Monday, August 18, 2025

দীঘিনালা ঘোষণা- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি

পার্বত্য চট্টগাম জনসংহতি সমিতি
বিশেষ কর্মী সম্মেলন ২০১০
দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা

দীঘিনালা ঘোষণা
এপ্রিল ১০, ২০১০ খ্রিস্টাব্দ

যে সময়ে বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় রয়েছে এবং এর জন্য জনসংহতি সমিতির অধিকতর ঐক্য ও সুদৃঢ় নেতৃত্বের প্রয়োজন; বাঘাইহাট-খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক বর্বরোচিত ঘটনার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যখন প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে; জুম্মজাতির সকল শ্রেণী-গোষ্ঠী নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর এবং যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়-কন্দরের অসহায় মানুষ ভ্রাতৃঘাতি হানাহানির চরম অভিশাপ হতে মুক্তির প্রত্যাশায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে শান্তির ভিক্ষাপ্রার্থী ঠিক তেমনি সময়ে শ্রী সন্তু লারমা গঠনতন্ত্রের সকল নির্দেশনা লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৯ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে (২৯-৩১ মার্চ, ২০১০) পার্টি, জুম্মজাতি, দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের চরম অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রমাণ দিলেন। সমিতির নেতা-কর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সমাজের সচেতন মানুষের "জেএসএস-কে ঐক্যবদ্ধ রাখার" সকল আবেদন এমনকি অশীতিবর্ষীয় বিবেকবান ব্যক্তির করজোড়ে প্রার্থনা করা আকুতিও অবজ্ঞাভরে ঠেলে দিয়ে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজটি আরও সুদৃঢ় করলেন।
শ্রী লারমার লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি পেয়ে তার অস্বচ্ছতা, নৈতিক অধঃপতন ও মূল্যবোধের অবক্ষয় এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যার কারণে সৎ, আদর্শবান ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার কাজ করা আর কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। তাই, তার এইসব নেতা-কর্মীদের পার্টি হতে বিতাড়িত করে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ২০০৫ সালের মাঝামাঝি হতে উপদলীয় চক্রান্ত শুরু করেন এবং ৮ম জাতীয় সম্মেলনে নির্বাচিত বেশকিছু কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যকে এই জাতীয় সম্মেলনের পরপরই কেন্দ্রীয় কমিটি ও পার্টির সকল কার্যক্রম হতে অপদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে দেন। বিগত জরুরী অবস্থার দোহাই দিয়ে এইসব নেতা-কর্মীবৃন্দকে বিভিন্ন আপত্তিকর বিশেষণে বিভূষিত করে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাজনক বিষয় যে, তৎসত্ত্বেও এইসব দায়িত্ববান নেতা-কর্মী ও শ্রী লারমার সঙ্গে থাকা বেশ ক'জন কেন্দ্রীয় সদস্যের পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সকল প্রচেষ্টা তার একগুঁয়েমির কারণে ব্যর্থ হয়ে যায়। গঠনতন্ত্রের ৭ নং ধারা (পার্টি সদস্যের অধিকারসমূহ), ৯ নং ধারা (বহিস্কার), ১৬ নং ধারা (শাস্তিমূলক ব্যবস্থা) ও অন্যান্য ধারা লঙ্ঘন করে বেশ কিছু পুরানো-অভিজ্ঞ, আদর্শবান ও নীতিবান নেতা-কর্মীকে পার্টি হতে বহিস্কার ও বাদ দিয়ে তার "বল প্রয়োগের রাজনীতি" অর্থাৎ সহিংস রাজনীতির চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। গঠনতন্ত্রের ২ নং ধারা (নীতি ও আদর্শ) ও ৩ নং ধারায় (উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য) বিধৃত সকল বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে জুম্মজাতির মহাননেতা প্রয়াত এমএন লারমার অনুসৃত নীতি, কৌশল ও নির্দেশনাকে পরিত্যাগ করে নিজের মনগড়া রাজনীতি চালু করেছেন। এমএন লারমার প্রদর্শিত সঠিক কর্মীনীতি অনুসরণ না করে ভ্রান্ত কর্মীনীতি চালু করে পার্টি সংগঠনের সর্বনাশ ডেকে এনেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে শ্রী সন্তু লারমা বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ বৈঠক ব্যতীত একক সিদ্ধান্তে নবম জাতীয় সম্মেলনের প্রায়ই কার্যাবলী চুড়ান্ত করে তবেই ২৫ মার্চ, ২০১০ এক খণ্ডিত কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত করে তার চরম স্বৈরাচারী নেতৃত্ব আরও একবার প্রদর্শন করেন এবং এই সম্মেলনে পার্টির শীর্ষ অনেক নেতাকে বহিস্কার ও বাদ দেন। তার এমন স্বেচ্ছাচারী ও অধঃপতিত নেতৃত্ব দিয়ে আর কোন অবস্থায় আন্দোলন পরিচালনা করা কিংবা জুম্মজাতির মুক্তি আদায় সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে পার্টির সচেতন নেতা-কর্মীবৃন্দ পার্টির এই চরম দুঃসময়ে পার্টি তথা জুম্মজাতির করণীয় বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন দীঘিনালা উপজেলার বড়াদম হাইস্কুলে এক বিশেষ কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আলোচনা, পর্যালোচনা ও অভিমত প্রদানের মাধ্যমে আজ ১০ এপ্রিল, ২০১০ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার এই দীঘিনালা ঘোষণা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।
পার্টি সম্পর্কিত:
১। বিগত ২৯-৩১ মার্চ ২০১০ শ্রী সন্তু লারমা কর্তৃক অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সম্মেলনকে একতরফা, অগঠনতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক বিবেচনায় এই সম্মেলন ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করছে।
২। (১) জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের নিমিত্তে ৭ সদস্যক একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দৃঢ় ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে। শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা ও শ্রী রূপায়ণ দেওয়ানকে যুগ্ম আহ্বায়ক (Co-chairperson), শ্রী তাতিন্দ্র লাল চাকমাকে সদস্য-সচিব ও প্রকৌশলী মৃণাল কাস্তি ত্রিপুরা, এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা, শ্রী উদয় কিরণ ত্রিপুরা ও মিজ কাকলি খীসাকে সদস্য করে ৭ (সাত) সদস্যক আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।
(২) সুবিধামতো সময়ে জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করার ক্ষমতা এই সম্মেলন এই আহ্বায়ক কমিটিকে দিচ্ছে।
(৩) কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পার্টির সকল কার্যাদি সম্পন্ন করার ক্ষমতা এই আহ্বায়ক কমিটিকে দেওয়ার ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।
(৪) শ্রী সন্তু লারমার গঠনতন্ত্রবিরোধী সকল কার্যকলাপের শ্বেতপত্র প্রকাশ করার ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কিত:
১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
২। এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরূপণ করে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ঘোষণা এই সম্মেলন দিচ্ছে।
৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী "পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১" সংশোধনপূর্বক দ্রুত ভূমি-বিরোধ নিস্পত্তির যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বাঘাইহাট-খাগড়াছড়ি বর্বরোচিত সহিংস ঘটনা সম্পর্কিত:
১। গত ফেব্রুয়ারী মাসে রাঙ্গামটি জেলার বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ি জেলা শহরে সংঘটিত বর্বরোচিত সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
২। এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে। এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে সেইসব মামলাসমূহ দ্রুত প্রত্যাহারের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি সম্পর্কিত:
১। বাংলাদেশের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের দাবী এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
২। বাংলাদেশের সকল আদিবাসীর ভূমি অধিকার সুনিশ্চিত করাসহ যথাযথ উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার ঘোষণা এই সম্মেলন করছে।
৩। আদিবাসীদেরকে, আদিবাসী নামে পরিচিতি না দিয়ে 'উপজাতি' নামে পরিচিত করানোর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক আপত্তিকর ভাষায় যে গোপন সার্কুলার সম্প্রতি ইস্যু করা হয়েছে তার জন্য এই সম্মেলন গভীর উদ্বেগ জানাচ্ছে এবং সেই সার্কুলার প্রত্যাহার করার দাবী জানাচ্ছে।
৪। দেশের সকল রাজনৈতিক দল, সকল প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিকশক্তির প্রতি দেশের সকল আদিবাসীদের অধিকার সুনিশ্চিতকরণে অধিকতর ইতিবাচক ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে আদিবাসী বিষয়ক নিজ নিজ নীতিমালা প্রণয়ণ ও কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান এই সম্মেলন জানাচ্ছে।
আহ্বান:
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য বৃহত্তর জুম্ম জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান এ সম্মেলন জানাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে অধিকতর সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমূহের প্রতি আহ্বান এ সম্মেলন জানাচ্ছে।

No comments: