তামান্না মিনহাজ
কালের কন্ঠ
২০১৭
যুগ যুগ ধরে শোষণহীন, সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখেছে মানুষ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন কার্ল মার্ক্স ও ফ্র্রেডরিক এঙ্গেলস।
তাঁদের মতাদর্শকে ধারণ করে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের পরিচালনায় ও বলশেভিক পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টি) নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে (পুরনো জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ২৫ অক্টোবর, আর নতুন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৭ নভেম্বর) রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ বিপ্লবকে মহান ‘অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ আখ্যায়িত করা হয়।
বিপ্লবের আগের রাশিয়া
অক্টোবর বিপ্লবের আগে রাশিয়া ছিল পিছিয়ে থাকা একটি দেশ। রাশিয়াকে বলা হতো ‘ইউরোপের পশ্চাদ্ভূমি’। জারশাসিত রাশিয়ায় (দেশের রাজাকে জার বলা হতো) অনাহার, দারিদ্র্য ও অসহনীয় শোষণ ছিল জনগণের নিত্যসঙ্গী। উন্নত শিল্প দূরের কথা, সাধারণ মাপের শিল্প উত্পাদনের ব্যবস্থাও তখন ছিল না। দ্য ‘গ্রেট রাশিয়ান’রা অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোকে শাসন-শোষণ করত।
বিপ্লব শুরুর প্রক্রিয়া
রাশিয়ার বিপ্লবী শক্তিগুলো জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলে। এসব সংগ্রাম ধীরে ধীরে বিপ্লবে রূপ নেয়।
১৯০৫ সালে এ ধরনের একটি বিপ্লব ব্যর্থ হয়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরেকটি বিপ্লব হয়। সেই বিপ্লবে জার স্বৈরতন্ত্র উত্খাত হয় এবং ‘অস্থায়ী সরকার’ গঠিত হয়। এই সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর সঙ্গে আপস করে গঠন করা হয়েছিল। তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ক্রমে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অস্থায়ী সরকার শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে পড়ে। গড়ে ওঠে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের নতুন এক ধরনের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সংস্থা ‘সোভিয়েত’। বলশেভিক তথা কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে শ্রমিক বিক্ষোভ। শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে। সৈন্যরাও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯১৭ সালের ১০ অক্টোবর লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে। ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) শ্রমিকদের সশস্ত্র অংশ ও বিপ্লবী সেনারা অস্থায়ী সরকারকে উত্খাতের প্রস্তুতি নেয়। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে যুদ্ধজাহাজ ‘অরোরা’ থেকে একটা ফাঁকা শেল ছোড়ার মধ্য দিয়ে বিপ্লবী সেনা (যারা আসলে উর্দি পরা কৃষক) ও রেড গার্ডের সহায়তায় রাজধানী পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকরা বুর্জোয়া সরকারের কেন্দ্র ‘উইন্টার প্যালেসে’ অভিযান শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই পতন হয় উইন্টার প্যালেসের। অস্থায়ী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা চলে আসে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের ‘সোভিয়েতের’ হাতে। পরের কয়েক সপ্তাহে রাশিয়া ও পুরনো জার সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে ক্ষমতা দখল করে বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণি।
নতুন সরকার
বিপ্লবের পরে লেনিনের নেতৃত্বে জনগণের কমিশারদের পরিষদ নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়। জমি, শান্তি ও রুটির স্লোগানে বলশেভিকরা জনগণকে সংগঠিত করেছিল। নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল জমি ও শান্তির জন্য ডিক্রি জারি। ‘শান্তির ডিক্রি’র মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরুর ডাক দেওয়া হয়। ‘জমির ডিক্রি’র মাধ্যমে খোদ কৃষককে জমির ওপর অধিকার দেওয়া হয়। অন্য ডিক্রিগুলো ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, বিনা মূল্যে চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের নতুন ইউনিয়ন গঠন সম্পর্কিত।
রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজ শুরু করার আগেই অক্টোবর বিপ্লব প্রতিবিপ্লবী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে। বেধে যায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। চার বছরের গৃহযুদ্ধের পর ‘লাল ফৌজ’ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ধ্বংস করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। সোভিয়েতবিরোধী চক্রান্ত ঘৃণ্যরূপ ধারণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। হিটলার যুদ্ধ শুরু করে দেশের পর দেশ দখল করে নিতে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ‘লাল ফৌজে’র বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাছে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল হিটলারের বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
দ্রুত উন্নয়ন
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। মাত্র দুই দশকের মধ্যেই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা হয় কাজ, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিত্সাসহ সাধারণ মৌলিক চাহিদা। এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করা হয়।
কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য আসে। নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক সরকার ১৯২৭ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দু-তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়। ১৯২৯-৩৩ সালের মহামন্দায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আক্রান্ত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে স্পর্শ করতে পারেনি। সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মর্যাদা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও ঘটে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মহাবিশ্বকে স্পর্শ করে স্পুটনিক। ১৯৫৯ সালে মহাশূন্যে প্রথম পাড়ি দেয় সোভিয়েত নভোচর ইউরি গ্যাগারিন। সব মিলিয়ে সোভিয়েতব্যবস্থা উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হয়। একটি পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে ওঠে ‘পরাশক্তি’।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই বেগবান হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় একডজন দেশ সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করে। চীনে বিপ্লব সফল হয়। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশ অর্জন করে রাজনৈতিক স্বাধীনতা। সদ্য স্বাধীন এসব দেশের জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা এর একটি অকাট্য প্রমাণ।
ব্যর্থতার কারণ
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে মার্ক্সবাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। এর পতনের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের বৈষয়িক সম্পদ ভোগের তৃষ্ণা পুঁজিবাদী দুনিয়ার মানুষদের চেয়ে কম ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের নাগরিকদের পরিপূর্ণ চাহিদা মেটাতে পারেনি। আরেকটি বিষয়ও রয়েছে—ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার অধিকার। শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে কোনো ইনসেনটিভ না থাকায় উত্পাদনে নিরুত্সাহ দেখা দেয়। মার্ক্সীয় সমাজতান্ত্রিকব্যবস্থায় সব ক্ষমতা ও সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে বলে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বা স্টেট ক্যাপিটালিজম। আর এই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ ভোগ করে মুষ্টিমেয় কিছু পার্টিনেতা ও আমলা। যে পুঁজিবাদী শোষণ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মার্ক্সবাদের জন্ম, শেষ পর্যন্ত তাদের আত্মসমর্পণ করতে হয় সেই পুঁজিবাদের কাছেই।
No comments:
Post a Comment