আমাদের পূর্ব পুরুষেরা আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের জুম্ম জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন ।আমাদের মাঝে রোপন করেন করে গিয়েছিলেন এক বৈপ্লবিক চেতনার।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ১০ ভাষাভাষী ১১টি জাতিগোষ্ঠীকে জুম্মজাতীয়তাবাদের মাধ্যমে এক কাতারে নিয়ে এসে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আগামীর এক সম্ভাবনার।যার মূল নায়ক হলেন পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা।পাহাড়ী মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীর বুকে আমরাও যেন নিজ নিজ ভাষা,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করতে পারি সেই প্রচেষ্টাতেই জুম্মজাতীয়তাবাদ এবং জনসংহতি সমিতির উথথান।পাহাড়ী মানুষের প্রাণের সংগঠন জনসংহতি সমিতির আন্দোলনের সূচনা হতে জনগন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগীতার ফলে বিভিন্ন সময়ে জনসংহতি সমিতি বিপর্যের মধ্যেও আজো ঠিকে রয়েছে।পাহাড়ী মানুষের আন্দোলনের সূচনা হতে প্রতিক্রিয়াশীলগোষ্ঠী তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল,আজো আছে।এবংকি তৎকালীন জনসংহতি সমিতির মধ্যেও ছিল,যাদের কারণে আমাদের মহান নেতাকে জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছিল।মহান নেতাকে ৮৩' এর গৃহযুদ্ধে হারানোর পরও আমাদের পূর্বপুরুষের দমে যায়নি।আমাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা পুনরায় মহান নেতার দেখানো পথে হাটঁতে শুরু করেছিল।দুই দশকের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামের পর ৯৭' এ চুক্তির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলেও ছাত্র পরিষদের কিছু নেতা চুক্তির বিরোধীতা করে পাহাড়ে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করলে শুরু হয় পুনরায় গৃহযুদ্ধ।যার কারণে জনসংহতি সমিতির চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রামে ভাটা পড়ে যায়।ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুনের লাশের সংখ্যা শুধু বাড়তেই থাকলো।চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা ইউপিডিএফের পূর্ণস্বায়ত্বশাসন আদায়ের সংগ্রাম তা শুধু অধরাই রয়েগেল।যে আশা-আকাঙ্খা নিয়ে আমাদের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সে সব আশা-আকাঙ্খা থেকে আমরা ছিটকে যাচ্ছি আর যাচ্ছি।
দেশে জরুরী অবস্থার সময় জনসংহতি আবার আত্মকোন্দলে জড়িয়ে পড়লে পরবর্তীতে প্রকাশ্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং ১০ এপ্রিল ২০১০ জনসংহতি সমিতির এক পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা জনসংহতি সমিতি ঘোষণা করে ।ফলে পাহাড়ে ৩টি রাজনৈতিক সংগঠনের আবির্ভাব হয়,এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গড়ে উঠা শক্তিগুলো দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হয়ে গেল।পাহাড়ে রক্তের বন্যা বইতেই থাকলো অবিরাম! ১৫সালের দিকে এই সংঘাত কিছুটা কমে এলেও ১৭ সালের শেষের দিকে ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামে নতুন আরেকটি সংগঠ্নের আবির্ভাবে পাহাড়ে পাহাড়ে লাশের মিছিল চলতে থাকলো,যা আজো চলমান।
আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস গৌরব্বজ্বল ইতিহাস,তাদেরকে নিয়ে আমরা বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারি।কিন্তু আমরা কেন এমন হলাম? আমরা কি পারিনা সেই আন্দোলনের সূচনালগ্নে এমএনলারমার দেখানো পথে নিজেদের অগ্রসর করতে?যেখানে আমরা আমাদের ইতিহাসকে অক্ষুন্ন রাখার সেখানে আমরা ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে নিজেরা নিজেরা মরছি! পাহাড়ের মানুষ কখনো চায়নি তাদেরকে ঘিরে ৪-৫টি সংগঠন গড়ে উঠুক আর তাদেরকে নিয়ে রাজনীতি হোক।তারা চেয়েছিল সকলের সম্মিলিত একটি আন্দোলন,একটি বিপ্লব।যে বিপ্লবের মাধ্যমে পাহাড়ের অধিকার হারা মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে,বেঁচে থাকার ঠাঁই হবে।আমরা এখনো স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি সেখানে সাধারণ মানুষদের নিয়ে রাজনীতি গড়ে উঠা কখনো সুফল বয়ে আনতে পারেনা।আমাদের অধিকার আদায়ের প্রশ্ন যখন এক ও অভিন্ন তখন আন্দোলনে এক ও অভিন্ন কেন নয়?
জুম্ম জনগনের অধিকার আদায়ের পথে আমরা অসংখ্য সহযোদ্ধা,বন্ধু জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের এই বলিদানকে আমরা ব্যর্থ হতে দিতে পারিনা।আমরা নিজেরা নিজেরা অনেক মরেছি ,এখন সেই রক্তের বদলা হবে সম্মিলিতভাবে এক বিপ্লব,যার প্রতিপক্ষ হিসেবে সবসময় থাকবে শাসকগোষ্ঠী।
১২ই মার্চ ২০২০
No comments:
Post a Comment