লেখক- চন্দ্রশেখর চাকমা
(এই প্রতিক্রিয়াটি দৈনিক সংবাদে গত ৫ আগষ্ট ২০০৫ ও দৈনিক ভোরের কাগজে ২২ আগষ্ট ২০০৫ এবং প্রতিক্রিয়াটির অংশ বিশেষ ৩১ আগষ্ট ২০০৫ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। পাঠকদের অনুরোধে এই প্রতিক্রিয়াটি পুনঃমুদ্রিত হলো তথ্য ও প্রচার বিভাগ।।
'পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু ও সেনাবাহিনী, মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা' শিরোনামে গত ২২ জুলাই দৈনিক সংবাদ ও ২৬ জুলাই দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত লেঃ কর্ণেল মোঃ নজরুল ইসলাম পিএসপি, এইসি এর লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়লাম। তাঁর প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলো মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত জাতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিডিয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও তাঁর সমর্থিত কতিপয় ব্যক্তি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালিয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে।
তিনি তাঁর প্রবন্ধে যথার্থই বলেছেন যে, 'সংবাদপত্রের দল নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ট ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রকাশের ফলে কোন একজনের ব্যক্তি জীবন, কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন বড় সামাজিক উদ্যোগ বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।' তিনি তাঁর প্রবন্ধে মিডিয়ার শেষোক্ত নেতিবাচক দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। কিন্তু প্রথমোক্ত ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে কোন আলোচনাই করেননি। একটি নিরপেক্ষ স্বাধীন সংবাদপত্রই জনগণের কাছে ন্যায়পালের ভূমিকা রাখতে পারে। জনসাধারণকে সঠিক তথ্য-সরবরাহের মাধ্যমে অবগতকরণ, সচেতনকরণ, উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে দেশে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। নানা ধরণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার জট জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে সংবাদপত্র ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কার্যকলাপ সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদসমূহকে এই ইতিবাচক দিক থেকেও বিশ্লেষণ করতে হবে। কিন্তু লেঃ কর্ণেল মোঃ নজরুল ইসলামের লেখায় কেবল নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে বলা যায়, তাঁর লেখা একদেশদর্শী ও একতরফা।
প্রবন্ধকার বলেছেন যে, 'পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বিদেশী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। .. এ অঞ্চলের সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ...এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী শান্তিচুক্তির পক্ষে জেএসএস এবং বিপক্ষের ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসীরা বিদেশী সন্ত্রাসী দলগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে।... সুতরাং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি পার্বত্যাঞ্চল পরিস্থিতি যে হুমকি সৃষ্টি করেছে তা হেলাফেলার বিষয় নয়।'
প্রথমেই বলতে চাই, এ অঞ্চলের সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে। দেশে এখন সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি নেই এমন কোন অঞ্চল খুঁজে পাওয়া যাবে না। সারাদেশ আজ বেআইনী অস্ত্র, কালো টাকা, পেশীশক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই তার জাজ্বল্য চিত্র চোখে পড়ে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির তীব্রতা দেখলে বরং বলা যায় যে, পার্বত্য জেলাগুলোতে তার পরিমাণ কিছুটা কম। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনডিপি'র পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত যৌথ ঝুঁকি নিরূপণ মিশনের রিপোর্টের অপরাধ সংক্রান্ত তথ্যাদি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। উল্লেখিত রিপোর্টের অপরাধ সংক্রান্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, দাঙ্গা, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিন পার্বত্য জেলাগুলো থেকে সমতল জেলাগুলোর গড়পড়তা পরিমাণ অনেক অনেক বেশী। তিন পার্বত্য জেলাগুলো থেকে সমতল জেলাগুলোতে ডাকাতি ২.০ গুণ বেশী, ছিনতাই ২.৬ গুণ, খুন ২.৭ গুণ, দাঙ্গা ৪.৪ গুণ, ধর্ষণ ৬.৮ গুণ ও অপহরণ ২ গুণ বেশী সংঘটিত হয়েছে।
অপরদিকে ১ এপ্রিল ২০০৪ চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, ২০০২ সালে বগুড়ায় গুলিভর্তি ট্রাক উদ্ধার, হাটহাজারীর সীতাকুন্ড পাহাড়ে প্রশিক্ষণ শিবির সন্ধান লাভ ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার, ৩ জুন ২০০১ গোপালগঞ্জে ক্যাথলিক চার্চে বোমা হামলা ও ১০ জন নিহত, ২১ মে ২০০৪ সিলেটে ব্রিটিশ হাই কমিশনারের উপর বোমা হামলা, ১১ আগষ্ট ২০০৪ হুমায়ুন আজাদের উপর মৌলবাদী জঙ্গীদের হামলা, ২১ আগষ্ট ২০০৪ শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা ও ২৩ জনের মৃত্যু, ২৭ জানুয়ারী ২০০৫ শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যা, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৫ খুলনা প্রেস ক্লাবে বোমা হামলা ইত্যাদি ঘটনার তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ও বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা নিঃসন্দেহে নগণ্য বলা চলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত 'বিপুল' পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হলেও চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার ও বগুড়ায় গুলিভর্তি ট্রাক উদ্ধারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের কোন নজির নেই।
গত ৯ জানুয়ারী দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত 'অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্র চালান ও জাতীয় নিরাপত্তা' শীর্ষক প্রবন্ধে রাশেদ খান মেনন বলেছেন যে, 'এর আগেও বিএনপির বিগত শাসনামলের শেষভাগে কক্সবাজারে সমদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল।..এই বিএনপি শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরুতেই বগুড়ায় ট্রাক ভর্তি গুলি ও বিস্ফোরক ধরা পড়ে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী সে সময় বলেন, ঐসব গোলাবারুদ দিয়ে ঢাকার অর্ধেকটাই উড়িয়ে দেওয়া যেতো।.. বগুড়ার চেয়ে বড়ো অস্ত্র চালানের ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে।..এ ধরনের অস্ত্র চালান অথবা মজুদ অস্ত্রের সন্ধান লাভ জাতীয় নিরাপত্তার যে গুরুতর প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এনেছে তাকে উপেক্ষা করা যাবে কীভাবে।..ঐ অস্ত্রের ব্যবহার বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।'
গত ৭ জানুয়ারী দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত হয় যে, 'জঙ্গি ইসলামি সংগঠন জাগ্রত মুসলিম বাংলাদেশের (জেএমবি) সশস্ত্র ক্যাডারের হাতে গত বছর দেশের উত্তরাঞ্চলে ২০ জন নিহত হয়েছে। তাদের হামলায় আহত ও পঙ্গু হয়েছেন ২ শতাধিক মানুষ এবং প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়েছে আরো শতাধিক।' শুধু একটি জঙ্গী সংগঠনের এক বছরের ঘটনা কত ভয়াবহ তা উক্ত রিপোর্ট থেকে সহজেই অনুমেয়।
কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে পুলিশই স্থানীয় অধিবাসীদের সহায়তায় এসব অস্ত্র চালান ধরতে সক্ষম হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি তথা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশের পরিবর্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও সেনাশাসন 'অপারেশন উত্তরণ' জারী করা হয়েছে মূলতঃ আদিবাসী পাহাড়ীদের জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত করতে, পাহাড়ীদের জমি ও ভিটেমাটি বেদখল করতে, বহিরাগত সেটেলারদের নিরাপত্তা বিধান করতে, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া রুদ্ধ করা ও পাহাড়ী-বাঙ্গালী বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে উগ্র জাত্যাভিমান ও সাম্প্রদায়িকতা পাকাপোক্ত করতে।
রাশেদ খান মেনন উক্ত প্রবন্ধে আরো বলেছেন যে, 'পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়িতে ১১টি একে-৪৭ রাইফেল ও অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।...এই নিয়ে গত দু'মাসে পাঁচদফায় নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে এ ধরনের ভারী অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হলো। কিন্তু অন্যান্য বারের মতো এবারও ঐসব অস্ত্রের মালিকদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার করা যায়নি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর কাউকে।'
বস্তুতঃ অস্ত্র মালিকদের ধরা না পড়ার পেছনে নানা রহস্য রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বদানকারী সংশ্লিষ্ট কম্যান্ডারদের প্রমোশন লাভ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শক্তিশালী সশস্ত্র দল রয়েছে এই অজুহাত সৃষ্টি করার জন্য নানা অভিনয়ের মাধ্যমে অস্ত্র উদ্ধার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ৩ ডিসেম্বর ২০০৪ দৈনিক চট্টগ্রাম মঞ্চে প্রকাশিত সংবাদে কবির হোসেন সিদ্দিকী বলেছেন, '... কতিপয় বিডিআর কর্মকর্তার সাজানো নাটক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রমোশন পাবার জন্যই একবার উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো বার বার করেই দেখানো হচ্ছে।' ২ ডিসেম্বর ২০০৪ দৈনিক পূর্বকোণে একে এম জাহাঙ্গীর ও মিনারুল হক লিখেছিলেন যে, '.. দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তার কাছে এসব অস্ত্র উদ্ধার বিষয়ে মূল তথ্য জানতে চাইলে, জবাবে তিনি জানান, কোন সন্ত্রাসী গ্রুপের এসব অস্ত্র তা বেশি একটা মুখ্য নয়, আসল কথা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে এলাকা থেকে এটাই বড় এ্যাসিভমেন্ট।'
প্রবন্ধকার বলেছেন যে, 'সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু হলে, সন্দেহভাজন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অথবা সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কাউকে আটক করা হলে সেনাশাসন ও নির্যাতনের, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে'। প্রবন্ধকারের এই কথা সর্বৈব মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেননা সন্ত্রাসীদের ধরার নামে সাধারণ নিরীহ জনগণের উপর হামলা, ধরপাকড়, মারপিট, গ্রেপ্তার ও মিথা মামলায় জেলহাজতে প্রেরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; যেমন গত ৩ জানুয়ারী ২০০৫ বাঘাইছড়ির শীলছড়ি নামক স্থানে বিশেষ মহলের মদদপুষ্ট ইউপিডিএফের একদল সশস্ত্র সদস্যের সাথে কচুছড়ি সেনা ক্যাম্পের বিডিআর সদস্যের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষের পর সংঘটিত হয়েছিল। উক্ত সংঘর্ষে শাহজাহান নামে একজন বিডিআর জওয়ান ঘটনাস্থলে নিহত হলে শত শত সেনা সদস্য সন্ত্রাসীদের তল্লাসীর নামে বাঘাইছড়ি উপজেলায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায় এবং এলাকার নিরীহ জনগণের উপর ধরপাকড়, মারধর, মিথ্যা মামলায় জড়িত করে জেলহাজতে প্রেরণ, গ্রামবাসীদের মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী তছনছ ও লুটপাট, ধর্মীয় পরিহানি ইত্যাদি নিপীড়ন-নির্যাতন করে বলে খোদ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই ১৫ জানুয়ারী ২০০৪ রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা করেছেন।
অনুরূপভারে গত ২৫ মে ২০০৪ সন্ত্রাসী ধরার নামে সেনাবাহিনী খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারায় হামলা চালিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও যুব সমিতির ১৭ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে এবং ক্যাম্পে নিয়ে যাবার পর ২৪ ঘন্টা যাবৎ হাত-পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় লাঠি ও রাইফেলের বাট দিয়ে মারধর করা, পায়ে রশি বেঁধে গাছে ঝুলানো ও পিটানো, ইনজেকশনের সূই ফুটিয়ে দেয়া ও বিদ্যুতের শক দেয়া ইত্যাদি মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। পরে কোন অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বিনাশর্তে মুক্তি প্রদান করা হলেও দোষী সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা হেলাফেলার বিষয় নয়। তবে সমতল জেলাগুলোর ন্যায় পুলিশ বাহিনী দিয়ে এসব সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি ঘটনার মোকাবেলা করা যেতে পারে। এখানে প্রবন্ধকার সাবেক এমপি দীপঙ্কর তালুকদারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, '... পাহাড়ের আইন-শৃঙ্খলা মোকাবেলা করার শক্তি-সামর্থ্য বা দক্ষতা কোনোটাই স্থানীয় পুলিশের নেই। তাই দক্ষ পুলিশ গড়ে না তোলা পর্যন্ত আর্মি প্রত্যাহারের প্রশ্ন আসে না।' কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রথমতঃ সেনাবাহিনী মোতায়েন করে কি পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি কমানো গেছে? চুক্তি-উত্তর কালেও সেনাবাহিনী পূর্বের মতো মোতায়েন রয়েছে এবং সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে প্রবন্ধকারের বক্তব্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি কমে নাই, বরং বেড়েই চলেছে। দ্বিতীয়তঃ আইন-শৃঙ্খলা মোকাবেলার জন্য কেন স্থানীয় পুলিশবাহিনীর দক্ষতা ও শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো না? কবে নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য জেলাসমূহের স্থানীয় পুলিশবাহিনী গঠিত হবে? পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুসারে 'জেলার আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও উহার উন্নতি সাধন; এবং পুলিশ (স্থানীয়) পার্বত্য জেলা পরিষদের হস্তান্ত রিত বিষয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬২ ধারা মোতাবেক "আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন স্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং পরিষদ তাঁহাদের বদলী ও প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাঁহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে; তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় থাকিবে।"
বস্তুতঃ উল্লেখিত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়ে পার্বত্য জেলাসমূহের পুলিশবাহিনী গঠিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি মোকাবেলা করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি। কারণ স্থানীয় অধিবাসীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া কোন উদ্যোগ সফল হতে পারে না।
প্রবন্ধকার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, 'এই ভূখন্ড রক্ষার জন্য সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব জাতীয় সরকারের হাতে থাকতে হবে' এবং 'শান্তিচুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীকে ভব্যিষতে আর কোন দায়িত্ব দেয়া যাবে না এরূপ কোন ধারা নেই'। কিন্তু প্রবন্ধকার বলেননি যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন অনুসারে "পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব আঞ্চলিক পরিষদের। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির 'ঘ' খন্ডের ১৭(ক) ধারা অনুসারে "আইন-শৃংখলা অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাইবে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করিতে পারিবেন।"
কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের আইন-শৃঙ্খলার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে সেনাবহিনী মোতায়েনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ সাপেক্ষে বা সরকার যদি সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চায় তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শ ক্রমেই তা কার্যকর করতে পারে। বলা যায় যে, উল্লেখিত বিধান অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের অধীনেই সেনাবাহিনী মোতায়েন বিধিসম্মত হতে পারে।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে উপেক্ষা করে এবং কোনরূপ পরামর্শ ও আলোচনা ব্যতিরেকে সরকার ২০০১ সনে 'অপারেশন দাবানল'-এর নাম পরিবর্তন করে 'অপারেশন উত্তরণ' নামে সেনাশাসন অব্যাহত রাখে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়-দায়িত্ব সরাসরি সেনাবাহিনীর হাতে ন্যস্ত করে।
জনসংহতি সমিতি কখনোই দাবী করে নাই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন সেনাবাহিনী থাকতে পারবে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এ অঞ্চলেও সেনাবাহিনী থাকবে। তাই চুক্তিতে স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলিকদম, রুমা ও দীঘিনালা) থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশিষ্ট সকল অস্থায়ী ক্যাম্প গুটিয়ে নিতে হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে মাত্র। কিন্তু প্রবন্ধকার এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন মনে হবে যেন জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সকল সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে বা সেনাবাহিনীকে কোন দায়িত্ব দেয়া যাবে না মর্মে দাবী করে আসছে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, জনসংহতি সমিতি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পসহ সেনাশাসন 'অপারেশন উত্তরণ' প্রত্যাহারের দাবী এ যাবৎ করে আসছে।
লেঃ কর্ণেল মোঃ নজরুল ইসলাম পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধীতাকারী উগ্র জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে গলা মিলিয়ে বলেছেন যে, 'শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিদ্রোহী বাহিনী তাদের অস্ত্র ভান্ডারের সব অস্ত্র সমর্পণ না করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র গোপন স্থানে সরিয়ে ফেলে।' তাঁর মতো একজন দায়িত্বশীল সেনা কর্মকর্তার পক্ষে এই প্রকারের বক্তব্য আশা করা যায় না। তাঁর এই মনগড়া ও কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি অতি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রেরই অংশ বলে ধরা যেতে পারে।
তিনি আরো বলেছেন যে, '... বিগত সরকার যখন ৭০টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করেছে, তখন সম্ভলারমা দাবি করেন মাত্র ৩১টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। ...এরপর এ পর্যন্ত ১৫২টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সেনা সদর দপ্তর জানালেও জেএসএস নেতৃবৃন্দ ৩০ বা ৩১টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে বলেই দেশে বিদেশে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন।' জনসংহতি সমিতি কখনোই কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য প্রদান করে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির একজন সদস্য ও চুক্তি স্বাক্ষরকারী একটি পক্ষ হিসেবে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সরকারী অগ্রগতি প্রতিবেদন পাওয়ার অধিকার রাখেন। তারই ভিত্তিতে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সেনা দপ্তর থেকে তালিকাসহ ৩১টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে লিখিতভাবে জানানো হয় এবং জনসংহতি সমিতি তা যাচাই করে তার সত্যতা পেয়েছে। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে আরো ৩৯টি (৭০-৩১) ক্যাম্প প্রত্যাহার বা বর্তমান সময় পর্যন্ত মোট ১৭২টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কোন পত্র (প্রত্যাহৃত অস্থায়ী ক্যাম্পের তালিকাসহ) সেনা দপ্তর থেকে সন্তু লারমা বা জনসংহতি সমিতির হস্তগত হয়নি। তাই কিসের ভিত্তিতে সন্তু লারমা বা জনসংহতি সমিতি ১৭২টি ক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবী মেনে নেবেন। আমি আশা করবো আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে লেঃ কর্ণেল মোঃ নজরুল ইসলাম অচিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ও চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমার দপ্তরে প্রত্যাহৃত ক্যাম্পের তালিকা পাঠিয়ে তথাকথিত 'প্রোপাগান্ডা'র অবসান করবেন।
প্রবন্ধকার তাঁর প্রবন্ধে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাপ্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তাঁর প্রবন্ধে প্রায়ই 'উপজাতীয়' বা 'পাহাড়ী' সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করেছেন। তার মূল উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাসের সাথে জাতিগত সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত করা; অর্থাৎ 'উপজাতীয়' বা 'পাহাড়ী' মাত্রই সন্ত্রাসী এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি অতি সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করা। কিন্তু তিনি সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে একবারও 'বাঙালী' জাতিগত পরিচয়ের উল্লেখ করেননি। তাঁর প্রবন্ধ পড়ে মনে হবে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের 'উপজাতীয়' বা 'পাহাড়ী' মাত্রেই অস্ত্র চালান, সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। দেশের একজন উচ্চ শিক্ষিত ও পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দেশের নাগরিক সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত ও দারিদ্রপীড়িত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি যেখানে সংবেদনশীল হবেন সেখানে তার এই জাতি-বিদ্বেষ প্রসূত বক্তব্য ও একচোখা মানসিকতা সত্যিই উদ্বেগজনক।
এ প্রসঙ্গে গত ১৬ জুন 'সুপ্রভাত বাংলাদেশ' দৈনিকে প্রকাশিত 'নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার স্বর্গভূমি' শীর্ষক সংবাদে করা হয় যে, '... এসব এলাকার চোরাকারবারীরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এদের মধ্যে মদসহ রেজাউর রহমান প্রকাশ রেজাইয়, উমর ফারুক প্রকাশ ফারুইক্কা ও ভুট্ট গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন পর এলাকায় এসে আবার এইসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে যার নাম ব্রাশ গ্রুপ। নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে প্রবেশ করলে এদের আধিপত্য দেখা যায়। এই গ্রুপকে বর্তমানে সক্রিয় করেছে দারুল আনসার আল খাইরিয়ার মৌলভী নজির।'
গত ১১ ডিসেম্বর ২০০৪ দৈনিকে সংবাদে 'বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হলেও ধরা পড়ছে না সন্ত্রীরা' সংবাদে বলা হয় যে, '...এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (এআরএসও), আরাকান আর্মি (এএ), ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আরাকান (ডিপিএ), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অফ আরাকান (নুপা), আরাকান লিবারেল পার্টি (এএলপি) এবং আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (এএসও) সহ আর কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ। ...এসব গ্রুপ মায়ানমার থেকে অস্ত্র এনে এখান থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকাসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করছে বলে এলাকায় ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে।' উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী বলা যায় যে, 'উপজাতীয়' বা 'পাহাড়ী'রা নয়, স্থানীয় বাঙালী ও রোহিঙ্গ্যা মুসলিম বিদ্রোহীরাই অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে।
প্রবন্ধকার পত্রিকার বা বিভিন্ন বই-পুস্তকের অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং যেহেতু উদ্ধৃত সবগুলো অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্ত বায়নের প্রতিকূলে ও সেনাবাহিনীর অনুকূলে, তাই তিনি সবগুলো সত্য ও যৌক্তিক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। পক্ষান্তরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও বই-পুস্তকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগই তিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জ্ঞান করে নিয়েছেন। প্রবন্ধকারের প্রবন্ধটি পড়লে মনে হবে যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং জাতীয় পর্যায়ের কিছু মিডিয়া কেবলই সেনাবাহিনীর খুঁত কোথায় রয়েছে তা বের করার জন্য তৎপর রয়েছে। সেখানে সত্যের লেশমাত্র নেই। বস্তুতঃ প্রবন্ধে বর্ণিত সব উদ্ধৃতি প্রবন্ধকারের একদেশদর্শিতা ও উদ্দেশ্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরই সেনাবাহিনীসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী একটি উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করে আসছে যে, জনসংহতি সমিতি সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেয়নি। এটা জায়েজ করতে গিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের অব্যবহিত পরে ১৯৯৮ সালের প্রথম দিকে প্রচার করে যে, 'প্লাবন' নামে জনৈক কম্যান্ডারের নেতৃত্বে সাজেকে প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র সদস্য সংগঠিত হয়েছে। তাদেরকে অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ দেখা গেছে। এরপরই 'ব্ল্যাক ডক', জুম্ম লিবারেশন আর্মী ইত্যাদি নামে নানা আঙ্গিকে সশস্ত্র গ্রুপের অস্তিত্বের কথা ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে জুম্ম জনগণের মধ্যে চুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সশস্ত্র সংঘর্ষ ইত্যাদি নামে ফলাওভাবে সংবাদ প্রচার করতে মরিয়া হয়ে উঠে। এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে তালবাহানা এবং চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সেনাশাসন বলবৎ রাখার হীন তৎপরতাকে দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর কাছ থেকে আড়াল করা; পক্ষান্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে জায়েজ করা। প্রবন্ধকার উক্ত হীন উদ্দেশ্যেরই বশবর্তী হয়ে একতরফাভাবে 'উপজাতীয়' সন্ত্রাসীদের দ্বারা সশস্ত্র তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন এবং পক্ষান্তরে সেনা নির্যাতনের অভিযোগ খন্ডন করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন।
প্রবন্ধকার এও বলেছেন যে, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে মোতায়েন সেনাবাহিনী আইনানুসারে নিষ্ঠার সঙ্গে নিরপেক্ষতাভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এ দায়িত্ব পালনকালে সেনা সদস্যরা দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্থানীয় আদিবাসীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকছে, তবুও একটি মহল সুপরিকল্পিতভাবে অপপ্রচারের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে বিতর্কিত করে তোলার অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে।' তাই যদি হয় তাহলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে সেটেলার বাঙালীরা কিভাবে জুম্মদের উপর বার বার সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে আসছে? গত ৪ এপ্রিল ১৯৯৯ সেনা সদস্য কর্তৃক বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট বাজারে জুম্মদের উপর হামলা চালানো হয় এবং এতে ৫১ জন জখম হয়। ১৬ অক্টোবর ১৯৯৯ বাবুছড়া জোনের সেনা সদস্য কর্তৃক দীঘিনালার বাবুছড়া বাজারে জুম্মদের উপর হামলা চালানো হয় এবং এতে ৩ জন নিহত, ২১৬ জন আহত ও ৭৪টি জুম্ম দোকান ও ঘরবাড়ী লুটপাট ও ভাংচুর করা হয়। ১৮ মে ২০০১ সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতে দীঘিনালা বোয়ালখালী-মেরুং এলাকায় জুম্ম গ্রামে হামলা চালানো হয় এবং এতে ৪২টি বাড়ী ভস্মিভূত ও ১৬১টি বাড়ী ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। ২৬ জুন ২০০১ রামগড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে জুম্ম গ্রামে হামলা চালানো হয় এবং ১১০টি বাড়ী ভস্মিভূত ও ১১৭টি বাড়ী লুটপাট ও ভাংচুর করা হয়। ২৬ আগষ্ট ২০০৩ মহালছড়িতে ১৪টি জুম্ম গ্রামে হামলা করা হয় এবং এতে চার শতাধিক বাড়ী ভস্মিভূত ও লুটপাট, ২ জন জুম্মকে হত্যা ও ১০ জুম্ম নারীকে ধর্ষণ করা হয়।
সেনাবাহিনী শুধু সাম্প্রদায়িক হামলার ইন্ধন দিচ্ছে না, একই সঙ্গে আদিবাসী জুম্মদের চিরায়ত প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনাকে অস্বীকার করে জুম্মদের জায়গা-জমি জবরদখল চালিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বান্দরবানে আর্টিলারি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য সাড়ে ১১ হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। রুমা সেনানিবাস সম্প্রসারণের জন্য ৯ হাজার ৫৬০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে হাজার হাজার আদিবাসী পাহাড়ী তাদের বাস্তভিটা ও চিরায়ত জুম ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে পড়বে। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় খাগড়াছড়ির লেমুছড়ি, গামাঢ়ীঢালা, জয়সেন কার্বারী পাড়াসহ রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় জুম্মদের রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জমির উপর সেটেলার বাঙালীদের শত শত ঘরবাড়ী নির্মিত হচ্ছে।
এছাড়া সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বানচাল করা তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক উম্মাদনাকে উস্কে দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, 'পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন' নামে একটি উগ্র জাতীয়তবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্রন্ট খুলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জঘন্য সাম্প্রদায়িক তান্ডবতা শুরু করেছে। সেনাছাউনির নিরাপদ আচ্ছাদনে তথাকথিত এই সমঅধিকার আন্দোলন জুম্মদের উপর প্রতি মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক হামলার পাঁয়তারা করে চলেছে। এই গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবি ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে এবং গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০০৪ রাঙ্গামাটিতে জনসংহতি সমিতির সমাবেশে যোগ দিতে আসার সময় প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে হামলা করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাঞ্চিত ঘোষণা দিয়ে তাঁর ফাঁসি দাবী করছে।
এছাড়া এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনে যোগ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও জুম্মদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে 'আদি ও স্থায়ী বাঙালী কল্যাণ পরিষদ'এর উপর চাপ দেয়া হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে গত ১৪ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম আদি ও স্থায়ী বাঙালী কল্যাণ পরিষদের ১৮ জন নেতৃবৃন্দকে রাঙ্গামাটি ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন ফেরদৌস তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও হয়রানি করেন। এ ঘটনাকে প্রবন্ধকারের ভাষায় "আগে থেকে জ্বরে আক্রান্ত আজম আলী আজম জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় হাসপাতালে সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ দিয়ে ভর্তি করার" বিষয়ে যেভাবে মিথ্যার বেসাতি করেছেন তা ভাবতে অবাক লাগে। প্রবন্ধকারের এই জাজ্জ্বল্য মিথ্যাকেও যদি সত্য হিসেবে ধরে নেয়া হয় তাহলে 'আগে থেকে জ্বরে আক্রান্ত আজম আলী আজম'কে হাসপাতালে না পাঠিয়ে সকলা ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কমপক্ষে ৫ ঘন্টা ধরে ক্যাম্পে আটকে রেখে সেনা সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করলো কেন?
প্রবন্ধকার বলেছেন, 'চুক্তির পর আন্দোলনের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এ আশঙ্কায় জনসংহতি সমিতির অনুসারীরাই পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধিকারের দাবি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইউপিডিএফ গঠন করে।' তার এই বক্তব্য সর্বাংশে সত্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর তৎকালীন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের একটি ক্ষুদ্র অংশ জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিক্রিয়াশীল মহলের মদদে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং জনমতকে বিভ্রান্ত 'করার লক্ষ্যে তথাকথিত 'পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন' কায়েমের শ্লোগান তুলে। পরবর্তীতে এই গোষ্ঠী ইউপিডিএফ নামে একটি দল গঠন করে জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের উপর সশস্ত্র হামলা শুরু করে। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পাওয়ার মতো এতে সরকারের পোয়াবারো হয়। স্থানীয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ বরাবরই ইউপিডিএফ'কে নানা কায়দায় বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিতে থাকে যাতে তারা বেড়ে উঠে জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে ধংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বানচাল করে দিতে পারে। বলাবাহুল্য সেনাবাহিনী কর্তৃক মাঝে মধ্যে ইউপিডিএফ সদস্য গ্রেপ্তারের ঘটনা লোক দেখানো নাটক এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করার কৌশল বৈ কিছু নয়।
জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় পদার্পন করেছে। তাই জনসংহতি সমিতি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে গণতান্ত্রিক উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রবন্ধকারের ভাষায় 'অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য' বা 'এলাকার আধিপত্য বিস্তারের জন্য' 'জেএসএস তাদের কর্মীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আবার সংঘবদ্ধ করার' বা 'ব্ল্যাক ডগ গঠন করার' বা 'অস্ত্র সংগ্রহের' প্রশ্নই আসতে পারে না। এসব অবান্তর বিষয় কেবলমাত্র 'সমঅধিকার আন্দোলন' এর মতো উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন বা তাদের অনুসারীরাই প্রচার করতে পারে।
ইউপিডিএফের চাঁাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিরোধ করতে গিয়ে যদি কেউ সংগঠিত হয় তাহলে এক্ষেত্রে জনসংহতি সমিতি তার দায়িত্ব নিতে পারে না বা 'চুক্তি পক্ষের' নাম দিয়ে জনসংহতি সমিতির ঘাড়ে তার দায়ভার চাপিয়ে দেয়া যুক্তিগ্রাহ্য ও বাস্তবসম্মত হতে পারে না। অপরদিকে প্রবন্ধকারের '... জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম জোরদার করার উদ্যোগ' বা 'জেএসএস-প্রীতি গ্রুপ-ইউপিডিএফ বিরোধ মিটিয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা' হচ্ছে বলে কল্পনাপ্রসূত আওয়াজ তুলে প্রবন্ধকার অতি সুক্ষ্মভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার অপপ্রয়াস চালান। জনসংহতি সমিতির চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনের সাথে ইউপিডিএফের চুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতার মধ্যে সমঝোতার যোগসূত্র একমাত্র প্রবন্ধকারের মতো সাম্প্রদায়িক ও অপরিণামদর্শী সেনা কর্মকর্তারাই ভাবতে পারেন।
প্রবন্ধকার তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধে 'সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবির সাথে তাদের (জনসংহতি সমিতির) কোন অশুভ পরিকল্পনা বাস্ত বায়নের' বা 'দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপতৎপরতার' যোগসূত্র বরাবরই বের করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, সেনাশাসন কখনোই দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে না। পাকিস্তান আমলের। আইয়ুব-ইয়াহিয়া শাহীর সামরিক শাসন এবং বাংলাদেশের জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসন বরাবরই এদেশের গণতন্ত্রকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। একটা গণতন্ত্রকামী দেশের কোন অংশে যদি সেনাশাসন বলবৎ থাকে তাহলে সে দেশে কখনোই সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনানুসারে কার্যকর করার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাশাসন 'অপারেশন উত্তরণ' ও চুক্তি মোতাবেক সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের কোন বিকল্প নেই। এর সাথে 'কোন অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের' বা 'দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপতৎপরতার' যোগসূত্র একমাত্র দেশের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠায় যারা বিশ্বাস করেন না তারাই ভাবতে পারেন।
প্রবন্ধকার সবশেষে বলেছেন, 'শান্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জিতেছে সেনাবাহিনী এবং হেরেছে প্রচারে...। এ অপপ্রচার এখনও অব্যাহত রয়েছে। মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত জাতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত অপপ্রচার রোধে মিডিয়ার সহযোগিতা অপরিহার্য।' এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে সেনাবাহিনী মিডিয়াকে কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো এবং সেনাবাহিনীর স্বপক্ষে বিভিন্ন ধরনের পত্রিকা, সংকলন ও বই-পুস্তক প্রকাশ করা হতো। এমনকি আজ অবধি সে ধারা কমবেশী অব্যাহত রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশে-বিদেশে জুম্ম জনগণের উপর নৃশংস দমন-পীড়নের ঘটনা ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হয়নি। তার একমাত্র কারণ জুম্ম জনগণ সত্য ও ন্যায়ের পথে ছিল। দেশে-বিদেশে মিডিয়াসহ গণতান্ত্রিক, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল শক্তিসমূহ বরাবরই জুম্ম জনগণের পাশে ছিল এবং বর্তমানেও রয়েছে।
বলাবাহুল্য বাংলাদেশের সেনাবাহিনী শুধু বাঙালীদের সেনাবাহিনী নয়, এটা জুম্ম জনগণসহ সমগ্র দেশবাসীর সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সেনাবাহিনীর সুনাম হলে আমরা জুম্ম জনগণও গর্ববোধ করি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের সেনা সদস্যরা সুনাম অর্জন করলে সমগ্র দেশবাসীর ন্যায় আমরাও গর্বিত হই। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী যদি সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে সমগ্র দেশবাসীর ন্যায় আমরাও তার নিন্দা জানাই। সেনাবাহিনীর ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হোক এটা কারোরই কাম্য হতে পারে না।
[জুম্ম সংবাদ বুলেটিন, বুলেটিন নং- ৩৫, ১৫ বর্ষ, ১০ নভেম্বর ২০০৫ থেকে নেয়া প্রবন্ধ]
লেখক চন্দ্র শেখর চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
.jpg)
No comments:
Post a Comment