- ১৮৬০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামকে চট্টগ্রাম জেলা থেকে আলাদা করে তিনটি সার্কেলে ভাগ করা হয় যথা : চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল এবং বোমাং সার্কেল।
- ১৮৬৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা নির্দিষ্ট করা হয়।
১৯০০ সালের বৃটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ও অনুমোদিত হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল এ্যাক্ট বা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধি যা পাহাড়ি আদিবাসীদের কাছে প্রিয় বলে বর্তমানে মনে করা হয়। এর কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো :
• পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি এক্সক্লুডেড বা ননরেগুলেটেড এরিয়া বা অ-শাসিত বা অনিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ এলাকা “যেখানে জেলা প্রশাষকের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ আসতে পারবে না।
• আদিবাসীরা পচিঁশ বিঘা পর্যন্ত জমি ব্যবহার করতে পারবে তবে মালিকানা হতে পারবে না।
• বিচারালয়ে কোনো উকিল থাকতে পারবে না।
• রাজা হেডম্যান এবং কার্বারি থাকবে।
• দরকার হলে বিনাপারিশ্রমিকে আদিবাসীরা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ করে দিতে বাধ্য থাকবে।
• রাজা হেডম্যান এবং কারবারীরাও আদিবাসীদের বিনাপারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে।
“এই বিধি গুলো ছিল তখনকার পাহাড়ি আদিবাসীদের শাসন ও দাসত্ব করা বিধি। এই আইনটি ব্রিটিশদের দ্বারা রচিত পাহাড়ি আদিবাসীদের শাসন শোষনের আইন নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। তখনকার দিনে তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল না বিধায় তা হয়েছিল বলে ক্ষোভ বা আক্রোশের কমতি ছিল না। - ১৯১৬ সালে কামিনীমোহন দেওয়ান প্রতিষ্ঠা করেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম সমিতি “
- ১৯২০ সালের এক্সক্লুসিভ এরিয়া বা একান্ত এলাকা ঘোষনা।
- ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর কামিনীমোহন দেওয়ান ও স্নেহকুমার চাকমার নেতৃত্বে একটি দল (জনসমিতির প্রতিনিধি) এবং ভূবনমোহন রায়ের নেতৃত্বে ও আরেকটি দল (পার্বত্য রাজাদের প্রতিনিধি ) দিল্লিতে গিয়ে কংগ্রেস নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন ; ভারতের অন্তভূক্ত হওয়ার জন্যও আবেদন করেন। অবশেষে, র্যাডক্লিক কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তভূক্ত করেন।
- ১৯৫৪ সালে এসে “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি ” গঠিত হয়।
৮. ১৯৬২ সালে এসে পাকিস্তান কর্তৃক “উপজাতীয় এলাকা ” ঘোষনা। - আবার ১৯৬৪ সালের উপজাতীয় এলাকার মর্যাদা লোপ করে পুনরায় ১৯০০ সালের বিধি গ্রহন করে।
- ১৯৬৬ সালের মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ঢাকা ও ট
চট্টগ্রামে “উপজাতীয় ছাত্র সমিতি ” গঠন করেন। - ১৯৬৯ সালের উপজাতীয় ছাত্র সমিতির প্রধান কার্যালয় রাঙামাটিতে স্থানান্তরিত হয়ে একটি “মার্ক্সবাদী-মাওবাদী ” সংগঠনে পরিবর্তন আনা হয়।
- ১৯৭০ সালের পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ হয়। এতে অনেক পাহাড়ি আদিবাসী স্বেচ্ছায় বাংলার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তারমধ্য (মৃত) উক্যচিং মারমা বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত হন।
- ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি মাসে স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে “চারুবিকাশ চাকমা ” নেতৃত্বে একদল আদিবাসী প্রতিনিধি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে দেখা করে হতাশ হন। আবার ১৫ ফেব্রুয়ারি : রাজা মং প্রু সাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে সাক্ষাৎের চেষ্টায় ব্যর্থ হন এবং তাদের দাবিগুলো রেখে যান। এরপর ২৩ মার্চ সংবিধান রচনা করার জন্য গণপরিষদ আদেশ জারি করা হয়। ১০ এপ্রিলে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে।
- ১৯৭২ সালে ২৪ এপ্রিল : মনবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিম্নে দাবিগুলো আরো বিস্তৃতভাবে পেশ করেন বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান প্রণেতাদের কাছে।
▪ পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
▪ পার্বত্য আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ন্যায় অনুরুপ সংবিধি শাসনতন্ত্রে থাকবে।
▪ পার্বত্য আদিবাসী রাজাদের সংরক্ষণ করা হবে।
▪ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয় এরুপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। ²
কিন্তু দূঃখের বিষয় তার দাবিগুলো মেনে নেইনি। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বলেছিল বাঙালি হয়ে যেতে এবং তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ³ এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের বাঙালি জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে ৭২ এর সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। - তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে “জন সংহতি সমিতি ” (জেএসএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। জনসংহতি সমিতির মূল দাবি –
▪ ভূমি অধিকার।
▪ সেটেলার বাঙালি (অভিবাসনকৃত ) প্রত্যাহার
▪ সেনাবাহিনী প্রত্যাহার।
▪ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, এবং
▪ বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষনা প্রদান। - ১৯৭৩ সালে ৭ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির ইটছড়ির জঙ্গলে শান্তিবাহিনী (জেএসএস এর স্বশস্ত্র সংগঠন আত্বপ্রকাশ করে।
- ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সরকারের স্বশস্ত্র বাহিনী ও শান্তিবাহিনী মধ্যকার তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। এর মধ্যে ১৯৭৯সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লে: জেনার”েল জিয়াউর রহমান ” সুপরিকল্পিত ভাবে বিপুল পরিমাণ বাঙালি (সেটেলার) মুসলমানদের এ অঞ্চলে অভিবাসন করেন।⁴
১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতি মধ্যকার বহুবার শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্ত কোন সুরহা হয়নি।
পরিশেষে, প্রায় দুই যুগ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে ঐতিহাসিক “পার্বত্য চুক্তি ” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে সরকার পক্ষ থেকে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রধান আবুল হাসনাত আআব্দুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে সভাপতি জ্যোতিরিন্দ বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা ) স্বাক্ষর করেন। এসময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন। এসময় পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি আদিবাসীরা এ চুক্তি কে অধিকার আদায়ের চুক্তি বলে অভিহিত করেন।
এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় তৎকালীন বিরোধী দল (বিএনপি এর অঙ্গ সংগঠন) চুক্তির বিরোধিতা করে দেশের এক বিরাজমান পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং দেশকে অচল অবস্থা তৈরি করেছিল। এ সময় তারা এ চুক্তিকে “কালো চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা আসে এবং সরকার গঠন করে। এ সময়ে চুক্তির তেমন কোন বাস্তবায়ন হয়নি।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে ১৯৯৮ সালে ২৬ ডিসেম্বর ” ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট “(ইউপিডিএফ) নামে আরেকটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এ সংগঠন মূলত : তখনকার “পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং পাহাড়ি গণপরিষদ মিলিত একটি রুপই মাত্র।
লিংকঃ
No comments:
Post a Comment