎকালীন সহ-সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা,সহ-সভাপতি রুপায়ন দেওয়ান,সাধারণ সম্পাদক চন্দ্র শেখর চাকমা,সহ সাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমাসহ বহু নেতা।ফলে তাঁদের সমর্থন দেয়া কর্মীদের দিয়ে গড়ে উঠে পাহাড়ের আরেকটি সংগঠন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)।এমএনলারমার আদর্শে গড়া সংগঠন জনসংহতি সমিতি।তাই সংগঠনের নামের সাথে এমএনলারমা নামটি জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবী করা হয়।শক্তিমান চাকমা যোগদেন নতুন গঠিত হওয়া জনসংহতি সমিতিতে।পরে দায়িত্ব পান সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে।
পাহাড়ে জন্ম হয় আরেকটি নতুন সংগঠনের।জুম্ম জনগন পা বাড়ায় আরেকটি সংঘাতে।
সংঘাত রূপ নেয় জেএসএস(সন্তু লারমা) বনাম ইউপিডিএফ,জেএসএস(এমএনলারমা)।

শক্তিমান চাকমা ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে এমএনলারমা দলের পক্ষ হতে নির্বাচন করে রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়াচর উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।এরপর তার উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন করেছেন বলে লোকেমুখে শোনা যায়।

 এককালীন ইউপিডিএফ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা(বর্মা) ও শ্যামল কান্তি চাকমা(তরু) তাঁদের সংগঠনের কাছ থেকে যখন বিভিন্ন হয়রানি,তোষামেদ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে গুপ্ত হত্যার কথা জানতে পারলে তারা এমএনলারমা দলে আশ্রয় নেয়।কিন্তু ইউপিডিএফ থেকে বর্মা-তরুদের তাঁদের হাতে তুলে দিতে এমএনলারমা দলকে চিঠি দেয়া হয়েছিল।কিন্তু আমরা যদি ইতিহাস দেখি তাহলে আমরা দেখতে পাই রাজনৈতিক আশ্রিত কাউকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়নি।
এমএনলারমা দলও তাই করেছিল বলে আমরা জানতে পারি।যখন ইউপিডিএফ থেকে অতিরিক্ত চাপ আসতে থাকে তখন বর্মা-তরুদের তাঁদের পথ তাদেরকে খুজতে বলা হলে তাঁরা নতুন একটি সংগঠন ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) গঠন করে।মানবিক কারণে তাদেরকে এমএনলারমা দল নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয়।
এমএনলারমা দল গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে সাংগঠনিক সুযোগ দেয়ার কারণসহ বিভিন্ন কারণে শক্তিমান চাকমাকে হত্যার খবর আমরা জানি। 
( ইউপিডিএফ-এমএনলারমা দলের সংঘাত সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে আমার পূর্বের লেখাটা পড়তে পারেন।
Link:https://draft.blogger.com/blogger.g?blogID=3863652744512578728#editor/target=post;postID=8586920090343160249;onPublishedMenu=allposts;onClosedMenu=allposts;postNum=1;src=postname)

২০১৮ সালের ৩রা মে বেলা এগারটার দিকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে শক্তিমান চাকমাকে।জানা যায় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ আর জেএসএস সন্তু গ্রুপের সমন্বিত পরিকল্পনাতেই তাকে হত্যা করা হয়।ঝড়ে যায় পাহাড়ের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
পরদিন ৪ঠা মে তার শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাওয়ার সময়  রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের ১৭মাইল এলাকায়  ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় শহীদ হন ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা(বর্মা) সহ ৫জন।

আজ ৩রা মে ২০২০,পাহাড়ের উজ্জ্বল একটি নক্ষত্র হারানোর দুবছর পূর্ণ হলো।স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে।তার রেখে যাওয়া অবদান জুম্মজাতি ভুলতে পারবেনা।আমাদের জুম্ম সমাজ থেকে আমরা শত শত তরুণ প্রতিভাকে হারিয়েছি,হারাচ্ছি।যার মাশুল হিসেবে বর্তমান প্রজন্ম রাজনীতি বিমূখ হচ্ছে,অদূর ভবিষ্যতে জুম্মদের এই অবস্থা চলতে থাকলে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে যাবে।আমরা অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনের যে পথে নেমেছিলাম সে পথ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আগামী প্রজন্ম যদি রাজনীতি বিমূখ হয়,জুম্মজাতি যদি নিজেদের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখতে না পারে এর সম্পূর্ণ দায় গিয়ে বর্তাবে বর্তমানে বিদ্যমান আঞ্চলিক সংগঠন গুলোর উপর।

লেখকঃপেদেলা চাঙমা(ছদ্মনাম)

































No comments: