লেখক- চন্দ্রশেখর চাকমা
[এই লেখাটি প্রকাশের জন্য গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৫ দৈনিক সংবাদে প্রেরিত হয়। কিন্তু ছাপানো হয়নি। তবে তার আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৫ এর সংক্ষিপ্ত অংশবিশেষ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। তথ্য ও প্রচার বিভাগ।]
গত ১৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত লেঃ কর্ণেল মোঃ নজরুল ইসলামের "পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু ও সেনাবাহিনী: মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে চন্দ্রশেখর চাকমার ভাষ্য প্রসঙ্গে" শীর্ষক দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া পড়লাম। আগের লেখার মতো এবারেও প্রবন্ধকার একপেশে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। বরাবরেই মতো পার্বত্যাঞ্চলে সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখার পক্ষে কল্পনাপ্রসূত ও মনগড়া নানা উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। কখনো 'অপারেশন দাবানল', কখনো 'অপারেশন উত্তরণ' জারী রেখে বছরের পর বছর ধরে সেনাশাসন বলবৎ রাখাও মৌলিক অধিকার' পরিপন্থী নয় এবং 'সংবিধান স্বীকৃত বলেও তিনি উলেখ করেছেন। এমনকি 'অপারেশন উত্তরণ'-এর আওতায় সেনাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত কোন অভিযোগেরই লেশমাত্র সত্যতা নেই; সকল অভিযোগই ভিত্তিহীন; এটা স্রেফ 'সেনাবিদ্বেষ' ছড়ানো ইত্যাদি বলে একতরফাভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন। উপরন্তু 'সেনাসদস্যরা প্ররোচণা ও উসকানির মুখেও সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করছেন' বলে একপ্রকার হুমকি দিয়েছেন। উলেখ্য তাঁর এই হুমকিমূলক বক্তব্য পড়ে যে কোন পাহাড়ী মাত্রই আতঙ্কিত হতে বাধ্য। কেননা তাদের সেই 'সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযম' যে কোন সময়েই ভেঙ্গে যায় এবং যেতে পাবে তা সকলের স্মরণে আছে। এজন্যেই জুম্মরা বলেন 'জীবন আমাদের নয়'।
বিভিন্ন পত্রিকা, গ্রন্থ ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি এবং একচোখা নীতি
প্রবন্ধকার তাঁর প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে বলেছেন, তাঁর লেখায় সন্নিবেশিত বিভিন্ন পত্রিকা, গ্রন্থ এবং বিশেষকদের উদ্ধৃতিগুলো আমি তাঁর নিজস্ব মতামত হিসেবে চিহ্নিত করে আমি আলোচনা করেছি এবং পাঠকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছি। বস্তুতঃ বিভ্রান্ত করার চেষ্টা যদি করা হয় সেটা তিনিই করেছেন; আমি করিনি এটা পাঠকমহল সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন। কারণ তিনি কেবল একদেশদর্শী উদ্ধৃতি অর্থাৎ জুম্ম জনগণের আন্দোলনের বিরুদ্ধে এবং সেনাবাহিনীর অনুকুলে লিখিত মতামতগুলো উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পক্ষান্তরে জুম্ম জনগণের আন্দোলনের সপক্ষে এবং সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে লিখিত মতামতগুলো তাঁর প্রবন্ধে ভুলক্রমেও উলেখ করেননি। যেমন প্রবন্ধকার ১২ সেপ্টেম্বর'০২-এর দৈনিক সংবাদের 'চুক্তিপক্ষীয়দের ১৭ জন সমর্থককে অস্ত্রসহ আটক করার' ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে জনসংহতি সমিতির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। অথচ উক্ত রিপোর্টে 'তাদের (১৭ জন) ঘরবাড়ি থেকে টেনে এনে গ্রেফতার করা হয়েছে' বলে উলেখ রয়েছে। কিন্তু তিনি সেই অংশটির উদ্ধৃতি দেননি। এভাবেই তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোতিভাবে অংশবিশেষ উদ্ধৃতি তুলে ধরে পাঠককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই একপেশে উদ্ধৃতি এটাই নির্দেশ করে যে, তিনি যা বিশ্বাস ও সত্য হিসেবে মনে করেন তা তিনি নিজের মুখে না বলে বিভিন্ন পত্রিকা, গ্রন্থ এবং বিশেষকদের উদ্ধৃতির মাধ্যমে বলতে চেষ্টা করছেন। মহালছড়ি সাম্প্রদায়িক হামলার উপর প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদসমূহ বিশেষণ করলে তাঁর এই একচোখা ও একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি আরো সুস্পষ্ট হবে।
মহালছড়ি হামলায় সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে
তিনি হরি কিশোর চাকমার রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে মহালছড়ি হামলার নেপথ্য কারণ হিসেবে 'পাহাড়িদের চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়, পুনর্বাসিত বাঙালিদের বসতি সম্প্রসারণের চেষ্টা এবং এসব নিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব' উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু উদ্ধৃত অংশের পরের বাক্যে 'অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সেনাবাহিনীর ইন্ধন ছিল' বলে অভিযোগ করা হয় তা তিনি উল্লেখ করেননি। এছাড়া ৪ সেপ্টেম্বর'০৩ জনকণ্ঠ ও প্রথম আলো এবং ১০ সেপ্টেম্বর ০৩ সংবাদে 'ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীরা বলেছে, প্রায় সব গ্রামেই আগুন দেয়া হয়েছে সেনা সদস্যদের উপস্থিতিতে' বলে উল্লেখ ছিল। ৪ সেপ্টেম্বর ০৩ জনকণ্ঠ রিপোর্টে উল্লেখ ছিল, 'এলাকার সূত্রগুলো বলেছে, বিনোদ বিহারী নিহত হয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে' এবং 'ঘটনার সময় বাবুপাড়া আম্রকানন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ শাসনাপ্রিয় ভিক্ষু ও দায়ক আদি রতন খীসাকে জনৈক সেনা সদস্য বন্দুক উচিয়ে দরজা খুলতে বাধ্য করে'। উল্লেখ্য, বিহারটি সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়।
প্রবন্ধে তিনি দৈনিক সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, 'সেনাসদস্যদের ওপর এ ঘটনার দায় চাপানোর জন্য সেনা পোশাক পরিহিত পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা সেদিন ঘটনাস্থলে সক্রিয় ছিল'। কিন্তু 'ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীরা বলেছে, সেনা পোষাক পরা যারা গ্রামে ঢুকেছিল তারা পাহাড়ী নয়, বাঙালী' (৪ সেপ্টেম্বর ০৩ জনকণ্ঠ)। মহালছড়ি হামলায় সেনা সদস্য কর্তৃক নারী ধর্ষণের অভিযোগ খন্ডন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'মহালছড়ির ঘটনার অব্যবহিত পরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সরেজমিন রিপোর্টে কোনো ধর্ষণের ঘটনার উল্লেখ ছিল না।' এ প্রসঙ্গে ৫ সেপ্টেম্বর ০৩ ভোরের কাগজের সম্পাদকীয়কে বলা হয়েছে, 'হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ধর্মীয় স্থান ধ্বংস- কোন কিছুই বাদ যায়নি বলে পত্রিকায় রিপোর্টে বলা হয়েছে'। অপরদিকে 'কালাসোনা বলেছেন চারজন বাঙালী ও পোষাক পরিহিত অবস্থায় মোট সাতজনের গণধর্ষণের শিকার তিনি হয়েছেন' (৪ সেপ্টেম্বর'০৩ জনকণ্ঠ)। 'বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ার কারণে ধর্ষণের ঘটনাগুলো ঘটে কেরেঙ্গানাল গ্রামে। ঐ গ্রামের ১০ জন ধর্ষিতার পরিচয় পাওয়া যায়' (৫ সেপ্টেম্বর ০৩ ভোরের কাগজ)। এ প্রসঙ্গে প্রবন্ধকার জানতে চেয়েছেন, 'মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্ষণের বিষয়টি প্রমাণপূর্বক কোনো প্রকার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কিনা।' আমিও উল্টো প্রশ্ন করতে চাই, পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার মা-বোন যারা ধর্ষিত হয়েছেন তাদের ক'জনের মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছিল? মহালছড়িতে যেখানে চার শতাধিক ঘরবাড়ী সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়, যেখানে মানুষের প্রাণ বাঁচানো দায়; সেই ভীতিকর পরিবেশে প্রবন্ধকার কীভাবে মেডিকেল পরীক্ষার কথা বলতে চান ভাবতে অবাক লাগে। তাছাড়া সরকারী তরফেও তাদের ডাক্তারী পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়নি (৬ সেপ্টে'০৩ জনকণ্ঠ)। মহালছড়ি ঘটনায় আমি ২৬টি গ্রামে হামলায় কথা বলিনি, বলেছি ১৪টি গ্রামে। এছাড়া পুড়ে যাওয়া ঘরের সংখ্যা জনসংহতি সমিতির তথ্যানুসারে ৪ শতাধিক আর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (অনেকের মতে সেনাবাহিনীর) প্রকাশিত বুকলেট অনুসারে ৫৭৫টি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা ও তৎপরতা' প্রসঙ্গে
প্রবন্ধকার পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন বলবৎ রাখার পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও পার্বত্যাঞ্চলের অপরাধ ও সন্ত্রাসের পার্থক্য বুঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা ও তৎপরতার ইতিহাস বেশ পুরনো' এবং সেই ইতিহাস উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'স্বাধীনতার কিছুদিন পর সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করা হয়েছিল এই অঞ্চল থেকেই।' প্রথমতঃ সশস্ত্র সংগ্রামের অর্থ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হতে পারে না। মানব ইতিহাসে দেখা যায় যে, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা রুদ্ধ হলেই মানুষ অনিয়মতান্ত্রিক বা বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয়তঃ স্বাধীনতার পর পার্বত্যাঞ্চলের জুম্ম জনগণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাবী আদায়ের আন্দোলন চালায়। জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পার্বত্যাঞ্চলের জুম্ম জনগণ চারদফা সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি জানায়। জুম্ম জনগণের সেই ন্যায়সঙ্গত দাবি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী প্রত্যাখ্যান করে এবং পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক সামরিকায়নে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হলে জুম্ম জনগণের দাবি আদায়ের সংগ্রাম সশস্ত্র রূপলাভ করে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহতি পরেই ১৯৭২ সালের প্রথমার্ধ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকায়ন শুরু হয় (Amena Mohsin, The Polities of Nationalism, p.164)। তাই বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে ১৯৭৩ সালে সশস্ত্র শাখা গঠন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং পাশাপাশি বরাবরই রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখে জনসংহতি সমিতি। এ লক্ষ্যেই ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তিত হলেও রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের স্বার্থে জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও তৎকালীন সাংসদ এম এন লারমা বাকশালে যোগদান করেছিলেন।
তৃতীয়তঃ জনসংহতি সমিতি বা পার্বত্যাঞ্চলের জনগণ কখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতা ঘোষণা বা দাবি করেনি। পক্ষান্তরে সশস্ত্র আন্দোলন চলাকালেও জনসংহতি সমিতি রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে পার্বত্য সমস্যা সমাধানের নীতি অনুসরণ করে। তারই আলোকে ১৯৮৫ সালের ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দ্বিতীয় বৈঠকে জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের নিকট পাঁচদফা দাবিনামা সম্বলিত প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি পেশ করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত পাঁচদফা দাবিনামা সংশোধন করে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের পরিবর্তে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিনামা পেশ করা হয়। উক্ত দাবিনামার আলোকে সংলাপের এক পর্যায়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এখানে প্রবন্ধকার কোথায় বিচ্ছিন্নতাবাদের গন্ধ পেলেন ভাবতে অবাক লাগে।
বলাবাহুল্য, সেনাবাহিনীর একটি অংশসহ দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক মহল বরাবরই জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আন্দোলন বলে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে এবং রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের পরিবর্তে সামরিক উপায়ে এবং বহিরাগত অনুপ্রবেশের মাধ্যমে জাতিগত নির্মূলীকরণ নীতির ভিত্তিতে সমাধানের জন্য ওকালতি করে আসছে। এতে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যা আরো জটিলতর রূপ ধারণ করছে।
জুম্ম জাতি ও জুম্মল্যান্ড প্রসঙ্গে
মিডিয়ার বরাত দিয়ে প্রবন্ধকার বলেছেন, "শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের একটি অংশ 'স্বাধীন জুম্মল্যান্ড' প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।" অপরদিকে আমার লেখায় 'জুম্ম জনগণ' শব্দ ব্যবহার করায় প্রবন্ধকার সেই 'জুম্মল্যান্ড' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তিনি খুঁজে পেয়েছেন। 'স্বাধীন জুম্মল্যান্ড' প্রতিষ্ঠা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমার মতামত রেখেছি। এবারে 'জুম্ম জনগণ' প্রসঙ্গে বলি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী দশ ভাষাভাষি এগারটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের সম্মিলিতভাবে 'জুম্ম' হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।
'মূলতঃ দশ ভাষাভাষি এগারটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত চাষাবাদ পদ্ধতি 'জুম' থেকে 'জুম্ম' শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। জুম্ম শব্দটি দুটো অর্থ নির্দেশ করে। প্রথমতঃ সাধারণভাবে ধান, তিল, তুলা, মরিচ, শাকসজি ইত্যাদি ফসল একই সাথে কোন পাহাড় বা উচ্চভূমিতে চাষ করা হয়ে থাকলে সেই খাদ্য-শস্য পরিপূর্ণ শস্যক্ষেতকে 'জুম' বলা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়তঃ মূলতঃ পাহাড় অর্থে 'জুম' শব্দটি বুঝানো হয়ে থাকে। তাই 'জুম' কথাটি 'পাহাড়' (উচ্চভূমি) শব্দের সমার্থক অর্থ নির্দেশ করে। 'জুম্ম' অর্থ হচ্ছে পাহাড়ের অধিবাসী বা পাহাড়ী। ২ নভেম্বর ১৯৭২ সালে সংবিধান বিলে ৪৭ক নামে একটি নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজনী প্রস্তাব উত্থাপনের সময় গণপরিষদের অধিবেশনে এম এন লারমা বলেন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোট ছোট জাতি সবাই মিলে আমরা নিজেদেরকে পাহাড়ী বা 'জুম্ম' বলি।' সুতরাং 'জুম্ম' শব্দটি একটি জাতিগত পরিচয়জ্ঞাপক। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর অধিকার আছে তাদের স্বকীয় নৃতাত্তিক পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার। এক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতবাদ বা স্বাধীনতার যোগসূত্র খোঁজা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপচেষ্টা বৈ কিছু নয়।
জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করে 'জুম্মল্যান্ড' করার প্রস্তাব করা হয়। বস্তুতঃ এ অঞ্চলটি চট্টগ্রামের অংশ নয়। আর এ অঞ্চলটি এক সময় 'কার্পাস মহল' নামেও পরিচিতি ছিল। উপরন্তু এ অঞ্চলটি স্মরণাতীত কাল থেকে জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চল। তাই আদিবাসী জুম্মদের দাবী এই অঞ্চলটির নাম জুম্ম ল্যান্ড করা হোক। এতে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা সার্বভৌমত্ব বিরোধী কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না। উধপপধ-এর বানানকে উযধশধ করা এবং মাদ্রাজকে চেন্নাই নামকরণের ফলে কোন দেশের রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ক্ষুন্ন হয়নি।
আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা স্বায়ত্বশাসন বা বিশেষ স্বশাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে
প্রবন্ধকার 'আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা স্বায়ত্বশাসন বা বিশেষ স্বশাসন ব্যবস্থার' সাথে 'স্বাধীন জুম্মল্যান্ড' প্রতিষ্ঠার মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছেন। বলাবাহুল্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সমাজ, ধর্ম, রীতিনীতি, জীবনধারা, অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র সত্ত্বার অধিকারী। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্বার জন্য যদি আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক বিশেষ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে তাদের সেই স্বকীয়তা ও জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মাধ্যমেই কেবল একটা জাতি নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ার সুযোগ লাভ করতে পারে।
উপরোক্ত বাস্তবতার আলোকে বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এককেন্দ্রিক বা যুক্তরাষ্ট্রীয় যেই শাসনকাঠামোর আওতায় অনগ্রসর ও সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে বা জাতিসমূহের জন্য বিশেষ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা আত্মনিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে স্ব-শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে আসছে। যুক্তরাজ্য একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও মোট জনসংখ্যার ৯.২% অধিবাসী ও মোট আয়তনের ৩২% অঞ্চল নিয়ে গঠিত স্কটল্যান্ডের জন্য একটি উন্নত স্বায়ত্বশাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। অনুরূপভাবে ইতালির জার্মান-ভাষী দক্ষিণ টাইরল-এর মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৭৫% (১৯৮১ সনে ৪,৩৩,২২৯ জন) অধিবাসীদের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রদান পূর্বক অধিকতর স্বায়ত্বশাসন প্রবর্তন করা হয়েছে। মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৪৬% (২২,৯০০ জন) সুইডশ-ভাষী ফিনিশ নাগরিক অধ্যুষিত এলান্ড দ্বীপপুঞ্জেও ফিনল্যান্ড সরকার স্বায়ত্বশাসন প্রদান করেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে সংঘশাসিত রাজ্য, স্ব-শাসিত জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ, উপজাতি অঞ্চল নামে বিভিন্ন স্তরের স্বায়ত্বশাসনের ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে পাকিস্তানেও খাইবার, কোরাম, মালাকান্দ ইত্যাদি এলাকায় উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল নামে পৃথক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। অনুরূপভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অধীনে আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক স্বশাসন ব্যবস্থা দাবী করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(৪) নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং উক্ত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের অঙ্গীকার করা হয়। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ স্বশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। তাই এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ স্বশাসন ব্যবস্থার সাথে 'স্বাধীন জুম্মল্যান্ড' প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ টানার অর্থ হচ্ছে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করা এবং জুম্ম জনগণের বিরুদ্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তবাদকে উস্কে দেয়ার অপচেষ্টা বৈ কিছু নয়।
এ প্রসঙ্গে প্রবন্ধকার একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রায়ই 'রাজা ত্রিদিব রায়ের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা'কে উদ্ধৃতি দিয়ে আসছেন। এখানেও প্রবন্ধকারের একচোখা নীতি ও ষড়যন্ত্রমূলক মানসিকতা ফুটে উঠে। তিনি শুধু ত্রিদিব রায়ের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাকে দেখে থাকেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে জুম্মদের অংশগ্রহণ তিনি দেখেন না। দেখলে এই একপেশে উদাহরণ তিনি বার বার দিতেন না। দ্বিতীয়তঃ এটা সত্য যে, জুম্মদের মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলেন, যেমনি করেছিলেন বাঙালীদের মধ্যে অনেকেই। তজ্জন্যে গোটা বাঙালী জাতি যেমনি দায়ী হতে পারে না তেমনি সমগ্র জুম্ম জনগণ বা জনসংহতি সমিতিও দায়ী হতে পারে না। দেশবাসীর মধ্যে জুম্ম জনগণ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টির লক্ষ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তিনি এটা বারে বারে উল্লেখ করছেন বলে বলা যেতে পারে।
সমতল অঞ্চলে ও পার্বত্যাঞ্চলে সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে
প্রবন্ধকার পার্বত্যাঞ্চলে সেনা মোতায়েনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন যে, 'সমতল অঞ্চলেও সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য সেনা মোতায়েন করা হয়ে থাকে।' নব্বই সালে স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর দেশের কোন অঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বছরের পর বছর ধরে সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে বলে নজির নেই। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের আমলে কয়েক মাসের জন্য 'অপারেশন ক্লিট হার্ট' জারী করা হয়েছে মাত্র। সাময়িক কালের জন্য প্রচলিত আইন মোতাবেক তা হতে পারে। সেজন্য আমি গত লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে যদি পার্বত্যাঞ্চলে সেনাবহিনী মোতায়েন করতে হয় তাহলে পার্বত্য চুক্তি ও আঞ্চলিক পরিষদ আইন অনুসারে আঞ্চলিক পরিষদের অধীনেই সেনাবাহিনী মোতায়েন বিধিসম্মত হতে পারে। অপরদিকে পার্বত্যাঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে, এমনকি পার্বত্য চুক্তিকে লঙ্ঘন করে 'অপারেশন উত্তরণ' জারী করে শত শত অস্থায়ী (অপারেশনাল) ক্যাম্প বলবৎ রেখে সেনা মোতায়েন রাখার সাথে সমতল এলাকার সেনা মোতায়েনের তুলনা হতে পারে না।
প্রবন্ধকার সেনা শাসনের লক্ষণসমূহ উল্লেখ করতে গিয়ে সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের প্রয়োগ স্থগিতকরণ, সেনা কমান্ডার কর্তৃক বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ,..এক কথায় গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতির কথা বলেছেন। 'অপারেশন দাবানল' বা 'অপারেশন উত্তরণ' অব্যাহত রেখে পার্বত্যাঞ্চলে সেনাশাসন কায়েম করা আর সমগ্র দেশে সামরিক আইন জারী করা এক বিষয় হতে পারে না। প্রচলিত (কনভেনশনাল) সামরিক আইন জারী করার মাধ্যমেই প্রবন্ধকারের উল্লেখিত লক্ষণসমূহ দৃশ্যমান হতে পারে। দ্বিতীয়তঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাহ্যতঃ সিভিল প্রশাসন বলবৎ থাকলেও কার্যতঃ সেনাবাহিনীই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। সিভিল প্রশাসনের উপর সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণেই মহালছড়ির সাম্প্রদায়িক হামলার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় তৎকালীন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, 'পাহাড়িরা অসহায়, তিনি নিরুপায়' (৪ সেপ্টেম্বর'০৩ প্রথম আলো)। এই অপ্রিয় সত্যকে প্রকাশ করায় তাকে সাথে সাথে অন্যত্র বদলি করা হয়। সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়িতে অস্ত্র উদ্ধারের পর সেনাবাহিনীর একাধিপত্যের কিছু কথা পত্রিকায় সংবাদে চলে আসে। বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার বলেছিলেন, 'আমাকে এখানে কেউ কোন তথ্য দেয় না। দেবার প্রয়োজনও মনে করে না' (৮ সেপ্টেম্বর'০৫, জনকণ্ঠ)। পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে আঞ্চলিক পরিষদ বা পার্বত্য জেলা পরিষদকে সম্পৃক্তকরণের কথা বাদ, কেউ অবহিতকরণের তাগিদও অনুভব করে না।
এছাড়া সেনাবাহিনী কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে রাত্রিকালীন চলাচল নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ জারী করা হয় (৬ আগষ্ট'০৩)। রাজনৈতিক দলের নেতৃবন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের তথ্যাবলী সংগ্রহের নির্দেশ জারী করা হয় (দীঘিনালা সেনানিবাস, জুলাই'০৪)। স্কুল শিক্ষক, জুমচাষী, বোট চালক, হেডম্যান-কার্বারী, বাজার কমিটি ও ব্যবসায়ী, মৎস্য শিকারীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পার্বত্যাঞ্চলে সেটেলার বাঙালীদের কাছ থেকে জমির খাজনা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে তিন পার্বত্য জেলা প্রশাসককে গোপনীয় পত্র দেয়া হয়। এমনকি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এনজিওদের তথ্যাবলীও সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় (চট্টগ্রাম সেনানিবাস স্মারক নং-১০০৩/সিএ/২১/বিবিধ/৫৯, তারিখ ২২/৪/০২)। পার্বত্য চট্টগ্রামে বানিজ্যিক মোবাইল ফোন সেন্টার বন্ধ করা হয় (বিডিনিউজ ২০ আগষ্ট)। সেনা প্রশাসনের অমতে এখানে সিভিল প্রশাসন কিছুই করতে পারে না। এভাবেই আজ সিভিল প্রশাসনের কাঁধে ভর করে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে একপ্রকার সেনাশাসন।
অব্যাহত অপপ্রচার ও সংবাদের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে
প্রবন্ধকার প্রশ্ন রেখে বলেছেন যে, তিনি পত্রিকায় যেসব রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছেন সেগুলো যদি ভিত্তিহীন হয় তাহলে সেগুলো যখন প্রকাশিত হয় তখন কেন প্রতিবাদ করা হয়নি। প্রথমতঃ প্রতিবাদ করা হয়নি তা তিনি নিশ্চিত হলেন কি করে? আগের লেখাতেই উল্লেখ করেছি, সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে সেনাবাহিনীসহ একটি বিশেষ মহল মিডিয়াকে কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো এবং জুম্ম জনগণের আন্দোলনের বিপক্ষে বিভিন্ন ধরনের পত্রিকা, সংকলন ও বই-পুস্তক প্রকাশ করা হতো। এমনকি আজ অবধি সে ধারা কমবেশী অব্যাহত রাখা হয়েছে। ফলতঃ প্রকাশিত অনেক সংবাদের প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও পত্রিকায় তা ছাপানো হয় না। দ্বিতীয়তঃ অপপ্রচারণামূলক সব অবান্তর সংবাদের প্রতিবাদ করার কোন অর্থ হয় না। কথায় আছে, চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। তৃতীয়তঃ প্রতিবাদ দেয়াটাই যদি প্রবন্ধকারের কাছে সত্য-মিথ্যার একমাত্র মানদন্ড হয়, তাহলে গত লেখার এতগুলো বিষয় প্রতিবাদ করলাম ও তার সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরলাম তবুও তিনি কেন 'ভিত্তিহীন' ও 'কল্পনাপ্রসূত' বলছেন?
চুক্তি পক্ষ-বিপক্ষ ও সেনা অভিযান প্রসঙ্গে
প্রবন্ধকার দৈনিক সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, যেদিন (৫ আগষ্ট) সংবাদে আমার লেখাটি প্রকাশিত হয় সেদিনই খাগড়াছড়িতে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডারের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের সংবাদ প্রকাশিত হয়। আগের লেখাতেই উল্লেখ করেছি, ইউপিডিএফের চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিরোধ করতে গিয়ে যদি কেউ সংগঠিত হয় তাহলে এক্ষেত্রে জনসংহতি সমিতি তার দায়িত্ব নিতে পারে না বা 'চুক্তি পক্ষীয়' নাম দিয়ে জনসংহতি সমিতির ঘাড়ে তার দায়ভার চাপিয়ে দেয়া যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। বলাবাহুল্য, কোন কোন সংবাদপত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই 'চুক্তি পক্ষ'কে জনসংহতি সমিতি হিসেবেও উল্লেখ করে থাকে। শাসকগোষ্ঠীর এটা পুরানো কৌশল যে, যত সন্ত্রাসই হোক সব দায় জনসংহতি সমিতির।
তিনি বলেছেন, 'সন্ত্রাসীবিরোধী অভিযান শুরু করলে সমস্বরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতন-হয়রানির অভিযোগ তোলা হয়।' এ প্রসঙ্গে গত ২৩ জুলাই মানিকছড়ি উপজেলার ফকিরনালা গ্রামে সেনা অভিযানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২২ জুলাই দুই বিবাদমান গ্রুপের মধ্যে গভীর জঙ্গলে বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়। তারপর দিন সিন্দুকছড়ি জোনের ক্যাপ্টেন আজিজ ফকিরনালা গ্রামের জুম্ম অধিবাসীদের নিয়ে ক্যাম্পে তথাকথিত এক মিটিং ডাকেন। মিটিং-এ গ্রামবাসীরা সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে তথ্য দিতে না পারার কারণে এক পর্যায়ে সেনা সদস্যরা গ্রামবাসীদের এলোপাতাড়ী মারধর করে। পরে অন্যান্য গ্রামবাসীরা ছাড়া পেলেও আপ্রুশী মারমা ও সুজাই মারমা গুরুতর আহত অবস্থায় সেনা হেফাজতে আটকে রাখে। এই অবস্থায় উক্ত নীরহ দুই গ্রামবাসীকে উদ্ধার করতে শত শত গ্রামবাসী সমবেত হয় এবং একপর্যায়ে উদ্ধার করে রাস্তায় নিয়ে আসে। এ সময় উক্ত দু'জন আহত গ্রামবাসীদের হাসপাতালে নেয়ার পথে সেনা সদস্যরা আবার গ্রামবাসীদের উপর চড়াও হয়। এ সময় হাসপাতালের সামনে সেনাবাহিনী ও পাহাড়ী-বাঙ্গালীর মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এহেন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে লক্ষ্মীছড়ি জোনের লেঃ কর্ণেল মোঃ মোমেন খান ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। এসে তিনি আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসার জন্য চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন। তাৎক্ষণিকভাবে মানিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ উক্ত লক্ষ্মীছড়ি জোন কম্যান্ডার জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান করেন। এ সময় জোন কম্যান্ডার সেনা সদস্যদের এহেন অযাচিত ও অমানুষিক নির্যাতনের জন্য জনতার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং তার জন্য ক্ষমা চান। তিনি সে সময় উক্ত সেনা নির্যাতন তদন্তের আশ্বাস প্রদান করেন।
উক্ত সেনা কর্মকর্তাকে সাধুবাদ জানাই জনতার ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য। এ রকম সেনা অভিযান ও নির্যাতন প্রতিনিয়ত হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরীহ জনতা সংঘবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করার সাহস পায় না কিংবা লক্ষ্মীছড়ি জোন কম্যান্ডারের মতো প্রগতিশীল ও সংবেদনশীল কম্যান্ডার থাকে না। অপরদিকে সঙ্গত কারণেই এসব সেনা নিপীড়নের উপর রিপোর্ট করার সাহস পার্বত্যাঞ্চলের অধিকাংশ সংবাদদাতার থাকে না। ফলতঃ এসব ঘটনা সংবাদপত্রের পাতায়ও স্থান পায় না, যেমনটি পায়নি ফকিরনালার উক্ত ঘটনা। প্রথমতঃ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক সেটা পার্বত্যবাসী চায়। কিন্তু সেটা হতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও পার্বত্যাঞ্চলে বিদ্যমান আইন মোতাবেক। দ্বিতীয়তঃ সন্ত্রাসীদের তল্লাসীর নামে সাধারণ মানুষের উপর হয়রানি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তৃতীয়তঃ সেনা নির্যাতনকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিরূপ ধারণাই সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার ও 'অনির্বাচিত ব্যক্তি' প্রসঙ্গে
প্রবন্ধকার বলেছেন, 'চুক্তির কোথাও নেই যে, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার সংক্রান্ত রিপোর্ট কোন অনির্বাচিত ব্যক্তিকে প্রদান করতে হবে।' প্রথমতঃ চুক্তির 'ক' খন্ডের ৩নং ধারায় এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্যকে আহ্বায়ক এবং এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতিকে সদস্য করে একটি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করার বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এরফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির একজন সদস্য হিসেবে জনসংহতি সমিতির সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সরকারী অগ্রগতি প্রতিবেদন পাওয়ার অধিকার রাখেন। এখানে নির্বাচিত-অনির্বাচিত প্রশ্ন অবান্তর। দ্বিতীয়তঃ যে কোন চুক্তিতে সাধারণতঃ খুঁটিনাটি বিষয়সমূহ উল্লেখ থাকে না। তাই সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার সংক্রান্ত রিপোর্ট কাকে কাকে দিতে হবে তা পার্বত্য চুক্তিতে উল্লেখ থাকার প্রশ্নই উঠে না। তৃতীয়তঃ চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির একজন সদস্যকে 'অনির্বাচিত ব্যক্তি' হিসেবে অজুহাত তুলে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রদানে অসম্মতির মাধ্যমে তাঁর পার্বত্য চুক্তি বিরোধী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলা যায়। প্রবন্ধকারের মতো সেনা কর্মকর্তাদের এই চুক্তি বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই উদ্বেগজনক।
'গণতন্ত্রের প্রতি জনসংহতি সমিতির অঙ্গীকার সম্পর্কে সংশয়'
পরিশেষে প্রবন্ধকার 'গণতন্ত্রের প্রতি জনসংহতি সমিতির অঙ্গীকার সম্পর্কে সংশয়' ব্যক্ত করেছেন। বলাবাহুল্য, 'সংশয়'বাতিকতা পরস্পরের আস্থা অর্জনের বাধা সৃষ্টি করে। এদেশের শাসকগোষ্ঠী বরাবরই জুম্ম জনগণের উপর এই সন্দেহ ও সংশয় পোষণ করে আসছেন। তারই ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান আমলে জুম্ম জনগণকে 'ভারতপন্থী' এবং আবার স্বাধীনতা অর্জনের পর 'পাকিস্তানপন্থী' হিসেবে আখ্যায়িত করতে দেখা যায়। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবির সাথে 'জনসংহতি সমিতির কোন অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের' বা 'দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপতৎপরতার যোগসূত্র' খোঁজা হয়। এমনকি 'উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যু ও ঘটনা ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর ওপর দোষ চাপানো' এবং 'জনসংহতি সমিতি সকল অস্ত্র জমা না দেয়া' ইত্যাদি মনগড়া সংশয়ও পোষণ করা হয়। 'সংশয়'বাতিক রোগ থেকেই পার্বত্য সমস্যা সমাধানে গঠনমূলক ও ইতিবাচক উদ্যোগের পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক নীতিই অনুসৃত হয়ে আসছে। পার্বত্যবাসী কামনা করে, লেঃ কর্ণেল নজরুল ইসলামদের এই জাতিগত বিদ্বেষমূলক 'সংশয়' প্রবণতা 'সংবেদনশীলতা'য় রূপান্তরিত হোক। বলাবাহুল্য, ক্ষুদ্র জাতি হিসেবে 'সংকীর্ণতা'র (প্রবন্ধকারের ভাষায় 'সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ') উর্ধ্বে গিয়ে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে জুম্ম জনগণ তথা পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীরা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখন দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বড় জাতি হিসেবে প্রবন্ধকারদের জাত্যাভিমান বিসর্জন দিয়ে ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতঃ সেনাশাসন 'অপারেশন উত্তরণ'সহ অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা বাঞ্ছনীয়।
সমস্যা সমাধান কোন পথে?
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এ সমস্যাকে জাতীয় পর্যায়ে ও রাজনৈতিক উপায়ে সমাধান করতে হবে। বিগত তিন দশক প্রমাণ করেছে যে, সামরিক উপায়ে বা সেনাশাসন জারী রেখে এ সমস্যা সমাধান করা যায়নি। এ সমস্যাকে রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু উক্ত চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার পক্ষের গড়িমসির কারণে এবং স্বার্থান্বেষী সুযোগসন্ধানী মহলের চুক্তি বিরোধী তৎপরতার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি দিকে ধাবিত হচ্ছে। জুম্ম জনগণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে সরকারের প্রতি একপ্রকার অনাস্থা ও অসন্তোষ গড়ে উঠছে। চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে চুক্তি বিরোধীতাকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে এবং সেই সুযোগে নিজের কায়েমী স্বার্থ চরিতার্থ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, সন্ত্রাস ইত্যাদি দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণীত হলেও এই আইনসমূহ যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি। এসব আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহকে আইন মোতাবেক সকল বিষয় ও কার্যাবলী অর্পণ করা হয়নি। পক্ষান্তরে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের নির্বাচন না দিয়ে একের পর এক সরকার অন্তবর্তী পরিষদসমূহের মেয়াদ বাড়িয়ে অগণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করছে। ফলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। অধিকন্তু সরকার আঞ্চলিক পরিষদের কার্যবিধিমালা বছরের পর বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলশ্রুতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ইহার উপর অর্পিত বিষয়াবলী যথা- অত্রাঞ্চলের সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, উন্নয়ন, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সংস্থাসমূহের কার্যাবলীসহ অন্যান্য কার্যাবলী সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্বভাবতই পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি সমস্যা সমাধান না হওয়ার ফলে এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। চুক্তি মোতাবেক আভ্যন্তরীণ পাহাড়ী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসিত না করার ফলে তাদের দুর্বিসহ জীবন করতে হচ্ছে। ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তি মোতাবেক প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্থীদের ৩.০৫৫ পরিবারকে তাদের জমিজমা ফেরৎ না দেয়ার কারণে তারা এখনো নিজ দেশে পরবাসী জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী, আধা-সরকারী, পরিষদীয় ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে জুম্মদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগের বিধান কার্যকর না হওয়ার ফলে বিশেষ শাসনব্যবস্থার অনুকূল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চুক্তি মোতাবেক সকল সেনা, আনসার, এপিবি ও ভিডিপির অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার না করা ও পক্ষান্তরে 'অপারেশন উত্তরণ' জারী করে সেনাশাসন বলবৎ রাখার ফলে গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা তথা পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই। পার্বত্যবাসী আশা করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের যে ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা নষ্ট হোক লেঃ কর্ণেল নজরুল ইসলামরাও কামনা করেন না। কাজেই চুক্তি মোতাবেক অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারসহ চুক্তির উল্লেখিত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে নজরুল ইসলামের মতো সেনা কর্মকর্তারা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন পার্বত্যবাসী তা আশা করে।
[জুম্ম সংবাদ বুলেটিন, বুলেটিন নং- ৩৫, ১৫ বর্ষ, ১০ নভেম্বর ২০০৫ থেকে নেয়া প্রবন্ধ]
লেখক চন্দ্র শেখর চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
.jpg)
No comments:
Post a Comment