Writer: Sudarshi Chakma
শান্তি চুক্তি নামে খ্যাত,বাংলাদেশ সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির যে চুক্তি তা আজ ১৬ বছরে পা দিয়েছে।
১৬ বছর আগর ক্লাস টু'তে পড়া ছেলেটি আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষের পথে। এই ১৬ টা বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের যে আর্থ সামাজিক,অর্থনৈতিক,সাংস্কৃতিক, সমাজ ব্যবস্থা ও তাদের জীবন যাপনের যে পরিবর্তন তা সত্যিই আমাদের ভাবায়।
১৬ বছর আগর ক্লাস টু'তে পড়া ছেলেটি আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষের পথে। এই ১৬ টা বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের যে আর্থ সামাজিক,অর্থনৈতিক,সাংস্কৃতিক, সমাজ ব্যবস্থা ও তাদের জীবন যাপনের যে পরিবর্তন তা সত্যিই আমাদের ভাবায়।
এই ১৬টা বছরে তিন-তিন বার সরকার আসলো এবং গেলো।কিন্তু পার্বত্যবাসীর নিরাপত্তা ও শান্তি কোনটাই
এলোনা বরং তার বিপরীতে এই ১৬টা বছরের মধ্যে ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট মহালছড়ি, ২০১০ সালেরর ১৮-১৯ফেব্রুয়ারি সাজেকে
সেটলার বাঙালী কর্তৃক পাহাড়ীদের উপর আক্রমণ এবং সেনাবাহিনীরর গুলিতে বুদ্ধপতি চাকমা ও লক্ষী বিজয়
চাকমার মৃত্যু, তার ঠিক কয়েকদিন পরে অর্থাৎ ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে সেটলার কর্তৃক আদিবাসীদেরর উপর আক্রমণ
এবং তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, ২০১১সালে রামগড় জালিয়া পাড়া এলাকায় পাহাড়িদের উপর হামলা,২০১২ সালে রাঙ্গামাটি
শহরে তান্ডব চালানো,২০১৩ সালের ৩ আগস্ট খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং-এ আদিবাসীদের বসটভিটা আক্রমণ চালানো ছাড়াও প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অসংখ্য দন্ধ ও সংঘাততো রয়েছেই।
অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারীদের উপর নির্যাতন বেড়েই চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এই ১৬টা বছরে রিতা,সুজাতা,
সবিতা সহ নাম না জানা আরো অনেককে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৪ খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে
সবিতা চাকমাকে ধর্ষণ ও হত্যা,১৮ই ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের লক্ষীছড়িতে এক সেনা সদস্য কর্তৃক এক
চাকমা নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা এবং তার দুই দিন পর অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি মাটিরাঙ্গা উপজেলায় সেটলার কর্তৃক এক ত্রিপুরা নারীকে ধর্ষণ।
এ যেন সভ্য জগতের এক নিষ্ঠুর অসভ্যতা।সভ্য জগতে এসেও মানুষ যে কতটা অসভ্য ও নিষ্ঠুর এই তার প্রমাণ।
অথচ এই অসভ্য ও নিষ্ঠুর লোকগুলো বার বারই রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে।
সিএচটি কমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি নারীর উপর একের পর এক সহিংস আক্রমণ,ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্র এসব ঘটনার জন্য পাহাড়ে অভিবাসিত বাঙালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত।
দেখা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের উপর হামলা বা নারী ধর্ষণের ব্যাপারে কোন ঘটনা কয়েকদিন যাওয়ার পরে কোন সমাধান ছাড়াই সবকিছু চুপ হয়ে যায়। প্রতিবাদ না করে চুপ করে বসে থাকা মানেই শাসকের নীতিকে মেনে নেয়া।
যদি তার বিরুদ্ধে কেউ মত পোষণ করেন তবে তার সোচ্চার হতে হবে।আর সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করা,বিক্ষোভ
করা মানেই হচ্ছে মানুষকে রাষ্ট্রীয় শাসন নীতি ও শোষণ নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তোলা।
আর তাই জনগণকে সচেতন করে তোলার দায়িত্ব আমাদের ছাত্র সমাজের।
পার্বত্যবাসীর পক্ষে ফেলে আসা ১৬টি বছর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।কিন্তু পার্বত্য আদিবাসীদের যে অধিকার,নিরাপত্তা ও শান্তি তা এখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব। আর তাই আমি জোর দিয়ে বলছি পার্বত্য আদিবাসীদের অধিকার,নিরাপত্তা ও শানবতি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ আমাদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেই নিতে হবে।
এই ১৬টা বছরের মধ্যে সরকার চাইলেই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারতো।কিন্তু সরকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে বলে মনে হচ্ছেনা। যদি চুক্তি বাস্তবায়ন করার সদিচ্ছা থাকত তাহলে সরকার অনেক আগেই চুক্তি বাস্তবায়ন করতো।তাই এই চুক্তি বাস্তবায়নের
আশায় বসে থাকা কি এক ধরণের বোকামী নয়? আর তাই পার্বত্য জনগণ এই অপেক্ষার অবসান চাই।
সূর্য উঠবে বলে সকালের অপেক্ষায় অন্ধকারে বসে থাকার কোন মানে হয়না এবং সেই অপেক্ষার
জন্যও সময় আর নেই।অন্ধকারের মধ্যে থেকেই সূর্যকে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের উপর সরকারের যে কৌশল তা একটা চৌবাচ্চার মধ্যে রাখা ব্যাঙের সাথে তুলনা করা যাক।
একটি চৌবাচ্চার মধ্যে একটি ব্যাঙ রেখে তার উপর যদি এক সাথে অনেক গরম পানি ঢালা হয় দেখা যাবে ব্যাঙটি গরম পেয়ে এক লাফে চৌবাচ্চা থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ব্যাঙটির উপর যদি আস্তে আস্তে গরম পানি ঢালা হয় তখন দেখা যাবে ব্যাঙটি গরম পেয়ে এক লাফে চৌবাচ্চা থেকে বেরিয়ে যাবেনা।ব্যাঙটির প্রথমে হয়ত একটু গরম লাগবে।পরে এই গরম পাওয়াটাই এর ভালো লাগবেএবং একসময় গরম পেতে পেতে ওই ব্যাঙটি আস্তে আস্তে মারা যাবে।পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থাও অনেকটা এই ব্যাঙের মতই হতে যাচ্ছে।তাই সাধারণ প্রতিবাদ বা বিক্ষোভের মাধ্যেমে আমাদের অধিকার আদায় সম্ভব নয়।এ জন্য চাই বিপ্লব আর গনজাগরণ,চাই জয় অথবা মৃত্যু।
এই ১৬টা বছরে আমরা কতটা পিছিয়ে গেছি তা হয়তোবা আমরা জানিনা।আমরা যদি ১৬টা বছর আগের কথা চিন্তা
করি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের অবস্থান কোথায় ছিল? আর এখন যদি আমরা চিন্তা করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে
আমাদের অবস্থান কোথায়?এবং আজ থেকে ১৬'বছর পরের কথা চিন্তা করি,তখন আমাদের অবস্থান কোথায় থাকবে?
তার উত্তর একটাই অবস্থানের অবনতি। পৃথিবীতে প্র্ত্যেক প্রাণীকে সংগ্রামের মাধ্যমেই ঠিকে থাকতে হয়।
সংগ্রাম ছাড়া ঠিকে থাকা সম্ভব নয়। আর নিজেকে টিকিয়ে দায়িত্বও নিজের এবং কিভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখা যায় সেটাও নিজেকেই বের করতে হবে। অন্য কেউ এসে আমাকে টিকিয়ে রাখবে তা আশা করা যায়না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বর্তমান যে অবস্থা তার জন্য আমি,সরকার ওআঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোের ভ্রাতৃ সংঘাতকেই দায়ী করছি। আঞ্চলিক দলগুলো যদি একই উদ্দেশ্য নিয়ে একসাথে কাজ করতে তাহলে হয়তোবা আজ
আমরা আমাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম।আজ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার একটি বাক্য খুবই মনে পড়ছে।
তিনি বলেছেন-
"নেতৃত্ত্বের মৃত্যু হয় কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয়না"।
অথচ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখে মনে হয় নেতৃত্বের মৃত্যু হয়না কারণ নেতৃত্ব গেলেই নেতৃত্ব আসবে কিন্তু
আদর্শের মৃত্যু হয় কারণ আমাদের দলগুলো নিজেদের আদর্শে বিশ্বাসী। আজ জাতিকে এই অবস্থায় রেখেও যদি আমাদের
দলগুলো নিজেদের ভ্রাতৃ-সংঘাত নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাহলে সাধারণ জনগণ কিইবা করতে পারে।তাই সাধারণ জনগণ,ছাত্রসমাজ,
বুদ্ধিজীবি সমাজ,সচেতন সমাজ সকলের কাছে আমার আহ্বান আসুন জাতির এই অবস্থায় আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে রুখে দাড়াই।
লেখক:শিক্ষার্থী,ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ত্রিশাল,ময়মনসিংহ।
রানজুনি,২০১৪ইং।
বার্ষিক সংকলন বৈসাবি।
No comments:
Post a Comment